এক আদিম গর্ভগৃহ থেকে নদী আর ঝরনার পিয়ানো বাজাতে বাজাতে কবি জাহিদ সোহাগ অনেকটাই যেন প্রতিবিপ্লবীর মতো আজ আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন; তার কবিতায় সমুদ্র-তরঙ্গের হিংস্র গর্জন শোনা যায়; তার কবিতায় ব্রহ্মাণ্ডস্বরূপ বিরাট ধানক্ষেতের আমিষ সৃষ্টিশীলতার যৌন উত্তেজন টের পাওয়া যায়; মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে, মায়ের আলপনা থেকে প্রেমিকার ঊরুর মনীষায় চলে যান তিনি; হাতভর্তি হিম মাকড়শার লালা এবং বুকভর্তি ব্যাটারি-চালিত ইচ্ছেগুলো নিয়ে তিনি গোটা বিশ্বেই গড়ে তুলেছেন তার নিজস্ব একটা ঋতুচক্রের দোকান; এই দোকানটার নাম—‘ক্রোধ আর মাংসের দোকান’; এই দোকানে কী পাওয়া যায়? কী কী পাওয়া যায়? আমিষ-তালিকা খুললেই পাওয়া যায় লড়াকু মোরগ, লাঙলের কৌমার্য, ছিন্নমুণ্ডু কবুতর, ফ্রিজভর্তি জীবাশ্ম, সাপিনীচঞ্চল শিশ্ন, ঘোড়ার হ্রেষা, উটের কুঁজ, লুপ্তপ্রায় মাছ, দাসীর যোনি, ন্যাংটো রাইফেল, বর্বর কলকব্জা, প্রতিবিপ্লবীর লালবই, সংখ্যাতীত বংশধর, লোহার দরোজা, ক্রশসমেত ঈশ্বর; ক্রোধ আর মাংসের দোকান রাষ্ট্রের নাকের ডগায় ঝুলিয়ে তিনি ঘাড় উঁচু করে তিনি হেঁটে যান কোনো এক নিরপরাধ সবুজ ক্ষেতের দিকে; বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বায়নের এই ভয়াবহ কালখণ্ডটাকে চিহ্নিত করতে করতে তিনি তার কবিতার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট বুঝিয়ে দেন মানুষের লোভ আর ক্ষুধা নিয়ে গড়ে তোলা পুঁজিবাদী ধনতন্ত্রের দোকানটা ভেঙে গুড়িয়ে দিতে না পারলে আমরা এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সবাই মাংসের দোকানে কাটা মাংসের মতোই চিরকাল ঝুলে থাকব; ঠিক সময়েই তিনি চারিদিকের চক্রবূহ্যের মতো গড়ে ওঠা মাংসের দোকানটাকে তীব্র প্রতিঘাতে আঘাত করেছেন; আদিম গর্ভগৃহের আদিম মানুষ তিনি ছেনি বাটালি আর হাতুড়ি নিয়েই দোকান ভাঙতে এসেছেন।
- জহর সেনমজুমদার
বীজ
হাওয়া আসে ঘরে। ভেতরে একটি ঊনমানুষ। আমাদের দেখা শেষ তারাটি, খুব ক্ষীণ, ক্ষীণতর হতে হতে, মিলিয়ে যাবে। কত বিচিত্র জীবন। দোয়াত উল্টে গেল। এখন ঘর। শূন্য ঘর। শূন্য ঘর থেকে, ওই তারাটি দ্যাখো।
হাওয়া আসে ঘরে। ওপারে আকাশ, কলকব্জা খুলে খুলে পড়ছে। বর্বর গতির ভেতর, ঘুরতে ঘুরতে, ওহ্ কী দুঃসহ, তাকে অচৈতন্য করে, পৌঁছে দেয় ধূলিঝড়ের শৃঙ্খলায় যেন মানুষের চেতনা, তার ভেতরে, একে একে, পুঁতে গেছে, ঊর্ধ্বমুখী, শূন্যের বীজ।বিবাহিত কবিতা
বাকি আছে আমার শরীরে র্যাঁদা টেনে সমান করে নেয়া। যাতে তোমার সাথে আমার ক্ল্যারিকাল প্রেম আরো সহজ হয়। তুমি ডালভাতে আর একটু আলুভর্তা মেখে নিতে পারো।
বাগানে পোষা ফোয়ারাটিকে দেখে দেখে ভাবতে পারো পদ্মাপাড়ের ছেলেও কেন শহরে এসে ঘুমিয়ে পড়ে!
