আমার বন্ধু রবীনের বউয়ের সঙ্গে রবীনের খুব ঝামেলা। আমরা বন্ধুরা কয়েক বছর যাবৎ যেকোনো সময় ওদের ডিভোর্স হয়ে যাবে ধরে নিয়ে জীবনের অন্যান্য কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে নিচ্ছিলাম। হঠাৎ একদিন ভোর সাড়ে পাঁচটার সময় রবীনের বউয়ের নাম্বার থেকে কল আসতে থাকলে প্রাথমিকভাবে আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। রবীনের বউ জানাল, রবীন তাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। সেও আর রবীনের ঘরে ফেরত যেতে চাচ্ছে না। ‘তাহলে কি যশোরে ফিরে যাবেন?’ পিতৃভিটার দিকে ইঙ্গিত করে আমি জানতে চাই। ‘সেটা কি হয়? কিভাবে বলেন এমন কথা!’ রিঅ্যাকশন দেখে অবাক হই। এছাড়া আর কী অপশন আছে আমার তা জানা নাই। ‘যাই হোক, আপনি কি আমার একটা উপকার করতে পারবেন?’ জিগ্যেস করে রবীনের বউ। আমি নিশ্চুপ থাকি, সে বলে, ‘আমাকে হাজার বিশেক টাকা ধার দিতে পারবেন?’ আমি নিরুৎসাহিত করে বললাম, ‘আরে ধুর, ঝামেলা মিটে যাবে। আপনি বাসায় যান তো। রবীনকে আপনি চেনেন, একটু পর নিজেই বের হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করবে।’ রবীনের বউ ক্ষেপে গিয়ে বলল, ‘আমি কি ওর মুরগির ছানা নাকি যে খুঁজতে বের হবে! আর কিভাবে ভাবলেন আমি ওর করুণার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকব!’ আমি একটু ঠান্ডা করতে চেয়ে বললাম, ‘আচ্ছা বাদ দেন না। ঝামেলা তো আগেও হইছে। মিটেও গেছে। একটু ধৈর্য ধরতে অসুবিধা কোথায়?’ ‘আর না, যথেষ্ট হইছে।’ কড়াভাবে জানায়। আর সোজাসুজি জানতে চায়, ‘হাজার বিশেক টাকা দিতে পারলে দেন, না পারলে নাই। দয়া করে উপদেশ দিয়েন না।’ ‘ঠিক আছে ঠিক আছে, আপনি শান্ত হন।’ ‘হাজার বিশেক টাকা নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে আসেন। আমি সাতটা চল্লিশের ট্রেনে চট্টগ্রাম যাব।’ ‘চট্টগ্রাম যাবেন কেন?’ ‘আশ্চর্য তো! এত কিছু জানতে চাচ্ছেন কেন?’ এবার আমি একটু রিঅ্যাক্ট করলাম যে, ‘শোনেন, আপনি যদি আমার প্রতি এত ক্ষিপ্ত হয়েই থাকেন তাহলে আমার কাছ থেকে টাকা ধার করা আপনার উচিত না।’ এ কথায় রবীনের বউ শান্ত হয়। ‘সরি’ বলে। এবং দ্রুত একটা সিএনজি নিয়ে আমাকে কমলাপুর চলে যেতে বলে। লাইন কেটে রবীনকে কল দিয়ে ওর ফোন বন্ধ পেলাম। সারা ঘর খুঁজে মোটে পাঁচ হাজারের কিছু বেশি টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু টাকাটা আমার দেওয়া উচিত হচ্ছে কিনা বুঝতে পারি না। আরো কয়েকবার চেষ্টা করেও রবীনের নাম্বার বন্ধ পাই। এমন সময় সুতপা এসএমএস দিয়ে জানাল ওদের ক্লাস ক্যানসেল হয়েছে। বন্ধুরা মিলে সী বিচে যাচ্ছে সাঁতার কাটতে। আমি জানতে চাইলাম, ‘সাঁতারের ড্রেস কি কলেজেই ছিল?’ নাকি ক্লাস ক্যানসেল হতে পারে ভেবে সবাই প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিল। বিশেষভাবে জানতে চাই, ‘স্টুয়ার্ট সঙ্গে আছে কি?’ ‘তোমার খালি খালি বাজে বাজে সন্দেহ’ লিখে সে রিপ্লাই পাঠায়।
