সেলিম আল দীন : তাঁর কবিতার কথা

সংস্কৃত সাহিত্যশাস্ত্রে নাটককে দৃশ্যকাব্য হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং এই দেখানোর যৌক্তিকতাও আমাদের প্রতিভাবান ও সৃজনশীল পণ্ডিতবর্গ প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্তসহ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ব্রতী হয়েছেন। এ-বিষয়ে ভিন্নমত পোষণের বিশেষ কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু বাংলা নাটকের ইতিহাস ও পরম্পরা, প্রকৃতি ও পরিধি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল পাঠকমাত্র জানেন, কাহিনি বা ঘটনার চিত্রায়ণে আমাদের নাট্যকারদের আগ্রহ ও আসক্তি যত তীব্র, সেই অনুপাতে তাঁদের কবিপ্রতিভার উদ্ভাস বা উন্মোচনে উজ্জ্বল নাট্যসাহিত্যের ভাণ্ডার তত সমৃদ্ধ নয়। এর কারণ নিশ্চয়ই আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে উপস্থিত যা শিল্পস্রষ্টাদের চেতন ও মননকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করেছে, সৃষ্টিশীল অভিব্যক্তি ও অনুধাবনের গতিবিধি নির্ধারণ করেছে। এই নিয়ন্ত্রণ বা নির্ধারণ যেখানে কিছুটা খর্ব হয়েছে, সেখানেই সৃষ্টি হয়েছে ব্যতিক্রমী ও বিস্ময়কর কিছু সাহিত্যকর্ম, যা বাংলা নাটকের পাঠককে অভ্যস্ত পথের বাইরে এনে দাঁড় করিয়েছে। এই দাঁড় করানোর কাজটি যাঁদের হাতে নিপুণভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সেলিম আল দীন (১৯৪৯-২০০৮) তাঁদের অন্যতম। যে-সকল কালজয়ী শিল্পকর্মের স্রষ্টা হিসেবে তিনি বাঙালি পাঠকের চিত্তে নাট্যাচার্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন, তার যে-কোনো একটির ভাঁজ খুলে বসলেই পাঠক বুঝবেন সেলিম আল দীন কেবল গল্প বা ঘটনার ঘাড়ে চেপে পাঠক, শ্রোতা বা দর্শকের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করেন নি। মন জোগানোর দিকে তাঁর আগ্রহ বরাবরই কম, বরং তিনি মন জাগানোর মন্ত্র উচ্চারণ করতে চেয়েছেন। এই মন্ত্রের সদর-অন্দর নিশ্চয়ই অনেক কিছুতে সমৃদ্ধ। কিন্তু আমার বিবেচনায় এই মন্ত্রে সবচেয়ে বেশি শক্তি জুগিয়েছে তাঁর কবিপ্রতিভা। 

সেলিম আল দীনের কবিপ্রতিভার সবচেয়ে শক্তিশালী অঞ্চল হলো অনুভব ও উলব্ধির বিশ্বকে দৃশ্যের সীমায় স্থান করে দেয়া, চিত্তের গভীরদেশে জন্ম নেয়া অনুভবপুঞ্জ ও ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহের তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোকে চিত্রের মতো করে পাঠক ও শ্রোতার চোখের সামনে মেলে ধরা। এই কাজটি উপমা-রূপক-চিত্রকল্পের বরাতেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বস্ত ও উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে। ধারণা করি, এ-কারণেই জীবনানন্দ দাশ কবিতার এই শক্তিশালী দিকটির উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘উপমাই কবিত্ব’। এই কালজয়ী কবির সৃষ্টিশীলতায় সেলিম আল দীনের নিবিড় অবগাহনের খবর তাঁর কাছের মানুষেরা নিশ্চয়ই জানেন। আরও এক বাঙালি কবির একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন তিনি, যাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বকবির গীতবাণীর একটা বিরাট অংশ তাঁর স্মৃতিতে মুদ্রিত ছিল, যা তাঁর কাছের মানুষদের বিস্মিত করত। ভক্তবেষ্টিত সেলিম আল দীন যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ও প্রাণবন্ত ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াতেন, তখন বিচিত্র আলাপচারিতায় মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক উন্মোচনে ক্রমাগত তিনি উদ্ধৃত করতেন রবীন্দ্রনাথকে। আমরা যদি সেলিম আল দীনের নাট্যভুবনের দিকে দৃষ্টি দেই, সেখানেও দেখব মানুষ ও প্রকৃতির আন্তঃসম্পর্কের স্বরূপ উপলব্ধির বিচিত্র প্রয়াস। সমাজ-সভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাসপাঠে যাদের আগ্রহ আছে তারা জানেন প্রকৃতির সহজ-স্বাভাবিক বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেই মানুষ শান্তি ও সমৃদ্ধির খোঁজে গলদঘর্ম হয়েছে, যদিও বিপদ-বিপর্যয়-দুর্যোগে এই প্রকৃতির কোলেই আশ্রয় নিতে হয় মানুষকে। সেলিম আল দীনের সাহিত্যকর্মে আমরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মানুষের বিক্ষোভ ও বেদনার নানা দিকে আলো ফেলতে দেখি। জীবনরহস্যের তলহীন সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে খেতে মানুষ যখন তীরবর্তী সবুজের দিকে প্রত্যাশার দৃষ্টি মেলে ধরে, সেখানেও রহস্যের বিস্তৃত জালে তার দৃষ্টি জড়িয়ে যায়। সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে সেলিম আল দীনও এই রহস্যের আদি-অন্ত নিজের মতো করে বুঝে নিতে চেয়েছেন। বিচিত্র তত্ত্বের নিরিখে জীবনকে দেখার চেষ্টা করেছেন তিনি। জন্মান্তর বা রূপান্তরের দণ্ডে তিনি বিচার করতে চেয়েছেন মানুষ ও প্রকৃতির আত্মিক যোগাযোগের সম্পর্কসূত্রকে। এ-প্রসঙ্গে সেলিম আল দীনের কালজয়ী সৃষ্টি কিত্তনখোলার একটি সংলাপের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই:

সোনাই ভাবে—তাড়ির দোকানের পেছনের সেই বনে বনশ্রীর কালো সুডৌল শরীর পোড়া ছাইয়ের ভেতর থেকে আগামী আষাঢ়—ভাদ্র—পৌষ—মাঘ পেরিয়ে সকলের অগোচরে কোনো নিঃসঙ্গ তালের আঁটি থেকে কি জন্ম নেবে একটি তাল গাছ—নারী ও ফলবান? ছড়ি নামব। লাল ঠিলার রসে নেশা হবো আরেক ছায়ারঞ্জনের—আরেক সোনাইর। (কিত্তনখোলা)

গল্প বা ঘটনার পূর্বাপর না জেনেও পাঠক এই উচ্চারণের অন্তর্নিহিত অভিব্যক্তি অনুধাবন করতে সক্ষম। মানুষের জীবনযাপনের আনন্দ-বেদনা ও সৃষ্টিশীল সত্তার পুনর্জাগরণের সঙ্গে প্রাকৃতিক রূপান্তরের এই রূপকল্প ভাবের গতরে দূরসঞ্চারী দীপ্তি সঞ্চার করে। এভাবেই তাঁর বোঝাপড়ার ভাষা যখন ভাব ও রূপের অপার বিস্ময়ে পাঠক-শ্রোতাকে বিমোহিত করে, তখনই কবি সেলিম আল দীনকে পাঠ করতে ইচ্ছে করে।

কবি ও কবিতা বিষয়ে সেলিম আল দীনের বিবেচনার ধরনটি ধরা পড়েছে তাঁর ‘কবি ও তিমি’ শীর্ষক কবিতায়। কেবল কবিতাই নয়, শিল্পের গৌরব ও গভীরতার মৌল প্রান্তটি তিনি এই কবিতায় উন্মোচনের প্রয়াস পেয়েছেন। শিল্পসাহিত্যের বিপুল বিস্তৃত পরিসরকে তিনি একটি সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং সেই সমুদ্রেরই এক বিপুলায়তন তিমির প্রসঙ্গে তিনি শিল্প ও শিল্পীর সম্পর্কে নির্দেশ করতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, ‘বিপুলা এই পৃথিবীর কতটুকু জানি’, তেমনি সেলিম আল দীনও উল্লেখ করেছেন, শিল্পের বিরাট ব্রহ্মাণ্ডের সামান্য অংশেই মানুষের অধিকার জন্মে যা তিনি তিমির শরীরের অতি ক্ষুদ্র অংশে হাত বুলানোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। সমুদ্রের গভীর জলে তিমি বসবাস বলেই তিমির শরীরে সুপ্ত থাকে তলহীন সমুদ্রের অমোচনীয় স্পন্দন। সেলিম আল দীন দেখিয়েছেন একটি সমুদ্রের সঙ্গে কিভাবে পৃথিবীর সমগ্র জল গভীর সম্পর্কসূত্রে আবদ্ধ থাকে। তিনি বলেছেন. ‘এদিকে সমুদ্র মানেই—আকাশ বর্তুল হয়ে/মিশে যাওয়া পরস্পর।/তার নীচে জলের বিস্ফার।/সে বিরাট তিমির/ সাদা কিংবা নীল দেহ/ কোন কবি—আটলান্টিকের/ এপার ওপার—/ মাত্র তর্জনীর ডগায় ছুঁয়েছে সাহসে।’ (‘কবি ও তিমি’)। এই সাহসের গভীরেই সুপ্ত থাকে একজন সৃজনশীল মানুষের জানা, বোঝা ও ব্যক্ত করার আগ্রহ-উদ্দীপনা। কবি যা দেখেন এবং যা লেখেন তা সব সময় একই সমান্তরালে প্রসারিত হয় না, অনুভব ও উপলব্ধির ব্যাখ্যাতীত রসায়নে তা ক্রমাগত বদলে যেতে থাকে। এই বদলে যাওয়ার ভেতরেই প্রতিভাধর শিল্পস্রষ্টার অন্তর্গত সত্তার মৌল অবয়বটি মুদ্রিত হয়ে যায়। সেলিম আল দীন যখন তিমি দেখতে ও দেখাতে গিয়ে তিমিরের দিকে দৃষ্টি দিতে বলেন, তখন পাঠক হিসেবে আমরা বুঝে যাই, শিল্পের বিপুলায়তন ভুবনের অন্ধকার ঠেলে ঠেলেই আলোর কণা সংগ্রহ করেন একজন কালজয়ী শিল্পস্রষ্টা। কবিতার অবয়বকে তিনি বরাবরই বিশাল ক্যানভাসে উপস্থিত করতে পছন্দ করেন। সামান্যকে তিনি ঠেলে দেন অসামান্যের দিকে। এই কবিতায়ও তিনি তিমি ও কবির আত্মতার আড়ালে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এক নান্দনিক রূপকল্প নির্মাণের প্রয়াস পেয়েছেন। কবিতাটির অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা যাক : 

