পুরস্কার এক ধরনের তিরস্করণী মুকুট, এই বাংলাদেশে। সহজ কথায়, এক প্রকার জুতার মালা।
বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রায় অবধারিতভাবে বলা যায় পুরুষকারই পুরস্কারের মানদণ্ড। ‘পুরুষকার’ বলতে আমরা বোঝাতে চাইছি, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে ব্যক্তির দাপুটে অবস্থান। রাষ্ট্র ও তার এজেন্সিগুলো ব্যক্তির ওই অবস্থানকেই মূলত পুরস্কৃত করে, তার সাহিত্য বা সৃজনশীলতাকে নয়। সেইজন্য, এই কালে এই রাষ্ট্রে যখন কেউ পুরস্কার পায় তখন তাকে অভিনন্দন জানানো যেতেই পারে, বিশেষ ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি অর্জনের জন্য। কিন্তু সাহিত্যকৃতির জন্য কস্মিনকালেও নয়।
আর তাই আমাদের অভিশংসন, ঘৃণা ও ধিক্কারের একমাত্র প্রাপক পুরস্কার-কমিটি ওরফে জুরিবোর্ড। এরাই প্রকৃতপক্ষে সাহিত্যের পরিবেশ দূষিত করে তুলছে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে। বলা ভালো, নৃশংসভাবে। কেননা তাদের মিসলিডিং বিচারকার্যে যেভাবে পাঠক বিভ্রান্ত হয়ে নিম্নরুচির উদযাপনে স্বস্তি খোঁজে এবং নবীন লেখক উদ্ভ্রান্ত হয়ে নিম্নমানের সাহিত্য রচনায় ব্রতী হয় তা নৃশংসতারই শামিল। এ কথাও বলা উচিত, এসব জুরিবোর্ড সব সময়ই ভালো সাহিত্যকে আড়াল করে দাঁড়ায়। এও এক সাংস্কৃতিক হত্যাকাণ্ড বটে।
দিনের পর দিন এসব চলতে থাকলে জুরিবোর্ড গ্রহণযোগ্যতা হারাবে, এ সত্য তাদের চেয়ে ভালো কে জানে। সে কারণেই নিজেকে ন্যায্যতা দিতে মাঝে মাঝে তাকে প্রকৃত সাহিত্যিকের সন্ধানে নামতে হয়। আর তাতে আমরাও আশায় বুক বাঁধি ‘ভালোরা আলোর মুখ একদিন দেখবেই’ এই প্রত্যয়ে।
কিন্তু চূড়ান্তপর্বে গিয়ে দেখি সাজ্জাদ শরিফ আমাদের হাতে এই পাখি বলে বইটি দিয়ে বলেন, আমরা আলতাফ হোসেনের জন্য কিছু করতে চাই।
খারাপ সাহিত্য পুরস্কৃত হলে কী ঘটে সেটা নির্মোহভাবে বুঝে নেওয়া দরকার। প্রথমত, অযোগ্য ব্যক্তির সামান্য তারকাখ্যাতি জোটে, বাড়ে সামাজিক পরিসর। তাতে হয়তো আমাদের চোখ টাটায়। গোপনে কারও বুক ফাটায়। সেটা ঈর্ষায় নয়, ক্ষোভে। দ্বিতীয়ত, অদীক্ষিত অর্বাচীন লেখক ওই খারাপ সাহিত্যকে আদর্শ ভেবে অগ্রসর হয় এবং নিজেকে সেভাবে প্রস্তুত করে। তৃতীয়ত, মেধাবী লেখক খানিকটা ডিমোরালাইজড হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে সাংস্কৃতিক অবনমন ঘটতে থাকে একটি গোষ্ঠীর, কখনোবা জাতির।
পুরস্কার-প্রদানের পাপাচার কিভাবে সংঘটিত হয়, তার একটা প্রামাণ্য দলিল হাজির করা যাক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘চিহ্ন’ পত্রিকার দশকপূর্তি সংখ্যায় খোন্দকার আশরাফ হোসেনের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। তার একটি অংশ তুলে ধরছি :
চিহ্ন : আমাদের দশকপূর্তিতে আপনার আগমনকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু শুরুর প্রশ্নটা করতে হচ্ছে বিস্ময়ের সঙ্গে। মাত্র কয়েকদিন আগে ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা গ্রন্থ ২০০৯’ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা জানি সিলেকশন বোর্ডে আপনিও একজন সম্মানিত বিচারক ছিলেন। জানতে পারি কি আলতাফ হোসেনের পাখি বলে কবিতাগ্রন্থে কী এমন বিশেষত্ব আপনারা পেলেন?
