কবি ও গল্পকার সানোয়ার রাসেল তবুও বসন্ত কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন ২০১৩ সালে। প্রতিপ্রহরের গল্প গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন ২০১৫ সালে। ২০১৭ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় জন্য তার প্রকাশিতব্য বই নিমগ্ন পঙ্ক্তিমালা’। নিমগ্ন পঙ্ক্তিমালা কাব্যে তার আত্মগত অনুভূতির প্রকাশ পেয়েছে। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন রাজীব রায়। নন্দিতা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হবে। পাণ্ডুলিপি থেকে কিছু কবিতা ‘পরস্পর’ পাঠকদের জন্য...
তোমার দুঃখ আমি লুকাব কোথায়
ওরা তোমার দুঃখ বোঝে না,
কখনও বোঝে নি।
তোমার দুঃখগুলো যখন উড়াল পর্বতের পাদদেশ থেকে ধাবিত
হচ্ছিল,
ওরা তার নাম দিয়েছিল 'সভ্যতা'।
তোমার দুঃখগুলো যখন তুর্কি ঘোড়ায় চড়ে
ধেয়ে আসছিল, ওরা তার নাম দিয়েছিল 'নিয়তি'!
তোমার দুঃখগুলো যখন ফিরিঙ্গি-জাহাজে চড়ে বন্দরে খালাস হচ্ছিল,
ওরা তার নাম দিয়েছিল 'বাণিজ্য'!
তারপর দুঃখগুলো কেবল খেয়ালি কিশোরীর
চকিত চাহনির মতো বদলে বদলে যেতে লাগল
যতদিন না ওরা ধর্মের নাম দিল দেশ!
দেশ, দেশ হলো, ধর্ম, ধর্ম হলো,
তোমার দুঃখের কোনো কিনারা হলো না।
তোমার দুঃখ আমি কোথায় লুকাব?
কোন সপ্তসাগরতলের ঝিনুকে
তোমার দুঃখগুলো ঠাঁই নিলে
ক্ষরিত হবে শান্তির মুক্তো-রসদ?
তোমার দুঃখ আমি কোথায় লুকাব?
বুকের কোন গোপন কুঠুরির প্যান্ডোরার বাক্সে?
ওরা যে আজকাল তোমার দুঃখের নাম দিতে চায় 'গণতন্ত্র'!
মিশর
আমার ক্লান্তিগুলো গন্তব্যহীন,
নিউরনের এক্সন আর ডেনড্রাইটগুলোকে ভারাক্রান্ত করেও পরিযায়ী
পাখির মতো
ওরা আর ফেরার পথ পায় না!
এলোপাথাড়ি বৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়া
সুতা ছেড়া ঘুড়ির মতো মাতলামি করে
কেবল ফিরে ফিরে আমার মস্তিষ্কেই গোত্তা খেয়ে পড়ে।
তাই অবসাদের পাহাড় বুকে নিয়ে
আমি মাঝরাত্তিরে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ শুনি!
বহিঃস্থ আঁধারে বিপন্ন দৃষ্টি অগত্যা
বিকল্প কল্পনার পথে নিজেকে চালিত করে।
যেখানে ফেরাউন মমি হয়ে আছে, সোনালি বালুকায়,
পিরামিড নাম ছাড়া এই সব সমাধির নাম
যদি আর কিছু হতো!
এই সব গূঢ়কথা
প্রিয় ধুলোমাখা ধূসর দীর্ঘশ্বাস!
ভুলে যাওয়া জমানার নীলখামে,
তোমায় কতটা দিন একটা একটা করে জমিয়ে রেখেছি,
কিশোরীর বইয়ের ভাঁজে তেল-চিনি মাখা ময়ূর-পালকের মতো!
তারপর বুকপকেটে সবগুলো নীলখাম যত্নে রেখে বোহেমিয়ানের মতো
এলোমেলো হেঁটেছি
নিষ্ফলা পথ, পাথরে-কাঁকরে-পিচে,
আরক্তিম, অস্তগামী সূর্যের পিছে পিছে।
অবশেষে কোনো একদিন,
ধুলোমাখা পায়ের আঙ্গুল দেখি,
পিপাসিত নিজের ঠোঁট দেখি, চাক্কা ক্ষেতের মতো চৌচির!
অনুর্বর পথ পথিককে কোনো ফসল দিতে পারে না,
বইয়ের ভাঁজে রাখা ময়ূর-পুচ্ছ কি বংশবৃদ্ধি করতে পারে?
