অলঙ্করণ : সারাজাত সৌম
সময়টা তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনালগ্নে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দাসত্ব থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার জন্য বিপ্লবীদের ডাক। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেদিন সাড়া দিয়েছিলেন এই ডাকে। অসংখ্য ইস্পাতদৃঢ় বীর ইংরেজের গুলিতে-ফাঁসিকাষ্ঠে আত্মবলিদান করেছিলেন, কারাগারে ও দ্বীপান্তরে শিকার হয়েছিলেন অসহনীয় নির্যাতনের। বাংলায়ও তখন চলছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দাসত্ব থেকে মুক্তির বিপ্লবী যজ্ঞ। ১৯১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এই কিংবদন্তিতুল্য বিপ্লবী নায়কেরা উড়িষ্যার উপকূলে বুড়ি বালামে ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে ট্রেঞ্চের মধ্যে যুদ্ধ করতে করতে অসীম বীরত্বের সাথে শহিদ হন। ইতিহাসে অমর নায়কদের রক্তরঞ্জিত আত্মবলিদানের এমনই এক সন্ধিক্ষণে ১৯১৫ সালে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন তাঁর রাজনৈতিক উপন্যাস ঘরে বাইরে এবং পরম যত্নে সৃষ্টি করেছেন তাঁর নায়ক নিখিলেশকে। এই উপন্যাসটি রবিবাবুর লেখা অন্যান্য উপন্যাসের মতো নয় আর তার লেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষিত ও পরাধীন ভারতীয় উপমহাদেশীয় দৃষ্টিতে একটি আপনদৃষ্ট উপন্যাস মাত্র। প্রায় ১০০ বছর ধরে রবীন্দ্রবিরোধী গোষ্ঠী এবং রবীন্দ্রনাথের পূজারী গোষ্ঠী বিশ্লেষকগণ এই ঘরে বাইরে নিয়ে কথা বলেছেন এবং এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। আমাদের আজকের এই আলোচনা কোনো চূড়ান্ত পর্যায়ের বিশ্লেষণ বা বাণী নয় যে এইটাই শিরোধার্য, তবে হ্যাঁ, রবিবাবুর এই ঘরে বাইরে উপন্যাসের দুইটি দিক নিয়ে আমাদের আলোচনা এগিয়ে যাবে। এর একটি দিক হলো উপন্যাস লেখাকালীন সময়কাল ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আর দ্বিতীয় দিক হলো উপন্যাসের চরিত্র চিত্রায়ণের উদ্দেশ্য এবং কারণ বা গুরুত্ব। সবিশেষ বলতে চাই এই আলোচনাটি অন্য অনেকের মতো রবি-বধ বা রবি-পুজোর কোনো প্রকল্প বা মিশন নহে।
প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের লেখা ঘরে বাইরে নিয়ে চিঠি দেখে নিতে পারি—
‘বস্তুত ঘরে বাইরে বইখানিকে বাঙালি পাঠক যেরূপ অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ করিয়া দেখিয়াছিল বিলাতের পাঠকেরা তেমন করিয়া দেখে নাই—ইহাতে আমি অত্যন্ত তৃপ্তি লাভ করিয়াছি। আমি আমাদের দেশের পলিটিক্যাল অবস্থাকে মুখ্য করিয়া সাহিত্য রচনা করিতে অক্ষম— অথচ সেই কুনো দৃষ্টিতে আমার লেখা পড়িলে পদে পদে উল্টো বুঝিতে হয়। ঘরে বাইরে’র মূল কথাটি রাষ্ট্রতত্ত্ব সমাজতত্ত্ব আকারে বর্ত্তমান কালের সকল জাতির মধ্যেই চিন্তায় ও কর্ম্মে ব্যাপকরূপে সংক্রামিত। সেই কারণেই আমার এ বইটি লেখা সহজ হইয়াছে। অবশ্য গল্পের মূল ভাবটি যতই সর্ব্বজনীন হউক না তাহার মূর্ত্তিটি বিশেষ দেশকালকে অবলম্বন না করিয়া থাকিতে পারে না।—সেই কারণে ঘরে বাইরে বাংলাদেশের স্বদেশী আন্দোলন আশ্রয় করিয়া আপন আখ্যায়িকার কাঠামো বানাইয়াছে। ইহা উপলক্ষ্য মাত্র, লক্ষ্য নয়।’
রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে লেখা এই চিঠিতে বেশ কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায় এই উপন্যাস তৈরির। সুকুমার সেনের মতে, “রবীন্দ্রনাথের কোনো উপন্যাসে যথার্থ ভিলেন বা পাষণ্ড নাই একমাত্র এই সন্দীপ ছাড়া।” উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিমলা, জমিদার তথা ‘মহারাজ’, নিখিলেশের স্ত্রী, ‘রাজবাড়ী’র ‘ছোটরাণী’। নিখিলেশই ছিলেন বিমলার শ্রদ্ধা, প্রেম ও আদর্শের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু দেশব্যাপী ব্রিটিশ-বিরোধী বয়কট-স্বদেশী আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ আন্দোলিত করে বিমলাকে, উদ্বুদ্ধ হন তিনি। এ সময়েই আবির্ভাব ঘটে সন্দীপের, যিনি ব্রিটিশ-বিরোধী বয়কট-স্বদেশী ও সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা এবং নিখিলেশের বন্ধু। সন্দ্বীপ তাঁর বাগ্মিতা, সাহস ও রাজনৈতিক আদর্শবোধের উচ্ছ্বাসে মোহাবিষ্ট করেন বিমলাকে। আন্দোলনের প্রয়োজনে নিজস্ব গয়না, টাকা, এমনকি ‘রাজবাড়ী’র সম্পদ চুরি করে তাঁর হাতে তুলে দিতে দ্বিধা করেন না তিনি। নিখিলেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিমলার এই রূপান্তর মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণায় নিক্ষেপ করে নিখিলেশকে। তাদের নয় বছরের বিবাহিত জীবনে দেখা দেয় অস্থিরতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর শান্তি, সংস্কার ও অহিংসার মন্ত্রে দৃঢ় থাকেন। আদর্শগতভাবে তাঁর অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় তাঁর শৈশবের শিক্ষাগুরু বৃদ্ধ চন্দ্রনাথবাবু। নিখিলেশের ভাষায়, “ঐ মানুষটি তাঁর শান্তি, তাঁর সত্য, তাঁর পবিত্র মূর্তিখানি নিয়ে আমার জীবনের মাঝখানটিতে তাঁর জীবনের প্রতিষ্ঠা করেছেন। “সন্দ্বীপ ও তাঁর তরুণ স্বদেশী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিতর্কে অবতীর্ণ হন নিখিলেশ, ‘রক্ষা’ ও ‘পুনর্বাসিত’ করেন স্বদেশীদের দ্বারা ‘অত্যাচারিত’ দরিদ্র পঞ্চুকে এবং শরণাপন্ন হন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের পুলিশের। এই প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে নিখিলেশের রাজনৈতিক দর্শন, ব্রিটিশ পরাধীনতার অধীনে থেকে সামন্ততন্ত্র-নির্ভরশীল জনসেবা ও দেশসেবা । অন্যদিকে দ্রুতই সন্দ্বীপের মিথ্যাচার, আদর্শের ভণ্ডামি, নিষ্ঠুরতা, সন্ত্রাস ও অসততায় মোহমুক্তি ঘটতে থাকে বিমলার। ব্যক্তি সন্দীপের প্রতি নেতিবাদ থেকে তিনি ব্রিটিশ-বিরোধী আপসহীন সংগ্রামের রাজনীতি ত্যাগ করেন। এবং