বরিশাল
চিরন্তন বরিশাল বুকে নিয়ে পদ্মার পাড় ঘেঁষে রাত্রির স্টিমার একা যায়। সার্চলাইট ফেলে ফেলে নদীতীরে ছেলেবেলা খোঁজে; আংশিক গ্রামের গায়ে আলো পড়ে—খণ্ডে খণ্ডে জ্বলে ওঠে নারকেল গাছ, উঠানের পাড়, বাজারের পায়ে হাঁটা পথ— সার্চলাইট যদিওবা আংশিকতা দেখে দেখে যায়, অংশের মৃদুতা তবু মানুষের মনে এক সমগ্র গ্রামকে পৌঁছে দেয়; শহরস্টিমার ভাসে, ভেসে ভেসে যেতে থাকে গন্তব্যের দিকে। নিদ্রিত মানুষ তার ইচ্ছা আর পশুপাখিদের নিয়ে ডেকের ওপরে জেগে ওঠে; ধীরে ধীরে সার্চলাইটে তৈরি হওয়া সীমাহীন আংশিকতায় ডুবে যায়; কুয়াশা ও জোছনার যৌথ রহস্যের কাছে সবকিছু অপার্থিব হয়ে গেলে মানুষ ও ধ্রুবতার যুগ্ম প্রয়োজনে স্টিমার পথভ্রষ্ট হয়... ধবল জলের মাঠে, নীরব তৃষ্ণায় ঘুরে, সার্চলাইট জ্বেলে, গ্রামসমূহের শান্ত অজানা গল্পের পরে অংশে অংশে দীর্ঘ আলো ফেলে, স্টিমার কবিতা হয়ে ওঠে; অনুগ্র সারেং ভাবে, বরিশাল কত দূর? কোনোদিন স্টিমার কি পৌঁছাবে সেখানে? প্রপেলার ঘুরে চলে, ঘুরে চলে, ঘুরে ঘুরে প্রপেলার ঢুকে যায় ঘুরে ঘুরে চলার চিন্তায়, নদীপাড় ঘুরে আসে জলরব, তারাদের ছুঁইয়ে এসে, জল কেটে, পুনরায় পানির ভিতরে ঢোকে, বের হয়, পথ ভ্রষ্ট হয়ে একা আপন উৎস থেকে ভেসে ভেসে জলচাকা কোথায় যে যায়; ডেকের উপরে বসা সজাগ মানুষ দেখে, সার্চলাইটে জেগে পরিচিত ঘাটেরাও সরে সরে যায়, যেন তারা ঘাট নয়, অস্থায়ী ছায়ার কিছু আলো, মানুষের খণ্ডতাকে টের পেয়ে, সরে গেছে সব ঘাট থেকে; সার্চলাইট ফেলে ফেলে স্টিমার ঘাটহীন পথে আংশিক দৃশ্যের থেকে পূর্ণতর দৃশ্য খুঁজে চলে; দৈনন্দিন নদী থেকে মুছে গিয়ে শেষে জ্বলে ওঠে অন্য এক কুয়াশার আলে বরিশাল তার আর কোনোদিনই পৌঁছানো হয় না...
অপেক্ষা
যোগাযোগ নেই বলে সেই উদ্ভিদকে মনে পড়ে। দাঁড়িয়ে রয়েছে এক মাঠে স্থিরভাবে কবে থেকে; পাশে আর কেউ নেই। অনন্ত জলের মধ্যে সে-ই একা সবুজ জোছনা। আর আমি ঘুরছি পৃথিবী সারা দিন, হুশ নেই; জানা নাই পারব কিনা আর কোনোদিন কাছে যেতে। কত দূরে সেই মাঠ? কিভাবে যে যাব। শাদা অস্পষ্টতা নেমে এসেছে শহরে ভোর থেকে এত চিরস্থায়ী সব দেয়াল উঠেছে চারপাশে; তবু সবই ভেসে আসা তার মুখচ্ছবির কাছে অর্থহীন। যেখানেই যাই আমি মনে মনে স্পষ্ট দেখতে পাই সে একা দাঁড়িয়ে আছে কোমর পানিতে, শেষহীন, আমার ফেরার অপেক্ষায়।
নাম
ধীরে ধীরে নামগুলি ভুলে যাচ্ছি আমি। বিভিন্ন ক্ষতির মুখে ঠেলে যারা দিয়েছে আমাকে— অথবা যাদের ক্ষতি আমিও করেছি নানাভাবে, ভুলে যাচ্ছি তাদের জরুরি নামগুলি। প্রতিশোধ ভেবে নয়, অপরাধ-বোধ থেকে নয় মানুষের পরিচয় জেনে নিতে নামগুলি মনে রাখা প্রয়োজন খুব। যে সব মানুষ এসে আমাকে এগিয়ে দিয়ে গেছে অথবা যাদের পাশে আলো হয়ে জেগেছি কখনও তাদের বিবিধ নামও মনে রাখা প্রয়োজন ভাবি আত্মশ্লাঘা, কৃতজ্ঞতা, এইসব চিন্তা থেকে নয়, অন্তঃস্থিত সূর্য আর আঁধারকে বুঝে নিতে চেয়ে। তবু কেন নামগুলি ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছি আমি? আমার বিষণ্ন মন যেন বুঝে গেছে, এইসব নাম মনে রাখা বা না রাখা, মানুষকে লক্ষ করা, বোঝা বা না বোঝা, সবই এক; জীবনের দৃষ্টিবান আবহমানতা হতে চেয়ে, সব কিছু এক নয়, বোবা স্বরে একথা জানাতে, আমরা শুনি না তবু এইসব নাম, কি জানি কি মনঃকষ্টে আমাদের চারপাশে রাতদিন ঘোরে।
কেবল বর্ষণ ছাড়া
কেবল বর্ষণ ছাড়া আর কিছু নেই, সকালের জানালায় আজ। অর্ধেক মুখের মতো এই ধারাপাত লম্বভাবে নেমে আসা আকস্মিক নদী। অথবা সে দিগন্তদেয়াল— রৌদ্র ছিল কাল বিকালেও। আজ এক অনশ্বর কারাগার চারদিকে দোলে। মানুষ জোছনা-হীন; বর্ষণের ধারাপাতে ডুবে সারাদিন একা বসে থেকে, বোঝা যায়। সুদূর মোহনাগুলি আকাশ গহ্বরে শুয়ে আছে। যা কিছু নিকটে নেই, দূর থেকে তারা ডেকে বলে উজ্জ্বল রৌদ্রের চেয়ে বর্ষণের প্রগাঢ়তা বেশি। এরকম বৃষ্টি হলে সবকিছু ছিদ্রময় লাগে; মনে হয় স্বতঃস্ফূর্ত কোনো কিছু কোনোদিন ধারণ করি নি। বৃষ্টির মতো ব্যক্তিগতরূপ মানুষের আজও নেই, চেষ্টা করা ছাড়া কোনো অনায়াস ছন্দ নেই তার। বর্ষণের মুহ্যমান নিজস্বতা তবু কোনো এক অপর্যাপ্ত মানুষেরই মতো, মুখ ঘষে সকালের জানলায়; শূন্য এক বাতাসে দাঁড়িয়ে...
বজ্রের আঘাত
বজ্রের আঘাতে আমি পড়ে যাই শূন্যের ভিতরে। কিছুকাল একমনে হামাগুড়ি দেই আমি সেরে উঠতে চেয়ে। চারদিকে শূন্যে নির্মিত ঘাস, শূন্যের গুবরেপোকা, শূন্যসাপ, শূন্যের জংশন। আমার প্রাণের মধ্যে ঢুকে যায় সব, বুকে হেঁটে। বুদ্বুদে তৈরি ভূমি পার হয়ে যাই। মাইল মাইল ভেদ করা আকাশ বিস্তৃত-কারী তার হই, মরুভূমি হই। উবু ভাবে শুয়ে থাকি পথ ছেড়ে রক্ত-বমি-সম লোহিতের মনে। তারপর বহু কষ্টে শূন্যে দুইহাত মেলে দাঁড়াই যখন বজ্রের আঘাতে আমি পুনরায় পড়ে যাই শূন্যের ভিতরে। আমার শরীর-মাংস শূন্যের সুঘ্রাণে ভরে ওঠে। হামাগুড়ি দিতে থাকি, হামাগুড়ি দিতে থাকি আমি বেদনায়। আমি যাতে পড়ে যাই সে ব্যবস্থা মহাপথে মহা-মমতার মতো জাগে। আমার হৃদয় সব বোধ করে, সব কিছু জানে, জেনে নেয়। হৃদয়ে নিঃশব্দ ট্রেন শীত ভেদ করে ছুটে যায়। সিরসিরে অনুভূতি আমার ও জগতের দেহে বয়ে চলে। বজ্রের অনেক চুল শাদা হয়ে গেছে এক সময়ের মতো। বয়স হয়েছে তারও, বহু—বহু টায়ারের দাগ তার মুখে ধীর পায়ে আসে আর অবগত হয় এ-জীবন। শীর্ণ নীল শূন্যে গঠিত ঠোঁট বাঁকা হয়ে ঝুলে যায় গভীর অপ্রেমে। উপত্যকা, দ্রোণি আর নদীবিধৌত ভূমিখণ্ড পার হয়ে আমার পতিত ট্রেন, ভ্রমপ্রবণেরশীত ভেদ করে অসীমের দিকে চলে যায়। এই সব দেখি আর বজ্রের আঘাত পেয়ে ল্যাবিরিন্থ হামাগুড়ি দেই। হামাগুড়ি দিতে দিতে শূন্যের সজাগ ঘাসে রূপান্তর হই। মাটি হই, খালের মতন হই-ডাল ছুঁয়ে দেই ঢেউ-হাতে। বহুদিন চলে যায়, বোধগম্য হয়ে যায় সব। সত্য অপলক চোখ ঘাসের, গাছের। কি যে স্থিতিশীল ভাবে তাকায় উদ্ভিদ। মহা আদি অন্ত আমি; ও-আমার পুনঃপুন বজ্রের আঘাত। ভয়ংকর ভালোবেসে বহু সত্য শাদা ঘাস হয়, হয়ে থাকে। বহু মিথ্যা মুখর মুখোশ। বহু সত্য জন্ম নেয় মিথ্যার ঔরসে। শত মিথ্যা বহু বহু সত্যের অধিক হয়ে আসে, নিমগ্ন গল্পের মতো ফুটে ওঠে আমাদের মুখে। যখন অশান্ত হই, চুরমার ভেঙে পড়ি উপগ্রহ প্রায়, হামাগুড়ি দিতে দিতে তখন তোমাকে বড় ভাবি। আমি আজ সত্য মিথ্যা সবই। তবু যদি কথা হতো আঘাত না পেয়ে— যদি কথা ভালো ভাবে বলা যেত—যদি কথা ভালো মতো হতো— সময়, শ্রেডার—তবু দেহময় কথা যদি হতো— নীল দীর্ঘ চিকন আলোর মতো কথা যদি হতো আমাদের। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, গান নেই, শুধু ভার আছে। শূন্যের ভিতরে আমি পড়ে গেছি বজ্রের আঘাতে। আপেক্ষিক সত্য থেকে পরম সত্যের দিকে যেতে যেতে যেতে এ-জীবন শেষহীন পড়ে যাওয়া, পড়ে যেতে থাকা হয়ে গেছে— বহু কষ্টে দুইহাত মেলে ফের দাঁড়িয়েছি যেই বজ্রের আঘাতে আমি পুনরায় পড়ে গেছি শূন্যের ভিতর।