না আমি দেখিনি তিমিকে ছুঁয়ে
কিন্তু শুধু একবার
বিশাল অন্ধকার রাতে এই ঘর—
জাহাজের চতুর্দিকে জল—কথা বলে অবিরল
গীতল ভাষায়
তিমি নয় তিমির ছুঁয়েছি।
বাতাসে বাতাসে ঢেউ—
লেজের পাখনা নড়ে 
সে তিমিরের মুখোমুখি
শিকারীর হৃৎপিণ্ড নিয়ে
হার্পূণ হাতে—আঙুলে নিরেট।
এমন মহান তিমি—চারপাশে জ্বলে নেভে
তারাদের ফসফরাস ফেনা। 
সে এসেছে ক্যারীবীয় কূল থেকে—
গ্রিনল্যান্ডের বরফ সৈকত আর
লাব্রান্ডার স্রোত পার হয়ে
দক্ষিণ প্যাসিফিক। 

(তিমি ও কবি)

এই কবিতাংশের পাঠ একজন কাব্যরসিকের চিত্তে যে আলোড়ন ও আন্দোলন সৃষ্টি করে, বিশ্বভ্রমণের যে অনাস্বাদিত অনুরণন সঞ্চার করে, তার সামান্য অংশই গদ্যে ধারণ করা সম্ভব। ‘কত অজানারে জানাইলে তুমি’—রবীন্দ্রনাথের এই আবেগঘন উচ্চারণে উল্টোপিঠে যে আক্ষেপ মুদ্রিত তা এই যে, অনেক অজানার সঙ্গে বোঝাপড়ার আগেই মানুষকে বিদায় নিতে হয়। তবুও আশার ভেলায় আমাদের ভাসতে ভালো লাগে এবং এই ভেলায় ভুবনের ঘাটে ঘাটে নোঙর করে জীবন ও সৃষ্টির বিচিত্র রসদ সংগ্রহ করতে করতে আমরা এগিয়ে যাই। সেলিম আল দীন ‘তিমি ও কবি’ শীর্ষক কবিতায় তিমির সেই অজানা জগতের কথা বলতে চেয়েছেন। যে তিমিকে ছুঁয়ে দেখার পরও স্পর্শের বাইরে থেকে যায় তার বিরাট অংশ, তাও বোধকরি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বাইরের কোনো রহস্যাবৃত বিশ্বের দিকে ইঙ্গিত করে। 

শিল্প বিষয়ে সেলিম আল দীন আরও কিছু তাৎপর্যপূর্ণ অভিমত প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছেন ‘শিল্পী বিষয়ক’ কবিতায়। ঠিক অভিমত হয়তো নয়, এ-বিষয়ক উপলব্ধির কিছু বিচূর্ণিত চিত্ররূপ উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন তিনি। এই কবিতায়ও প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর নানা ঘটনা ও চরিত্রের দেখা মেলে। সভ্যতার নানা স্তরে মানুষের পরিক্রমণ ও অর্জনের নানা নজির তিনি হাজির করেছেন, একইসঙ্গে অধিগ্রহণের বাইরের ঘটনাপ্রবাহে কবিতাটিতে ধরা পড়েছে একজন একনিষ্ঠ প্রত্নতাত্ত্বিকের নিরবচ্ছিন্ন অভিনিবেশ। এই কবিতায় যিশুর আবির্ভাব, অবস্থান ও প্রস্থানের চিত্রাত্মক উপস্থাপন আমাদের চোখে পড়ে। একই সঙ্গে এই মহামানবের জীবানাচরণের সঙ্গে সেলিম আল দীন যুক্ত করেছেন সৌন্দর্য ও শিল্পের নিরবচ্ছিন্ন সংরাগ ও সংযুক্তির ধারণা। এই কবিতার অন্তর্নিহিত সৌরভ ও সমৃদ্ধি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে বিস্তারিত করা অসম্ভব বলেই আমি মনে করি। কেবল পাঠক হিসেবেই এর গভীরতলশায়ী রসসমৃদ্ধির সান্নিধ্যে আসা যায়। বিশ্বসভ্যতার বিচিত্র বাঁক-বদলের দিকে যাদের দৃষ্টি নেই, শিল্পতত্ত্ব ও সৌন্দর্যতত্ত্বের নাড়িনক্ষত্র সম্পর্কে যাদের আগ্রহ নেই, তাদের পক্ষেরও এই কবিতার পরিপূর্ণ রসাস্বাদন অসম্ভব। অবশ্য শিল্পরসের পুরোটায় অধিকার না জন্মালেও একটি সার্থক শিল্পকর্মের সঙ্গে পাঠকের সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায় না। পাঠকের বোধ ও উপলব্ধির সক্ষমতার সমান্তরালেই বিস্তার লাভ করে একটি কালজয়ী সৃষ্টির সৌরভ-সমৃদ্ধি। আগ্রহী পাঠক নিশ্চয়ই সময়-সুযোগমতো কবিতাটির সামগ্রিক পাঠ নিরূপণের চেষ্টা করবেন। আপাতত এই কবিতার কয়েকটি চৌম্বক অংশে আমি পাঠকের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রাখতে চাই :

ক.
...কফিনভাঙা অন্ধকার
ক্রমশ ভরে উঠছে গলিত মাংসের সঞ্চরণশীল
গন্ধে। গির্জার চত্বরের চারপাশে সারিবদ্ধ
হলুদ মৃত্যু দূতের ছায়া।

খ.
...দেখ এমন এক নবী—মৃত্যু তাঁর
মৃত্যুর ভঙ্গিকে কখনই পারেনি অতিক্রম করতে।

গ.
...ইকুয়েডোরিয়ানদের বুল ফাইটের 
বুল—মৃত্যুর হাতে ট্রফি তুলে দিয়ে সটান
পড়েছে শুয়ে। মদের পাত্র ললাট পাথরে 
লেগে ভেঙে গেছে—আর সোঁদাগন্ধ
ঘিরে মাছি ওড়ে—রক্তবমির মাছি।

ঘ.
...হলুদ মৃত্যুর
কঙ্কালেরা ঝোল চোখ হাড়ের আঙুলে চুষে।
রাত্রির
গির্জার ভেতর থেকে ওই এক চিলতে আলো—দরোজা 
পেরিয়ে শানে আছড়ে পড়েছে। ধর্মের কাছে ওইটুকু
ছাড়া যেন আর কোনো আশা নেই।

ঙ.
বহুদূর ক্যারিবীয় সমুদ্রের ঢেউ এসে হাত রাখে
বাতাসের উদ্দাম পেশীতে। সমুদ্রের দেবতা তার
স্বর্গীয় পাখা পায় উকুয়েডোরীয় সমুদ্র হাওয়ায়।

চ.
ধর্মের তোরণ থেকে
ক্ষীণ সেই এক চিলতে আলোয়—পৌরাণিক মুদ্রা—
শোভন—চত্বরে এলো দিব্যনারী পাবলোভা 

(শিল্পী বিষয়ক)

উদ্ধৃতি অধিক হলেও সেলিম আল দীনের এই আলোকসঞ্চারী উচ্চারণের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আনন্দ পাঠককে নিশ্চয়ই পল্লবিত করবে। কবিতাপাঠের সঙ্গে সঙ্গে প্রিয় পঙ্‌ক্তির তলদেশে রেখা টানার অভ্যাস যাদের আছে, তারা নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, ওপরের পঙ্‌ক্তিসমূহের সম্মোহন এড়িয়ে এই কবিতার নির্মোহ পাঠ প্রায় অসম্ভব। 

