নাইজেরীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক স্যার বেন গোল্ডেন এমুওবোহো ওকরি, সংক্ষেপে বেন ওকরি নামে সারা বিশ্বে পরিচিত। পোস্টমডার্ন ও পোস্টকলোনিয়াল ধারার আফ্রিকান সাহিত্যিকদের মধ্যে তাঁকে অগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, বক্তা ও পরিবেশবাদী অ্যাক্টিভিস্ট। ওয়েস্ট সেন্ট্রাল নাইজেরিয়ার মিন্না শহরে ১৯৫৯ সালের ১৫ মার্চ তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা ইয়োরুবা এবং মা অর্ধ-ইগবো গোত্রের হওয়ায় নাইজেরিয়ার অসংখ্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে প্রধান দুই গোষ্ঠীর ঐতিহ্যিক পরম্পরা তিনি বহন করেন। বেন ওকরির বয়স যখন ২ বছরেরও কম তখন তাঁর পরিবার লন্ডনে চলে যায় এবং ১৯৬৬ সালে পুনরায় নাইজেরিয়ায় ফিরে আসে। নাইজেরিয়ার লাগোস শহরে তাঁর পিতা আইন পেশায় নিয়োজিত হন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত নাইজেরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালে বেন ওকরি স্থানীয় কলেজে সেকেন্ডারি লেভেলের ছাত্র ছিলেন। ওই যুদ্ধ বেনের কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করেছিল যা পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যকর্মে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে যায়গা করে নেয়। ১৯৭৮ সালে বেন ওকরি নাইজেরিয়া সরকারের বৃত্তি নিয়ে এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করতে লন্ডন চলে যান। ১৯৮০ সালে ২১ বছর বয়সে প্রথম উপন্যাস ‘ফ্লাওয়ার্স অ্যান্ড শ্যাডোস’ প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যিক যাত্রা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ১৯৯১ সালে ‘দ্য ফেমিশড রোড’ ট্রিলজির প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ফেমিশড রোড’ এর জন্য তখনকার মতো সবচেয়ে কম বয়সে (৩২) ম্যান বুকার পুরস্কার পেলে আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক পরিমন্ডলে লেখক হিসেবে বেন ওকরি সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি তাঁর সাহিত্য কর্মের জন্য কমনওয়েলথ রাইটার প্রাইজ, আগা খান প্রাইজ, গার্ডিয়ান ফিকশন প্রাইজসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অনেক পুরুস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের অনেক নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। ১৯২৩ সালে তাঁর জন্মদিনে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেছে। কথাসাহিত্যে খুব বেশী সমাদৃত হলেও তিনি নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় কবি পরিচয়টি প্রথমে উচ্চারণ করেন। ১৯৯১ সালে ম্যান বুকার