সহজ গান
একদিন তুমি শুধু আমাকেই ভেবো সারাদিন। নীরবে কল্পনা করো কোথায় রয়েছি বসে একা— কোথায় আমার মন—কোথায় যে আমার শরীর— কফি কেন ঠান্ডা হয়ে যায়—লেখা কিছুতে আসে না— তুমি কি সক্ষম দিতে, এটুকু আমাকে একদিন? আমি ভাবি সারাদিন ধরে, প্রতিদিন। তোমাকে দেখার সাধ আমার ভিতরে জেগে থাকে ভ্রূণ হয়ে। তাদের মতন ভাগ্য আমার তো নয়, তোমাকে বেষ্টন করে যারা আছে সারাদিন রাত। যদি দাও একদিন তাহলে উঠবে জেগে ভ্রূণ; কিছুক্ষণ বাতাস বইবে জোড়ে, ঝড় উঠবে, ক্লান্ত বৃষ্টি নামবে; অন্যেরা নিশ্চয়ই তাতে বেশি কিছু মনে করবে না; আমাদের কথা ভেবে বেদনা পাবে না কল্পনায়। কিসের অভাবে যেন বড় বড় গাছের ছায়ার কাছে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আমি কোথায় তেমন গাছ পাব? বরং তুমিই একদিন পূর্ণ ভাবে ঢেকে দিও বিষণ্ণ ছায়ার মতো নুয়ে, ডালদের মতো নম্র দুহাতে জড়িয়ে। অমিল ছন্দের কথা—হারানো সূর্যের কথা—না হয় সেদিন ভাবলাম দুইজনে এক হয়ে—কসমিক বিছানায় শুয়ে— একাধিক দীর্ঘ পথ পারি দেই আমরা সকলে। অন্যের দুঃখের কথা আজ আর ভাবি না তেমন। নিজ নিজ বিমর্ষতা নিজ নিজ হয়ে থাকে গ্রহে। বহুবিধ টানাপড়েনের মধ্যে বসে, তবু দেখি, আমার বেদনা তুমি ভাবো। কেন ভাবো? একদিন সারাদিন তুমি শুধু আমাকেই দিও— পরিপূর্ণ হয়ে উঠো প্রকৃতির মতো সেইদিন। আমার ক্ষমতা হীন দুই হাত জাগবে তোমাকে করবে স্পর্শ, যদি তুমি অনুমতি দাও।
হাঁস
একটি বিহ্বল হাঁস জলে প্রলম্বিত হয়ে আছে। অসীমের খালে স্রোত মৃদু ভাবে বয়। তীরবর্তি গ্রাম আর সংসারের লেনদেন নম্র ছায়া ফেলে কাঁপে জলের উপরে— সময় রূপান্তরিত দিনভর রৌদ্রে—জল ভূমে সকলেই প্রবাহিত—শুধু প্রলম্বিত ঐ হাঁস। সারাদিন চলে গেছে— সন্ধ্যাও ফুরিয়ে যায় সংযত ঈর্ষায়। বাড়ি ফেরা কোনোদিন হবে না সে জানে—হবে না এ জল ছেড়ে উঠে দুই পায়ে হেঁটে যাওয়া শাদা পথে। পালকের ঘুম থেকে শ্যাওলা সে আর সরাবে না। রাত্রি নিগূঢ় হলে বহু সাপ জলে নেমে আসে তার কাছে; দংশন সম্পন্ন করে এঁকে বেঁকে পানের বরজে ফিরে যায়। কত যে নৌকার বৈঠা দিগ্বিদিকে আবছা জলের, শব্দ নেই; কতবার স্বপ্ন মধ্যে আসে যায় স্বপ্নহীন ফণা, জলে ডোবে আর ভাসে জগতের শত শত লগি হাঁস তবু বসে থাকে দংশিত আবেশে, একা একা। স্রোতে দিক ঘুরে যায়; দিন রাত্রি হয়ে চলে স্বপ্নে, চরাচরে। অন্য গ্রাম থেকে জল পথে এ খালে পৌছায় কত জন। স্নান করে জল ছেড়ে ওঠে যায় কত কত যুগ, অপরাহ্ণে। শাশ্বতের খালের ভিতরে শুধু প্রলম্বিত হাঁস বসে থাকে।
হামাগুড়ি
পরে আমি দিনরাত বুকে হেঁটে দূর গ্রামে যাই। অতল পাইপ প্রায় পানির উচ্ছ্বাসে, তলে তলে, পাইথন বিষণ্ণতা বুকে নিয়ে ছুটির অ-দিনে, যাব যাব এরকম ভাবতে ভাবতে চলে যাই আমি, নদী ও গঞ্জের নিচু অসীম গহ্বরে। বাঁশঝাড়ে জেগে ওঠা দেহ ঘূর্ণনের শব্দের সহিত শতশত চুলায় জ্বলতে জ্বলতে আমি যাই। আমি যাই অনন্তের রেলপথে কানপেতে বসে থাকা নিঃশব্দ কাঞ্চন নগরের মতো ঝুঁকে ঝুঁকে। পরে আমি যাই তার গ্রামে লোকাল ট্রেনের যাত্রীশূন্য বগিদের মতো ঘ্যাটং ঘ্যাটং শব্দে। অথবা যাই না। ব্যথা আছে মনে তাই হয়তো বা যাবার প্রসঙ্গ শুধু ভাবি, শীতল পানির মতো; নীরব যেমন, কিন্তু আসলে যাই না। ভাবি আরও পরে যাব আমি দিনরাত বুকে হেঁটে হেঁটে। এইভাবে বুকে হাঁটা নতুন অভিজ্ঞতার মতো হয়ে যায়। বুকের, মাটির এ ঘনিষ্ঠতা আমি আগে আর দেখি নি কখন; সব সম্ভবপর হয় আজ। ঘাস লাল হয়ে ওঠে অনায়াসে অন্য গ্রহে আকাশের মতো। সে নাই বলে কি সব এভাবে বুকের কাছে আসে? দূর গ্রামে যাবার প্রসঙ্গ ভাবি অতল পাইপের মতো শুয়ে। আরও ভাবি যদি জানতাম কিভাবে চাইতে হয় গ্রাম, কিভাবে বা বাতাসের মতো চলা ফেরা করতে হয় গ্রামাঞ্চলের ঝোপঝাড়ে, যদি জানতাম তাকে বিকালের দিকে, গ্রাম ঘেষা রেলপথে। পুনরায় বাঁশঝাড়ে জেগে ওঠা দেহ-ঘূর্ণনের শব্দ শত শত চুলায় জ্বলতে থাকে ভোর থেকে, কিম্বা রাতে। অরূপ রূপের স্রোত পৌঁছায় গহ্বরে। কিন্তু পৌঁছায় না। কোনোদিন পৌঁছাবে না। অথবা পৌঁছাবে। অনন্তের রেলপথে কান পেতে অশরীরী শব্দ-শূন্য কাঞ্চন-নগর বুক ভরা পেয়ারা গাছের মতো মাটির সমীপে ঝুঁকে আছে আজীবন, যদি দেখা যেত তাকে সন্ধ্যার প্রাক্কালে নগ্ন বুকে, এই ভেবে। আরও পরে বাতাস চমকে দেয় ভোর। কোঠার পাখিরা আগে থেকে ঘুম থেকে জেগে ওঠে ঘুরতে থাকে আমাকে বেষ্টন করে বহু বহুকাল। আমার মতন আর এ গ্রহ জানে না অন্য কেউ। পরে দেখি শুয়ে শুয়ে ওইখানে যাওয়া জানি আমি। জানি আমি হামাগুড়ি দিতে দিতে তত-দূর যাওয়া— যতদূর যাওয়া গোপনে ও প্রকাশ্যে দরকার। জানি আমি কিভাবে রক্তাক্ত করতে হয় হাত কিভাবে বুকের রক্ত নিঃশব্দে মেশাতে হয় ঘাসে। সমুদ্র নিকটবর্তী বনাঞ্চলের মতো শুয়ে থেকে চলে যাই গ্রামে। বিমানের প্রলম্বিত শ্বাস আমি; চক্ষুদের মতো আমি যেতে থাকি, এইসব রয়েছে আমার; বালুতে জন্মানো ঘাস আমি হয়ে আছি, হয়ে আছি। পানির পাইপের মতো পাব দূর গ্রাম কোনোদিন এ পাতালে হামাগুড়ি দিতে দিতে দিতে— আমাকে যে উপড়ে ফেলবে, সে সাধ্য তোমার আর নাই।
জর্জ স্ট্রিট
বাষ্পীভূত নিশ্বাসের মতো জর্জ স্ট্রিটে আজও ঘুরি। যদি তুমি হেঁটে আসো, দূর থেকে তোমাকে দেখার সম্ভাবনা তৈরি হয়, এ আশায় ভোর থেকে হেঁটে হেঁটে সন্ধ্যা অতিক্রম করি জর্জ স্ট্রিটে। সন্ধ্যার অতল থেকে আলো ওঠে, ধীরে, পাতালের সিঁড়ি হয়ে। আমার বাতাস দেহ তার স্পর্শে কাঁপে। থামি না তথাপি আমি, হাঁটার ভিতরে শান্ত লাটিমের মতো ঘুরে যেতে থাকি অবিরাম। রাত্রি হলে জর্জ স্ট্রিট এক থেকে বহু পথ হয়। সে-সবের কোনোটিতে নেমে, তুমি কোনো দিকে চলে গেছ? এই প্রশ্ন, এই অভিজ্ঞতা জর্জ স্ট্রিটে জেগে আছে। গভীর সমুদ্র উঁচু হয় অন্ধকারে। কোথাও বা বনভূমি আরও সম্পন্নতা ভেবে ছুটে চলে আসে। অতল অজ্ঞানতার বশে আমি জর্জ স্ট্রিটে হেঁটে চলি। জানা নাই কোন দিকে যেতে হবে তোমাকে খুঁজতে। হয়তো তুমিও হাঁটো জর্জ স্ট্রিটে, একা, আনমনে; টাউন হল পার হয়ে কুইন ভিক্টোরিয়াকে বামে রেখে, উইনইয়ার্ড ফেলে, সুদীর্ঘ ক্যাথেড্রালের ছায়াকে এড়িয়ে, ধীরে ধীরে চলে যেতে থাক সার্কুলার কী’র দিকে; অভ্রান্ত ঘাসের মাঠে দু এক মুহূর্ত বসে কোনো কিছু ভাব, বহু আগে শুরু হওয়া, শেষ হওয়া চুম্বনের স্বাদ জাগে, মরে। বিকালেরা ফুলে ওঠে জলের পৃষ্ঠায়। টাগ বোট, বিকল জাহাজ নয়, জাহাজের বেদনাকে টেনে আনে। তুমি আমি দুজনেই ভিন্ন ভাবে জর্জ স্ট্রিটে আসি, হেঁটে চলি। আমি আসি বহু দূর দেশ থেকে ক্ষীণ বাতাসের মতো; আর তুমি সন্ধ্যা শেষে কোনো স্থানে একা একা পৌঁছাবার কষ্টে।
এই এক