‘লুইচ্চা লোক, তুই আজকে রবীনের বউকে কী করবি? আমিও স্টুয়ার্টকে তা করব।’
উচ্চ শিক্ষার্থে অস্ট্রেলিয়া চলে যাওয়ার পর থেকে তাকে নিয়ে নানা ধরনের সন্দেহ ও অবিশ্বাস আমার মধ্যে তৈরি হয়েছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নাই। সুতপার ফেসবুকে আগেও একবার সমুদ্র স্নানের ভিডিও পাওয়া গেছিল। আপলোডার ছিল এই স্টুয়ার্ট, সুতপাকে ট্যাগ করা হয়েছিল সেই ভিডিওতে। ভিডিওটা আমি দেখতে দেখতেই হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। ‘কনটেন্ট নট এভয়লেবল’ লেখা ভাসল। পরে দেখি ভিডিওটা আর নাই। ভিডিওটা আমি যে পর্যন্ত দেখি তাতে স্টুয়ার্ট সুতপাকে পেছন দিক থেকে আলগে তুলে ওদেরই কারো বানানো একটা বালির তৈরি টিলায় আছড়ে ফেলে। সুতপা পরে এমন কোনো ভিডিওর অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই না জানার ভান করে। ‘মিথ্যা বলো না সুতপা, ভিডিওটা তুমি ওকে বলে ডিলেট করাইছো।’ ‘আসলে ছোট লোকের মনে শুধু ছোট ছোট চিন্তা’ সুতপা আমাকে শাসায়। আমি ফিরতি এসএমএস পাঠাই, ‘রবীনের বউ বাসা থেকে বের হয়ে গেছে। আমার কাছে বিশ হাজার টাকা ধার চাইতেছে।’ সে রিপ্লাই পাঠায়, ‘বের হয়ে গেছে মানে? খবরদার কোনো টাকা ধার দিবা না।’ আমি লিখলাম, ‘টাকা নিয়ে কমলাপুর স্টেশনে যাচ্ছি। অবলা নারী, বিপদে পড়তে পারে।’ ধারণা করি, রেগে গিয়ে কল দিয়ে বসে সুতপা। আমি ধরার সাহস পাই না। এসএমএস পাঠায়, ‘লুইচ্চা লোক, তুই আজকে রবীনের বউকে কী করবি? আমিও স্টুয়ার্টকে তা করব।’ এই এসএমএস পেয়ে আমি অসাড় হয়ে গেলাম। রিপ্লাইয়ে পাঠালাম, ‘ওইখানে যেও নাকো তুমি..’ সে ছোটলোকের মতো লিখে পাঠাল, ‘স্টুয়ার্টেরটা তোমারটার চাইতে ভালোই হবে।’ আমি রেগে গিয়ে রবীনের বউকে কল দিয়ে জানতে চাইলাম কমলাপুর যাওয়ার প্ল্যান ঠিক আছে নাকি ইতোমধ্যেই ঘরের মুরগি ঘরে ফিরে গেছে। রবীনের বউ শান্ত কণ্ঠে জানাল ‘ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’ আমি জানতে চাইলাম, ‘আপনি তাহলে এখন কোথায়?’ ‘পান্থপথ ক্রস করছি।’ আমি বললাম, ‘বেশ, মগবাজার দিয়ে আসেন, মোড় থেকে আমাকে পিক করেন।’ ‘আপনি কি টাকাটা ম্যানেজ করতে পারলেন?’ দুম করে মূল প্রসঙ্গে চলে আসে। ‘কিছুটা। ঘরে পাঁচ হাজারের মতো টাকা পাওয়া গেল’, বলি। ‘আপনার এটিএম কার্ড নাই? পরে টাকা তুলে দিতে পারবেন না?’ ‘হ্যাঁ পারব’ বললে তখনই সে, শোনা গেল সিএনজি ড্রাইভারকে বলছে, ‘সোজা যান, মগবাজার দিয়ে।’ মগবাজার মোড়ে এসে রবীনের বউকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। আমি ফ্রেশ হয়ে জামা কাপড় বদলে বের হতে হতে ভোরের আলো পরিষ্কার হয়ে গেছে। ‘সরি, একটু দেরি হয়ে গেল’ বলে সিএনজিতে ঢুকে পড়ে রবীনের বউয়ের পাশে বসে ড্রাইভারকে দ্রুত চলতে নির্দেশ দেই। ‘আমি সরি। নিরুপায় হয়ে ধার করতে হচ্ছে।’ ‘ব্যাপার না’ আমি অভয় দিয়ে বলি, ‘এক বছরের মধ্যে শোধ করে দিয়েন।’ ‘অনেক ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞ হয়ে গেলাম।’ আমি ভদ্রতা এড়িয়ে সিদ্ধান্তটা চূড়ান্ত কিনা জানতে চাইলাম। ‘একশ ভাগ,’ দৃঢ়তার সঙ্গে জানাল। ‘একদিক থেকে খারাপ না,’ আমি বলি, ‘মিলমিশ যদি না-ই হয় কোনোভাবে, একত্রে থেকে লাভ কী?’ ‘আপনাদের কী অবস্থা?’ সুতপা ও আমার সম্পর্কের প্রতি ইঙ্গিত করে জানতে চায়। এবং যোগ করে, ‘দেখলাম বিকিনি পরে সমুদ্রে নামা হচ্ছে খুব।’ ‘কী!’ একটু থমকে যাই। ‘কই দেখলেন?’ ‘এই যে দেখেন’ বলে মোবাইলে ফেসবুক খুলে দেখায় সে। বিকিনি না। লাল রঙের একটা সাঁতারের পোশাক। ‘হুম, সুখেই আছে মনে হয়,’ আমি বললাম। ‘কিন্তু এসব স্বল্প পোশাক-আশাকের ছবি দেখলে ছেলেটা তো কষ্ট পাবে।’ আমি এই কথার কোনো উত্তর না দিয়ে সুতপাকে এসএমএস পাঠাই, ‘সী বিচেই কিছু করোও যদি ছবি তুলে পোস্ট দিও না।’ ‘কই দেখলা? নতুন ফেইক আইডি খুলছ?’ যেহেতু মূল আইডিতে আমাকে ব্লক করে রাখছে, সেই প্রেক্ষিতে রিপ্লাইয়ে সে বলে। পরপরই আরেকটা এসএমএসে সংশোধনের ভিত্তিতে লিখে পাঠায়, ‘ওহ! তুমি তো এখন ওই মাগিটার সাথে, ভুলেই গেছিলাম। দাঁড়াও ওরেও ব্লক করতেছি।’ আমি লিখলাম, ‘রবীনের বউয়ের পাশাপাশি তোমার বাপ ভাইদের আইডিও ব্লক করো। ছেলেটা ওইখানে আছে।’ সে লিখল, ‘চোরের মায়ের বড় গলা। ছেলেটাকে যখন একটা বেলার জন্য রাখতে পারতা না, সেটা খুব যোগ্য বাপের আচরণ ছিল?’ এই এক প্রসঙ্গ ধরে সুতপার সঙ্গে আমার দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। ছেলেকে সে একাই লালন পালন করেছে। মানি তার অবদানই বেশি, কিন্তু আমি কি কিছুই করি নাই? খেলি নাই ছেলেটার সাথে? দুয়েকটা কথা, যেমন কেউ 'গুড বাই' বললে জবাবে 'সি ইউ সুন' বলতে তো ওকে আমিই শিখাই। তারপর সুতপার মনে হলো আত্মনির্ভরশীল হওয়া দরকার। উচ্চ শিক্ষার্থে অস্ট্রেলিয়া চলে গিয়ে আমাকে দেখিয়ে দেয় মেয়েরাও পারে। ছেলেটা ওর নানির বাড়িতে থাকে। আমি মগবাজারে বাসা ভাড়া নিয়েছি এক বছর হলো। রিপ্লাই দিলাম, ‘একই বাজনা আর কত বাজাবা? দয়া করে ডিভোর্সটা দিলে বেঁচে যাই।’ সে লিখল, শীঘ্রই দেবে। শীতকালে দেশে ফিরে। এবং বলল, চাইলে আমিও দিতে পারি। আমি আবার কিছু লিখতে নিতেই সিএনজি কমলাপুর স্টেশনের সামনে পৌঁছে গেল। রবীনের বউ ব্যাগ থেকে বের করে ভাড়া দিল। বলল, ‘আমি টিকেট নেওয়ার চেষ্টা করছি। আপনি কি দেখবেন টাকাটা তুলতে পারেন কিনা?’ আমি পকেট থেকে বের করে পাঁচ হাজার টাকা ওকে দিয়ে বললাম, ‘এটা নিয়েই রওনা হন। একটা নাম্বার দিয়েন। বাকি টাকাটা পরে বিকাশ করে দিব।’ কিন্তু এই প্রস্তাবে রবীনের বউ এই পাঁচ হাজার টাকাই নেবে কিনা, ইতস্তত করে। ‘আমার আসলে পুরা টাকাটা দরকার।’ ‘পাঠিয়ে দিব বললাম তো। আসলে এটিএম কার্ডটা হারাইছে। এখনো তোলা হয় নাই।’ অবিশ্বাসী চোখে রবীনের বউ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। এবং এক পর্যায়ে পুরো টাকাটা সে অন্য কোনোভাবে ম্যানেজ করবে বলে এই টাকাটা নিতে অস্বীকৃতি জানাল। ‘থ্যাঙ্কস, আপনি এই পর্যন্ত আসলেন, তার জন্য।’ ‘সেটা ঠিক আছে, কিন্তু আমার সীমাবদ্ধতাটা বুঝবেন না? আসলেই আমার কার্ড হারাইছে,’ বলে মানিব্যাগ থেকে একাউন্ট পে চেক বের করে দেখালাম, ‘ব্যাংক খুললে এটা দিয়ে টাকা তোলা যাবে। কিন্তু ব্যাংক খুলতে তো সময় লাগবে।’ ‘তাহলে কি পরের কোনো ট্রেনে যাব?’ জিগ্যেস করে রবীনের বউ। আমি বলি, ‘সেটা হতে পারে। ব্যাংক খোলার পরের কোনো ট্রেনে গেলে পুরা টাকাটাই দিতে পারব।’ ‘আসলে চট্টগ্রামে কিভাবে কয়দিন থাকতে হয় জানি না। আমার এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছি, ওর গানের স্কুলে একটা চাকরি হওয়ার কথা।’ টাকার প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে আমার কাছে মুখ খোলে। প্রসঙ্গ পাল্টে জানতে চায়, ‘আপনি রবীনকে কল দেন নাই তো আবার?’ আমি সত্যটাই বলি, ‘দিয়েছিলাম, ফোন বন্ধ বলছে।’ ‘কেন ফোন দিলেন ওকে!’ ক্ষেপে যায় রবীনের বউ। ‘আহা বোঝেন না কেন, ও-ই তো আমার বন্ধু, এটা তো আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।’ ‘ফোন ধরলে কী বলতেন? তোর বউ আমার কাছে টাকা ধার চাইতেছে?’ ‘আরে না না, আমি ঝামেলা মিটিয়ে ফেলতে বলতাম।’ আমাকে আগ বাড়িয়ে এমন সব দায়িত্ব নিতে নিষেধ করে সে বলে, ‘আজকের সব কিছুই যেন গোপন থাকে প্লিজ।’ ‘কিন্তু পরে আপনিও তো বলে দিতে পারেন। যখন আপনাদের মধ্যে সব আবার ঠিক হয়ে যাবে।’ ‘হা হা, সেরকম কোনো সম্ভাবনাই নেই।’ অট্টহাসিসহ আমাকে কনফার্ম করে রবীনের বউ। বিকালের ট্রেনের টিকেট কিনে রবীনের বউসহ স্টেশনের দ্বিতীয় তলায় বিরতি রেস্টুরেন্টে নাস্তা করতে বসি। ‘এখন কয়টা বাজে?’ জিগ্যেস করে নিজেই মোবাইল ফোন বের করে বলল, ‘সাতটা দশ।’ আমি বললাম, ‘ব্যাংক খুলতে এখনো অনেক দেরি। তাছাড়া আপনার ট্রেন তো আরো পরে, বিকালে।’ ‘হুঁম’ বলে অন্যমনস্কভাবে আরেক দিকে তাকিয়ে থাকে। ‘এতক্ষণ স্টেশনে থাকবেন? কোথাও গিয়ে রেস্ট নিলে হয় না?’ ‘কোথায় যাব?’ ‘আপনার বন্ধুবান্ধব কেউ নাই যে গোপনীয়তা রক্ষা করে আপনাকে কিছুক্ষণ থাকতে দেবে?’ ‘সেরকম কোথাও যেতে চাচ্ছি না। বাইরেই থাকব। অসুবিধা নাই।’ আমি প্রস্তাব দিই, ‘আপনি আমার বাসায় গিয়ে রেস্ট নিতে পারেন। বাসার সামনে থেকে চাবি দিয়ে দিলাম।’ ‘বাসার সামনে থেকে চাবি দিয়ে দিলেন মানে?’ ‘মানে..’ যদিও রবীনের বউয়ের অস্বস্তির কথা চিন্তা করেই এমনভাবে বলেছিলাম, কিন্তু এখন কারণ দর্শাতে গিয়ে বিষয়টাকে কিভাবে বর্ণনা করব বুঝতে পারলাম না, ‘মানে আমি থাকলে তো আপনি হয়তো অস্বস্তি বোধ করবেন। আপনাকে চাবি দিয়ে দিলে আপনি উঠে রেস্ট নিলেন। আমি এই সময়টা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে, অফিস থেকে একটু ঢুঁ মেরে আসতে পারি।’ ‘ও আচ্ছা, ঠিক আছে। হতে পারে সমস্যা নাই,’ রবীনের বউ বলে, ‘কিন্তু ব্যাংক তো আর দেড় ঘণ্টা পরেই খুলবে। টাকাটা তুলে নিয়ে বাসায় গেলে হয় না?’ মনে হলো টাকার ব্যাপারে রবীনের বউয়ের দুশ্চিন্তা এখনো দূর হয় নাই। ‘ঠিক আছে সেটা হতে পারে।’ বলে, প্রস্তাব করি, ‘তাহলে চলেন শহরতলী স্টেশন থেকে ঘুরে আসি।’ ‘সেটা কোথায়?’ ‘কমলাপুর স্টেশনের সঙ্গেই, এই স্টেশন থেকে শুধু নারায়ণগঞ্জের ট্রেন ছাড়ে।’ শহরতলী স্টেশনে থেমে থাকা ইঞ্জিনবিহীন একটা ফাঁকা বগির ভিতরে ঢুকি আমরা। জানালা থেকে অর্ডার দিয়ে ফ্লাস্কে বেচা চা খাই। রবীনের বউ বলে, ‘রবীনের সঙ্গে কিন্তু আমার প্রেম করে বিয়ে।’ ফ্রেন্ড সার্কেলে শেষের দিকে যুক্ত হওয়া মেম্বার হিশেবে তথ্যটা আমার নাও জানা থাকতে পারে ভেবেই হয়তো বলে। কিন্তু আমি জানতাম, প্রত্যেকের কাছ থেকেই অসংখ্যবার শুনেছি। বিশেষ করে বর্তমান এই ঝগড়াঝাঁটি যুগের বিপরীতে অতীতে এককালে তাদের মধুর মেলামেশাগুলো তুলনা হিশেবে সহজেই আর বারবার সামনে চলে আসত। ‘তা তো আমি জানিই।’ বললাম। ‘হুম, সবাই জানে। জানানোটাই একটা ব্যবসা,’ রবীনের বউ বলে। ‘মানে?’ বুুঝতে না পেরে সরল অভিব্যক্তিতে জানতে চাই। ‘এই লাভ স্টোরি বেচে চাকরি পেল, প্রমোশন পেল। নিজের প্রতিষ্ঠান দাঁড় করালো’, বলতে থাকে, ‘কিন্তু আমি পুরনো হয়ে গেলাম,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘একদিন অবশেষে,’ শেষ করে কথাটা। ‘কেন আর কিভাবেই-বা?’ আমি জানতে চাই। ‘পুরুষ মানুুষের এই ন্যাকামিগুলো কেন বলুন তো! আমি সিওর সুতপাকেও আপনি পুরনো ভাবেন।’ আমি বিস্ময়ে অভিভূত হবার ভঙ্গি করি। ‘সুতরাং কিভাবে আমি রবীনের কাছে পুরনো হয়ে গেলাম সেটা জানতে চাওয়া আপনার মানায় না।’ ক্ষেপে গিয়ে আমার মনে হয়, সারারাত না ঘুমিয়ে ভোর থেকে শুরু এই পাগলামির ইতি টানা দরকার। ‘দেখুন, আমার মনে হয় আপনি এমন সব কথা বলছেন যেগুলো আপনার বলার কথা না।’ রেগে গিয়ে আগের প্রসঙ্গও টেনে আনি, ‘সিএনজিতে আপনি সুতপার বিকিনি পরে সমুদ্রে নামার খবর দিছেন কেন আমাকে? এটা তো আপনার কাজ না।’ শুনে রবীনের বউ মুচকি মুচকি হেসে চায়ে চুমুক দেয়। বলে, ‘যখনকার রিঅ্যাকশন তখন না দেখাইলে পরে আর হয় না।’ উঠে দাঁড়িয়েও হতাশ হয়ে বসে পড়ি আবার। ‘কী চান আপনি? এসব কেন বলছেন? সুতপা আর আমাকে জড়িয়ে বাজে মন্তব্য করার সাহস আপনি কই পান?’ সোজাসাপ্টাভাবে জানতে চাই। ‘আরে বসুন বসুন।’ বলে আমার হাত টেনে ধরে রবীনের বউ, ‘এখানে বসুন’ পাশে বসার ইঙ্গিত করে বলে। ‘না ঠিক আছি।’ বলে আমি মুখোমুখি আগের সিটটাতেই বসে থাকলাম। শহরতলী স্টেশনের অন্য লাইনগুলোতে একটা বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিন একা ঘোরাফেরা করছিল। সেটার দিকে ইঙ্গিত করে রবীনের বউ বলে, ‘বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিনে চড়ছেন কখনো?’ ‘হ্যাঁ, চড়ছি।’ আমি বলি। ‘কোথায়?’ ‘পাহাড়তলী লোকোশেডে। আমার এক স্কুলফ্রেন্ড ট্রেনের ড্রাইভার।’ ‘বাহ!’ খুশি হয় রবীনের বউ, ‘আমিও চড়ছি, এটা আমার আর আপনার একটা অদ্ভুত মিল’, দাবি করে সে। ‘তাই নাকি? অদ্ভুত হবে কেন। আপনি কোথায় চড়ছেন?’ জানতে চাই। ‘ঈশ্বরদী জংশনে।’ বলে স্মৃতির দিকে চেয়ে থাকার ভঙ্গি করে চোখ দুটোকে ঝাপসা করে ফেলে প্রায়, ‘জানেন, আমার একটা রেলে কাটা-পড়া প্রেমিক ছিল।’ ‘বলেন কী! প্রেম তো কাটা পড়ার আগেই ছিল, নাকি?’ প্রাসঙ্গিকভাবেই আমি জিগ্যেস করি। ‘ধুর, কী সব আজব আজব কথা!’ বলে সামনের সিটে আড়াআড়িভাবে পা মেলে দেয়। ‘তো, পুরনো হয়ে গেলে তখন কী করতে হয় জানেন?’ প্রশ্ন করে রবীনের বউ। প্রসঙ্গের এই বাঁক বদলে মানিয়ে নিতে নিতে বলি, ‘কই! না তো, জানি না।’ ‘নবায়ন করতে হয়’, নাটকীয় ভঙ্গিতে বলার চেষ্টা করে সে। ‘তাই নাকি, কিভাবে সেটা?’ আমি সত্যিকারের আগ্রহ নিয়ে জানতে চাই। যদিও সেটা সুতপা আমার কাছে পুরনো হয়ে গেছে বলে নয়, বরং আমিই তার কাছে পুরনো হয়ে গেছি কিনা আর সেক্ষেত্রে নবায়ন করার পদ্ধতিটা ঠিক কী, জানা দরকার ভেবেই। কিন্তু আবারও মনোভাব বদল করে রবীনের বউ বলে ‘বাদ দেন এসব ফালতু প্রসঙ্গ। বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিনের কথাই শোনেন।’ ‘বলেন,’ আমিও মেনে নিয়ে বলি। ‘সালমাকে চিনতেন?’ জিগ্যেস করে রবীনের বউ। ‘কোন সালমা?’ ‘ওই যে বাংলাদেশের একমাত্র নারী ট্রেন ড্রাইভার।’ ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তাকে নিয়ে তো প্রায়ই পত্রিকাগুলোয় ফিচার বেরোয়।’ ‘ঠিক ধরছেন। সালমার একটা ছবি ছিল একটা বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিনে সে একা একা উঠতেছে।’ ‘কোথায় ছিল?’ ‘আরে! মানে বুঝলেন না, ফিচার ছাপা হলো, সেখানে ছবি ছিল।’ ‘আচ্ছা হ্যাঁ।’ ‘আমি ওই রকমভাবে একটা বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিনে উঠতে চাইতাম। এ কারণে প্ল্যান করে এক তরুণ ট্রেন ড্রাইভারের সঙ্গে প্রেম করলাম কিছুদিন।’ ‘বলেন কী! বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিনে উঠতে চেয়ে প্রেম!’ ‘হা হা ভালো বলছেন’, প্রাপ্য প্রশংসাটুকু বুঝিয়ে দিয়ে রবীনের বউ বলতে থাকে, ‘তারপর একদিন ওর সাথে ঈশ্বরদী জংশনে একটা বিচ্ছন্ন ইঞ্জিনে উঠি প্রথমবার।’ ‘বাহ! তারপর?’ ‘তারপর খুব রোমান্টিক দৃশ্য। ঈশ্বরদী জংশনে ঘোরাফেরারত একটা বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিনের ভিতর তরুণ ট্রেন ড্রাইভারের সঙ্গে চুমাচুমি বলতে পারেন।’ ‘খুব মজার ব্যাপার।’ আমি উৎসাহ দিই, আর যৎসামান্য ফিল্মসেন্স থেকে বলি, ‘এই দৃশ্য যদি সিনেমায় ব্যবহার করা যায় খুব হিট হবে।’ ‘আর নবায়নের ব্যাপারটা হলো, রবীন যখন আমার প্রতি আর কোনো আকর্ষণ ফিল করতেছে না, ওর মাথায় বুদ্ধি আসলো আমি যদি অন্য কারো সঙ্গে প্রেম করি, তাহলে হয়তো আকর্ষণ ফিরে আসতে পারে।’ হঠাৎ ইউটার্ন নিয়ে প্রসঙ্গ আবার এইদিকে চলে আসবে ভাবতে পারি নাই। প্রস্তুত হয়েই বসতে হলো। ‘করলাম প্রেম। একাধিক স্পট থেকে অন্তরঙ্গ বিভিন্ন মুহূর্তে আমাকে সে উদ্ধার করে নিয়ে গেল।’ ‘মানে?’ সত্যিই কিছু বুঝতে না পেরে জানতে চাইলাম। ‘মানে হলো জেলাসি দিয়ে আকর্ষণ ফেরানোর চেষ্টা। হা হা..’ উচ্চস্বরে হাসতে থাকে রবীনের বউ। ‘প্রথমে নুসরাতের হোম-টিচারের সাথে প্রেম করতে হলো,’ বলে যায় সে, ‘রবীন বুঝতে পারল একসময়, কিছু একটা চলছে আমাদের মধ্যে।’ ‘তারপর?’ আমি দমবন্ধ করে কান খাড়া করে রাখি। ‘তারপর নুসরাত বাসায় ছিল না। হোম-টিচার বাসায় আসবে। আমি ফোন করে রবীনকে জানিয়ে দিই। সময় মতো রবীন এসে আমাদের হাতেনাতে ধরে ফেলে।’ আমি হা হয়ে যাই। ‘বলেন কী! এর সবই ইচ্ছাকৃত?’ ‘হ্যাঁ তবে আর বলছি কী!’ ‘ওকে ওকে..’ আমি থিতু হই। ‘হোম-টিচারকে কানে ধরে ওঠবস করানো হলো। বহিষ্কার করা হলো।’ ‘বহিষ্কার করা হলো?’ ‘হ্যাঁ!’ ‘আর আপনাকে?’ ‘আমার প্রতি তো খুবই ক্ষেপে গেল। বলল, ‘তুমি সত্যি সত্যি চুমু খাচ্ছিলে কেন!’ ‘গ্রেট’, আমি বললাম, ‘আপনি সত্যি সত্যিই চুমু খাচ্ছিলেন?’ ‘হ্যাঁ, আমি কী করব, আমার তো হোম-টিচারকে ভালো লেগে গেছিল।’ ‘তারপর আকর্ষণ ফিরল রবীনের?’ চোখ টিপে বলল, ‘শুধু আকর্ষণ? অবসেসড হয়ে গেল পুরা। সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখল। হোম-টিচারের সঙ্গে সত্যিই রিলেশন হয়ে গেছে সন্দেহে অনেক কান্নাকাটিও করল।’ ‘তখন কি আপনি সুখী ছিলেন?’ আমি জানতে চাইলাম। ‘একদম না।’ ক্ষিপ্তভাবে বলে সে। ‘আমার বরং হোম-টিচারের জন্য মন কেমন করত। গোপনে যোগাযোগ করতাম।’ ‘হায় হায় বলেন কী!’ ঘাবড়ে গিয়ে আমি বলি। ‘হ্যাঁ, একদিন সত্যিই আমরা মিলিত হলাম। রবীন কিছুই জানতে পারল না।’ ‘এটা তো প্রতারণা।’ নিস্তেজ হয়ে আমি বললাম। ‘হুম, এটা শাস্তিও, রবীনের পাওনা ছিল।’ ‘হোম-টিচারের সঙ্গে সম্পর্ক কতদূর গড়ালো?’ ‘ওইটা শেষ করে দিছিলাম অল্প কয়দিনে।’ আমি বললাম ‘এটা তো বেশ রোমহর্ষক গল্প বলা যায়।’, জানতে চাইলাম, ‘রবীন কখনো জানে নাই হোম-টিচারের সঙ্গে পরেও দেখা করছেন?’ ‘না, তারপর অনেকদিন পার হলো। আবারও আকর্ষণ কমতে থাকল...’ এমন সময় আবারও সুতপার কল আসলে আমি ‘সরি’ বলে ফোন রিসিভ করে প্লাটফর্মে নেমে আসলাম। শান্ত কণ্ঠে সুতপা জানতে চাইল, ‘কোথায় তুমি?’ আমি বললাম, ‘অফিসের নিচে, চা খাইতে আসছি।’ ‘রবীনের বউ কই?’ মিথ্যা বললাম যে, ‘পরে সিদ্ধান্ত হলো টাকাটা ওকে বিকাশ করে দিব।’ ‘ওহ, অবলা নারীকে সরাসরি সাহায্য করার সুযোগটা তাহলে মিস হয়ে গেল?’ ‘তা গেল।’ ‘আহারে, কেন গেল। অবলা নারীটিই ক্যানসেল করেছিল বুঝি?’ আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ‘ধরো তাই’ বলে অন্য প্রসঙ্গে যেতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু খপ করে সে ধরে বসল যে, ‘শুয়োরের বাচ্চা মিরপুর ১ নাম্বারে ট্রেনের হুইসেল আসলো ক্যামনে?’ আমি এর জবাবে কী বলা যায় ভেবে না পেয়ে ফোন কেটে দিয়ে সুইচ অফ করে দিলাম। ট্রেনে ফিরে না গিয়ে রবীনের বউকে নামতে বললাম।
‘তার মানে আমার প্রতি আপনার কোনো ইন্টারেস্টই নাই?’ রাগ করার ভঙ্গিতে ঠোঁট বাঁকায় রবীনের বউ।
