মুখোশ
কে জানে লোকোত্তর এই ডানার উড়াল কতদূর নিয়ে যাবে আমাদের দিনশেষে নিরন্তর এই সৌর-ভ্রমণে ক্লান্ত হয়ে হয়ে তবু কেন বয়ে বেড়াই নিস্প্রাণ ছায়াটির শব নিশ্চুপে পেরিয়ে ছায়াঘন অলিভ বাগান এসো আজ স্থির হই নিজ নিজ ঘুমে প্রশ্নের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবো বিবিক্ত আঙুলের পরিচয় যেহেতু অচেনা মুখোশের নিচে পড়ে থাকে আরও অজ্ঞাত আমাদের মুখ চিরকাল দেখেছি শতচূর্ণ আয়নার বিভ্রমে স্বর্ণশৃঙ্খলে বাঁধা কেবলই আমাদের আত্না দূরাগত মুসাফির পাখির মতো
হাতঘড়ি
বস্তুত, শূন্যতা অসম্ভব নয়, এই ভেবে আরও ঘনিষ্ঠ হতে চাই বহমান সময়ের সাথে খুব ধীরে 'কিছু নেই' থেকে সবকিছু অপার হাওয়ালোকে ক্রমশ অস্ফুট আলো ও সুর, মৃদু তরঙ্গের মতো আমি কি তবে অস্ফুট আলো, অজানা? মহাশূন্যে বেজে উঠা অশ্রুত গান? যখন জন্মায় নি সময়, তারও বহু আগে সৃষ্ট কেবল এক বিকল হাতঘড়ি নেড়ে চেড়ে দেখেছিল প্রিয় ফেরেশতারা।
বোধ ও বসন্ত
যেদিকে ইঙ্গিত করে বিকল কম্পাসকাঁটা, সেদিকে হারানো সরাইখানা, পরিত্যক্ত আস্তাবল কালো টাট্টু সমেত উপনিত হই যবে ধূসর কমলাভূমিতে ততদিনে ম্লান হয়ে গেছে তোমার শ্বেতপুষ্পের বাগান, মর্মর প্রাসাদ, পথে পথে নির্জন তুলাবন, হর্ষনাদ, কত ভঙ্গিমায় উড়ে উদ্যানের পাতা বিভিন্ন পবনের গতি, দুলে ওঠে ছায়াবৃক্ষের ডালপালা যেন পাহাড় পেরিয়ে আসে চার্চের ঘণ্টারোল যেন হৃৎপিণ্ড একটি ঘুমন্ত ঘড়ির পেন্ডুলাম এ কেমন বায়বীয় সূর্যের দিন ফুলে ওঠে পৃথিবীর স্তন নীল রেকাবির ঘোটকি, সরিষা খেতের পাশে, তার দেহ জুড়ে ছড়িয়েছে সোনাচূর্ণ রোদ তার খসেপড়া ছায়া ঢেকে যাচ্ছে এলম পাতার নিচে আহা, কী অন্যমনস্ক ঘোটকী তুমি তোমার তন্দ্রাচ্ছন্ন সজ্ঞার ভেতর কয়েকটি চড়ুই ঢুকে পড়ে...অসংখ্য চড়ুই তোমার নিদ্রার ভেতর।
গমক্ষেতের স্মৃতি
(অনুপম মণ্ডলকে—নিকটতম দূরের বন্ধু) বিলীন কোনো ভাবনার মতো ম্লান একেকটি বিকেল, স্থির, হাওয়া এসে নাড়িয়ে যায়, নাশপাতি বনে, কখনো হাতি আসে শিশুদের শহরে, বেদনা মন্থনকারী উজ্জ্বল ঐরাবত, তার অন্ধ মাহুতের খুঁজে, আনমনে হাঁটে, গলার ঘুঙুর বাজে দিনমান, টুংটাং টুংটাং... ঘরে ঘরে ছড়ায় যেন ঘুমের জাদু। যতটা সম্ভব ঝুঁকে থাকি মাটি ও ছায়ার দিকে, অচল আধুলি হাতে যতবার গিয়েছি অন্ধকার রুটির দোকানে, দেখেছি ধূলির মতো করে উড়ে শুধু পুরনো যবের দানা, আর উপকথার মতো মানুষের মুখে মুখে ফেরে বিগত গমক্ষেতের স্মৃতি। জাদুকর শহরে, হাতি তবু বার বার আসে তার অন্ধ মাহুতের খুঁজে...
পালকের ব্রিজ
আরও দূর, ওই উদ্বাস্তু পাখিদের পালকের ব্রিজ ডুবে গেছে সূর্যাস্তের নিচে, তারও নিচে মেঘস্তূপ, পৃথিবীর সব কাচঘর একযোগে সন্ধ্যা হয়ে গেলে যেন মৃতদের শহরে জেগে ওঠে এক বিষণ্ন আর্তনাদ, আমরা তাই ভাবছি, যা ছিল আমাদের উত্তর সমাধির এপিটাফ লিপি, একজন শববাহক যা ভাবে, ধূপগন্ধ। আর অর্ধবৃত্তের ভিতর বিলীন বিন্দুর একাকিত্বে ফুঁপিয়ে কাঁদছে একটি অসুস্থ নারী-জেব্রা তার দীর্ঘ অনিদ্রা থেকে জন্মানো ক্ষতে জমে আছে চাঁদডোবা রাত্রির হলাহল, তিনটি অন্ধ প্রজাপতি, তাদের বিকল ডানার ঝাপটায় দুলে উঠছে আমার মনস্তাপ, অবিশ্বাস একটি আঁধার জড়ানো তুঁতগাছ।