এই এক ঘোরপ্যাঁচ চলছে অনেক কাল ধরে। যখন আমাকে তুমি দেখবার কথা কল্পনাও কর না ঠিক তখনই তোমার সামনে থাকি আমি, আশে পাশে ঘোরাঘুরি করি। ধরো অনেক দূরের এক হিল স্টেশনে বরফ পড়ছে অস্থায়ী ভাবে অনেক দিন তুমি সেখানে আছ, বহুদিন আমাদের দেখা নেই, বরফ আচ্ছাদিত পথ দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছ তুমি, চারদিকে বিষণ্ণ দোকান আর ছোট্ট পাহাড়ি শহরে নেমে আসা অসীমের ছায়া, আমাদের বহুদিন দেখা নেই, তুমি কল্পনাও করতে পারছ না যে ঐ দূরের শহরে তোমাকে দেখতে যাব আমি। অথচ যে পাথরের পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছ, তার পাশেই একটা অদম্য ল্যাম্প পোস্টের নিচে ভূতের মতো কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি, তুমি আমার পাশ দিয়েই ধীরে ধীরে হেঁটে চলে গেলে কিন্তু আমাকে দেখলে না। আমার ছায়ার শরীর তোমার কল্পনা নেই বলে আস্তে আস্তে শূন্যে মিলিয়ে গেল। কিম্বা ধরো সময়ের ওই পারের এক গ্রামে বেড়াতে গিয়েছ তুমি। হয়তো সে গ্রাম তোমারই, অথবা আমার, অথবা কারোরই নয়; বহুদিন আমাদের দেখা নেই, কিন্তু ধান শুকচ্ছে উঠোনে, অথবা রাশি রাশি আপেল পথে পড়ে আছে কে যেন বারান্দায় বসে আছে একা, আমাদের দেখা নেই বহুদিন, হঠাৎ স্টেশনের পাশের গাছগুলোর মনে তীব্র পর্বত-ইচ্ছা জেগে উঠল তুমি জেগে ওঠা বাতাসের মধ্যে অনেক চেপে রাখা নিশ্বাস শুনতে পেলে, আমার কথা মনে পড়ল তোমার, বহুদিন আমাদের দেখা নেই, কিন্তু তুমি ভাবতেও পারলে না যে এই এত এত বছরের পর, অত দূরের এক আপেলের গ্রামে আমি দেখতে যাব তোমাকে, তুমি প্রকৃতির স্যান্ডেলিয়ারের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকলে, এবং আমি একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কাল ভূতের মতো তোমার দিকে তাকিয়ে থাকলাম, তুমি দেখলে না বলে একটু পরেই বাষ্প হয়ে ওড়ে চলে গেলাম অন্য দিকে। বহু রেললাইন আমাদের মুখমণ্ডলের উপর দিয়ে চলে গেছে, টেক অফ আর ল্যান্ডিং-এর দাগ লাগা বহু এয়ারপোর্ট জেগে উঠেছে শরীরে আমাদের; দৃষ্টির ওপার পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে বসে আছে বাষ্পীভূত মাঠ কখনো সে ডুবে যায় আদিগন্ত জলের কল্পনায়; মাঝে মাঝে ভাবে, হয়তো এখনও সে একটি ধান ক্ষেত। তুমি এক কেয়ারা নৌকায় করে যাচ্ছ পরদেশে, আমি সেই নৌকার মাঝি, অথচ আমাকে দেখছ না তুমি। অথচ যখন তুমি আমাকে দেখতে পাবে ভাব, এই নিয়ে কল্পনা কর, তখন আমি আর সেখানে নেই; তখন হয়তো আমি অনেক দূরের এক জলে ডোবা ধান ক্ষেতে ঢেউ অথবা বাতাস হয়ে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছি স্টিমার নেই, জাহাজ নেই, এরকম একটি রাতে। অনেক কাল থেকেই এরকম চলছে আমাদের। কার যেন কল্পনার ঘোরপ্যাঁচে পরে সময়ের দুই ভিন্ন পরতে চলে গেছি আমরা দুজন বহু আগে।
অনেক কুকুর
অনেক কুকুর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত নভশ্চর এই রাতে। বহু দূরে দূরে, রিং রোড যেন ওরা অবাস্তব শহরের। রিং রোড ঘিরে আরও রিং রোড ঘিরে আরও রিং রোড ওরা এই জীবনের। আমার হৃদয় থেকে উৎসারিত নিঝুম জাতিস্মর। ওদের ধ্বনির নিচে ব্যাখ্যাহীন রিং রোড আমি। টের পাই আজ রাত কুকুরের ডাক। পৃথিবীকে পার হয়ে পৃথিবীর বেদনার গোলাকার পথ চলে গেছে জ্যামিতিক হাত ধরে, ধীরে, ঠিক জ্যামিতিরই মতো, গোল আর চ্যাপ্টা হতে হতে, গোল আর চ্যাপ্টা হওয়া পার হয়ে, বহু দূরে, জোছনায় অবিমিশ্র গোল-চ্যাপ্টা হয়ে। চার পায়ে হেঁটে হেঁটে বহু দূর থেকে ওরা এসেছে এখানে। যুগান্তরের অসীম নিরবচ্ছিন্ন লালা চেটে চেটে, বহু আকাশের রেলকর্মীদের পার হয়ে, বহু ভাসমান তাঁবু, নীল জলে ঢাকা মরুভূমি পিছে ফেলে ওরা ক্রমশ এসেছে— ওদের ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত প্রগাঢ়তা শুনে বোঝা যায়। চুপচাপ এইসব নভপ্রাণ ধ্বনিগুলি বুঝে নেই আমি। এইসব বুঝে নেয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো কাজ নেই এখন এ-রাতে। আজ রাতে কুকুরেরা জীবনের অনেক উপরের অন্ধকারে... পূর্ণিমায় চলে গেছে। আমাকেও নিয়ে গেছে সাথে। ঘুমের সহজ লোভ, প্রলোভন পড়ে আছে অনেক পিছনে। সেখানে কখনো ফেরা হবে না আমার। মুখ উঁচু বিমান-পথের ধ্বনি ওরা— আকাশে ছড়িয়ে পড়া বিলিয়ন বিলিয়ন নীল রিং রোড। রিং রোড তারাময় রেল, এই পথে কুকুরের ধ্বনি প্রতিধ্বনির মায়া বাতাবি লেবুর মতো হাত ভরে দেয়। নরম পুকুর ওরা, চার পেয়ে, ওদের স্পর্শ পেয়ে তার মুখ মনে পড়ে। নিশাকর আকাশের মৃদঙ্গের শব্দে তাকে জানি। জেনে নিয়ে, পুনরায় তাকে আরও জানতে যে হবে, বাতাবি লেবুকে ধরে রিং রোড থেকে আরও রিং রোডে ছড়িয়ে ছড়িয়ে গিয়ে, বুঝে নেই অধিকের মতো আজ রাতে। দীর্ঘ নিশ্বাসের প্রায় নিজ অবাস্তবতার কথা মনে আসে। মনে হয় ভাঙা একসাঁকো হয়ে ঝুলে আছি এ শহরে, এর চেয়ে তাকে ছেড়ে ওই উঁচু হিমকর রিং রোডে চলে যেতে পারা ভালো হবে। এই রাত গ্রাম থেকে হেঁটে আসা ভূমিহীন মানুষের পথ, কন্সট্রাকশনের সাময়িক কাজে লিপ্ত হতে চেয়ে, এ-শহরে, সঘন বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ওঠে যায় যারা ব্যাখ্যাহীন। দেয়ালে হেলান দিয়ে কুকুরের ধ্বনি প্রতিধ্বনির মতো, রিং রোডে বসে থাকে অব্যাখ্যাত সকল মানুষ। ওদের সবার সাথে আমার অমোঘ মিল দেখি। কারো ঠোঁট নড়ে নাই, তবু না নড়া ঠোঁটের গল্প শুনি আমি নিয়ত প্রকাশমান রিং রোডে বসে। ব্লু মাউন্টেন মনে আসে না আমার। কুকুরের মতো হয়ে, কুকুরের মতো হয়ে হয়ে, মানুষের, কুকুরের মতো হয়ে যেতে থাকি আজ, শুধুমাত্র মানুষের মতো হতে পারব না জেনে। বাতাবি লেবুকে ধরে দুই হাত ভরে। সব বস্তু প্রাণময়, চক্রাকার লেবু ধরে, নুয়ে, আমি দেখি। মনে পড়ে পদদলিতের মতো অসতর্ক ছিলাম আমিও— চিনি নাই তাকে, সত্য তবুও বলেছি। আমি আর কুকুরেরা দীর্ঘশ্বাস ছিলাম তখন। দীর্ঘ দীর্ঘ নিশ্বাস ছিলাম আমি আর কুকুরেরা, মৃদঙ্গ সমান। ড্যাগারের মতো ধারে তার নাম লেখা হয়েছিল এই দেহে। পাতার মোহের ধ্বনিচূর্ণ রক্তে ব্যাপ্তি পেয়েছিল। মিশে গিয়েছিল দ্রুত আমার শরীরে। তবু আমাকে গাছের মতো কেটে ফেলে দিলে, কোনো দিকে হেলে পড়ে যাব আমি, কিম্বা কাটা হয়ে গেলে, গাছ কোনো দিকে হেলে পড়ে যায় মানুষের মতো, সেসব সে ভাবে নাই, শুধু কেটে ফেলে দিয়ে চলে গেছে। এখন রাত্রির রৌদ্রে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত রিং রোডে সকল স্বচ্ছতা ধীরে ভূমিহীন এ হৃদয়ে আসে। স্বচ্ছতা বিহ্বল আর আমাকে করে না। চাঁদের আলোতে এসে স্বচ্ছতাকে বুকে নিয়ে চুপ করে বসে থাকি আমি। অনেক কুকুর ডাকে। সেই ডাকে ভেসে উঠি ধ্বনির মতন। স্বচ্ছতার কাজ এই, সে তোমাকে ধ্বনির মতন এক নীরবতা দেয়। লীন হয়ে আসে মুখ, রিং রোডে, অগাধ কিরণে।
সেই ফ্ল্যাট