পুরস্কার পাওয়ার পরের বছরেই অর্থাৎ ১৯৯২ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘অ্যান আফ্রিকান এলিজি’ প্রকাশিত হয়। বেন ওকরির কাজ অধ্যাত্মিকতা, দার্শনিকতা, বাস্তব ও পরাবাস্তবের মধ্যে এক ধরনের সংযোগ স্থাপন করে। অনেক সমালোচক তাঁর বেশকিছু কাজকে আফ্রিকান ম্যাজিক রিয়েলিজম হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অনেকেই বলেন ফ্যান্টাসি রিয়েলিজম। কেউ কেউ তাকে আফ্রিকার ‘মার্কেজ’ হিসেবেও উল্লেখ করে থাকেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কর্মের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস: ফ্লাওয়ার্স অ্যান্ড শ্যাডোস, দ্য ফেমিশড রোড, দ্য ল্যান্ডস্কেপ উইদিন, সংস অব এনচেন্টমেন্ট, অ্যাশটোনিশিং গড, ডেঞ্জারাস লাভ, ইনফিনিট রিচেস, ইন আর্কেডিয়া, স্টারবুক, দ্য এজ অব ম্যাজিক, ফ্রিডম আর্টিস্ট, দ্য লাস্ট গিফট্ অব দ্য মাস্টার আর্টিস্টস; ছোটগল্প: ইনসিডেন্টস এট দ্য শ্রাইন, স্টারস অব দ্য নিউ কারফিউ, টেলস অব ফ্রিডম, প্রেয়ার ফর দ্য লিভিং; প্রবন্ধ: বার্ডস অব হ্যাভেন, অ্যা ওয়ে অব বিয়িং ফ্রি, অ্যা টাইম ফর নিউ ড্রিমস; কবিতা: অ্যান আফ্রিকান এলিজি, মেন্টাল ফাইট, ওয়াইল্ড, রাইজ লাইক লায়নস:পোয়েট্রি ফর মেনি এবং অ্যা ফায়ার ইন মাই হেড: পোয়েমস ফর দ্য ডন ইত্যাদি।
আফ্রিকার ঔপনিবেশিক, উত্তর-ঔপনিবেশিক সংকট, নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং প্রেম ও মৃত্যু সম্পর্কিত চিরায়ত ভাবনার পটভূমিতে রচিত ‘অ্যান আফ্রিকান এলিজি’ বেন ওকরির প্রথম প্রকাশিত কাব্যসংকলন। ২০২৪-এর ডিসেম্বর মাসে সংকলনটি কবি ও অনুবাদক তানভীর রাসেল-এর অনুবাদে ‘আফ্রিকার শোকগাথা’ নামে উজান প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন নির্ঝর নৈঃশব্দ।
আফ্রিকার শোকগাথা
আমরা সেই অলৌকিক ব্যাপার
সময়ের তিক্ত ফলের আস্বাদ দিতে ঈশ্বরই যা ঘটিয়েছেন।
আমরা মহার্ঘ্য,
আমাদের যাতনাগুলোও একদিন বিশ্বের বিস্ময় হবে।
যা কিছু আমাকে পোড়ায় এখন
আমার সুখ সেগুলোকেও দেয় সোনালি বৈভব।
তোমরা কি বোঝ আমাদের বেদনার নিগূঢ় রহস্য?
এই যেমন দারিদ্র্যের ভার কাঁধে নিয়েও
দিব্যি গান গাই আর মিষ্টি সব স্বপ্ন দেখতে পারি।
আমরা কখনোই অভিশাপ দেই না আন্তরিক বাতাসকে
সুমিষ্ট ফলকে
কিংবা জলের উপর আলোর বিনীত নাচনকে।
কষ্টের উপকরণগুলোকেও আমরা আশীর্বাদ করি;
আশীর্বাদ করি সুগভীর স্তব্ধতায়।
এজন্যেই আমাদের সংগীত এত মধুর যাকে বাতাসও পারে না ভুলতে।
অনেক গোপন অদ্ভুত ব্যাপার থাকে আমাদের কর্মে,
সময়ই একদিন প্রকাশ করবে সব।
আমিও শুনেছি মৃতদের গান।
তারা গায় যে, এ জীবনই ভালো
হোক তার বিনীত যাপন, সাথে নিয়ে আগুন ও আশা।
এখানেই বিস্ময়।
এখন অদৃশ্য পদক্ষেপের সবকিছুতেই চমক