মিথ-পুরাণের পৃথিবীতে সেলিম আল দীনের দখল বিষয়ে তাঁর ভক্তবৃন্দের জানা থাকার কথা। তাঁর কবিতার পাঠকবৃন্দও অনুভব করতে পারবেন, সেকালের সঙ্গে একালের সম্পর্কসূত্র প্রণয়নের কাজে পুরাণের পৃথিবী থেকে তিনি দুই হাতে গ্রহণ করেছেন। বিখ্যাত রাশিয়ান প্রাইমার বলেরিনা ও কোরিওগ্রাফার পাবলোভাকে তিনি অনায়াসে যিশুর মৃত্যুদৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে পাবলোভার যুগান্তকারী অভিনয়কীর্তি মরাল রাজহাঁসকে সেলিম আল দীন তাঁর কবিতার জলে ভাসিয়েছেন। কেবল পাবলোভাই নয়, একই সঙ্গে ভালোবাসা সৌন্দর্য ও চিরযৌবনের দেবী আফ্রোদিতিকেও তিনি তাঁর কবিতার সভায় আমন্ত্রণ জানান। কবির ব্যবস্থাপনায় এ যেন বিশ্বশিল্প-সম্মেলন, যেখানে নৃত্য পরিবেশন করছে বিশ্বসেরা নৃত্যশিল্পীরা, যেখানে পুরাণের মহাত্মারাও অবলীলায় অংশ নিতে পারেন :

বসন উড়ছে—দক্ষিণ হাতে সূচিক মুদ্রায়
তর্জনী জ্বলে ওঠে—পায়ের পাতার নীচে ঝড়ের
নাভি—উড়ছেন পাবলোভা
আর দেখো দেখো আলো অন্ধকারে উরু—প্রিহেলেনিক—
বসনের নীচে ঠিক রয়ে গেছে আফ্রোদিতির—
তলপেটে ফ্লোরেন্সীয় মার্বল—একমাত্র
এঞ্জেলো-ই তাঁর নাভি
রেনেসাঁর কালে ছুঁয়েছিল একবার। সমুন্নত স্তনে
সামুদ্রিক শঙ্খের ফুৎকার। 

(শিল্পী বিষয়ক)

এই আয়োজনেই আমরা দেখি ‘চায়কোভস্কির সেই সুরেলা মরাল’। যদিও আন্না পাবলোভাই এই নৃত্যসভার প্রধান আকর্ষণ এবং এই আকর্ষণ এত তীব্র যে তাতে যিশুর অংশগ্রহণও অনিবার্য হয়ে ওঠে : ‘আর দেখ দুই কপোলের আভা—শেষবার/ দ্রাক্ষারস পান শেষে যিশু আকাশে তাকালেন।’ ঠিক এইরকম একটি আয়োজন একজন শিল্পীর চোখকেও সৃষ্টিশীলতায় উদ্দীপিত করে যা সেলিম আল দীনের ভাষায় চমৎকারভাবে ধরা পড়েছে: ‘শিল্পীর চোখে ক্রমে মধ্যরাতের/ মেসোয়ামেরিকান পূর্ণিমার চাঁদ ওঠে/ ব্রয়েরির ঘ্রাণে বাতাসও ফলবতী—/ তা ক্রমে ব্যপ্ত হয়ে—সমাধি প্রান্তরের/ চিহ্ন-ফলকের পাথর ছুঁয়েছে।’ এই আনন্দ-আয়োজনে সমাধির প্রসঙ্গ নিশ্চয়ই বেদনা ছড়াতে চায়, কিন্তু সেই বেদনার গহ্বর থেকে ধ্বনিত হয় শিল্পের আহ্বান।

নামকরণ থেকেই আমরা বুঝে যাই কবিতাটি ‘শিল্পী বিষয়ক’, যদিও শিল্পীর চেয়ে শিল্পের বেদনাই এই কবিতায় অধিকতর আলোক সঞ্চার করেছে। দীর্ঘ ভ্রমণের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি শিল্পের কাঁধেই মাথা রেখেছেন, আরো দৃঢ় ও দৃপ্ত কণ্ঠে শিল্প ও শিল্পীর সীমানা নির্দেশ করেছেন। এই কবিতা বিষয়ক আলোচনার শেষ কথা মূলত সেলিম আল দীনের কবিতার শেষেই চমৎকারভাবে বিধৃত। আসুন সেলিম আল দীনকেই পাঠ করা যাক: 

উড়ছে শরীরে জড়ানো মসলিন—হাওয়ায়
হাওয়ায় তাঁতের খটখট ধ্বনি। যুদ্ধক্ষত
মহামারী ঢেকে দেয় এমন বসন আছে—
কিন্তু সে কেবল নবী ও শিল্পীর গায়ে।
দর্শক শুনতে পায় ধ্বসছে পাহাড়ে—মৃত্যুষাঁড়
জাগছে শিঙের মুকুট নিয়ে—রক্তবর্ণ বস্ত্র হাতে
করিজিদর নামছেন মাঠে। হাততালি বাজে চতুর্দিকে।
সহসা চিৎকার করে সাহসী মানুষেরা—
এসো এসো—যিশু।
নাচো পাবলোভা—শিল্পের সীমা
মানুষের বোধে ও ত্বকের দিকে আরো 
বিস্তৃত হোক। 

(শিল্পী বিষয়ক)

নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই নবী।’ কিন্তু সেলিম আল দীন বিধ্বস্ত বর্তমানের রক্তস্রোতকে অতীতের আত্মদানের সমান্তরালে নির্মাণ করেছেন এবং ভবিষ্যতের পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগস্থাপনের পথটিকেও উন্মুক্ত রেখেছেন। আধুনিক বিশ্বের রক্তপাত বন্ধের জন্য আর কোনো নবীর আবির্ভাব ঘটবে না বলেই আমরা জানি, কিন্তু প্রাণের টানেই কিছু মানুষ পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর পথে অগ্রসর হন। এই মহামানবদেরই কবি-শিল্পীর মর্যাদা দিয়েছেন, যাঁদের গায়ে নবীর মতোই মহামারী ঢেকে দেওয়ার মতো মহিমান্বিত বসন আছে। 

বর্তমান নিবন্ধে ‘শিল্পী বিষয়ক’ কবিতাটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও অধিক উদ্ধৃতি উপস্থাপনের কারণ, এই কবিতায় বিধৃত শিল্পবোধ ও জীবনবীক্ষার সারাৎসারকে আমরা সেলিম আল দীনের শিল্পদৃষ্টি ও কাব্যচিন্তার মৌল প্রান্ত হিসেবে নির্দেশ করতে চাই। কবি ও কবিতার গন্তব্য সম্পর্কে তাঁর যে অভিব্যক্তি তার অনেকটাই এই কবিতায় ধরা পড়েছে। ফলে কবিতাটির পাঠ ও মর্মোদ্ধারকে আমরা কবি সেলিম আল দীন পাঠ ও অনুধাবনের সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। এই কবিতার শেষ প্রান্তে তিনি যখন বলেন, ‘চিকিৎসার অতীত এক ক্রন্দনের সীমা থেকে/ পাবলোভা চললেন/ নৃত্যকীর আইকনে যিশু’, তখন আন্না পাবলোভার এই যাত্রাপথে সকল বিভেদ-বিচ্ছেদ-বৈচিত্র্য অতিক্রম করে পৃথিবীর সমুদয় শিল্পী যোগ দেন এবং এই মিছিলের অগ্রভাগে সেলিম আল দীনের মুখাবয়বও ভেসে উঠতে দেখি। 

সেলিম আল দীনের একটি দীর্ঘ কবিতার নাম ‘ডিম’। কবিতার নাম না বলে কাব্যগ্রন্থের নাম হিসেবেও একে ধরে নেয়া যায়। ‘ডিম’ শিরোনামের পর তিনি সংখ্যা দিয়ে কবিতাগুলোকে আলাদা করেছেন। প্রত্যেকটি কবিতার স্বতন্ত্র ভাব, রস ও অবয়ব থাকা সত্ত্বেও এর একটি সামগ্রিক পরিণতি তিনি অক্ষুণ্ন রেখেছেন। কাব্যগ্রন্থ হিসেবে এর পাঠ-নিরূপণ সম্ভব হলেও এর অন্তর্নিহিত চরিত্রের দিকে দৃষ্টি দিলে এই রচনা কাব্যনাট্য হিসেবেই অধিকতর তাৎপর্যবহ। অধিকাংশ কবিতার স্থান-কাল নির্দেশ করা হয়েছে। কখনোবা পাত্রপাত্রীর নাম ও অবস্থার আলোকে শিরোনামে যোগ করা হয়েছে স্বতন্ত্র বাক্য। গল্প বা ঘটনার ইঙ্গিতও যথেষ্ট স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। বলা যায়, এই লেখার সেলিম আল দীন মূলত নাট্যকার সেলিম আল দীন, যিনি নাট্যপ্রতিভার অনুকূলে তাঁর কবিপ্রতিভার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। নরসুন্দা নদীপ্লাবিত কুসুরিয়া গ্রামের দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-হাহাকার কবি-হৃদয়ে যে রক্ত ঝরিয়েছে, তারই সঙ্গে তাঁর কল্পনাপ্রতিভার সমান্তরাল সম্প্রসারণ ‘ডিম’-এর বাস্তবায়ন সম্ভব করে তুলেছে। কবি একা নন, তাঁর সঙ্গে যুক্ত আছেন আরও একজন। ধারণা করি, কবিতাটি যাঁকে উৎসর্গ করা হয়েছে, কবির সেই সহকর্মী ফেনীর আরেক কৃতী সন্তান অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল হকই তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন। যদিও তিনি উল্লেখ করেছেন, আমরা দুজন সাংবাদিক—/ পকেটে আইডেনটিটি কার্ড—/ শরতের হিঙ্গুল সন্ধ্যার সামনে দাঁড়াই/ নরসুন্দা নদীর কিনার’, কিন্তু বর্ণনার কোনো অংশেই সাংবাদিকের বস্তুনিষ্ঠতা বা বাস্তবানুকরণের ছিটেফোঁটা নেই। বরং বাস্তবকে অতিক্রম করে কল্পনাপ্রতিভার বিচ্ছুরণই এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে। তিনি যে সত্যের দাসত্ব করবেন না তারই ইঙ্গিত দিয়েছেন নিজেদের পরিচয় পুনর্নির্মাণ করে। কবিতায় তিনি উল্লেখ করেছেন : 