কে যেন হেঁটেছে সাথে, চক্রাকারে, কিছু দিন, সমাজবিহীন; এক সাথে ট্যাক্সিতে এসেছে, আর নেমে গেছে ফ্ল্যাটের সম্মুখে, ক্লান্ত নৌকা; সন্ধ্যাগুলি বাতাসের স্কোরবোর্ড, বিলুপ্ত হয়েছে— যাই নি কখনো আমি পর্দা টানা তার শান্ত ফ্ল্যাটে; জানা হয় নাই সেই ফ্ল্যাট সত্যি সত্যি পর্দা ঢাকা ছিল কিনা; অবশেষে, কত দূরে, কোনো সমাজবিজ্ঞান-হীন পথে চলে গেছে ছায়া ঘর; আমার মনের মধ্যে আজ অবদি রয়ে গেছে শেষহীন ঘোরা; ছায়া থেকে সূর্য ছুটে আসে, আর পর্দা থেকে ইনসমনিয়া; গুগুলের গ্রহ থেকে ক্রমাগত ছাদ দেখা যায়; বাড়িটার চারপাশে আজও আমি রাত হলে ঘুরি; যেন সেই ফ্ল্যাট আছে—স্থানের স্থিরতা, যেন, মানুষের চেয়ে বহু বেশি; ঘুরে ঘুরে দেখি আমি সেই ফ্ল্যাট ঘুরছে ভয়েডে, বাতাসের শব্দের অসারতায়, দূর কালো গ্রহে, অন্ধের সূর্যের মতো স্থায়িভাবে সন্ধ্যার কিনারে
পিপাসা
বহু জলাশয়ে ডুব দিয়ে দেখেছি যে অবশেষে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাই আমি। অবগাহনের পানি স্বচ্ছ আর নীল —তথাপি দেখেছি আমি শাশ্বত জলের গ্লাস তৃষ্ণা না মিটিয়ে, নতুন তৃষ্ণার জন্ম দেয়। ক্রমে কম্পমান তুমি স্থায়ী হও আমার ভিতরে। আমার সকল বোধ তোমার শরীরে লেগে জেগে ওঠা জল। যদিও তোমার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা কোনোদিনও হয় নি আমার পিপাসার সাথে আমি এই নিয়ে আলোচনা সারাক্ষণ করি। তোমাকে দেখেছি স্নানে; তারপর থেকে পিপাসা মেটে নি আর অন্য জলাশয়ে, অন্য স্নানে। সকল সমুদ্রে, দেহে, মহাকাশ জুড়ে স্নান ঝোঁক। স্নানহীনতায় সব তলোয়ারে মরীচিকা আসে। পাখি আর মানুষেরা এক সাথে স্নানপাত্রে নেমে অবগাহনের পরে চলে যায় ভিন্ন ভিন্ন পথে, কেউ হেঁটে, কেউ উড়ে, ক্রম বেদনায়। আমার দুহাত ভাসে ধুলো আর শূন্যকে আঁকড়ে। খেয়ালে বিহ্বল হয়ে, জেগে আমি দেখি এই গ্রহ জেগে আছে, তৃষ্ণা হেতু, পুনরাবৃত্তিতে। তোমাকে দেখেছি আমি স্নান রত, একা; তাই জানি রক্তের ভিতরে সন্ধ্যা যদিওবা আসে, সূর্যাস্ত আসে না।
অপেক্ষা- ২
সংসারে বেদনা পাব, জেনেও এ পথে আমি ধোঁয়ার মতন থেকে দেখি একটি ঘুমের মধ্যে জন্ম নিয়ে স্বপ্নগুলি আরেক ঘুমের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়; উপস্থিতি-পোড়া মনে, নিঃশব্দ অগ্নির মতো একাগ্রতা কাঁপে ভেবে যদি ফিরে আসে, ভেজা হাত রাখে চোখে, কদাচিৎ যদি মনে পড়ে অলীক ধুলার সাথে আমার বিবশ দেহ উড়েছে অনেক ঘুমঘোরে আমারও ভিজেছে হাত, সংসার বেদনা পথে, স্বপ্নে কারও নিচু মুখ ছুঁয়ে।
ছায়া
একদিকে এক আর অন্য দিকে শূন্যকে বসিয়ে কে যেন শুনছে শুধু শূন্য আর স্বপ্নের আলাপ; যেনবা দু'দিকে দুই দর্পণ রেখে মাঝখানে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে একা। একই মুখ দুই আয়নায় দু'রকম হয় দেখে, যদিও বিহিতহীন, তথাপি সে দ্বিধাগ্রস্ত হয় নি এখনও; জানে সে, কখনও প্রতিবিম্ব কোনো অকস্মাৎ ঘোরে একই আয়নায় হতে পারে নানান রকম। একদিকে শূন্য আর অন্যদিকে তোমাকে বসিয়ে বহুদিন কাটে তার ঘুমহীন, অন্ধকার মাঠে; শূন্যের ভিতরে ছবি, শূন্যতার ছায়া এক জলের মুখোশ; মানুষ নিঃশব্দ হয়ে কথা বলে ঘুমে; একক ছড়িয়ে যায়, দর্পণ যেনবা তার আপন দু'হাত সামঞ্জস্য নেই বলে স্বপ্নে তার ছায়াও থাকে না— একদিকে এক আর অন্যদিকে শূন্যকে বসিয়ে কে যেন একাকী ওড়ে অনির্দিষ্ট ছায়ার সন্ধানে
আড়াল
নিজেকে দর্পণে দেখে আমি আরো একাকী হয়েছি। প্রতিবিম্ব নগ্ন করে; জেনে ঘুমেও ভুলি নি তাকে, স্বপ্নে পান করেছি কুহক। নিজের ছায়ার স্পর্শে জেগে ওঠে দেখেছি জ্যোৎস্নায় আমাকে একাকী রেখে ওড়ে যায় আমার আড়াল। আবার ঘুমিয়ে দেখি কে যেন মাথার কাছে রেখে যায় জল। কে যেন জানায় ইচ্ছা, অন্য পৃথিবীর ভাষা ব্যবহার করে; চোখের ভিতরে কার অর্থহীন জল জেগে আছে; কে যেন বৈঠক করে, ঘুম যেন শুধু তার ব্যথিত আড়াল— ঘুমের ভিতরে আমি ছুটে যেতে যেতে ভাবি, এখন জাগব। কিন্তু জাগি না আমি, টের পাই ঘুম-অসীমতা বরং ঘুমেই আমি স্পষ্টতর আয়নার মতন আমিই দর্পণ আর আমি তাতে প্রতিবিম্ব, ছায়া— নিজেকে দর্পণে দেখে আমি তাই ক্রমাগত একাকী হয়েছি।
বিদায়-গান
পাহাড় বিদায় করে দিতে হবে এ-জীবন থেকে— পাহাড় ঠেলতে আমি পারি না যে আর। ক্লান্ত হয়ে চুপ করে বসে থাকি পাশে। অবিরাম চেষ্টা করি কিন্তু তবু দেখি পারি নাই সরাতে পাহাড় এক বিন্দু। কুয়াশা বিদায় করে দিতে হবে এ-জীবন থেকে— কুয়াশা ঠেলতে আমি আর পারি না তো; অন্ধ হয়ে তার দিকে ক্রমাগত হাঁটি। গভীর সুরঙ্গ ঢোকে পানির শরীরে। আকাশ ঠেলতে আর পারে না শরীর; তবুও সরাতে হবে তাকে প্রাণ থেকে। যে আমাকে কখনো শাসন করে নাই, কেবল নৈকট্য দিয়ে গেছে নিশিদিন, সেও আজ প্রতিমান হয়ে গেছে যেন। তখন অন্ধত্ব ঘোচে, চক্ষু মেলে দেখি, কুয়াশাও তার গৃহ— আকাশের মতো, পাহাড়ের মতো। অনুভব হয়, সকলেই তার ঘর এই প্রকৃতিতে— কখনো আশ্রয় দেয়, শান্ত, কথাহীন। কখনো আশ্রয়-হীন করে ভোর থেকে, ধীরে ধীরে। বিদায় দেবার মতো রেখে দেয় সকল সন্ধ্যায়।
দুর্ব্যবহার
এখন কুয়ার কালো নীরবতা আমি—তাই অতি সহজেই আমার সহিত দুর্ব্যবহার করা যাবে, করা যেতে পারে। আপন কদর্য মন আপনার মধ্যে রয়ে গেছে; উড়ন্ত সেতুর নিচে জমে আছে স্থবির পাহাড়। একটু ঊর্ধ্বমুখী হয়ে কুয়ার উপরে গোলাকার আকাশ নেমেছে— ফলে বলা যায়, চোখ খুলে আমিও প্রস্তুত আছি এ-সব গ্রহণে। আজ অবসর বহু—তার দুর্ব্যবহার ব্যবচ্ছেদ করা যায় বসে বসে সারাদিন রাত। বিকালকে ভাবা যায় রাতভর। জেগে জেগে ভেবে দেখা যায় অপমান। বহুরাতে স্বপ্নে যদি সাপের ছোবল আসে নেমে সহজ চিৎকারে তবে জেগে ওঠা যায় বহুরাতে কিম্বা আরও পরে, আরও বহু পরে, অন্য শেষরাতে, কোনো পরদিন, অসীমার পরে এক দিন, বহু অ-দিনের পরদিন, কিম্বা অন্য সে-দিবসে জেগে ওঠা সম্ভবপর হয়। ঘুম ভাঙবার মুহূর্ত থেকেই আগেকার অপব্যবহারগুলি চিন্তা করা যায় নিচু হয়ে। বোমারু স্বপ্নের মতো উড়ে চলে যায় নীল মাছি। অবিরাম দুরাচরণের বসে থাকি আমি, তার কাছে। এসব নৈকট্য জানি গভীর আপস— ফলে সে দুর্ব্যবহার করে। তবু কদাচার পার হয়ে, তার বেদনাকে দেখি। এই দেখা ক্লান্তিকর কাজ, তবু দেখি। এ দেখা সয় না তার, ফলে স্বপ্নের সেতুর মতো হেঁটে হেঁটে কোথায় যে যায়... হয়তো ঘুমাতে যায় লগ-কেবিনের উষ্ণতায়, বেদনায়, ফলত রাখে না আর বিকল্প সংযোগ; রাখে না উপায়ান্তরের যোগাযোগ। দুর্ব্যবহারের মতো অপূর্ব মুখশ্রী মনে পড়ে, ভয় আসে। এখন তো কিছু নেই, আমি নেই, সেও নেই, ভয় নেই, তবু কেন ভয় রয়ে গেছে? অতল কদর্যরূপে আমার কদর্য মন রয়ে গেছে ভয়ে। সাপের কুণ্ডলী হয়ে শুয়ে আছে চক্ষুশূন্য চক্ষু খুলে আমার ভিতরে। কিছু নেই, শুধু এক ভয় রয়ে গেছে হৃদয়ের, এ-হৃদয়ে। এ-ভয়কে অঙ্গীকারের মতো ব্যবহার করে আবার সে অন্যের সহিত তার মিলনের গল্পগুলি বলে। আমার নৈকট্য