নিখিলেশের পদতলে পুনরায় নিজেকে সঁপে দেন। সন্দ্বীপের শিষ্য ১৮-১৯ বছরের তরতাজা তরুণ বিপ্লবী অমূল্য, সমকালীন বাংলা ও ভারতবর্ষের ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকীদেরই যেন প্রতিচ্ছবি। কিন্তু উপন্যাসে সে বিপ্লবের ‘ভ্রান্ত’ পথে চালিত অসচেতন নিষ্পাপ এক কিশোর। স্বদেশের মুক্তির ব্রতে নয়, বরং ব্যক্তিগত আবেগপ্রবণ সম্পর্কের কারণে সে ডাকাতি করে এবং অকারণে নিরপরাধ মানুষ খুন করার চিন্তা করতেও তাঁর বাঁধে না। অবশেষে বিমলার স্নেহের কাছে নতি স্বীকার করে অমূল্য। “আমার বন্দে মাতরম মন্ত্র রইল তোমার পায়ের তলায়”, বিমলার সামনে এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে সে তাঁর বিপ্লবী দেশব্রত পরিত্যাগ করে এবং কার্যত নিখিলেশের ভাবাদর্শের কাছেই আত্মসমর্পণ করে। নিখিলেশের কাছে বিমলা, অমূল্য, এমনকি সন্দীপ, সকলের আত্মসমর্পণ, এটিই উপন্যাসের মূল উপসংহার হয়ে দাঁড়ায় শেষাব্দি। অবশ্য উপন্যাসের সমাপ্তি টানা হয়েছে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা নয়, বরং দাঙ্গাকারী ‘মুসলমানের দল’ বয়কট-স্বদেশী আন্দোলনকারীদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে সামনে আসে। এই ‘মুসলমানদের দলে’র ভয়ে পলায়ন করেন সন্দীপ, মুসলমান দাঙ্গাকারীদের হাতে নিহত হয় নিরস্ত্র অমূল্য এবং গুরুতরভাবে আহত হন নিরস্ত্র মানবতাবাদী নিখিলেশ। এভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্য দিয়েই ঘটে উপন্যাসের সমাপ্তি। সুকুমার সেনকে উদ্ধৃত করে নেপাল মজুমদার তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন, ‘কিন্তু সেইসঙ্গে কতকগুলি প্রশ্ন থাকিয়া যায় : রবীন্দ্রনাথ সন্দীপকে এরূপ হীন স্বার্থপর ও কাপুরুষ করিয়া সৃষ্টি করিলেন কেন? সন্দীপ কি যথার্থভাবে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের আদর্শকে প্রতিনিধিত্ব করিয়াছে?... রবীন্দ্রনাথ কি ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, কানাই, সত্যেন, অরবিন্দ, মদনলাল ধিংড়া, রাসবিহারী ঘোষ, বাঘা যতীন প্রমুখ সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের নেতাদের দেখিতে পাইলেন না?” ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত উপন্যাসের সন্দীপ চরিত্র সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, “আমি অন্তত এ প্রকার বিপ্লবী বাংলার ভিতর দেখি নাই।” হিতেন্দ্র মিত্র প্রশ্ন তুলেছেন, “সন্দীপ কি বিপ্লবীদের প্রকৃত প্রতিনিধি? এই চরিত্রাঙ্কন কি বিপ্লবীদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের বিরূপ মনোভাবের প্রকাশ নয়?... এটা বেদনাদায়ক যে, ‘ঘরে বাইরে’ যখন ধারাবাহিকভাবে সবুজপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে, ঠিক সে সময়ে সেপ্টেম্বরে পুলিশের সাথে সামনাসামনি যুদ্ধে শহিদ বাঘা যতীনের অসম সাহসিকতাকে রবীন্দ্রনাথ ধর্তব্যের মধ্যেও নেন নি।” তিনি মন্তব্য করেছেন, “একজন লেখক যখন তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কালিমালিপ্ত করেন, তখন তা অবশ্যই আপত্তিকর।”