সাগরে সুরের লহরি
আকাশ প্রতিপক্ষ নয়
নিয়তিই আমাদের বন্ধু।
পড়ে পাওয়া মাধুর্য
ঝড়ো বাতাস যখন ভিক্ষুককে তুলে নেয়
তার আবর্জনার বিছানা থেকে
এবং উড়িয়ে নিয়ে যায় রাস্তার শেষপ্রান্তে শূন্য পানশালায়,
তখন চরাচর জুড়ে থাকে কেবলি ভোরপূর্ব পৃথিবীর নীরবতা
আর থাকে গাছেদের নিঃসঙ্গতা।
হ্যান্ডেল-এর সঙ্গীত
রহস্যময়ভাবে মনে করিয়ে দেয়
আমার কাটতে না চাওয়া শৈশবের সেই ভ্যাপসা রাতগুলির কথা—
বিশাল সমুদ্রের কোল ঘেঁষে সমৃদ্ধ মাজারগুলোর মাঝে
সেই ম্যালেরিয়াময় বস্তিতে।
অতীতের স্বপ্নগুলো গান গায় ভবিষ্যতের কণ্ঠে।
আর পৃথিবী এখন আচ্ছাদিত এমন মাধুর্যে যা তার প্রাপ্য নয়
ফুলগুলো গুনগুন করে অদেখা মৌমাছিদের স্বরে।
বাতাস ভরে ওঠে সেইসব গাছের জোরালো নিঃসঙ্গতায়
যাদের প্রতিরাতের ফিসফাস জুড়ে থাকে
পৃথিবীকে পুনর্দখলের কথা।
কিন্তু রাত গাছগুলোকে চালান করে দেয় আমার স্বপ্নের ভেতর
আর তারকারাজি তাদের মাধুরীসমেত ঝরে পড়ে
আমার নিঃসঙ্গ, জগত-পোড়া হাতে।
নোট: জর্জ ফ্রেডরিক হ্যান্ডেল (১৬৮৫-১৭৫৯) হলেন জার্মান বংশোদ্ভূত বিখ্যাত ব্রিটিশ মিউজিক কম্পোজার।
আমরা উদ্ভট সব গান গাই
আমরা যন্ত্রণার মুখে ছুড়ে দেই
উদ্ভট সব গান।
আর দৃষ্টিসীমার মধ্যেই করি ছোটখাটো অভিনয়।
আমরা অসার গানবাজনায় মাতি
শরীরী নকশাবাজি জড়িয়ে যায় ক্ষমতার বিলোপ আর বাষ্প-বুদবুদে:
ওপর থেকে চুইয়ে পড়া জল-ঠোকর আর আঘাতের শিকার আমরা।
আমরা উদ্ভট সব গান গাই
যখন সবকিছুই তলিয়ে যায় তুচ্ছতায়।
কথার অম্লে গলে যায় সাধারণ বিশৃঙ্খলা:
চোখের ভেতরে—
একটি যুতসই জোরালো রসায়ন
আতঙ্কের চাদরে ঢাকা মুখগুলোকে মুক্ত করে দেয়
আর চুরমার করে দেয় যন্ত্রণাদগ্ধ যাত্রার নৈঃশব্দ্যকে।
স্বপ্নেরা বেঁচে থাকে নীরবে
আমাদের গানে
আমাদের চোখজুড়ে।
আমরা উদ্ভট সব গান গাই
যখন সবকিছুই তলিয়ে যায় তুচ্ছতায়।
জীবন একটা আগুন
জীবন একটা ক্রুশকাঠ
পাথরকঠিন মুখের যে কেউ
তা অনুধাবন করতে পারে।
অনেক সমুদ্রে আমরা হারিয়ে যাই
সর্বাংশে ডুবে যাই
মুখোমুখি সংঘাতের ব্যর্থতায়।
বৃষ্টি, যা ভিজিয়ে দেয় আমাদের দরোজার চৌকাঠ,
তার কোন সম্পর্কই নেই সরলম আকাঙ্ক্ষা আর ক্ষতগুলোর সাথে
যা আমরা বয়ে আনি জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজে।
ভগ্ন পথে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটি
শুনতে পায় আমাদের ক্ষুধার চিৎকার।
কিছু না বুঝে ফিরিয়ে দেয় প্রতিধ্বনি
প্রেমের প্রাচীনতম পরিত্যাগের দিকে।
ভয়াবহতার পূর্ববর্তী ক্ষুদ্র বিপর্যয়গুলো
প্রতিধ্বনিত করে বর্ণনাতীত অনুভূতিকে।
মায়েরা, যারা অল্প শব্দেই জেগে ওঠে
বাবারা, যারা ধুমপান করে সারারাত
আর আমরা বাকীরা
যারা দমিতঘুমের দানবদের ব্যাপারে সতর্ক থাকি,
ভোরবেলায় খুঁজে পাই