তাকে অতিক্রম করে যেতে হয় গল্প বলে। অতিক্রম করে যাওয়া কত যে কঠিন আমি দেখি ভয়কে অঙ্গীকারের মতো সে এখনো ব্যবহার করে... এইভাবে চলতে থাকে—কাছে আসা, ভয় পাওয়া, গল্প বলা; অতিক্রম করবার চেষ্টা করা, অতিক্রম না করতে পেরে দুর্ব্যবহার করা—চলতে থাকে, চলতে থাকে, থাকে; ঋতু প্রবর্তন হয়; অরণ্যের পলেস্তারা খসে যায়, নতুন বাকল জন্মে, খসে পুনরায়, তারাপুঞ্জ ঘুমায় ও জাগে, দুর্ব্যবহার করা চলতে থাকে, চলে। এখন নিঃশব্দ আমি, অন্যকে সহজে জানা যায়। রৌদ্রের টেনিস-বল ভোর থেকে অভিঘাত হানে। ঘাসের মোরগ আর বাতাসের, পানিদের পাখি ডেকে চলে; এসবের অন্তরালে ক্ষয়ে যায় সামুদ্রিক চিল। গগন নিঝুম বলে কিছু দূর বহুদূর বলে মনে হয়। সকল বাতাস ঘোরে প্রলম্বিত গর্তে। ক্ষুধা-হীন হাতগুলি দিগন্তকে স্পর্শ কি করে? ঝাউ বনের ওপাশে, ঐ দূরে, ভোরের তরঙ্গ দেখা যায়। দূরদেশে সমুদ্রের ঢেউটিন ওঠে নামে কুয়াশা পর্যন্ত। গ্রাম-বেড়ে মোরগের কুজ্ঝটিকা নুয়ে আসে সন্ধ্যার মতন— সর্বত্র বাতাস হাঁটে, বেতন-বিহীন ভাবে প্রবাহিত হয়।
ভ্রমণের শেষ দিন
আজ মন বিষণ্ণ বাতাস। অবিরাম শুনি তাকে জলে আর নিজের ভিতরে। গড়িয়ে চলেছে বহু পিপাসার্ত ভ্রূণ পথে পথে। এই স্থান ছেড়ে যেতে হবে। অগোচর ধবল ক্রন্দন ভেসে আসে। যে আমার, যে আমার নয়, তাকে মনে পড়ে। জঙ্গলের মুখামুখি অনিশ্চিত বায়ু প্রবাহের মতো কার অলঙ্ঘনীয় ছায়া আমার উপরে, সারাদিন। শণের ঘরের মতো তার দেখা মিলবে না। বরজের পাশ দিয়ে হেঁটে যাব ব্যর্থ প্রেম ভেবে। সাকোর ছায়ার মতো জলের উপরে আমি থাকব শয়ান। হেঁটে যাব কুয়াশার স্বল্প ব্রিজে, রাতে। আমাকে উড়িয়ে নিয়ে চলে যায় বাতাস ইঞ্জিন। নিঃস্ব-ঝাউবন দূরে; অশরীরী পানকৌড়ি ডাকে। আমার সকল কথা বাতাসের শব্দ হয়ে যায়। শোনা যায় থেকে থেকে। তথাপি কি শোনা যায় তাকে? দূরে ঢেউগুলি ভেঙে পড়ে লীন পতাকার মতো। দাঁড়টানা নৌকাগুলি লবণে লবণে ক্ষয়ে যায়। স্বল্পকালীন জল দূর থেকে সমুদ্রের অস্থিরতা অনুভব করে। ভ্রমণের শেষ দিন অহেতুক, অযৌক্তিক লাগে।
নিরস্ত্র
নিরস্ত্র সত্যের মতো শ্রাবণেরা আসে। আর সকলের আসা যাওয়া পরিকল্পনা মাফিক। কিন্তু শ্রাবণের হাত সত্য-সম সহসা পৌঁছায়। শুয়ে থাকে পথে, আর শূন্য ভেদ করে অপভ্রষ্ট আমার হাতের সাথে নিজ হাত ঘষে। মানুষের দুরাগ্রহ স্বাদ, এখন অনেক রাতে, শ্রাবণের শব্দে, আমার দুচোখ থেকে মুছে যায় ধীরে। আমি তাকে ঘিরে বসে আছি, জেগে আছি; একসাথে অক্ষর ও নিরক্ষর কিভাবে সে হলো কিভাবে সে শব্দ তবু শব্দহীন হয়ে রয়ে গেল, শ্রাবণ শুনতে শুনতে আজ আমি জেনে যাব সব, হয়তো রাতেই। শ্রাবণে বিধৌত চোখ ঘাস। যারা ব্যথা পায়, আর যারা ব্যথা পায় ভাবে, তারা এক নয়। যারা ব্যথা পেয়ে চলে গেছে, আর যারা জানে ব্যথা পাওয়া ফুরাবে না কোনোদিন, তাদের কথার মতো আমাদের মন। বৃষ্টির প্রলম্বিত খেয়ালকে শোনা যেতে থাকে। হয়তো শ্রাবণ মানে দিনভর এইভাবে ঝরা। ঘাসবনে বিন্দু, বিন্দু, বিন্দু হয়ে যাওয়া। আমার শরীর থেকে ধুলো ধুয়ে যায়। নিরস্ত্র ঝিঁঝিঁর মতো বসি আমি ঘরের বাইরে।
কোকিল
শেষ রাতে তার ডেকে ওঠা শোনা যায় পুনরায়। সারারাত জেগে থেকে—ঘুমাবার চেষ্টা করে—ক্লান্ত হয়ে গেছে। এখন সে না চায় ঘুমাতে, না চায় জাগতে। জাগতিক বাইনারি বিধান সে পার হয়ে গেছে। কিম্বা তাও ভুল। হয়তো রাত্রির শেষে সামরিক প্লেন উড়ে যায়। ঘুমের ওপার থেকে পাড়ার তক্ষক স্বপ্ন দেখে। প্রেম-বিহীনতা তাকে কম্পমান করছে পুনরায়—শুধু এই। কিম্বা এক দুর্ব্যবহার—কেননা তা অভ্যাসের মতো— মজ্জাগত হয়ে গেলে—ছাড়ে না কখনও। যদিও বা জীবনের সকল মায়াই একদিন দীর্ঘশ্বাস হয়ে দেখা দেয়—তবু এই ধারণাও ভুল—খেয়ালের মতো প্রলম্বিত—তবু ভুল। এক কালো ডালের উপরে বসে পাশ ফেরে ম্রিয়মাণ পাখি, পাতার ভিতরে শ্রান্ত অসময় আসে। চেতনা উন্মুক্ত হতে মানুষের বহু দিন বাকি আছে— অন্ধকার থেকে এক অস্পষ্টতা উঠে শেষ রাতে আমার এ জাগরণে উঁকি দিয়ে যায়। কোকিলের ডাক আমি শুনি— ভোর রাতে—জীবনের চারপাশে অলীকের মশারির মতো। কিম্বা তাও অবিমিশ্র ভুল, তার সাথে দেখা করা শুধু নিরর্থক— বাস্তব পৃথিবী থেকে সীমাহীন দূরে—শেষ রাতে, কোকিলের ডাক শুনে জীবনের কোনো লাভ নেই। ঘুম নয়, যার যার আপনার চিন্তাই আজও মানুষের ঘুম। স্বভাবের গভীর ভিতরে ঢুকে শ্লথ চাকা ঘোরে, আটকে যায়, ফের ঘুরে চলে, বারবার। হয়তো তাও ভুল—শেষরাত ডেকে ওঠে—শুনি না আমিও।
সমুদ্র
সমুদ্র ধোপার মতো কালো তক্তা ফেলে, সময়ের পথ পার্শ্বে অবিরত কেচেছে তোমাকে। আর ঐ বাতাস প্রবহমান আকাশের কোণ থেকে কোণ থেকে কোণে। কুকুরের মর্মস্পর্শী ডাক ঝাউবনে শোনা যেতে থাকে সারাদিন— আরও নগ্ন হয় গাছ আমাদের চারপাশে থেকে। মনে পড়ে ডাকার নিয়ম। একটি কুকুর ডাকে। তারপর আরেক সময় থেকে ডেকে ওঠে আরেক কুকুর। সবশেষে অনেক কুকুর ডাকে আকাশের মতো। দল বেঁধে ভেসে আসা ডাক শুনে, আমি ভাবি, আগেও শুনেছি আমি কুকুরের ডাক, এই আজ আবার শুনছি। সারি সারি কুকুরের পরিশ্রান্ত মুখগুলি ভেসে ওঠে অন্ধকারে। সময়ের দশদিক হতে ওরা কাছে এসে দাঁড়ায় সন্ধ্যায়। আবারও ওদের মতো ডাকতে ইচ্ছা করে, এ শহর ছেড়ে যেতে যেতে। তারপর সব চুপচাপ। আবার বাতাস চলে। ওদের হাঁটার শব্দ শুনি। হারানো ডাকের মতো ছেড়ে যেতে থাকি আমি ভালোবাসি যাকে। মাথা নিচু শরীরের অতীন্দ্রিয় কষ্ট সারাদিন, সারারাত। অনেক মদের পর বোধ করি ঢেউ; অথবা ভীমরতি; অস্থির নানান তৃষ্ণা জন্ম নেয়, মরতে চায় না। ধোপার ধোয়ার মতো অবিরত বাড়ি খেতে রাজি হয়ে যায়। বিভিন্ন অঞ্চল হতে ভেসে আসা হিংসা-হীন ডাক—পৃথিবীর গভীরতা। বিস্ময়ের হয়ে আমি রয়ে যাই আশপাশ ভরে—আর ভাবি, কিভাবে বা পথ চেনে পিঁপড়ারা, চেনে শত দিক, ঝড়ের একটু আগে দ্রুত বেগে পার হয় ফাঁদ? কিভাবে স্পৃহার দিকে চলে যায় অনেক হরিণ; বহু পাখি, কী প্রকারে, পার হয় নেবুলার পথ... প্রবল বাতাসে ডুবে কিভাবে যে স্থির থাকে নৌকা, কোনো তীরে! বারান্দা অনুসরণকারী পানি, কোথায় থামতে হবে কিভাবে যে জানে। মেঘে মেঘে চেক ইন চেক আউট করে চাঁদ। যাকে ফেলে চলে আসি—সেও থেকে যায়— সকল থাকার মধ্যে—নানামত ধাক্কা গুঁতা খেয়ে। যে প্রহরে ওরা ডাকে, সে প্রহর, রাত কিম্বা দিন নয় সে সময় আরেক প্রহর। সে সময় শত চূর্ণ ধূপ, কারও স্নান, উপাসনা। সে প্রহরে কুকুরের ডাক শুনে, বহু সময়ের ঐ পার থেকে আসা কুকুরের ডাক শোনা যায়। সে প্রহরে, আমার ভিতরে কচুরিপানার মতো প্রবাহিত হতে থাকে শত অ-প্রহর। ধোপার উঁচানো স্বপ্ন নদী থেকে জেগে চারদিকে প্রসারিত হয়। সমুদ্র চড়ের পাশে গুলিবিদ্ধ পিঙ্গল অর্কেস্ট্রা। অপরাহ্ণে বিছানায় গুটিসুটি শুয়ে, অনেক রকম ডাক একসাথে শোনা গেলে চারপাশ ঘিরে তৃণ ওঠে। শব্দহীন খড়মের মতো ঘাস হেঁটে যেতে