খো. আ. হো : দেখুন এ বিষয়ে বলতে গেলে একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যেতে হবে। মনোনয়নের জন্য আমাদের কাছে সর্বশেষ যে ৩৬টি বই দেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে এ বইটির নাম ছিল না। আমরা হরিশংকর জলদাসের একটি বই মনোনয়ন দিয়েছিলাম। কিন্তু চূড়ান্তপর্বে গিয়ে দেখি সাজ্জাদ শরিফ আমাদের হাতে এই পাখি বলে বইটি দিয়ে বলেন, আমরা আলতাফ হোসেনের জন্য কিছু করতে চাই। আমরা তখন রাগ করে বেরিয়ে আসতে চাইলে অনুষ্ঠানটি করে যাওয়ার জন্য আমাদের অনুরোধ করা হয়। আসলে এটা আমাদের বিচারকদের মনোনয়ন নয়। প্রথম আলোর মনোনয়ন।
২
বিগত বছর দুয়েক ধরে একটা তর্ক চালু আছে মাসরুর আরেফিনের আগস্ট আবছায়া উপন্যাসকে কেন্দ্র করে। বলা ভালো, বইটির ব্লার্ব-রচয়িতা হাসান আজিজুল হককে কেন্দ্র করে। উপন্যাসটি সম্পর্কে হাসানের শংসাবচন পাঠ করে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছিলেন কতিপয় কথাসাহিত্যিক। তাদের চাপে পড়ে সেই শংসাবচন নিজের লেখা নয়, বরং অনানুষ্ঠানিক টেলিফোন-আলাপ বলে একবার ঘোষণা দেন বিচলিত আজিজুল হক। আবার একই সঙ্গে তার পূর্বের অবস্থানও ধরে রাখেন। হাসানের অবস্থা হয়েছিল এমন যে, কুল রাখি না শ্যাম রাখি। আমরা, দূরবর্তী পাঠকরা, এই রোমাঞ্চকর রহস্য পুরোপুরি ভেদ করতে পারি নি আজও। এর সত্যাসত্য নিরূপণ করা সম্ভব হয় নি স্বাভাবিকভাবেই।
তবে, জাকির তালুকদার ও স্বকৃত নোমানের অম্লমধুর কথা-চালাচালিতে আরেকটা বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হলো, সাহিত্য-বিচারে হাসান আজিজুল হক ছিলেন অস্থির এবং অসৎ।
অতিসম্প্রতি তর্কটা আবার তুলেছেন জিগর-জ্বলা কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার। তাকে এনকাউন্টার করতে মাঠে নেমেছেন তরুণ তুর্কি অথবা বাংলার বর্গি স্বকৃত নোমান। তাদের লড়াইয়ের মূল জায়গাটা হাস্যকর। একজন দাবি করছেন, শংসাবচন লেখার জন্য হাসান আজিজুল হক মাসরুরের তরফ থেকে বিশ-ত্রিশ হাজার টাকার চেক পেয়েছেন। অন্যজনের দাবি, চেক নয়, অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা জমা দেয়া হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, তারা দুজনেই দুজনকে অভিহিত করেছেন তেলবাজ হিসেবে। বিদেশ-গমন, সার্টিফিকেট-অর্জন ও পুরস্কার-গ্রহণ এসব ক্রিয়াকাণ্ডে বিভিন্ন মেশিনম্যানকে তৈলমর্দন করতে হয় বলে আমরা এতদিন শুনে এসেছি আড়ি পেতে। এবারে তা জানতে পারলাম সাক্ষীর জবানিতে। এ জন্য কোনো কোনো দুষ্টু পাঠক বলে থাকেন, লেখকদের মধ্যে মাঝে মাঝে স্বার্থ-সংঘাত হওয়া ভালো, আমাদের জন্য স্বাস্থ্যকর। ভদ্র পাঠিকা অবশ্য বলেন, লেখকদের খুব কাছে না যাওয়াই নিরাপদ।
তবে, জাকির তালুকদার ও স্বকৃত নোমানের অম্লমধুর কথা-চালাচালিতে আরেকটা বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হলো, সাহিত্য-বিচারে হাসান আজিজুল হক ছিলেন অস্থির এবং অসৎ। আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের বিচার ও বিবেচনাবোধে আস্থা রাখা সত্যিই বিপজ্জনক। এই জেঠুরাই বিভিন্ন জুরিবোর্ডে গুটিবাজি করে এসেছে। আজও করে। এরাই আলতু-ফালতু লোককে পুরস্কার দিয়ে থাকে।
এই কারণে, কে পুরস্কার পাচ্ছে তা আমাদের আলোচ্য হওয়া উচিত নয়। তাদের মানহানি করাও কোনো কাজের কথা নয়। আমাদের এখন নজর দেয়ার সময় এসেছে মেশিনম্যানদের ওপর। আই মিন, জুরিবোর্ডের ওপর। এই জেঠুদের ইমান নড়বড়ে বলেই বিচারিক যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সুবিচার থেকে বঞ্চিত বাংলার সারস্বত সমাজ।
কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, জুরিবোর্ডের জেঠুরা প্রায়ই থেকে যান আড়ালে। সে আড়াল কখনোবা আমরাও তৈরি করি। আমাদের ক্ষোভ, নিন্দা, সমালোচনা সব কিছু আবর্তিত হয় পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখককে নিয়ে ক্যারিকেচার করতে। ফলে, খুব অনায়াসে নেপথ্যের কুশীলব তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে মৃদু মৃদু হাসেন আমাদের দিকে চেয়ে।
৩
এই কুশীলব কারা? অবশ্যই ষাটোর্ধ্ব যুবক-যুবতীরা। পুরস্কার-দাতা ও গ্রহীতার পারস্পরিকতার এক চমৎকার উদাহরণ হলো সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম-মারুফুল ইসলাম। এই ইসলাম-জুটির কারসাজির কথা আপনাদের মনে পড়বে ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭’-এর ঘটনা স্মরণ করলেই। মারুফুলের নতুন করে পাব বলে কাব্যে সৈয়দ মনজুর তাকে নতুন করে আবিষ্কার করেন। তার এই আবিষ্কারে গৌণ হয়ে পড়েন ফরিদ কবির, মাসুদ খান, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, জুয়েল মাজহার, শান্তনু চৌধুরী, মজিদ মাহমুদ প্রমুখ কবিগণ, যারা আজও বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান নি।
পুরস্কার প্রদানের সবচেয়ে বড় পাপেট শো ‘জেমকন সাহিত্য পুরস্কার’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মুমূর্ষু প্রবীণ, পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক—বিচারক কমিটির কাউকেই বিশ্বাস করা চলে না। আমলাদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। তার প্রমাণ ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’। আমলাদের কারিশমাতেই খুনের মামলায় নয় বছরের কারাদণ্ডভোগী কোনো এক আমির হামজা মরে গিয়ে পেয়ে যান এই পুরস্কার। ব্যাপক সমালোচনার মুখে তা আবার বাতিলও হয়ে যায়। প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটে এসএম রইজ উদ্দিন আহম্মদের ক্ষেত্রে। পুরস্কার ঘোষণা করে প্রত্যাহার করা হয় তার নাম।
এর উল্টো চিত্রও আছে। যেমন আওয়ামী-স্নেহধন্য নির্মলেন্দু গুণের ধাতানিতে পাদানি থেকে পা-পিছলে পড়ে গিয়ে তড়িঘড়ি তার হাতে পদক তুলে দিয়েছে আমলারা। ‘জামান ব্যাপারী’ অভিধা পেয়ে শামসুজ্জামান খান মুখ বন্ধ করতে চেয়েছেন আবু হাসান শাহরিয়ারের। পুরস্কার বগল-দাবা করে শাহরিয়ারও চলে গেছেন নিরিবিলি বানপ্রস্থে।
পুরস্কার প্রদানের সবচেয়ে বড় পাপেট শো ‘জেমকন সাহিত্য পুরস্কার’। বন্ধুকৃত্যের করুণ উদাহরণও বটে। এখানে সাজানো নাটকে রোল প্লে করতে আসেন পশ্চিমবঙ্গের জেঠুরা। যেমন এক সময় আসতেন দেবেশ রায়। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে মিসগাইডেড পার্সন তিনি। তার মিসলিডিং লেখার দগদগে নমুনা হলো দ্বাদশ নভেলা-র ভূমিকা।
ঢাকা ক্লাব, রূপসী বাংলা, লা মেরিডিয়ানসহ গুটিকয় রেস্তোরাঁ ও বারে সাম্প্রতিক লেখক-লোকাচারে শামিল হওয়ার অভিজ্ঞতা যাদের রয়েছে, তারা নিশ্চয়ই অনুধাবন করবেন সাহিত্য-রাজনীতিতে ‘পাগলা পানি’র বিশেষ ভূমিকা আছে। এই পাগলা পানি গড়াতে গড়াতে ঢুকে পড়েছে লেখকের বাসগৃহে। সাহিত্যের জাঁকালো জেঠুরা পুরস্কার-পিপাসু লেখকের গৃহে অন্তত দুবার গমন করেন। পুরস্কার ঘোষণার আগে একবার, পুরস্কার প্রদানের পর আরেকবার।
ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে জুরিবোর্ড কোন কোন শুঁড়িবাড়ি বাদ-মাগরিব সুরাপান করতে যায়, সেটা খেয়াল করলেই আপনারা বুঝতে পারবেন কে কোথায় কোন পুরস্কার পেতে যাচ্ছে। কেবল এই দুই মাস আমাদের বুড়া লেখক ও অধ্যাপকদের নজরদারির মধ্যে রাখুন, হাতে-নাতে প্রমাণ পেয়ে যাবেন।