আর তুমি সুযোগ বুঝে, র্যাঁদা টেনে টেনে, প্রয়োজনে বাটালি দিয়ে নকশা কেটে, পেরেক ঠুকে দিও, যাতে তোমার সাথে আমার মহিমান্বিত দাম্পত্যের প্রদর্শনী হয়।
ডোমের সামনে
ডোমের সামনে পড়ে থাকব না ভেবে আত্মহত্যাও করি না
আমি জানি আমার পাঁজরে কুড়াল চালাবার আগে সে আমাকে প্রশ্ন করবে আর আমাকে নিশ্চুপ দেখে মগজে দুহাত ডুবিয়ে খুঁজবে শিং কৈ কুঁচো মাছ গনগনে ঘৃণায় সে মাছ রান্না হলে খেতে আসবে নেকড়েমুখো শিশুর দল যারা নার্সিংহোমে এসেছিল টুকরো টাকরো রক্তমাংসস্নেহ নিয়েকাচ
বহুদিন ফিরে গেছি জানি দরোজা খুললেই ভেতরে কাচ চড়ুইপাখির মতো কিচিরমিচির— একদিন যা ছিল কলম, কাঠের ঘোড়া, ব্রাশ, টিস্যু পেপার। সেল্ফের বইগুলো কাচের বয়াম, চূর্ণ হতে নামছে লাজুক ঝরনা। ফ্রিজ থেকে সবুজ আপেল ডিম আর বর্ষার মাছ লাফিয়ে নামল, যেন খুকির ঠোঁট ফোলানো অশ্রু আর তোমার শাড়ি? ভাঁজ করে রাখা পিংক, ম্যাজেন্ডা, সোনালি আর হলুদছাপা আর জামদানি রাজশাহী সিল্ক—এসব ঘুমন্ত কাচ? আর জন্মবিরতিকরণ পিলও মিষ্টি-কাচ টেস্টটিউবের মতো তিনটে কনডম বিছানায় গজিয়ে উঠেছে তারকাঁটা-কাচ কাছে ডাকলে ভেঙে পড়ল কণ্ঠ, ঝনাৎ করে মাথা, চুপচাপ হাত দুটো আর পা যেন আগুনে গলছে—আর আমিও পোশাকের ভেতর কাচপুরুষ; এক ধাক্কায় ঝাঁপ দিচ্ছি ফ্লোরে এরপর মানুষের যোনি ও শিশ্ন
অন্যদিন
আমার হাড়ের মধ্যে, দ্যাখো, রোদ এল এখনই উড়াল দেবে ফের— তার পাখনায় লাগুক বাতাস—এই আমি চাই; সে-ও ওই নীল থেকে নিয়ে নিক খড়কুটো; তাকে বলো, পক্ষিণীকে পাহারা দিক এ বেলা; যদি তার ডিম ফেটে আসে ঘরভর্তি কিচিরমিচির। অনেক তো হলো মেঘের ভেতর হারিয়ে ফেলা প্রেমিকার জন্য; তোমার হাড়ের শিশি খুলে এইবার ওই পক্ষিণীর হলুদ গ্রীবায় জল দাও।
তারকা
রাতের চেয়েও ঘন কোনো নারী; তাকে চুপিচুপি বলি, সে উত্তর দেয় দেহাভাসে; যেন সে দেহের নিচে জিরাফের দীর্ঘ নীরবতা বুনে দিতে চায়।
—মুণ্ডু কই? শুধু দেহ দেহ করে সে তার মস্তক টাঙিয়ে রাখে ওই লাইটপোস্টে যেন সে সারারাত জ্বলবে—নিচে, আমরা দেখি নীল নীল তারা!স্ত্রী