থাকে। গহন স্বভাবে খুব শাদা হয় ক্ষেপণিক বক। বাতাসের মিছিলের চলে যাওয়া দেখি। আলাদা কি করা যায়, একত্র কি করা যায়, পৃথিবীর স্বরগুলি হাওয়ার ভিতরে? যে ঘাস জন্মায় কষ্টে সমুদ্রের পাড়ে, সে কি প্রায় ম্রিয়মাণ মানুষের মতো, জন্মের আবেগে? প্রহরের লক্ষ লক্ষ পাইপ পার হয়ে, এইপাশে এসে, কে ও, ভুলে বসে থাকে নিজ দরজার হিশাব নিকাশ? অতন্দ্র পিঙ্গল ঘাস শিথিল মাঠের নীল তালা। সমুদ্রের ঢেউগুলি হারমোনিয়ামের হাত, কার গৃহ? ফিরে আসে, ধেয়ে যায়, শুরু থেকে শেষে চলে যায়; সারাদিন হাতছানি দেয়। সারারাত যে রহস্য চক্রাকারে ঘোরে, সারাদিন যাকে তুমি কিছুতেই ধরতে পার না, আসা যাওয়া করতে থাকা ঐ ঢেউ, সামুদ্রিক হারমোনিয়াম, শুয়োর বা পরিত্যক্ত আমি, কিম্বা বিমর্ষ হরিণ, সমুদ্র তীরের ঘাস, পৃথিবীর কষ্টে বেড়ে ওঠা সমবায়, সব শোনা যায় নিচু হলে, নিচু হয়ে গেলে। গভীর চরকা ঘোরে অন্তরে আমার। দিনে দিনে বিমূর্ত নকশা আর সুতা জমে মনে। আমি আর আমার ভল্লুক শেষহীন পথে তাই ঘুরি। দূরে যেতে যেতে দেখি নৌকার পাহাড়ে, টুরিস্ট প্রত্যয়হীন প্রশান্ত টুরিস্ট শুয়ে আছে। সমুদ্রের নিচ থেকে কোটি কোটি শাদা ট্রেন পানির অতল ব্রিজ পার হয়ে উপরে আসছে। দেখ নাই তুমি কিন্তু এই দেশে ভল্লুক নৌকার মতো কালো। বাতাস সুস্থির আছে পতাকায়— জন্তুর মতন পানি পিঠ উঁচু করে। আকাশের চারপাশ থেকে আসা কুকুরের ডাক, দেখি, প্রধানত, তোমার না-আসা। ফিরবার পথে ঢেউ আরও বড়, আরও উঁচু—বিমর্ষ বোল্ডার। বৌদ্ধসন্ন্যাসীর মতো ইমিগ্র্যান্ট খালি পায়ে সরে যাচ্ছে দূরে।
শুয়ে আছি
চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি; ঘুম নাই, বহু চিন্তা এসেছে মাথায়। ঘুম, সেও কি চিন্তাই এক? অন্য এক রকমের চিন্তা? লোহিতের? হৃদয়ের? মনে হয় ঘুমও এক চিন্তা, চেতনার ঐ পাশ থেকে আসা। কিন্তু চিন্তা। ফের ভাবি, শরীরের চিন্তা এই ঘুম, মানসের নয়। চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি। জলের অনেক নিচে ঘাস। বহু দ্রাঘিমাংশ-পাখি দূরত্বকে পার হয়ে জলে বসে আছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার মতো স্থির। ডুব দিয়ে ওঠে এসে ভাসছে, ঝগড়া করছে। আবার ডুবছে, ভেসে উঠছে গলা লম্বা সাব-মেরিনের মতো, নিপুণ ও কালো। পিঠের উপর থেকে ভাগ করা জল গড়িয়ে নামছে। মিশছে জলের মধ্যে সীমাহীন মেরিনের অলস শরীর। শুয়ে আছি আমি তবু সারারাত। শেষ রাত্রির পাখি শোনা যাচ্ছে সময়ের মতো। ভাবছি উঠব কিনা, যোগাযোগ করব কিনা তার সাথে। পাখির স্মৃতির মতো তার মন, মোলায়েম; মোলায়েম বড়। আমার ভিতরে এক সামগ্রিক বিষণ্ণতা, পূর্ণাঙ্গ ও কালো। ঘাসের নিকটবর্তী বাংলোগুলো আমাকে ডাকছে। আমার ভঙ্গুর গান কেন সে শুনবে? শুয়ে আছি, শুয়ে আছি অবশেষে। ভাবনার চেয়ে বেশি পাখিরা সরব, শুয়ে শুয়ে। ডাকছে। থামছে। থেমে ডাকছে আবার। দুইটি ডাকের মধ্যে, মাঝখানে, অসীম শূন্যতা। আবার ডাকছে পাখি। কিম্বা অন্য কিছু। হয়তো বিশুষ্ক ডাল ডাকছে আমাকে। জলের বুদ্বুদ, অনেক দূরের মাছি, বাতাসের ন্যাপকিন, তাকেই ডাকছে আজ, তার শেষ প্রেমের মতন— ডাকছে, ডাকছে শুধু, ডাকছে আবার। থামতে থামতে ডাকছে, ডাকতে ডাকতে থেমে যাচ্ছে। ডাকের বেদনা শোনা যাচ্ছে ডাকগুলির মাঝখানের নীরবতা জুড়ে। আমি শুয়ে আছি, আমি শুয়ে স্তব্ধ হয়ে আছি। শুয়ে থাকা মানে স্তব্ধ থাকা। কোনো কোনো পাখি কথা বলবার মতো ডাকছে— একই কথা বারবার বলে কিছু পাখি— দেখছি কারও কোনো ঘুম নাই, কোনো স্থানে যাওয়া নাই, শুধু শুয়ে থেকে চিন্তা করা, ডেকে যাওয়া আছে। ফলে আমি চিন্তা করতে থাকি। পৃথিবীর সাথে এক নৈকট্য স্থাপিত হয়ে যায়। জ্যামিতিক চেতনার ঐ পাশ থেকে আমি এই পাশে আসি। কিম্বা ঐ পাশে যাই। লক্ষ করি, শুয়ে আছি আমি, আমার দুচোখ বন্ধ আছে। আমার ভিতরে এক অন্ধকার ব্যাপকতা আছে। কেন্দ্রীভূত হই আমি, সঙ্কুচিত হই, প্রসারিত হতে থাকি। শুয়ে থেকে লম্বা হয়ে যেতে হয়, টের পাই আমি। লম্বা হয়ে যেতে যেতে সঙ্কুচিত হই, ভাবি শুয়েই কি আছি তবে আমি, স্থানে, কিম্বা স্থান-হীনতায়? টের পাই, স্থানে নয়, স্থান-হীনতায় শুয়ে আছি, যে প্রকারে জলের অনেক নিচে শুয়ে থাকে ঘাস— দ্রাঘিমাংশ-পার হয়ে জলের উপরে শোয় পাখি— সেইভাবে আমিও রয়েছি শুয়ে জলের অনেক নিচে, এবং উপরে। ওরা কথা বলবার মতো ডাকে, এক কথা দিয়ে শুরু করে— তারপর অনুক্ষণ এক কথা বলে, পরে অন্য কথা বলে— বলে, কোথায় বা যাবে তুমি, কার বাঁশি বাজাবে ভূমিতে? অথবা সেখানে যাও, যেখানে গিয়েছ বহুবার, কিন্তু যাও নাই। এইসব বলে আর ঘোরে, ঘুরে মরে, প্রশ্ন করে। চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকি; কিন্তু শয়ন আসে না। শয়নবিহীনভাবে শুয়ে থাকি আমি। শরীরের শব্দ আর নীরবতা শুনি; কোনো গান মনে আসে, কথা বলবার মতো অন্ধকার কে যে, কোথায় যে আছে। আবার কি ডাকে পাখি? কিম্বা অন্য কিছু। হয়তো বিশুষ্ক ডাল ডাক দেয় অতীত পাতাকে। বাতাসের ন্যাপকিনে লেখা সে অক্ষর কথা বলে— বারবার ডাক দেয়, থেমে থেমে থেমে। দুইটি ডাকের মধ্যে এক গ্যাপ আছে, শোনা যায়। বুঝতে পারি, দুইটি ডাকের মধ্যে লম্বা হয়ে শুয়ে আছি আমি। আমি শুয়ে গ্যাপের মতন হয়ে আছি। শুয়ে থাকা, দেখি আমি, গ্যাপ হয়ে যাওয়া। কিন্তু পাখি স্তব্ধ নয়, গ্যাপ নয়; স্পষ্টভাবে কথা বলে ওরা। একই কথা বারবার বলে—পাখির স্বভাব এই— একই কথা বারবার বলে ওরা ধীরে ধীরে পাখি হয়ে ওঠে— আমার মতন দ্বিধা ওদের তো নাই। জলের উপরে শুয়ে এক কথা দিয়ে শুরু করে— তারপর অনুক্ষণ সেই কথা ব'লে, পরে অন্য বহু কথা বলে— বলে, কোথায় বা যাবে, নতুন কোথায় শুয়ে রবে? স্থাণুবৎ শুয়ে থেকে তার কাছে যাওয়া কি সম্ভব? তবু কেন শুয়ে থাক, শুয়ে শুয়ে কোথায় যে পৌঁছে যেতে চাও… এইসব বলে আর ঘুরে ঘুরে নানা প্রশ্ন করে। শয়নবিহীনভাবে শুয়ে থাকি আমি; শরীরের শব্দ আর চুপসানো নীরবতা শুনি। ভূমিহীন অন্ধকার চারপাশে গোলকধাঁধার মতো ঘোরে। দুই দিন বৃষ্টি থাকে, তারপর বৃষ্টি থেমে গেলে বাতাস বৃষ্টির মতো শব্দে, পাতার ভিতর দিয়ে অবিরাম প্রবাহিত হয়।
সিঁড়ি