সুতরাং সন্দ্বীপ কতটুকু ইতিহাসের সত্যের শিল্পসম্মত সাহিত্য-রূপ, সেটা অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু নিখিলেশ, যাকে রবীন্দ্রনাথ একশ ভাগ ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তা ইতিহাসের সত্যেরই সাহিত্য-রূপ। কারণ নিখিলেশের মধ্যে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নিজে, যা বাস্তব ও সত্য। নিখিলেশের রাজনীতি ও মতাদর্শ তথা নিখিলেশবৃন্দ সে সময়ে, এমনকি তাঁর আগে ও পরে, ভারতের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিরাজ করছিল। সুতরাং, ঘরে বাইরে উপন্যাসটিকে রাজনৈতিকভাবে পর্যালোচনা করতে হলে মূল করণীয় হয়ে হয়ে দাঁড়ায় নিখিলেশ এবং তাঁর প্রদর্শিত পথ ও নীতিকে বিশ্লেষণ করা। তাহলেই উপন্যাসটির মর্মবস্তুতে আমরা পৌঁছতে সক্ষম হব। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ প্রয়োজন যে, বিশ শতকের সূচনা থেকেই রবীন্দ্রনাথ ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রশ্ন, যা চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উত্থাপিত হচ্ছিল—যেমন, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, ইংরেজ শাসন ও ভারতবর্ষের সম্পর্ক, সর্বভারতীয়তা, জাতীয়তাবাদ, দেশসেবা ও উন্নয়ন, বিপ্লবী রাজনীতি, জনগণের সংগ্রাম, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সম্পর্ক—ইত্যাকার প্রশ্নে তাঁর রাজনৈতিক মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রকাশ করেছিলেন। ঘরে বাইরে উপন্যাসে মূলত নিখিলেশ এবং কিছুটা চন্দ্রনাথের মধ্য দিয়ে তাঁর এই সকল মত-পথ প্রতিফলিত হয়েছে। ইতিমধ্যেই রবীন্দ্রনাথ বাংলা ও ভারতবর্ষে প্রধান সাহিত্য-প্রতিভায় পরিণত হয়েছিলেন এবং নোবেল পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি ও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এমতাবস্থায় ঘরে বাইরের পাশাপাশি তাঁর উল্লেখিত কালের মূল মূল প্রবন্ধগুলোর উপর আলোকপাত অবশ্যই একটা বড় সময়ব্যাপী রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে উপলব্ধিতে বিশেষ সহায়ক হবে।
রবীন্দ্রনাথ ঘরে বাইরে লেখা শুরু করেন ১৯১৫ সালের এপ্রিলে। ১৯১৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তা ধারাবাহিকভাবে সবুজপত্রে প্রকাশিত হয়। সে বছরই তা গ্রন্থাকারে প্রকাশ লাভ করে। রবীন্দ্র-জীবনীকার প্রভাতকুমার মন্তব্য করেছেন, ঘরে বাইরে সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বেশি আলোচিত উপন্যাস। প্রকাশের তিন বৎসর পর্যন্ত সাময়িক পত্র-পত্রিকায় এটি নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা চলেছিল এবং অনেক খ্যাতনামা লেখক তাতে অংশ নিয়েছিলেন। কার্যত, উপন্যাসটি