দুপায়ের নীচে—শেষতম শস্যভূমি
সামনে ঢল—প্রেতগ্রাম কুসুরিয়া।
বিস্তৃত জলেদের চলাচল দেখে 
চোখের পক্ষ্মে 
পলি পড়ে যায়।
নরসুন্দা তীরে আমরা দুজন
ভৌতিক হয়ে যাই।

(ডিম)

এই ভৌতিক হয়ে যাওয়ার সুবিধাটা সেলিম আল দীন পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন। চোখের সামনে যা ঘটেছে তার অবিকল উপস্থাপনের দায়মুক্তির জন্যই বোধকরি তাঁর ভৌতিক হওয়ার প্রয়োজন ছিল। অবয়ব ও অস্তিত্বের পুনর্বিন্যাসের ফলে সমস্ত শরীরে সজারুর চলাফেরা সহজতর হয়েছে, দাঁতের আকৃতির দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভবপর হয়েছে এবং হাতের নখগুলোও অনেক দূর প্রসারিত হতে পেরেছে। আর তাদের সমস্ত কথোপকথন বাস্তবের সীমানা পেরিয়ে ভূষণ্ডীর মাঠের ভৌতিক হাওয়ায় দোল খেতে খেতে কান্নার মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছে। এই কবিতার নামকরণের সূত্রটিও তিনি প্রাথমিক পর্যায়ে উল্লেখ করতে ভোলেন নি: 

শোক থেকে ভীতি—পথ খুব বেশি দীর্ঘ নয়
মাঝে মধ্যে শোক এরকম ভারি 
যে ছায়ার আঘাতে দর্পণও ভাঙে
মাঝে মধ্যে এরকম ভয়—
হাতের মুঠিতে ডিম—ছুটন্ত বালক পেছনে ঘরিয়াল
বাঁধের উপর থেকে 
বিলাপিনী নারীকণ্ঠ কোনো—
গড়ে এক নীল নাও—অবিরল কান্নার কাঠে। 
একাকিনী ভেসে যাবে সেই প্রেতপুরী
হাতে—
নিজেরই ছিন্ন কেশ
নখে নিজ বুকে ক্ষত

(ডিম)

কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরলেন কবি, জলপ্লাবিত একটি গ্রামের বাঁধের ওপর উঠে এলেন। নারীর কান্নাও বাস্তবের নিকটাত্মীয়। কিন্তু বিপর্যস্ত গ্রামবাসীর অবর্ণনীয় বেদনার দৃশ্যকল্পে তিনি প্রেতপুরীর থমথমে অবস্থা যোগ করে দিলেন। বন্যায় কেবল বানভাসী মানুষের জীবনজীবিকাই ভেসে যায় নি, কবির কল্পনা বিস্তৃত হয়েছে আরও অনেক দূর :

আজ এইখানে 
ঠিক কিছুতেই ঠাহর হচ্ছে না 
ভেসে যাচ্ছে যা—ধসে বর্ণমালা 
কীলকে খোদাই 
নড়ন্ত কিউনিফর্ম 
জলের আগুনে উৎকীর্ণ 
প্রত্নপাথর সব

(ডিম)

‘পাগলা মাঝির বর্ণনা’ শীর্ষক কবিতায় সেলিম আল দীন বন্যায় সর্বস্ব হারানো একজন মাঝির কথা বলেছেন, যে কেবল সহায়সম্বলই নয়, প্রিয়তম স্ত্রীকেও হারিয়েছেন। এই মাঝির অবয়ব নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘যে এসে দাঁড়ালো সে/ অস্ট্রোলয়েড/ ঝাপপুস চুলতামাটে বরণ/ তারপর/পানি খাওয়া দেহে জাগে/ শাদা ফাঙ্গাসের আস্তর।’ মালকোচা লুঙ্গির ওপর টকটগে লাল গামছা জড়ানো এই মানুষটির আচরণে এখন আর স্বাভাবিকতা নেই। আগে নিশ্চয়ই সুস্থ ছিল, কিন্তু এখন সে পাগলা মাঝি। এই মাঝির হাতের বগলে একটি সাঁদা হাঁস রয়েছে এবং সেই হাঁসের পায়ে লাল সুতো বাঁধা। তার স্ত্রী ভেদবমি হয়ে শেষ রাতের দিকে মারা গেছে। কিন্তু করব দেয়ার মতো শুকনো জায়গা কোথাও নেই। তাই বানের জলেই ভাসিয়ে দিতে হয়েছে তার মৃতদেহ। প্রিয় মানুষটির ভাগ্যে কবর জুটলো না, এই কষ্টই বোধকরি তাকে অপ্রকৃতস্থ করেছে। এই অস্বাভাবিক মানুষটির মনের অবস্থা ধারণ করার উপযুক্ত রূপকল্প হিসেবে সেলিম আল দীন লোকপুরাণের বেহুলা-লখিন্দরের শরণ নিয়েছেন। তাঁর মতে, পাগলা মাঝির বউয়ের ভাসমান দেহ জন্ম দিয়েছে ‘বিপরীত পুরাণে’র, যা সভ্যতার উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। প্রাসঙ্গিক কবিতাংশ উদ্ধৃত করছি: 

কেন এইভাবে বলে—উঁচু গোরস্থানে
মড়কের নতুন কবর তবু সে তা
খুঁড়ছে কানের ভেতর।
থল নাই কুসুরিয়া—পানি ভাসা
করেছে দাফন।
কলার মান্দাসে—বিপরীত পুরাণ 
দেখ দাঁড়ায়ে লক্ষিন্দর— 
ভাসে বেহুলা সে জলে। 

(পাগলা মাঝির বর্ণনা/ডিম)

বেহুলা-লখিন্দরের প্রসঙ্গে পাগলা মাঝির অন্তর্গত বেদনার একটি চমৎকার দৃশ্যকল্প এখানে নির্মিত হয়েছে। যে আছে মনের গভীরে, তাকে তো আর বানের জল বা ভেদবমি কেড়ে নিতে পারে না। তাই পাগলা মাঝির কেবলি মনে হয় তার বউ আবার ফিরে আসবে—‘কলরায় মরি শ্যাষে—বউডা নি/ ফিরা আইল সাব/ শাদা রানীহাঁস।’ 

এরপর ‘৩’-সংখ্যক কবিতায় এই পাগলা মাঝিকে নিয়ে লেখকের মানসিক অভিব্যক্তি ধরা পড়েছে। সেই সঙ্গে বানভাসি মানুষের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যাপক ঢাকঢোল ও লোক-দেখানো ত্রাণ-বিতরণের চিত্রল ব্যবস্থাপনার পরিচয় দেয়া হয়েছে—‘তার ভরা পেটে—ত্রাণের সেদ্ধ ডিম/ প্রীতি উপহার।’ পাগলা মাঝির হাতে যে হাঁস ছিল, সেই হাঁসের গল্পটি আর মাঝিকে বলতে হয় নি, কল্পিত গল্পটির একটি সম্ভাব্য পাঠ এখানে হাজির করেছেন কবি। সেই পাঠে নইতন নামের এক কিশোরীর দেখা মেলে, যার হাতে থাকে কীটনাশকের শিশি। সাংবাদিকেরা সেই পাগলা মাঝির ছবি তুলছেন। সঙ্গে সেই হাঁস। এই দৃশ্যের মঞ্চায়ন যখন চলছিল, তখনই জলে ভাসমান একটি সাপের দিকে চোখ পড়ে বৃদ্ধ মাঝির। সেই সাপও চলে আসে মাঝির হাতে। কিন্তু ততক্ষণে তার দেহখান কাঁদা-মাটিতে প্রাচীন পরিত্যক্ত মূর্তির রূপ ধারণ করেছে—

তার দেহে কচুরিপানার শেকড়— 
ছোঁড়াভেড়া—
শিশ্নের চুলে পলিমাটি— 
মাঞ্জায় কালো তাগা—মাথার সামনে দিকে
গাঢ় ঘয়েরি টাক—আট দশটি উদ্ভিন্ন শাদাচুল 
পেছনে ও পাশে—শাদাচুলে মেহেদীর 
খানিক আভাস 
শরতেই এরকম—কাশফুলে সূর্যালোকে
হয় মূর্তি রূপকথা।
জল-পাখরের চাঁই ভেঙে পাগলা মাঝিটি
তুলেছে মানব কোনো—প্যালিওপ্যাথিক—
এবং সরীসৃপ।
জীবনের হাতের মুঠা
কতদূর গেলে পায় ফণার নাগাল 

(পাগলা মাঝির বর্ণনা/ডিম) 