বিমর্ষ প্রেতের মতো সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে নামতে, অস্তিত্বের মধ্যে এক অন্ধকার চরকা জেগে ওঠে। সিঁড়ির অনেক নিচে দেখা দেয় অবিন্যস্ত মন। দ্বিধা জাগে, ভাবি আমি, সিঁড়ি দিয়ে নামি, নাকি নামি অন্য ভাবে? হয়তো বৃষ্টির মতো, দ্রাঘিমার নীরব চরকির মতো নামি। রেলিং-এর ফাঁক গলে পড়তে থাকি, চূর্ণ চূর্ণ ফোটা। প্রবল ইটের সাথে ধাক্কা খেয়ে, ভেঙে চুড়ে লাফ দিয়ে, শূন্য-বৃত্ত হই। আগুনের লাল রিং পার হই সার্কাসের পরিশ্রান্ত পশুর মতন, আবার প্রস্তুর হই লাল রিং পার হব বলে। এভাবে নামতে নামতে কোনো এক উল্টো দিক হতে, অনেক উপরে আমি উঠে যাই নাকি? হয়তো বা উঠে যাই। সোপানের দুই পাশে অবচেতনের ন্যায় দরজার মুখ। বহু উপন্যাস বন্ধ কপাটের মতো; তবু ঘটে। নক্ষত্র জানলা খুলে বসে আছে ঘোরানো অলিন্দে; ধাপে ধাপে জীবনের অ-তান্ত্রিক থুতু। ব্যবহৃত টুথপেস্ট—কৃপণের অবিরাম চাপ খেয়ে— যতটুকু পেস্ট থাকে বুকে—তাকে নিয়ে পড়ে আছে— এবরশনের পরে যেভাবে অস্তিত্বে ফেলে দেয়া ভ্রূণের ভগ্নাংশ থেকে যায় আজীবন, সেইভাবে। পরিপুষ্ট কনডম ঝুলে আছে রেলিং-এ, লম্বিত। চরকি ঘোরানো হাত, ক্রমে শীর্ণ পেশি, দেখা দেয়। মৃত্যুর ওপার থেকে এসে কারা যেন উঠে যাচ্ছে, নেমে যাচ্ছে চারপাশ ঘিরে। না নামার মতো ওঠে, না উঠার মতো নেমে, স্তরে স্তরে সিঁড়ি দিয়ে চলে যাচ্ছে, ট্রাপিজের শূন্য-দড়ি বেয়ে। অংশান্তর পার হয় সিঁড়িহীন ভস্মের দালান। অনির্দিষ্টতার মতো পরিত্যক্ত ফল পচা, কালো। ঘুরে ঘুরে ঘুরবার শব্দ আরও ঘুরন্ত কি হয়। যা ঘোরে তা ঘুরে চলে। যা রয়েছে থেমে—তাকে ঘূর্ণমান লাগে। সিঁড়িতে সিঁড়িও ওঠে নামে। যা নামে তা নামতে নামতে নামবার কষ্টে উঠে যায়। উঠে যেতে যেতে, উঠবার বহু কষ্টে ক্লান্তভাবে নেমে যায় পরিণামহীন কোনো নিচে। গভীর প্রেমের মতো অসরল একা, ছায়ার মতন কেউ নামে সাথে সাথে, কিম্বা ওঠে। ফলে আমি উঠে যাই, আরও শূন্য কারও সাথে একীভূত হই। কিম্বা শুধু কথা বলি, কথা, কথা, কথা, আর কথা। অর্থহীন কথা শুধু বলি আমি জীবনের সাথে, খাটে শুয়ে, বসে। দর্পণের মতো খাট, দশ দেহ দেখা যায় শুয়ে থাকা দেহে। নিজস্ব সঙ্গম কিম্বা ব্যক্তিগত চৌকি বলে কিছু আর নেই। যে কোনো মিলনে আছে, অনেক মিলন ঘাপটি মেরে; ত্রিভুজের মধ্যে বহু বৃত্ত, বহু চতুর্ভুজ; বহু বহু পরিব্যাপ্ত বিমর্ষতা, দাগ, সব দেহে; জনাকীর্ণ হয়ে আছে সকলের রূপ, শত খাটে— বহু ব্যবহৃত স্নান প্রত্যেকের স্নানের ভিতর। মিটমাট করা জলে দ্রুত স্নান করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাওয়া শেষ হয়ে যায় অন্ধকারে। কিম্বা হয় না। বন্ধ গেট পার হয়ে নামি আমি পথে। তবুও কি নামি? অনির্দিষ্ট হেঁটে যাই বাজারের দিকে; অথবা হাঁটি না। দেখি বাজারের শেষে কালো গাছ— কিম্বা কুয়াশা। তার হাতে হাত দিয়ে টের পাই সে আরেক সিঁড়ি। যে আর নিকটে নেই, কুয়াশার পথে সেও হাঁটে, নিরুপায়, দেখি তাকে শব্দহীন ডাল নিচু করে। অন্ধকার থেকে এসে দূর বিমানের ছায়া নড়ে। নীল কল্পনার ধাপে অসীমের গান—মনস্তাপে দরজার ঐ পাশে কান পেতে আছে কেউ। ভস্মের মতন সিঁড়ি ক্রমাগত নামছে, উঠছে।
পোকাগুলি
জানলার শার্শি বেয়ে অন্ধকার পোকাগুলি ওঠে। জানলার শার্শি বেয়ে পোকাগুলি আমৃত্যু কি ওঠে? আমার শরীর বেয়ে অন্ধকার ক্রমান্বয়ে ওঠে। মাথায় সে ঢুকে যায়, আক্রমণ করে অনুভূতি। পোকাগুলি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে অতীন্দ্রিয় জুতার ভিতরে— ফলে আমি কোথায় যে যেতে পারি বুঝি না তখন— দেহাতীত পোকাগুলি জীবনের চারদিকে আছে। ভূমিতে হাঁটছে ওরা—কিলবিল করছে শরীরে— চেতনারহিত মৃত্যু—কিম্বা এক চেতনার মতো— হামাগুড়ি দিতে দিতে ঢুকে গেছে সব শূন্যে, সব স্ট্রাকচারে। দূরের মৃত্যুর মতো, গোলাকার পথে, আমার ভিতরে ঢুকে, ওরা ধীরে, কোথাও বা পৌঁছাতে চাইছে। মৃত্যুকে ভাবি না আমি, তবু আমি মৃত্যুকেই ভাবি। অন্যের মৃত্যুর সাথে আমার মৃত্যুর প্রেম আছে, মনে হয়। সকল মৃত্যুর সাথে, মনে হয়, সকল মৃত্যুর প্রেম আছে। আছে নাকি জানা নাই, কিন্তু তবু আছে মনে হয়— পোকাগুলি ধীরে ধীরে হাঁটে—দ্রুত হাঁটে। মৃত্যুভয়হীন মৃত্যু—মৃত্যু ভয়-যুক্ত মৃত্যু—সব, ক্রমান্বয়ে, পোকাদের পার হতে হয়। যা এখনও মৃত্যুহীন, পোকা ছাড়া আর কেউ জানে না সেসব। মৃত্যুকে ক্রমশ খেয়ে পোকাগুলি মৃত্যুহীনতার কাছে যায়। জানলার শার্শি বেয়ে অন্ধকার অবিরাম ওঠে— সকল মৃত্যুর সাথে সকল মৃত্যুর এ আঁতাত— সারাদিন দেখি আমি, সারারাত দেখে যেতে থাকি। জুতাগুলি ধীরে ধীরে আমার চৈতন্যে ঢুকে যায়। উড়ে চলে শূন্য পথে পোকাদের হাজার পিলার, সময়ের পলেস্তারা ফুটা করে ওরা— শূন্যের সকল সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে বেয়ে— চিলেকোঠা পার হয়ে ফিরে আসে আমার জুতায়, কোথায় যে যেতে পারি জানি না তা আমি। বাগান বাগান যাবার পথে অতীন্দ্রিয় অনেক উদ্ভিদ—কালো, নীল। মার্কিন শাড়ির মতো নিশ্চুপ, বিমর্ষ। কেন ওরা নিশ্চুপ, বিমর্ষ—জানা নাই। কিন্তু দেখি কোনো এক অন্তর্দাহে ঝুঁকে আছে সময়ের ডাল; সেসব ডালের নিচে স্মৃতি ও বিস্মৃতি প্রলম্বিত। চেতনার মতো নীল অনেক জঙ্গল এই পথে। জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে বিষণ্ণ মন্দির। বাতাস প্রবোধ দেয়, তবু, একই ভাবে, বসে থাকে মনেস্টারি—স্টূপ—সারাদিন, সারারাত। বহু আগে আনন্দিত হয়তো বা ছিল, কিন্তু এখন নিশ্চুপ— কোনো এক মনস্তাপে ভাঙা, নুয়ে পড়া। যেতে যেতে দূর থেকে ওদের নৈঃশব্দ্য শোনা যায়। বাগান যাবার পথে পৃথিবীর সাথে দেখা হয়। আরও দেখি, পথ পার হয়ে পানি ঐ পাশে, দূর দেশে গেল। দূর দেশে বহু ভাবে যাওয়া যায়, পানিও তা জানে— কিন্তু তবু ধীরে ধীরে, কল কল করে, একদল শাদা নীল হাঁসের মতন, পানির অগাধ দেহ কাত হয়ে নেমে যায় অদ্ভুত বাগানে; দীর্ঘকায় হতে হতে তালগাছ আকাশকে ছোঁয়। বহু দূরে এসে গেছি; টের পাই; ধীরে ধীরে আরো দূরে চলে যেতে হবে। প্রলম্বিত হতে হবে বিকালের ছায়ার মতন। কিন্তু তবু, এত দূরে এসে তবু—তোমাকে কি ভুলে যাওয়া গেল? চারপাশে মর্মভেদী তালগাছ শুধু— কাছে তালগাছ, দূরে তালগাছ, আরো তালগাছ তারপরে। গৈরিক জীবনের মনোবেদনার মতো ঘুরছে জঙ্গল মাঠে মাঠে। যতদূর দেখা যায় মাঠ আর পৃথিবীকে ঘিরে তালগাছ এগোচ্ছে পিছাচ্ছে। এরকম সারি সারি চলমান তালগাছ শুধু বরিশালে দেখা যায়; আর এই দেশে। ফলে আর, তোমাকে তেমন ভাবে ভুলে যাওয়া সম্ভব হয় না! তালগাছ প্রতি রাতে জাগরূক জলে ডুব দেয়। আমাদের সাথে সাথে সাঁতরায় অসীম জঙ্গল। ঘুমের ভিতরে, স্বপ্নে, কোটি কোটি হাতগুলি নাড়ে; আমার ছায়ার মতো হামাগুড়ি দিয়ে, সন্ধ্যায় জলের মধ্যে নেমে, অগাধ তৃষ্ণার পাত্রে, মাঠে, বিপর্যস্ত তালগাছ ভাসে। দূর ও বিস্মৃতি এক নয়, এই দেখে, হত বিহ্বল আমি, অযোগ্য টুরিস্ট, চুপ করে, কফি শপে বসে থাকি। মানুষ দালান করে; স্টূপ, মনেস্টারি; তারপর সে দালান নানা ভাবে অসমাপ্ত রেখে মরে যায়— হেজে মজে মিশে যায় শূন্যের ভিতরে। কিন্তু তার দালানের বাধা পাওয়া সাধ পৃথিবীতে থাকে— জঙ্গলের চারপাশে অশরীরী দেহ নিয়ে ঘোরে; ধীরে ধীরে সবুজের সাথে মিশে যায়। সবুজ বিমর্ষ হয়, কালো হয়ে ওঠে; অনেক পরের কেউ সময়ের মধ্য দিয়ে যাবার সময় সময়ের এইসব আকুলতা দেখে— তৃষ্ণা-পাত্রে বিস্মৃত তৃষ্ণার মতো ডোবে, ভাসে, ডোবে। বৃষ্টির সাফল্য শব্দে—স্পর্শে— ভোর থেকে শব্দহীন শাদা বৃষ্টি নামে। অযুত খনন উঁকি দেয়। বাগানের টেম্পল ও স্টূপ, বহু ক্লান্ত তালগাছ— রাশীকৃত ঘোর—সব জেগে আছে— এ-অরণ্যে বিমর্ষতা চিরস্থায়ী, টের পাওয়া যায়।