নিয়ে পণ্ডিতমহলে তুমুল তর্কবিতর্ক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় এবং বিপ্লবীমহলে কিছুটা সমালোচনা ওঠে। সে সময় উপন্যাসটি সম্পর্কে জবাবদিহি করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘লেখকের কাল লেখকের চিত্তের মধ্যে গোচরে ও অগোচরে কাজ করছে।... আমাদের দেশের আধুনিক কাল গোপনে লেখকের মনে যে-সব রেখাপাত করেছে ঘরে বাইরে গল্পের মধ্যে তার ছাপ পড়ছে।’ সুতরাং এটা নিঃসন্দেহ যে সমসাময়িক কালের প্রতিক্রিয়া হিসেবে রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চেতনা ঘরে বাইরে উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গেই প্রভাতকুমার লিখেছেন, ‘দেশের কতগুলি সমস্যা কবিচিত্তকে কিছুকাল হইতে উদ্বেলিত করিতেছিল, তাহা তাঁহার গোচরে হউক আর অগোচরে হউক, উপন্যাস মধ্যে প্রকাশ পাইয়াছে।’ ১৯১৯ সালে ঘরে বাইরের ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশিত হয় The Home and the World শিরোনামে। অনুবাদকর্মটি যদিও করেন সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথেরও উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ তাতে ছিল। বিশিষ্ট ইংরেজ চিত্রশিল্পী উইলিয়াম রোদেনস্টাইন, যিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ট বন্ধু ও গুণমুগ্ধ পাঠক এবং যাঁকে তিনি গীতাঞ্জলির ইংরেজী অনুবাদ উৎসর্গ করেছিলেন, উপন্যাসটি পড়েই এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। উপন্যাসটি প্রখ্যাত আইরিশ কবি-নাট্যকার ইয়েটস ও নাট্যকার লেডি গ্রেগরির প্রশংসায় অভিষিক্ত হয়। জার্মানিতে উপন্যাসটি রবীন্দ্রনাথের সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থে পরিণত হয়। আইনস্টাইনকে তাঁর এক বন্ধু লেখেন, ‘এক কথায়, উপন্যাসটি তোমার অবশ্যই পড়া উচিত। সুদীর্ঘ কালের মধ্যে এটি আমার পড়া শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।’ বিশ্ববিখ্যাত জার্মান নাট্যকার ব্রেখট তাঁর ডায়েরিতে মন্তব্য করেছিলেন, ‘জাতীয়তাবাদের বিকৃতি সম্পর্কে উপন্যাসটি এক বলিষ্ঠ ও বিনীত সতর্কবাণী প্রদান করে’ এবং এটি ‘বলিষ্ঠ এবং মার্জিত একটি চমৎকার বই।’ তবে উপন্যাসটির খোলামেলা এবং তীক্ষ্ণ নেতিবাচক, সংক্ষিপ্ত এবং কিছুটা পূর্ণাঙ্গ সমালোচনা যিনি করেছিলেন, তিনি জর্জ লুকাচ (George Lukacs), হাঙ্গেরির বিশ্বখ্যাত লেখক, দার্শনিক, সাহিত্য-সমালোচক ও ইতিহাসবিদ। এর মাত্র কিছুদিন পূর্বে অর্থাৎ ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ জার্মান সফর করেছিলেন। ইতিপূর্বেই, গীতাঞ্জলি, ঘরে বাইরে ও Nationalism-সহ রবীন্দ্রনাথের অনেকগুলো কাব্যগ্রন্থ, প্রবন্ধ-সংকলন, ছোটগল্প, নাটক ও উপন্যাস জার্মান ভাষায় মোট আট খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। সবগুলি বইয়ের বিক্রয়ের পরিমাণও ছিল বিস্ময়কর।