বর্ণনা কিংবা রূপায়ণের সম্মোহন এমন যে, কবিতাংশ থেকে উদ্ধৃতির লোভসংবরণ করা কঠিন। ‘৫’-সংখ্যক কবিতায়ও পাগলা মাঝির প্রসঙ্গ উপস্থিত। বুড়ো মাঝিকে এখন একটি চালাঘরে নিয়ে আসা হয়েছে। বৃদ্ধ কিন্তু তার দেহের বর্ণনায় উৎপাদনক্ষম বলিষ্ঠ ভাবটি লেখক ধরে রেখেছেন—‘দৃঢ়পুষ্ট উরু—বোধকরি/ প্রজননে সিদ্ধপুরুষ—শস্য শ্রমিকের/ প্রত্নপিতা/ ফসলের সিদ্ধাচার্য—কামসিদ্ধ নর।’ মাটির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর বলেই আমরা এই অপ্রকৃতস্থ বৃদ্ধের শরীর থেকে উৎপাদনের সম্ভাবনা উদ্ভাসিত হতে দেখি। এই সম্ভাবনার সঙ্গে লেখক জুড়ে দেন নারীদেহের প্রতি পুরুষের প্রাগৈতিহাসিক আগ্রহ ও আসক্তির বয়ান।

বৃদ্ধের অবয়ব থেকে লেখক আমাদের নিয়ে যান নানা লোককথা-রূপকথার জগতে। সেখানে চম্পাবতীর কিসসা শোনা যায়, সাপের দেহলক্ষণ বর্ণনায় চোখের সামনে নড়েচড়ে ওঠে এই সাপ, কিন্তু আমরা তাতে ভীতবিহ্বল হই না—‘কালো সাপ শরীরে হালকা শাদা/ মিহি রেখা।/ লম্বায় সাড়ে সাত হাত—লেজ থেকে মাথা।’ মানুষের কাছে পরাস্থ এই সাপ অপলক চেয়ে থাকে, যা ‘কেউটে গোক্ষুর নয়—তারও অধিক’। সাপের প্রসঙ্গে উপস্থিত হয় সর্পাঘাতে মৃতপ্রায় মানুষের চিকিৎসার নানা লোকজ পদ্ধতি। 

বাউরা মাঝির কণ্ঠে কবি কূলকিনারাহীন জীবন-নদীর আধ্যাত্মিক উপলদ্ধি উপস্থিত করেন। লালন যেমন লিখেছেন, ‘এই দেশেতে এই সুখ হলো আবার কোথা যাই না জানি।/ পেয়েছি এক ভাঙা তরী জনম গেল সেঁচতে পানি।’, তেমনি সেলিম আল দীনের মাঝির কণ্ঠে আমরা শুনি—‘ভাঙা নাও সেঁচতে সেঁচতে/সেঁচলাম জনম।’ তারপর সেই হাঁসের প্রসঙ্গ, যা মাঝিদের কাছে মেজবান হিসেবে সম্মানিত হচ্ছে। যাকে জল থেকে তুলে আনতে গিয়ে বস্ত্রহীন পাগলা মাঝি আদম সুরতের মতো নদীর জলে ভেসে বেড়িয়েছে। এসব বলতে বলতে কবি আমাদের নিয়ে যান পালা-কথকতার দিকে, যাতে আছে 'গায়েন ও দোহার’।

এই পর্যায়ে ‘ডিম’ শীর্ষক রচনায় লোককথা ও লোকপালার অনুপ্রবেশ ঘটে। কথক ও দোহারদের সম্মিলিত উপস্থাপনায় বানভাসি মানুষ বাস্তব জীবনের কষ্ট ও হাহাকার থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করে। পরবর্তী অংশে সেলিম আল দীন নাটকের গঠনকৌশলকেই কাজে লাগিয়েছেন। গল্প বা ঘটনার চরিত্রের বর্ণনা দিয়েছেন, আসরের আশেপাশের যা-কিছু তারও নাটকীয় ও চিত্রাত্মক বর্ণনা হাজির করেছেন। ‘৯’-সংখ্যক কবিতার শিরোভাগে সেলিম আল দীন লিখেছেন— 

এর একটু পরেই—আমাদের বিস্মিত করে দিয়ে বৃদ্ধটি কাশলো। একটি দীর্ঘশ্বাস যাতে প্রদীপের স্থির শিখা উঠলো নড়ে। আলোর এমতো শক্তি যে চালা ঘরের সকল ছায়া কেঁপে কেঁপে উঠলো খানিক। মাটির বাসনে পানি পান করল বৃদ্ধ। শুরু হলো গল্প বলা। (ডিম)

গল্পটি শুনতে হলে সেলিম আল দীনের রচনার কাছেই ফিরে যেতে হবে। গল্প বা ঘটনার নির্যাস বা সারাৎসার হয়তো সংক্ষেপে উপস্থাপন করা যায়, কিন্তু তাতে লেখকের কৃতিত্ব বা কবিত্ব বোঝা যাবে না। 

আগেই উল্লেখ করেছি, গল্প বা ঘটনার চেয়ে পাত্র-পাত্রীর অন্তর্গত মনস্তত্ত্বের নানা প্রান্তে আলো ফেলতেই সেলিম আল দীনের আগ্রহ অধিক যা কেবল রচনার মূলপাঠেই মুদ্রিত থাকে। তিনি কুসুরিয়া গ্রামের আগ্রাসী নরসুন্দা নদীতীরের বানভাসি মানুষকে অবলম্বন করেই তাদের এই তলহীন বেদনার দোসর করে তোলেন লোককথা-রূপকথার নানা ঘটনা ও পাত্রপাত্রীদের। ফলে নাট্যমঞ্চে এসে উপস্থিত হয় রাক্ষস-খোক্কস, লালকমল নীলকমল, পুরাকালের সওদাগর ও বাণিজ্যপুত্তুর। আগ্রহী পাঠক নিশ্চয়ই এই রচনার মূলপাঠের খোঁজখবর নেবেন। আপাতত কয়েকটি চৌম্বক অংশ উদ্ধৃত করা যাক: 

ক.
আমাদের সব চোখ—হাতের তালুতে খুলে পড়ে
আমরা লাগাই চোখ—
আবার ঝরে।
- কিসের ডিম।
- দৈবই জানে।
- কোথায় পেয়েছ তুমি বাণিজ্যপুত্তুর।
- পান্নার পাহাড়ে—ভূমিকম্পে পর্বতের
- চূড়া থেকে গড়িয়ে পড়েছে।
কিন্তু আর কোনো প্রশ্ন নয়।
ভাগ্য বলে যাহ পাই প্রশ্নে তার 
খোসাও থাকে না। 

খ.
তিন ভাগের দুইভাগ ভোগপূজা—তামা কড়ি নিয়া যায়
কৃষ্ণপক্ষের রাইতে এক লোক। তারে
বাদুড়ে পেঁচায় চিনে যদি বা—মানুষ তো দেখে নাই।

গ.
সঙ্গমের পুণ্যের আশায়—বন্ধ্যানারী এক
ধানের শরীর থেকে ফেটে 
পুরোহিত বৃদ্ধের তাপে খই হলো।

ঘ.
আমাদের নারীরা লুণ্ঠিত—বিবসনা হলো—
গৃহবাসে ধূমশিখা
গরুর ওলান ছিঁড়ে—কাবাব বানানো হলো
পুুজ্য ডিম ধুয়ে মুছে সাফ করা
হলো পুনর্বার। 

(ডিম)

সেলিম আল দীন যে ডিম অবলম্বনে এই কবিতার নামকরণ করেছেন তা লোককথা তথা লোকপালার সমৃদ্ধ ভাণ্ডার থেকে সংগৃহীত। এই পালার গতরে তিনি লোকভক্তি তথা লোকবিশ্বাসের সহজ-স্বাভাবিক প্রবণতাকে জুড়ে দিয়েছেন। ভক্তি কিভাবে বিশ্বাসের বাস্তব সীমা অতিক্রম করে যায়, তারই দেখা মেলে এই রচনায়। এ এক অলৌকিক ডিম যার চারপাশে ক্রমাগত সঞ্চিত হতে থাকে বঞ্চিত মানুষের দুঃখ ও দীর্ঘশ্বাস মোচনের প্রতিশ্রুতি। যে বুনো মোষের শিঙের আঘাতে ভেঙে পড়ে এই পৌরাণিক ডিম, সেই মোষের শরীর থেকে ধসে যায় চামড়া—‘দেখতে দেখতে কালো মোষ/ থেকে তার বন্যবসন চামড়ার গেল খুলে।’ মোষের চামড়া হারানো হয়তো মানুষের কুষ্ঠ রোগের রূপকল্প হিসেবে দেখানো হয়েছে। ডিমের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা বৃদ্ধাও সাধারণ কেউ নয়—ওলানারী। শেষ অংশটুকু সেলিম আল দীনের ভাষায় পাঠ করা যাক: 

বৃদ্ধা সে ওলানারী ততক্ষণে
মড়কের দণ্ড উঁচু করে—উর্ধ্বমুখে
ডাকে আয় আয়—পশ্চিম আকাশ থেকে
অন্ধকার করে আসে পঙ্গপালের ঝাঁক—
নদী উল্টে যায়—থরথর ধস নামে
উত্তরের পাহাড়ে ধূলায় গড়ায় চূড়া—
গল্প শেষ হলে রাত্রি শেষ হয় 
সেই অদ্ভুত বুড়া বুঁজলো দু’চোখ
হাঁসটি উঠলো বসে
মৃতের বুকের পর।
ক্লিক ক্লিক। 