তন্দ্রায় নিহত হলে, রতিক্লান্ত স্ত্রীর সেমিজে বাতাস শুধু খেলা করে—যেন দূর্বিপাক থেকে কোনো ফড়িং প্রাণপণ ডানা ঝাপটায়—ভুলে নীহারিকা-বন। আঙুল বুলিয়ে দেখি তার চুল কোনো উদ্যান বুনেছে কিনা—যার নিচে, জলে, স্বচ্ছজলে দু’একটা মাছ, কবেকার একা ও রঙিন—জানি, মিছেমিছে নয়— তারকাঁটা ঠুকে ঠুকে খরগোশ খুন; যার স্বীকারোক্তি আমি কখনো চাই নি। আমার দিন তো শেষ, মদে ও বিষাদে; বৈঠার নাগালে নেই সামান্য ভরসা— শুধু এক গলুই শূন্যের জন্ম দিয়ে প্রেমিকের ছায়া খুঁজি স্ত্রীর মুখে, স্নেহে।
বাইবেলের ঈশ্বরকে
৪. কে জানত এইসব মানুষেরও সঙ্গে মেলাতে হবে আমার দেহ—আমার চোখে সংশয়ের তারকাঁটা ঠুকে বলবে, একা একা শীতের রাতে যেন মৃত্যু হয় আমার—নাস্তিকের মৃত্যুতে কি সাবধান হয়ে যাবে বৃক্ষের শেকড়? প্রেমিকার ফুল?
এর উত্তর আমি বাইবেলে খুঁজি।
আমার হারানো শিশ্নচর্ম মালার মতো গেঁথে যিনি সন্দিগ্ধ, তাকে আমি পাই না; আমার করোটির ভেতর নকশা আঁকা কাপড়ে কে যেন দান ফেলছে, যেগুলো পয়সা বা আমারই চোখ হতে পারে। আমি আমার ইন্দ্রিয় খুলে খুলে বেঁধে দেই তার রুমালে, এসব তুমি নাও, তুমিই বরং খুনোখুনি করো আমার হয়ে।
মানুষের বেঁচে থাকা হারামিপনা ছাড়া কিছু নয়। তাকে মহান শেখাতে এসো না।
৫. আমি তো নিজেকে যন্ত্র ভাবি না : আমার শিশ্ন শুধু লাল তরমুজে বীজ বুনে দেবে, আর সংখ্যায় মিশে যাবে তোমার ইচ্ছায়; যেন আমি নিয়তিনিয়ন্ত্রিত, তাবু গুটিয়ে মাত্র আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি পশুপাল ও স্ত্রীসমূহের জন্য তৃপ্তি নিয়ে; যেন নারীর যোনি তারও ইচ্ছার বাইরে মধুক্ষরা; তুমি যেভাবে পুরুষের শিশ্নচর্ম গেঁথে নিয়েছ, আমিও নারীযন্ত্র গেঁথে রাখি—
আমাকে বরং তুমি ভুলে যাও—আমাকে রেখে যাও আমার বিপন্ন করোটির ভেতরে—আমিই অনুমোদন করি আমার সর্বনাশ
ফুরন্ত ইচ্ছার মর্মরে
১. আমার প্রেমের গল্প শুনতে আসে নীল তিমি। তাকে বলি, একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে সব, প্রেম-অপ্রেম। রেখার ওপারে কতগুলো লোক খিস্তি করবে বলে মদের ভাঁড় নিয়ে বসেছে। আর এপারে আমি সংশয়বাদীদের বাইনোকুলার হাতে ভাবছি—
তখন নীল তিমি তার পিঠ উদোম করে দেয়, যেন ঘনঘোর বর্ষা এল। আমি তাতে মুখ রেখে বলি, ‘আমার চোখের ভেতর ইনসোমনিয়া।’
যেন আমারও খিস্তি করার দিন এসে গেছে। নিজেকে উপুড় করে ঢেলে ঢেলে পান করে হতোদ্যম আমি—ঝিঁ ঝিঁ ডাকা দুপুর পেলে ডেকে দিও, ডেকে দিও, যদি ঘুমুতে পারি।
এই কথা শুনে নীল তিমি রিকশার হুড টেনে চুপচাপ নেমে যায় জলে।