শ্রী রবীন্দ্রনাথের কর্তব্য হচ্ছে ভারতীয়দের আধ্যাত্মিকভাবে উদ্ধার করা, সহিংসতা-প্রবঞ্চনা প্রভৃতি যে সকল উপায়ে তাঁরা তাঁদের স্বাধীনতা- সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, সে সমস্ত আপদ থেকে তাঁদের আত্মাকে সুরক্ষা দেওয়া
হাঙ্গেরির লেখক গে লুকাচ ১৯২২ সালে Tagores Gandhi Novel, Review of Rabindranath Tagore: The Home and the World শিরোনামে ঘরে বাইরে উপন্যাসের নাতিদীর্ঘ, তীক্ষ্ণ মূল্যায়নধর্মী পর্যালোচনাটি লিখেছিলেন এবং বার্লিন থেকে প্রকাশিত Die rote Fahne সাময়িকীতে তা প্রকাশিত হয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে জার্মান ‘বুদ্ধিজীবী-অভিজাতবৃন্দে’র মাতামাতিকে তিনি সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি এবং তাদের অবক্ষয়ের একটি নিদর্শন হিসাবে অভিহিত করেছিলেন। লুকাচ লিখেছিলেন, ভারতবর্ষ নিপীড়িত, পরাধীনতার নিগড়ে বন্দি একটি দেশ। কিন্তু এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করছেন না। যত যাই হোক, তিনি তো একজন দার্শনিক, শুধু ‘চিরন্তন সত্য’ নিয়ে ভাবিত একজন নীতিবিদ। ব্রিটিশ সহিংসতার আশ্রয় নিয়ে নিজেরাই নিজেদের আত্মার ক্ষতি করেছে, এর বিহিতও তাঁরা নিজেদের মর্জিমাফিক নিজস্ব উপায়ে করুক! শ্রী রবীন্দ্রনাথের কর্তব্য হচ্ছে ভারতীয়দের আধ্যাত্মিকভাবে উদ্ধার করা, সহিংসতা-প্রবঞ্চনা প্রভৃতি যে সকল উপায়ে তাঁরা তাঁদের স্বাধীনতা-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, সে সমস্ত আপদ থেকে তাঁদের আত্মাকে সুরক্ষা দেওয়া। তিনি লিখেছেন, ‘সত্যের জন্য মানুষ মরে অমর হয়, কোনো জাতিও যদি সত্যের জন্য মৃত্যু বরণ করে, তবে তাঁরা মানব ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করবে’। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতবর্ষের চিরস্থায়ী দাসত্বের ভাবাদর্শ ছাড়া অন্য কিছু নয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপন্যাসের ঘটনা ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে এই অভিপ্রায়কে যেভাবে প্রকাশ করেছেন তাতে এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেশি নগ্ন ও মূর্ত হয়ে উঠেছে। বিশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপের চিন্তাজগতে প্রভাববিস্তারকারী বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী হিসাবে লুকাচের সমালোচনাটি ছিল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং আজও তা পর্যালোচনা দাবি করে। তবে এ প্রশ্নে যাওয়ার পূর্বে যে কালে ঘরে বাইরে লেখা হচ্ছে সেই কালটিকে কিছুটা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন এবং ঘটমান সৌন্দর্যকে আর ব্যাপ্তি প্রসরমানতার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