নভেম্বর
নভেম্বরে মনে পড়বে নভেম্বরও শেষ হয়ে যাবে। দূরত্বের বিভ্রান্তিতে পুড়ে যাবে সব। ডিসেম্বর হয়তো বা থাকবে না ডিসেম্বরে। দুপুরে, পথের ঘোরে, বাতাস আগুনে, দূর থেকে পৃথিবীর মরীচিকা দেখে, সুরম্য নদীর মতো লাগবে ও লাগবে না— জ্বরে ডুবে, ভুলে, এই দেখব বসে আছ মাথার নিকটে, এই দেখব নাই। নভেম্বরে কসমিক ভ্রান্তি আসবে যাবে। লিখিলের বেদনায় নিচু হয়ে ভাবব বিরলে জল এক অ্যাটিচুড, শুধু এক ভঙ্গিমার নাম। যদিও তা নয়। মাথায় শীতল হাত শুধু এক নিখিলীয় মনোভাব নয়। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বহু বিহ্বল দর্পণে, বালুকণা বেঁচে থাকবে কৃতপ্রশ্ন জল বুকে নিয়ে। শীতের নিঃসীম রৌদ্রে তোয়ালে অসীম হয়ে যাবে। এই যা বাস্তব তা-ই পরের মুহূর্তে অবাস্তব মনে হবে। কেউ কেউ কোনোদিনও জানবে না জল হয়ে ওঠা। অথবা জানবে। জলের ভঙ্গিমা, নিঃসঙ্গ গানের মতো থেকে যাবে অযৌক্তিক গ্রামে। ক্রমশ সন্ধ্যার পথে বিপর্যস্ত আঁধার নামবে। অন্ধকারে নিজ ছায়া হারাবে প্রশাখা। নীরব পার্কের বেঞ্চে, লম্বা হয়ে শুয়ে সামিয়ানা খুঁজবে উদ্ভিদ। অখিল কুয়ার হাত ক্রমশ ডাকবে। দিন শেষে হোটেলের নিবুনিবু ঘরে— সব ঘরই অংশত হোটেল— জীবনের দ্বৈতবাদ খুঁজে, তার তৃষ্ণা দুই হাত পাতবে সম্মুখে, আরও বহুবার, আরও বহু নভেম্বরে।
বাইরে বাইরে
শুদ্ধতা, অশুদ্ধতা, সফলতা, বিফলতা এসবের অনেক বাইরে... বহু দূরে... বাইরে বাইরে শূন্যের ভিতরে বহু পাহাড় উড়ছে। শাদা ও সুন্দর থেকে অনেক তফাতে অসুন্দর, অন্ধকার, আলো ও জোছনা থেকে দূরে ঘাসের উপরে লাল কয়েল জ্বলছে। দিনে দিনে ঘুরন্ত বিপদে বাইরের হয়ে গেছ তুমি, বহু বহু বাইরের, আরো বাইরের... বাইরের, বাইরের... হয়ে গেছ। ঘরের ভিতরে শুয়ে চলে গেছ বাইরের দিকে বিস্ফোরিত হয়ে গেছে স্বাদ, সময়ের পরিমাপ দিনে দিনে সময়-হীনতা হয়ে গেছে। দেখছ সকল সত্য বহুমুখী ভ্রান্তির ছাই; মিথ্যাও তাই—বহুমুখী ভ্রান্তির ছাই; সত্য ও মিথ্যার বাইরে, ডিপ স্পেসে...হাঁটছ, ভাসছ।
সময়, বক ও প্রজাপতি
রূপান্তরহীন বক এক পায়ে বিলের ভিতরে স্থির আছে। বহুদিন মাছ ধরা নেই, মৃত্যু নেই। এক পায়ে খাড়া হয়ে থেকে থেকে ক্ষীণ হয়ে গেছে তার রূপ, তার শাদা বিমূর্ততা। তাকে দেখে মনে হয়, সত্য নয় স্থিতি। শাদা পাটখড়ি দিয়ে কেউ তাকে এঁকেছে বাতাসে। বিলের বিরামহীন ঘ্রাণ চারপাশে। নীল ঢেউ বেড়ে ওঠে, ছোট হয়, ফের বৈশাখে বেড়ে ওঠে। জীবন্ত জলের শব্দ তার কার্যালয়, মাছগুলি তাকে ভেবে ঘোরে। একদা চৈতন্য ছিল ডানার পিছনে, শাদা ইচ্ছা, পিঙ্গল-টেকসই সাধ, মাছের মাংসের ঝোঁক, সবই ছিল। এখন কিছুই নেই, স্থির থাকা ছাড়া। সময়ের মতো স্থির—রূপান্তরহীন—শাদা বক— নিজের ইচ্ছায়—অনিচ্ছায়—রূপান্তরিত, আর শাদা। জল বাড়ে কমে, মাছ আসে যায়, ঝড় হয়, থামে— সময়ের মতো বক সময়ের নিবিড় শুনানি হয়ে থাকে। হয়তো অনেক পরে সেও আর থাকবে না শাদা। তথাপি সে রূপান্তরহীনতার ধাঁধা বিলের ভিতরে। এক পায়ে স্থির যেন বক নয়, শত শত ভোর আর রাত। এক সাথে রূপান্তরহীন থাকা আর রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া, তার মধ্যে আছে, দেখা যায়। অন্যদিকে প্রজাপতি বহু সহজেই মরে যায়। ভোর বেলা দেখি আমি তাকে। পড়ে আছে কাঁচের দেয়াল ঘেঁষে কাঠের মেঝেতে, স্থির, ক্ষীণ। হয়তো সে মারা গেছে কাল রাতে। কিম্বা আজ ভোরে। তার শরীরের কঠিনতা, প্রশ্ন, প্রশ্নহীন সত্যের সাক্ষর। আমি তাকে হাতে তুলে নেই। দেখি কোথাও প্রাণের, অস্পষ্ট ঘুমের কোন চিহ্ন আছে কিনা। কিন্তু না, সে ইতিমধ্যে মরে গেছে। উবু হয়ে পড়ে আছে নিরুদ্বেগ দেহ। সব ট্রমা শেষ। পীড়ন বা প্রেম ছেড়ে গেছে। ডানার স্থিরতা কিম্বা শরীরের নড়বার অক্ষমতা জুড়ে অন্য চিহ্ন, কিম্বা থাকা, ধ্রুব হয়ে গেছে। হঠাৎ বাতাসে তার ক্ষীণ পাখা কাঁপে। পরে ডানা-দুটি অপ্রতিভ ভঙ্গিমায় স্থির হয়। বহু দূরে এক পায়ে খাড়া আছে বক। প্রজাপতি কাত হয়ে পড়ে আছে ডেস্কের উপরে। চুপ করে বাইরে তাকিয়ে আছি আমি। পথের উপরে পাতা হামাগুড়ি দেয়।
বাষ্পীভূত
বাষ্পীভূত জীবনের দিকে দিকে বসে আছি আমি। কোথাও বা ঘুমহীন। কোথাও বা ঘুমে। ভোরের স্বর্ণাভ রৌদ্র কাঁপে। ভোর থেকে কোনো স্থানে যেতে চায় মন। কোথাও দুপুরে, কোথাও বা বহু রাতে। কিন্তু কোথায় যে যাব? পরিস্থিতি দেখা দেয়— রাত, দিন স্পষ্ট আর থাকে না তেমন— ঘুম আর সজাগের সীমারেখা ধীরে মুছে গেছে। প্রত্যন্ত তারার মতো স্থান মনে পড়ে। মনে এই প্রশ্ন আসে, "তাহলে কোথায় যাব আমি? বিমর্ষতা কি কোথাও গেলে কিছু কমে?" আরও বহু প্রশ্ন আসে, প্রশ্নের মতোই ওরা আসে, তবু দেখি প্রশ্ন নয় ওরা। কোনো সমাধানও নয়। উন্মত্ত ভাবের মতো ওরা সব; ঘোরে, শুধু ঘোরে। 'কোথাও' কি স্থান এক তবে? 'কোথাও' কোথায় আছে, জানো তুমি? কোথায় সে স্থান? তুমি জানো? বিযুক্ত হয়েও কেউ সংযুক্ত রয়েছে, মনে হয়। অন্য এক বিমর্ষতা আসে। তাপমাত্রা এত বেশি বাড়ে কমে বাষ্পীভূত হয়ে পড়ি আমি। নিজের ভিতরে থাকি; ঘরে। কেউ চলে গেছে। তবু দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু… কিম্বা… বাষ্পীভূত শাদা বৃষ্টি পড়ছে বাইরে।
বিহঙ্গ
গভীর বিহঙ্গ আমি ধারণ করেছি— স্বপ্নে দুটি রাজহাঁস আদর করেছি কালরাতে। লম্বা গলা ভাজ করে ঘুমের ভিতরে জীবনের অহংকার, অভীষ্টপূরণ, রাজহাঁস... বসেছিল বাস্তবের মতো। আমার আঙ্গুল নেমে গিয়েছিল আলোর ভিতরে— কোনো পাপ, কোনো দাগ কাল রাতে ছিল না কোথাও— নিঝুম শরীর জুড়ে সমুদ্রের মতো ওরা জেগে উঠেছিল। পাখসাটে নেমে আসা নীরবতা শুনেছি সমস্ত রাত ধরে। আমার চৈতন্য থেকে রাজহাঁস এসেছিল নেমে, নিঃশব্দ শামুকগুলি খুটে খাবে বলে, ঘুমের অতল ঘোরে, আমার ভিতরে, এমন বাস্তব-ভাবে, স্বপ্ন তবু, স্বপ্ন ওরা ছিল না মোটেই। আমার ভিতর থেকে আমার ভিতরে ওরা এসেছিল ঘুরে। আমিও ওদের স্বপ্নে কাল রাতে গেছি উড়ে উড়ে। তুমি কি দেখছ কিছু, কোনো হাঁস, কিম্বা আমাকে, উড়ে যেতে? জানি তুমি দেখ নাই, তবু ভাবি দেখেছিলে কিনা। আমার ভিতরে হাঁস, তাই আমি এরকম ভাবি। অবিমিশ্র উন্মত্তের মতো আমি চেতনার রাজহাঁস বুকে নিয়ে চলি আর ভাবি। নিচু স্বপ্নে, অবিভ্রান্ত পাখিগুলি ডাকে। আমার ভিতরে হাঁস বসে থাকে শামুকের মতো নিচু হয়ে। কালরাতে রাজহাঁস এসেছিল পরিশ্রান্ত আমার ভিতরে। মুগ্ধ ওরা করেছে আমাকে। আমার মুগ্ধতা ওরা গ্রহণ করেছে ধীরে ধীরে। বহু কিছু ভুলে গেছি— বহু কিছু পেয়ে গেছি—ওদের ভিতরে। যা কিছু সঞ্চিত ছিল নিজের ভিতরে— সেসব পিছনে রেখে অন্ধকারে নেমে যেতে পেরেছি তখন। গভীর বিহঙ্গ আমি ধারণ করেছি কাল রাতে।