(ডিম)

এই কবিতাংশে নদীর যে উল্টে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেই উল্টানো নদীর জলেই হয়তো কুসুরিয়া গ্রামবাসীর জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। একজন হৃতসর্বস্ব মানুষের অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের বিস্তর বিবরণ এই রচনায় উপস্থিত। কিন্তু সেলিম আল দীন সমস্ত অসামঞ্জস্যের শরীরে এঁটে দিয়েছেন ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তবতা এবং এই বাস্তবতার বিরাট অংশ জুড়ে জায়গা করে নিয়েছে লোককথা-লোকবিশ্বাস-লোকপুরাণের নানা চরিত্র, বিচিত্র গল্প ও ঘটনার নির্যাস। প্রাকৃত জীবন ও বিশ্বাসের সমান্তরালে ব্যক্ত হয়েছে বিপন্ন মানুষের দুঃখ ও দীর্ঘশ্বাস। তাই ডিমের কাছে সাধারণ মানুষের প্রার্থনার উল্লেখযোগ্য বস্তু হয়ে ওঠে ভাত—‘হে ঐশ্বরিক ডিম/ ভাত দে—ভাত দে রে/ গরম গরম গাঢ় ফেন মাখা/ গোলাপিবরণ ভাত/ শস্যের খোসা আমরার ক্ষেতে/ দানায় ভইরা দে।’ কিন্তু ডিমের দিক থেকে কোনো সান্ত্বনার আশ্বাস নেই—‘কিন্তু ডিম শাদা শান্ত থেকে যায়/ক্ষীরে ভরল না ভূষি—শত প্রাকৃত প্রার্থনায়।’ দীর্ঘ কবিতা শেষে কবি কোনো শান্তিময় নির্মল পৃথিবীর স্বপ্ন দেখান না, বরং মৃত্যুর মধ্যে প্রশান্তি খোঁজেন দুর্যোগগ্রস্ত মানুষ। তবুও জেগে থাকে হাঁস, যার শরীরে স্বকালের কোনো আঘাত ধরা পড়ে না, এমন কি বিপুল-বিস্তৃত জলের কোনো চিহ্নও মুদ্রিত থাকে না। 

সেলিম আল দীন ‘মসনভী’ কবিতায় সেকান্দার নামের এক পাখি-ব্যবসায়ী এবং তার চারটি পাখির কথা বলেছেন। প্রতিটি পাখির স্বতন্ত্র স্বভাবের পরিচয় যেমন তাতে উপস্থিত তেমনি পাখি-ব্যবসায়ীর মনস্তত্ত্বের সঙ্গে পাখিগুলোর সংরাগ-সংযুক্তির নানা দৃশ্য এতে ধরা পড়েছে। জলপিপি, বালিহাঁস বা পানকৌড়ি নয়, পাখির নাম জলসুখী। দেড়শ গ্রাম ওজনের একেকটি পাখি নিশ্চয়ই সেকান্দরের টানাটানির সংসারে সুখ আনবে না। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে নানা মৌসুমে নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে সে। সেলিম আল দীন জানাচ্ছেন:

সেকান্দর মুখ কালো—বয়স ত্রিশ কি বত্রিশ হবে।
বস্তিতে থাকে। বউটি বাঁজা ও চিররুগ্না।
কিন্তু সেকান্দর—দরিদ্র ও কামুক।
গ্রীষ্মকালে পচা আধপচাশবরী মনুয়া কলা বা
শাক সবজি— 
ঘণ্টায় ঘণ্টায় সিঁচে দেয়— 
ঝাঁকা নিয়ে হাঁকে—এই তরকারি। 

(মসনভী) 

এই পেশার পাশাপাশি চলে তার পাখি বিক্রি। বিশেষ করে শীতকালে। সারা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়ায় সে—গুলিস্তান—টিপুসুলতান রোড—বিজয়নগর—টিকাটুলী—আরো নানা জায়গায়। সেকান্দর যে পাখিগুলো বিক্রি করে সেগুলো ‘চালাক এবং রমণপ্রিয়’। এটা সেকান্দরের ধারণা। পাখিগুলোর এই জলসুখী নামও তারই দেয়া। এই পাখির ডিম নিয়ে একটি লোকবিশ্বাসের কথা সেকান্দর জানে, শুনেছে আরিচা-ঘাটের এক অর্ধউন্মাদ পাখি-শিকারির কাছে, যে কিনা ‘পাবনা বগুড়া দেশের নদীর ধারে ধারে/ জাল পেতে পাখি শিকার করে’, তার কাছে:

ডিমের রঙ নীল সবুজ।
তাতে জ্যোৎস্না চান্দের ওম।
দেইখতে হয় এক চোখ বন্ধ কইরা
না অইলে
ঠুস্। 

(মসনভী) 

দারিদ্র সেকান্দরের নিত্যসঙ্গী কিন্তু শরীরে টগবগ করে উত্তাল যৌবন। বাজা ও রুগ্না স্ত্রীর সান্নিধ্য তাকে সুখ দিতে পারে না। তাই পাখি বিক্রির নাম করে সে চলে যায় বেশ্যালয়ের দিকে। সেখানে ঝোলের টগবগানি আর ভাবের ঝোল চাখাপাখি শেষে সে যখন রাত দশটার দিকে বের হয়ে আসে তখন—

পাখি হাতে 
লুত নগরীর 
কোন অভিশপ্ত 
সমকামীর চেহারা 
সেকান্দরের।

(মসনভী) 

এই অভিশাপের ব্যাপারটি সেকান্দরের কাছে আরো বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে যখন তার খালি পেটের ভেতর থেকে বমি উঠে আসে। সেকান্দরের এই দশা দেখে সেলিম আল দীনের মনে হয়, অভিশপ্তদের ছায়া বোধকরি/ তাদের দেহের চেয়ে/ লম্বা বা ছোট হয়।/ অথবা—/ তারা ছায়াশাসিত/ বাইবেলের ঈশ্বর/ সাতটি দুর্ভোগ/ পৃথিবীতে/ মনুষ্য মধ্যে/ উপুড় করে দিয়েছেন।’ এ-প্রসঙ্গে তিনি হাজির করেন ঈসা নবীকে, যাঁর হাতের অষ্টম পেয়ালা উপুড় করার ফলে বেরিয়ে আসে চারটি জলসুখী পাখি। এই অপ্রকৃতস্থ সেকান্দরের কাছে তখন পাখিগুলোকে নিজের সন্তান বলে মনে হয়। নিজের সন্তানকে বিক্রি করে দেয়ার মতোই বেদনা উথলে ওঠে তার মনে। সেকান্দর নিজেকে রাক্ষসপিতা ভাবতে শুরু করে যে পিতা নিজের সন্তানকে রাক্ষসনখে ছিন্নভিন্ন করে আবার থুথু দিয়ে জোড়া লাগায়। এ ঘটনা অনেকটা রূপকথার মতো, যদিও সেলিম আল দীন বলছেন, ‘তবে এ রূপকথা/ কোথাও রয়েছে কিনা/ আমার ঠিক জানা নেই।’ এই পাখিগুলোকে সেকান্দর নিজে ধরে নি, আরিচাঘাটের এক গাঁজাখোর পাখিশিকারির কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে সে। এই পাখিশিকারির মতে, এগুলো কোনো সাধারণ পাখি নয়, দশ-বিশ বছরেও এরকম পাখির দেখা মেলে না— 

তিতাভূতা রহস্যময়
চরে চরে বগুড়া পাবনায়
শিশির জ্যোৎস্না পেরিয়ে 
আরও ভেতরে চলে গেলে 
যে অদ্ভুত শিল্পরাজ্য 
দুই চোখে তদ্রূপ আভা 
সোদমের অধিবাসী 
সেকান্দরের মুখে 
ভোরের আলো পড়েছে। 

(মসনভী)

এই পাখির গন্ধ স্বস্তিদায়ক নয়। কামকাতর সেকান্দরের কাছে এই পাখির নানা দিক উন্মোচিত হলেও এদের যৌনজীবনই অধিকতর প্রাধান্য পায়। সেলিম আল দীন সেকান্দরকে নিয়ে যে শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়ান, সেই শহর নানা রোগ-শোকে বিধ্বস্ত। পথেঘাটে মলমূত্রের স্তূপ। মানুষগুলোর জীবনযাপন বেপরোয়া, নারীদের সাজসজ্জা দেখে কেবলই বাড়তে থাকে যৌন-উত্তেজনা। পুলিশের উদ্ধত চলাচল। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিচিত্র বেলেল্লাপনা। শাসকের অদ্ভুত অশ্লীল কর্মকাণ্ড—আরও কত কী। ফলে পাখিদের ক্রেতা হিসেবে কবিতায় যারা উপস্থিত হয়, তাদের প্রসঙ্গ আর পাঠককে ভাবিত করে না। শাসকের বাসস্থান ঘিরে যে শাসকি সক্রিয়তা, কিংবা নির্বিঘ্নে শাসন-শোষণ অব্যাহত রাখার জন্য অস্ত্র ও গুলির মহড়া—তাই কবিতার প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। সেকান্দরের চোখ দিয়ে সেলিম আল দীন সরকারপ্রধানের বাসভবন এবং ভেতরে বসবাসকারী মানুষজনের খাদ্যাভ্যাসের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা সত্যিই মর্মভেদী: 