রবিবাবুর চতুরঙ্গ উপন্যাসের মতো ঘরে বাইরেও একটি ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনি : সন্দ্বীপ, বিমলা, নিখিলেশ। অতঃপর ঘরে বাইরের গল্পও ঔপন্যাসিক রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেন নি—তার বদলে তিনি পরস্পর জুড়ে দিয়েছেন সন্দ্বীপ, বিমলা, নিখিলেশের আত্মকথা। এই আত্মকথনের জন্যে আমরা তাদের মনের কথাকে পাই। তারা প্রত্যেকে যখন তাদের আত্মকথা লেখে—তখন তাদের নিভৃততম অন্তরের ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করে—তখন তারা কারো মুখ চেয়ে করে না, আর সে জন্যে খুব সহজে পৌঁছে যায় তাদের ব্যক্তিচৈতন্যের খুব অন্তর্গভীরে। মগ্নচৈতন্যের গভীর থেকে যে মানুষটি ধরা পড়ে, তাকে একেবারে অচেনা অভাবিত মনে হয়। চেনা মানুষের সারিতে অচেনা মানুষকে দেখে অবাক লাগে। এ জন্যেই বোধ করি প্রমথ চৌধুরী একদা ঘরে বাইরে উপন্যাসকে একটি রূপক করেছিলেন। 'সবুজপত্র' পত্রিকায় লিখেছিলেন, নিখিলেশ হচ্ছে প্রাচীন ভারতবর্ষ, সন্দ্বীপ নবীন ইউরোপ আর বিমলা বর্তমান ভারত।’
নারী একটা রেজিস্ট্যার্ডের মাধ্যমে কারও দাসে পরিণত হলো। সে-ই মনিব যেইটা চান তার বাইরে কিছুই সম্ভব না। রবীন্দ্রনাথ তাই-ই করলেন
তবে অধিকাংশ রবীন্দ্র-উপন্যাস আলোচক একমত পোষণ করেছেন যে, স্বদেশী যুগের রাজনীতির সাথে ঘরে বাইরে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ফলে ঘরে বাইরের পরিচয় রাজনৈতিক উপন্যাস। অর্থাৎ এক বিশেষ দেশকালের রাজনীতি উপন্যাসটির পরতে পরতে এমন মিশে আছে, যাকে বাদ দিয়ে এর কাহিনি পড়ে মরুক, উপন্যাসের কোনো চরিত্রকে পর্যন্ত ভাবা যায় না। এ কথা সত্যি, কিন্তু তার চেয়েও সত্যি, রাজনীতি ঘরে বাইরের অন্তর্গত হলেও, অবিমিশ্র নয়। বরং তার সাথে জড়িয়ে অচ্ছেদ্য হয়ে আছে নর-নারীর সঙ্কটাপন্ন জীবনসম্বন্ধ। এই সঙ্কট রাজনীতিকে উপলক্ষ করে ঘনিয়ে ওঠে ঠিকই কিন্তু শেষাব্দি তাকে ছাপিয়ে গেছে। তা না হলে সন্দ্বীপের ভূমিকা হতো অকপট, বিমলা সত্যি সত্যি বাইরে বেরিয়ে আসত, কেবল বসার ঘরে এসে থেমে যেত না, আর নিখিলেশের ভূমিকা হাহাকারের করুণ সুরে সমস্ত উপন্যাসজুড়ে ধ্বনিত হতো না—ঘরে বাইরে হতে পারত রবিবাবুর মহৎ এক সৃষ্টি। প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন তবে ঘরে বাইরে মহত্ব লাভ করে নি?
নিখিলেশ যেন রবীন্দ্রনাথের মানসপুত্র, স্বদেশী আন্দোলনের যুগ হইতে রবীন্দ্রনাথ যে স্বদেশী সমাজ ও পল্লীউন্নয়নমূলক আদর্শের প্রচার করিয়া আসিতেছিলেন, নিখিলেশ যেন সেই রকম আদর্শে নিষ্ঠাবান বলিষ্ঠ উদার চরিত্রের নির্ভীক যুবক। অপরদিকে, সন্দ্বীপ বাংলাদেশের তৎকালীন সন্ত্রাসবাদী বা সশস্ত্র বিপ্লববাদী আন্দোলনের একজন নেতৃস্থানীয়।