আমাদের বিভ্রান্তির স্পষ্টতম ছবি।
এমনকি অজ্ঞতার বোঝার নিচে
সেরা জিনিসগুলোও ধসে যায়।
জীবন একটা আগুন,
যাকে বুঝতে পারে যেকোনো তরঙ্গের আঘাত।
আর যদি তুমি আমাকে ছেড়ে যাও
আর যদি তুমি আমাকে ছেড়ে যাও
তবে বলব ক্যাসান্ড্রার ভূত পেরিয়ে গেছে চোখ ভেদ করে।
বলব, বিদ্বেষ বুকে তারারা আলোকিত করে আকাশ
শুধু আমার যন্ত্রনা বাড়াতেই।
আর ঢেউগুলো আছড়ে পড়ে তীরে,
চোখে-মুখে ছড়িয়ে দিতে নুনের দহন:
তুমি আমাকে পুনরায় জুড়ে দাও
আকাশের সব আলোয়
ঢেউয়ের লবণে
আর বাতাসে মিশে থাকা পুরাণে।
তোমার চলে যাবার সাথে সাথে
সন্ধ্যাটা হয়ে উঠবে এতটাই অন্ধকার, স্বপ্নই দেখা যাবে না
আর সকালটা হবে এতটাই উজ্জ্বল, তাকানোই যাবে না।
কবি ঘোষণা করছে
আমাদের সবার জন্যই আসে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে।
সবার জন্যেই আসে
এই ধাতব কাঁপুনে বাতাস
নভেম্বরের হিমশীতল হাত
এমন অদ্ভুত এক ঋতুতে
যখন মনের বল হারিয়ে যায়
আর অবধারিত সফেদ নিয়তির ধার আঘাত হানে
বিশ্বজুড়ে বিচরণ এবং সেই তারাদের সাথে পরিভ্রমণের
আকাশচুম্বী স্বপ্নের উপর,
যে তারাদের আগুন আত্মার ঝলকানি ছাড়া কিছু নয়।
ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আমাদের সবার জীবনেই এমনটা ঘটে—
আত্মার ভিত কেঁপে উঠা
শয়তানের বাঁধ খুলে যাওয়া
আদিম শক্তির বিস্ফোরণ
আমাদের স্বর্গীয় ভয়ের সতর্ক অনুপ্রবেশ।
মরচে ধরা এই বরফশীতল মাসে
লালচে চোখ আর পোড়া আঙুল নিয়ে
আমি একাত্ম হই প্রাচীন স্বপ্নের অঙ্গারগুলোর সাথে।
সঙ্গীত আমার আত্মাকে আলোকিত করুক
সীমার অধিক দূর ভ্রমণে যাব আমি
খুঁজে পেতে
নতুন আলোর উপহার।
ছবির বিলাপ
তারা নিয়ে গেল মুখোশগুলো
বলিদানের মুখগুলো
নিয়ে গেল কারুকার্য খচিত চারুকাঠ
যা প্রসারিত হতো অকৃত্রিম দেবতাদের জ্বালানো আগুনের দিকে,
আর সেই পবিত্র আঁধারগুলো
যেখানে বজ্রবিদ্যুতের কুঠার ছড়াতো অদৃশ্য রুপালি শক্তি।
নিয়ে গেল রঙকরা হাড়গোড়
ছাঁচে গড়া রাজমূর্তির আসন
চিতার পবিত্র ব্রোঞ্জমূর্তি
রক্তরঞ্জিত প্রতিমাগুলি;
আর জ্বালিয়ে দিল সবই, যা ছিল তাদের বোধের অতীত।
পুড়িয়ে দিল সব
যা কিছু তাদের আতঙ্কিত করত
আদিম স্বপ্নের ভয়াল শক্তিতে,
যা কিছু ধারণ করত ত্রাসের গোপন রহস্য
যা কিছু যুদ্ধ করত আতঙ্কের সাথে এই ভূমিতে
এবং যা কিছু সহায়ক ছিল শস্য উৎপাদনের,
যা কিছু কথা বলতো ঈশ্বরের সাথে নিবিড় নৈকট্য
আর অসীম দূরত্বের মহিমায়;
জ্বালিয়ে দিল সব
স্তূপ করে
অভূতপূর্ব ভক্তিতে।
তারা কিছু ছবিও নিল
এবং নিয়ে গেল ফ্যাকাশে সমুদ্রগুলো পাড়ি দিয়ে
রেখে দিল ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য
আফ্রিকার মানুষদের ধূসর আর দুর্ভেদ্য হৃদয়কে বুঝতে।
তাদের কাছে এসব ছিল 'আদিম বস্তু’
যা অধীন হলো বৈজ্ঞানিক ব্যাখা-বিশ্লেষণের।
২.