ঘোড়ার চেটের নাগাল 
একখান কামান। 
হায়রে 
পরীরদ্যাশে আইয়া পড়ছি।
রাজা সেকানে থাকেন।
তাঁর আছে—
হন্ত্রী যন্ত্রী ও মন্ত্রী।
মনে মনে দেখে সেকান্দর 
সেখানে 
ভোজের সময়— 
নিয়ে আসা হলো এক 
কিশোর বালকের রোস্ট।
তার শরীরে ঘিয়ের গন্ধ—ভাজাভাজা পেঁয়াজকুচি
—কিসমিস।
গতকাল গুলিতে নিহত হয়েছিল
এই বালক।
তার চোখ দুটো খুলে নেয়া হয়েছে—
মস্তক কর্তিত। গুলির
অংশগুলোতে মাখনের পুডিং।
পরীর দেশের রাজা
মানুষ খান
পাখি খান না
সেকান্দররের জ্বর জ্বর
বমিবমি লাগে। 

(মসনভী)

উদ্ধৃতি দীর্ঘ হলেও রাষ্ট্রযন্ত্র ও শাসন-শোষণ বিষয়ে সেলিম আল দীনের অনুধাবন তাঁর ভাষা ছাড়া আত্মস্থ করা সম্ভব নয়। মনে রাখা দরকার, সেকান্দরের এই মনোভাব কেবল পাখি বিক্রি করতে না পারার বেদনা থেকে উৎসারিত নয়। এর আড়ালে আছে রাষ্ট্রীয় শোষণ ও নিপীড়নের দীর্ঘ ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে শব্দরূপ দেয়ার ভাষা নেই সেকান্দরের, কিন্তু বেদনার চিরায়ত রূপটি তার মস্তিস্কেও খেলা করে। সেলিম আল দীন সেকান্দরের অন্তর্বেদনাকে শৈল্পিক সমৃদ্ধি ও সংহতি দিয়ে কবিতায় ধারণ করেছেন। 

‘মসনভী’ পাঠ করে আমরা জানতে পারি, পাখিগুলো শেষ পর্যন্ত বিক্রি হয় নি। সেকান্দরের চোখের সামনে এক এক করে মরে গেছে পাখিগুলো। এই মৃত পাখিদের সঙ্গে নিয়েই সে ফিরে এসেছে নিজের ডেরায়। কারণ, ‘পাখি মরে গেলে—/ বাঁধনের সুতো পড়ে থাকে।’ এই সুতোর টানেই মৃত পাখিগুলো জায়গা করে নিয়েছে সেকান্দরের মনে। পাখিদের একেকটি পালক থেকে জন্ম নিচ্ছে নতুন পাখি। সেকান্দর মৃত পাখিদের দিকেই হাত বাড়ায় এই আশ্বাসে যে, ‘হাত থেকে হাত খসুক—/ পাপ থেকে পাপ।’ কবিতাটির শেষ স্তবক এই কবিতার পাঠককে পৌঁছে দেয় অনুভব ও উপলব্ধির অন্য দিগন্তে: 

পাখিরা মরে না। 
মধ্যরাতের কিছু পর—
সেকান্দরকে ঠোঁটে নিয়ে
চারটি জলসুখী পাখি
দূর—পদ্মার থেকে আরো দূর—
জ্যোৎস্নাকুয়াশামাখা—হাওর-বাওরের দেশে
উড়াল দেয়। 
সেকান্দরের পাখিরা— 
মৃত্যুর পর প্রায়—
এক অলৌকিক—
শরীর। 

(মসনভী)

পাখির ঠোঁটে নিজেকে গেঁথে নিয়ে সেকান্দরের এই উড়াল দেয়া নিঃসন্দেহে বিচিত্র ভাব ও অর্থের দ্যোতক হিসেবে পাঠককে পল্লবিত করবে। শিল্পসাহিত্যে পাখির বিচিত্র উপস্থিতি সম্পর্কে যারা জানেন, তাদের জন্য সেলিম আল দীন নতুন কী বার্তা দিলেন, সে আলোচনা অন্য অবসরে করা যাবে। আপাতত এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, এই কবিতায় পাখির সান্নিধ্যে কামকাতর এক পাখিবিক্রেতার জন্মান্তর ঘটেছে। 

‘দুধ ও ভোর’ শীর্ষক কবিতাটিতে দুধের সঙ্গে ভোরের আত্মীয়তা নির্দেশের ধরনটি অসাধারণ। এই কবিতায়ও আছে শীতরাতে ‘গৃহস্থবাড়ির লেপা উঠানের মাঝখানে’ পালাগান বা লোককথার পরিবেশন-পদ্ধতি ও উপভোগের চিরায়ত দৃশ্যপট। সাত্তার গায়েনের কিসসা শোনার প্রসঙ্গে শৈশবের গ্রামকে নিশ্চয়ই অনেকে খুঁজে পাবেন। আয়োজনটা সেলিম আল দীনের ভাষায় এক ঝলক দেখে নেয়া যাক: 

নানা বর্ণের পৌরাণিক মেঘমুখ
হ্যাজাকের আলোতে-ছায়াতে ভাসছিল
গায়েনের ঠিক মাথার উপর।
তারাঠাঁসা পৌষ ধূমেল রাত। 
চান্দু লখিন্দার নেতা ও মনসা 
গায়েনের পেছনে নড়ল চড়ল
ছায়াপ্রায়। 

(‘দুধ ও ভোর’)

কিন্তু এই আয়োজন শেষ করেই কবিতাটি বাঁক নিয়েছে অন্যদিকে। সে বাঁক কখনো পথের শেষ নির্দেশ করে না। কেবল চলতে শেখায় এবং এই চলার মধ্যেই মূর্ত হয় অনাস্বাদিত আনন্দ। সেলিম আল দীন আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন : ‘কোনো কোনো আনন্দ/ সিসিফাসের পাথরযাত্রার শেষে/ উল্টো পথে/ ফের যাত্রা শুরু করতে হয়।’ লোকনাট্যের গায়েন ও সহযোগীদের পরিবেশনা ও সাজসজ্জার স্মৃতি মনে গেঁথে নিয়ে ঘরে ফেরার পর যে বৃদ্ধের কান্নার শব্দ শুনতে পান কবি, এই বৃদ্ধই কবিকে স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁর অন্য এক প্রিয়জনের কথা যে ‘সেলাইবিহীন শাদা কাপড় পরে/ চলে গেছে—যমুনা নদীর ওইপারে।’ এই চলে যাওয়া মানুষটিকেই কবির ভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছে। কারণ সে ছিল সমৃদ্ধির প্রতিকৃতি, যদিও প্রস্থানকালে তার ‘দড়ি কিংবা কাঠ কপালে জোটে নি’। সেই বৃদ্ধার সঙ্গে কবির স্মৃতির নানা দিক কবিতায় জায়গা পেয়েছে। স্মৃতি হাতড়ে তিনি সেই বুড়ির মুখ খুঁজে আনেন। এক রাত্রে আটত্রিশ বছর বয়সী কবির মুখের ওপর চেপে বসে আটাত্তর বছর বয়সী সেই বৃদ্ধা, আর কবির মনে হয়, ‘এই রাতে মোষেদের কালো শিং/ ষাঁড়দের শাদা কুঁদ/ জেগে থাকে সেই তেমনি তীক্ষ্ণ ভঙ্গিতে।’ দুগ্ধবতী গাভীর শারীরিক কসরত কবিতাটিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। কবি যখন বলেন, সেই গাভীর ‘লেজের চামড় অন্ধকারে শাঁইশাঁই করে।/ গাঢ় নিঃশ্বাস—/ কামসাধিকার কিংবা/ সৃষ্টিপ্রিয় কবির।’, তখন বুঝতে পারি, দুধের চাপ গাভীর শরীরে যে বেদনা সঞ্চার করে, তার সঙ্গে কবির সৃষ্টিশীলতার বেদনার একটা সম্পর্কসূত্র এখানে নির্মিত হয়েছে। কবিতাটির শেষ অংশ এই সিদ্ধান্তেরই অনুকূল:

রাত্রির রগে ভোর ছুটে যাচ্ছে
শিস্ দিতে দিতে।
আটছয় আটছয় পর্বভাগে ১৪ মাত্রার পয়ার
অন্ত্যমিলে এসে ফুরায়।
সেই রাত শেষে ভোরে দেখি মাটির মালসায়
ফেনা আলা দুধ নিয়ে এসেছে রাখাল।
দুই ভাই-বোন— 
ভোর ও দুধ এসেছে উঠানে
গিরস্থবাড়ির।

(দুধ ও ভোর) 