নীরব দুর্ভিক্ষের রঙে রঙিন দু'হাত দেখি!
সেই দিন,
এই সব দেখেছি যে দিনে অবশেষে,
জীবনের অনেকটা পথ হেঁটে এসে,
শুরু হয় ফের আমার উল্টো পথে হাঁটা।
প্রিয় ধুলোমাখা ধূসর দীর্ঘশ্বাস!
আমার সমস্ত বোহেমীয় স্বপ্নসমেত তোমাকে আজ উড়িয়ে দিলাম
মুক্তির শ্বেত কপোতীর মতো।
পথে মুক্তি নেই, মুক্তির পথ আছে,
সেই পথ কৃষকের পথ,
সেই পথে ফসল ফলে
জমিনের সাথে লাঙলের প্রেম হয়,
বীজের সাথে বৃষ্টির আলিঙ্গনে!
এই সব গূঢ়কথা ময়ূর-পালক পালা
সেই সব কিশোরীও একদিন ঠিক ঠিক জানে!
নিদ্রার শরণ নিই
অলৌকিক বাক্স থেকে দূরাগত ক্রন্দনের মতো ভেসে ভেসে আসছে
শ্রাব্যতার সীমার ভিতরের
কম্পনগুচ্ছ,
'বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি'।
কিন্তু আমি বুদ্ধের শরণ নিতে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে যাই,
কখনও সে নিমীলিত প্রায় চোখে কাৎ হয়ে শুয়ে,
কখনও সে মুদিত চোখে আসন গেড়ে ধ্যানমগ্ন।
কখনও তো তাকে সমগ্রভাবে জাগ্রত দেখি না!
এই ঘোর নেশায় বুঁদ গোলক জগতে ঘুমন্ত বুদ্ধ আমার সারথি হবে?
'ধর্মং শরণং গচ্ছামি'।
এবার অট্টহাসি না হেসে পারলাম না।
ধর্মের শরণ নেব!
ওরে বাওয়া! ঐ তো ধর্মেরা সব সৎ ভাইয়ের মতো কোঁদলে ব্যস্ত,
ধর্মকে পথ দেখাবে কে গো?
'সংঘং শরণং গচ্ছামি'।
নাহ! এবার বুঝি অলৌকিক বাক্সটার টুটি চেপে ধরতে হচ্ছে।
দেখছিস না, সংঘের বিপরীতে সংঘ দাঁড়িয়ে আছে!
ক্যাথলিকের বিরুদ্ধে প্রোটেস্টান,
সুন্নির বিপরীতে লা-মাযহাবী, বৈষ্ণবের বিরুদ্ধে শাক্ত!
অতএব, দুরনিয়ন্ত্রকের বোতাম চেপে কম্পনগুচ্ছকে
পাঠিয়ে দিই শ্রাব্যতার সীমার নিম্নে।
অতঃপর, অতল নিদ্রায় শান্তিমগ্ন কালক্ষেপন,
মৃত্যুর পূর্বে চির শান্তির ড্রেস রিহার্সাল।
সেই ভালো,
জীবনটা এক কথায় মন্দ নয়,
কী বল?
পিতা
আকাশের অগণিত সূর্যেরা কোন উদয়াচল ধরে আসে, কোন অস্তাচলে হারিয়ে যায়? আমি জানি না। অদৃশ্য অলীক রাহু-কেতু, শনির দশা নীলকান্তমণি, পান্না, চুনি কে কাকে নড়ায়-চড়ায়, কাছে টানে, দূরে সরায়? আমি জানি না। করতলের রেখায় কোথায় লেখা আছে আয়ুর গন্তব্য? কোথায় অর্থ? বিদেশভ্রমণ, স্ত্রী-সন্ততির পরিসংখ্যান? আমি জানি না। জ্যোতিষীর কোনো বিদ্যা আমার জানা নেই। কিন্তু তবুও আমি অতীত ও ভবিষ্যৎ জানি! আমি কেমন ছিলাম আমি জানি, আমি কেন তেমন ছিলাম আজ জানি, অনাগতকালে কেমন হবো তাও আজ জেনে গেছি আমি। কেননা, আজ আমার জরাগ্রস্ত পিতার লোমচর্ম হাত আমার দুহাতে নিয়ে তার ঘোলাটে চোখে আমি তাকিয়েছি, আর তার অস্পষ্ট ঘরঘরে স্বরে তিনি বললেন, ‘আমার আর কোথাও যেতে ভালো লাগে না।’