অন্যদিকে ঘরে বাইরে উপন্যাসে বিমলার উঁকিঝুঁকির মাঝে ডাক আসে উত্তাল স্বদেশী আন্দোলনের। সম্প্রীতির রাখিবন্ধন করে সেই ভাঙনকে রুখে দেন এক সূর্যের মতো দীপ্ত পুরুষ। দেশ যে কোনো ভৌগোলিক সীমানা নয়, দেশ যে পরাধীন জাতির আত্মায় বসবাস করে, দেশের মূক মুখ যে মানুষেরই অপমান! সে সন্দ্বীপ, নিখিলেশের বন্ধু। স্বামীর বন্ধুর সাথে জড়িয়ে পড়ল বিমলা, ‘এতদিন আমি ছিলুম গ্রামের ছোট এক নদী; তখন ছিল আমার এক ছন্দ, এক ভাষা। কিন্তু কখন একদিন কোনো খবর না দিয়ে সমুদ্রের বান ডেকে এল; আমার বুক ফুলে উঠল, আমার কূল ছাপিয়ে গেল, সমুদ্রের ডমরুর তালে তালে আমার স্রোতের কলতান বেজে বেজে উঠতে লাগল। আমি আপনার রক্তের ভিতরকার সেই ধ্বনির ঠিক অর্থটা তো বুঝতে পারলুম না। সে আমি কোথায় গেল? হঠাৎ আমার মধ্যে রূপের ঢেউ কোথা থেকে এমন করে ফেনিয়ে এল? সন্দ্বীপবাবুর দুই অতৃপ্ত চোখ আমার সৌন্দর্যের দিকে যেন পূজার প্রদীপের মতো জ্বলে উঠল। রূপেতে শক্তিতে আমি যে আশ্চর্য, সে কথা সন্দ্বীপবাবুর সমস্ত চাওয়ায় কওয়ায় মন্দিরের কাঁসার ঘণ্টার মতো আকাশ ফাটিয়ে বাজতে লাগল। সেদিন তাতেই পৃথিবীর অন্য সমস্ত আওয়াজ ঢেকে দিল।’
এখানে বিমলাকে যে রূপে আঁকা হলো তা পাঠকের সাথে এবার ভাগ করে নিতে পারি নিশ্চয়ই। বিমলা হলেন এই উপন্যাসের প্রকৃতি চরিত্র। তার রূপ তার মনোজগত সবই প্রকৃতির মতন। রবিবাবু বুঝি সেই সুযোগটাই নিয়েছেন। বিমলাকে করিয়েছেন পড়ালেখা, বিলেতি কায়দায় সব পোশাক-পরিচ্ছদ; কোথাও কমতি রাখেন নি। ঘরের সবকিছু শেষে আনলেন বাইরে, এরপর তাকে দিয়ে করিয়েছেন পরকীয়া। প্রতিটি মুহূর্তে ভাঙতে ভাঙতে শেষমেষ ভেঙে দেন পুরনো সব নিয়ম-রীতি-সংস্কার। আপন মহিমায় তখন ঘরে বাইরে হয়ে যায় সারা পৃথিবীর। বিমলাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি আগুনের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এসেছি, যা পুড়বার তা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যা বাকি আছে তার আর মরণ নেই। সেই আমি আপনাকে নিবেদন করে দিলুম তাঁর পায়ে যিনি আমার সকল অপরাধকে তাঁর গভীর বেদনার মধ্যে গ্রহণ করেছেন।’ একে ঠিক কী বলা যেতে পারে? কোনো গঁৎবাধা ছকে আঁটা খেলা কি? আমার মনে হয়, রবিবাবুর এই প্রগতিশীলতার ধার ধারেন না এমন অনেকেই বলে থাকবেন, একেবারে নিজের মনগড়া চরিত্র। নিজের স্বভাব চরিত্র যা, তিনি তাই করেছেন। বাস্তবতা হলো এই, রবীন্দ্রনাথ বিমলার মধ্যে দিয়ে দুই ধরনের সমান্তরাল ছবি এঁকেছেন। একদিকে নারীমুক্তির যে আন্দোলন, পুরুষের পাশে নারীরাও দাঁড়াতে পারে, নারীর উদারতা কোমলতা, প্রেম আর শিক্ষা; সবশেষে ঘৃণা—সবমিলেই তো ঘরে বাইরের বিমলা। অন্যদিকে নারীবাদী বা সমাজ-সংস্কারক রবীন্দ্রনাথ নিজেকে বানান প্রগতিশীল সকল দিক দিয়েই, কিন্তু তিনি সব কিছুর উর্ধ্বে সমাজকে উপেক্ষা করে বিমলাকে পারলেন না একেবারে বাইরে ছেড়ে দিতে। এইসব কথা বিবেচনা করলে বোঝা যায় আমরা সেই আদিম যুগে পড়ে আছি। নারী একটা রেজিস্ট্যার্ডের মাধ্যমে কারও দাসে পরিণত হলো। সে-ই মনিব যেইটা চান তার বাইরে কিছুই সম্ভব না। রবীন্দ্রনাথ তাই-ই করলেন। তিনি বিমলাকে দু-জন পুরুষ দ্বারা একবার ভেতর, একবার বাহির করলেন। তাতে সমাজের সেই কথিত সমাজসংস্কারই কেবল রক্ষা হলো, অন্য কিছু নয়।