সেলিম আল দীনের একটি অসাধারণ প্রেমের কবিতা ‘বিষ চুমু’। প্রেমকে দৃশ্যে ধারণ করার প্রয়োজনে কবিতায় জায়গা পেয়েছে প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ, যদিও কবি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘প্রকৃতির পূজক আমি নই/ ধমনীতে নেব শুধু তীব্র এক রস।’ এই রসের রূপকল্পে আর্দ্রতা ছড়িয়েছে আষাঢ়ের মেঘমালা, সেই সঙ্গে—গেরুয়া গেরামের কটি গাছ।/ জলদ ছায়ার নিচে ঢালু—/ তীর ছুঁয়ে জলজাগা ঘাস।’ দৈহিক অভিব্যক্তির দ্যোতক হিসেবে কালোবর্ণ কেউটের প্রসঙ্গ এসেছে এবং সেই কেউটের শরীর ছুঁয়েছে আষাঢ়ের জল। ইচ্ছের ডালপালা বিস্তারিত হওয়ার দৃশ্যপটকে বৃক্ষ ও লতাগুল্মের বিস্তৃতির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন তিনি। ‘শিকারের শীতল রক্তে’ কবির প্রত্যাশার ‘ডালপালা দ্রুত বর্ধনশীল’। রূপক-প্রতীকের আড়াল ভেঙে সেলিম আল দীন শেষ পর্যন্ত পরিষ্কার করেই তাঁর মনের কথাটি প্রকাশ করেছেন, যে মন অনেকটাই শরীর-শাসিত। কবিতাটির অংশবিশেষ উদ্ধৃত করি:

এই আমি
হাঁটু গেড়ে বসি—এইবার—
দাও বিষ বিদ্যুত-ছোবল এই ওষ্ঠপুটে।
করাল দ্রংষ্টার গোলাপিগহ্বর থেকে 
যে গন্ধ—ঝাঁঝাল ওজোনের।
স্নায়ু
যা বইতে পারে না—সেই বিষ—
হিমাঙ্কের বহু নীচে—
দাও বোধি—দাও শ্যাম-কূট 

(বিষ চুমু)

সেলিম আল দীন বাংলাদেশের বিশিষ্ট যাত্রা অভিনেতা ও পরিচালক অমলেন্দু বিশ্বাস (১৯২৫-১৯৮৭)-কে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন একটি কবিতায়। কবিতার নাম ‘সাংখ্য’। নামের নিচেই যুক্ত করেছেন কয়েকটি সংখ্যা— ৩১৯৬৬৩। এই কালজয়ী অভিনেতার ফোন নম্বরটিকে এই কবিতায় নানা অর্থে ব্যবহার করেছেন কবি। যে নম্বরে ফোন করে শিল্পসাহিত্য বিশেষ করে যাত্রাপালার ইতিহাস-ঐতিহ্য-পরম্পরা বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন কবি, সেই নম্বরে আর অমলেন্দু বিশ্বাসকে পাওয়া যাবে না, শোনা যাবে না সেই ভরাট বিহ্বল কণ্ঠস্বর। কবিতাটিতে ধরা পড়েছে প্রিয় মানুষকে হারানোর সেই দুর্মর বেদনা:  

তিনের সঙ্গে একমন—দেহ নবদ্বার 
দ্বৈত ষষ্টাঙ্গ সামনে ত্রিবিশ্ব
আর কারো নয় শুধু—
কানেক্ট হলেই হ্যালো—
অমলেন্দু বিশ্বাস। 

(সাংখ্য)

ফোন করে অমলেন্দু বিশ্বাসকে না পাওয়ার বেদনা কবি সংখ্যার শরীরেও ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই শিল্পীর অনুপস্থিতিতে আত্মস্থ সংখ্যাগুলোও কেমন মলিন ও বিমর্ষ হয়ে গেছে : ‘এক মানবিক শোক—/ বিশ্লিষ্ট করে দেয়/ নির্ধারিত ডায়াল নম্বর।’ যাকে আর কোনো কোনোদিনই পাওয়া যাবে না, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রয়োজনে তিন এক নয় ছয় ছয় তিন—এই সংখ্যাকেই শঙ্খ করেছেন কবি: 

অঙ্ক আর পায় না নাগাল তার—তবু
সংখ্যাকে শঙ্খ করি তুলি ফুৎকার 
মেঘের ফাটল থেকে নেমে আসে 
সূর্যের শেকড়

(সাংখ্য)

‘দেহত্ব’ শীর্ষক কবিতাটি অনেকটাই আত্মকথনের ভঙ্গিতে রচিত। এই কবিতার ‘তুমি’ থেকে সেলিম আল দীনকে খুঁজে নেয়া যায়। এই কবিতায় সভ্যতার উজ্জ্বল অবদান চাকার প্রসঙ্গ থাকলেও কবিতাটির পাঠ শেষে নাট্যাচার্যের চাকা নাটকটির কথা খুব মনে পড়ে। আর যে আত্মিক ও আধ্যাত্মিক সাধনার কথা কবিতায় বলা হয়েছে, তাও কবির দেহাত্ম-দর্শনের সমান্তরাল বলে মনে হয়। দর্পণে নিজেকে মেলে ধরার মধ্য দিয়ে তিনি হয়তো আত্মসমালোচনার প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে থাকবেন:

এক জোড়া আয়না পেয়েছ 
ঝেড়ে মুছে দেখে নাও ভেতরের কল 
আর আছে দুটি গহ্বর কর্ণকুহর 
ধ্বনি পাখিদের বাসা
দুই হাতে দুই কাঁদি শবরীকলা
ঝুলে আছে নিত্য তব কালের আহার। 

(দেহত্ব) 

কবিতাটির শেষ স্তবক অনেকটা সমাধিলিপির আদলে রচিত। ফুটন্ত নক্ষত্রের দিকে যে যাত্রা তা জন্মমৃত্যু, জীবনযাপনের বাইরের কোনো ভুবনের অভিঘাত সঞ্চার করে:

এইসব নিয়ে তুমি ছুটে যাও ফুটন্ত নক্ষত্রলোকে 
তোমার জন্মমৃত্যু পিছে রেখে চল
এই শোভন গড়ন নিয়ে 
উড়ে যাও ভুবনের সাথে—। 

(দেহত্ব) 

আলোচনার শুরুতেই আভাস দিয়েছি, সেলিম আল দীনের কবিপ্রতিভার গতিবিধি অনুধাবনের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক অঞ্চল তাঁর কালজয়ী নাট্যগ্রন্থসমূহ। একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে তাঁর নাটকের বইগুলো নাড়াচাড়া করতে গিয়ে তাঁর চরিত্রসমূহের অন্তর্লোক উন্মোচনের মুন্সিয়ানায় আমি যার-পর-নাই পুলকিত হয়েছি এবং এই নাটব্যক্তিত্বের বিরল ক্ষমতার গভীরদেশে প্রবহমান কবিত্বশক্তির স্পর্শে আলোকপ্রাপ্ত হওয়ার চেষ্টা করেছি। যদিও এই রচনায় সেলিম আল দীনের কোনো জনপ্রিয় বা যুগোত্তীর্ণ নাটকের কবিত্বময় ভাষার গড়িমা নির্দেশ করার চেষ্টা অনুপস্থিত। বিভিন্ন সময়ে বিশেষ প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ বিরতি দিয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর সেই কবিতাবলি কাছের মানুষদের নামে উৎসর্গ করেছেন। সেলিম আল দীনের প্রিয় মানুষদের তালিকা এখানে তুলে ধরতে চাই না, তবে এটুকু বলা যায় যে তাঁরা প্রত্যেকেই শিল্পসাহিত্যের নানা প্রান্তের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব এবং সেই সুবাদে আমাদেরও কাছের মানুষ, আপনজন। কবিতার শিরোভাগে তাঁদের নাম জ্বলজ্বল করলেও কবিতার ভেতরে সেই ব্যক্তিমানুষের সীমাবদ্ধ ভূগোলে পরিক্রমণের কোনো চিহ্নই খুঁজে পাওয়া যায় না। কিংবা বলা যায় তাঁদের সঙ্গে সেলিম আল দীনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ছিটেফোঁটা প্রভাব সত্ত্বেও কবিতাগুলি একটা নৈর্ব্যক্তিক চরিত্র ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। অন্তত কবিতার পাঠকের সৃষ্টিশীল অভিজ্ঞান ও অভিব্যক্তির ডালডালা বিস্তারে সেই সম্পর্কের তন্তুজাল কোনো তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে না। ব্যক্তিক সম্পর্কের দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবেই বোধকরি তিনি অনুভূতিকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের বিচিত্র ঘাতপ্রতিঘাতের সাপেক্ষে শব্দরূপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। 

সেলিম আল দীনের রচনাবলিতে কবি হিসেবে তাঁর যে সংক্ষিপ্ত ভূখণ্ডের দেখা মেলে, সেখানেও যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে পাঠককে সাবধানে পা ফেলতে হয়। এই প্রস্তুতির সব দিক সম্পর্কে আমার নিজের ধারণাও খুব একটা পরিষ্কার নয়। তবে বিশ্বসাহিত্যের নানা বাঁক ও বিভক্তি, বৈচিত্র্য ও বিস্তার বিষয়ে ধারণায় ঘাটতি থাকলে কবি সেলিম আল দীনকে ভজনা করা সত্যিই কঠিন। পরিশ্রমী পাঠক নিশ্চয়ই এতে ভয় পাবেন না। বোকার মতো বিরল সাহস নিয়ে তাঁর কবিতার একটা ব্যক্তিগত পাঠ নিরূপণের চেষ্টাও হয়তো অর্থহীন নয়। সেলিম আল দীনের কবিতা বিষয়ে এই লেখা সেই বিরল দুঃসাহস থেকেই উৎসারিত।

তারেক রেজা

তারেক রেজা

জন্ম ৯ নভেম্বর ১৯৭৮, গঙ্গারামপুর, হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ। বাংলায় স্নাতক...বিস্তারিত