ছবিগুলোর আত্মাই মরে গেল
আর পাশ্চাত্যের অন্ধকারে ডুবে মুখগুলো হলো বিকৃত।
নিজভূমে তৈরি হলো নতুন সব ছবি
নতুন ঋতুর জন্য,
জন্ম হলো নতুন ঈশ্বরের
নতুন যুগের প্রয়োজনে।
ছবিগুলো যখন কথা বলে উঠল ভুলে যাওয়া মৃত্যুর ভাষায়,
ভিনদেশি শিল্পীরা দুমড়ে-মুচড়ে দিল সেই কথামালার যাতনাকে
আর সৃষ্টি করল এক নতুন রসায়ন, যা প্রচল প্রথার ভয় থেকে মুক্ত।
তারা একেই বলল
শিল্প।
৩.
আফ্রিকানদের ধূসর আর দুর্ভেদ্য মনের গোপন স্থানগুলো
গভীর রাতের আত্মাকে ছুঁয়ে যায়।
মুখোশগুলো এখনও জ্যান্ত
এখনও কথা বলে
কিন্তু খুব কমলোকই শুনতে পায় সেই ভয়ার্ত মন্ত্রোচ্চারণ,
যা জন্ম দেয় প্রচল প্রথার অন্ধকার আর আলোর শক্তি
মনের পুনর্জাগরণের মাঝে।
ছবির কারিগরেরা ঠিকঠাক আগলে রেখেছিল
তাদের গোপন কৌশলগুলো,
যেহেতু মুখোশগুলো হারিয়ে যাবার পর
এই দেশ প্রায় ভুলেই গেছে তার প্রাচীন সব গান;
আত্মাদের জগত থেকেও হয়েছে সম্পর্কহীন।
৪.
আত্মারা মরিয়া, আমাদের স্পর্শ ও সংযোগ পেতে
নিঃসঙ্গতার ভেতর বাস করে করে তারা আজ পাগলপ্রায়!
তারা দখল নেয় আমাদের হৃদয়ের, আঁকড়ে ধরে স্বপ্নগুলোকেও
ভারাক্রান্ত করে আমাদের সৃষ্টির উল্লাসকে,
আর যখন তখন আমরা চিৎকারে ফেটে পড়ি অদ্ভুত ভাষায়।
হিংসার লাল আগুন ছড়িয়ে পড়ে মহাদেশজুড়ে
ভেসে বেড়ায় আমাদের আকাশে আকাশে।
ছবির কারিগরেরা
এখনও আছে আমাদের মাঝে,
শুনতে হবে তাদের কথাগুলো
আবার শিখে নিতে হবে পুরোনো সব গান
পুর্ণ করে নিতে হবে
আমাদের মৃতপ্রায় যুগের মানসিক শূন্যতাগুলো;
নতুবা জুটবে স্বর্ণালি সঙ্গীতহীন মূক আর অন্ধের জীবন
রহস্যময় শঙ্কাকুল ব্রহ্মাণ্ডের মহান সব স্বপ্ন-বিচ্যুত হয়ে।