রবীনের বউ নেমে আসতে গিয়ে ট্রেনের দরজায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে একটা পা এগিয়ে দিয়ে শাড়ির কুঁচি ঠিক করে দিতে বললে অপ্রস্তুত হয়ে যাওয়া ছাড়া আমার আর কিছুই করার থাকে না। এগিয়ে দেওয়া শূন্যে ভাসমান পায়ের বরাবর শাড়িতে কয়েকটা ভেঙে যাওয়া কুঁচি দেখে আমি বেকুবের মতো বলে বসলাম, ‘পা মেলে বসছিলেন তো, সেজন্য ভেঙে গেছে।’ ‘দেন না একটু ঠিক করে।’ ছিনালের মতো আবদার করে সে, আর আমি নিজেরই নীতি-নৈতিকতার দোহাইসহ নিজের সঙ্গেই এক ধরনের ফাইটে অবতীর্ণ হই। অভয় দেয় রবীনের বউ, ‘পায়ে স্পর্শ দিতে বলি নাই তো। শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে বলছি।’ ‘ওহ হ্যাঁ হ্যাঁ’ বলে আমি যতটা সম্ভব ভেঙে যাওয়া কুঁচিগুলোকে আবারও মচমচে করে তোলার চেষ্টা চালালাম। প্লাটফর্মে নেমে নারায়ণগঞ্জ অভিমুখে হাঁটতে শুরু করলে আমিও রবীনের বউয়ের পিছু পিছু হাঁটতে থাকলাম। ‘বউয়ের ঝাড়ি খাইছেন?’ জিগ্যেস করে রবীনের বউ। ‘না মানে হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে একত্রে থাকাটা পছন্দ করতেছে না। অথচ দেখেন নিজে ঠিকই স্টুয়ার্টের সঙ্গে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে।’ অভিযোগ দায়েরের ভঙ্গিতে বলি। জবাবে রবীনের বউ কিছুই না বলে হাঁটতে হাঁটতে প্লাটফর্মের শেষ প্রান্তে চলে আসলে, বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিনটাও পাশের রেললাইনে এসে দাঁড়ায়। ‘ইঞ্জিনে উঠা যাবে?’ বয়স্ক ড্রাইভারকে জিগ্যেস করে রবীনের বউ। ড্রাইভার ইঞ্জিনের দুপাশে থাকা রেলিং দেওয়া বারান্দা মতো জায়গায় উঠে দাঁড়াতে নির্দেশ দেয়। ‘আসুন।’ বলে হুট করে আমাকে টেনে নিয়ে ইঞ্জিনে উঠতে শুরু করলে আমি বললাম, ‘আরে থামুন কী করছেন?’ কিন্তু ‘উঠুন না, বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিনে ওঠা তো আর নতুন কিছু না আপনার জন্য।’ বলে আবারও অনুরোধ করলে আমিও ইঞ্জিনে উঠার হাতল দুটোয় হাত রাখলাম। আর কোমরে ধরে শেষ স্টেপে হেল্প করতে হলো রবীনের বউকে। ক্লিয়ারেন্স পেয়ে আবারও স্টেশনের দিকে ঢুকতে শুরু করে বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিনটা। এবার ডান দিকের লাইন ধরে এগিয়ে যায়। অভ্যস্ত পায়ে রবীনের বউ আমাকে টেনে নিয়ে যায় ইঞ্জিনের সামনের অংশে। সেখানেও যে দাঁড়াবার মতো জায়গা আছে সেটা আমারও অজানা না। আমরা দুজনেই পায়ের তলায় ইঞ্জিনের ঘর্ঘর আর কাঁপতে থাকা রেলিংয়ে হাত রেখে কান দুটোকে যেকোনো সময় চেপে ধরতে পারার মতো একটা সুবিধাজনক ভঙ্গিতে ঠেঁস দিয়ে দাঁড়াই। হুইসেল দিতেই কান চেপে ধরি। কখনো আমার কখনো রবীনের বউয়ের, হুইসেলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কান চেপে ধরতে দেরি হয়ে যায়। তখন আমরা ‘পম’ খাই। একটা করে ‘পম’ খেতে খেতে বধির হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। রবীনের বউ চিৎকার করে বলে, ‘আরে এটা তো কমলাপুর!’ আমিও চিৎকার করে বলি, ‘হ্যাঁ, বলেছিলাম না পিঠাপিঠি দুই স্টেশন।’ ‘হ্যাঁ বলেছিলেন! মনে আছে,’ রবীনের বউ চিৎকার করার সুখেই যেন চিৎকার করে চলে। বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিনটা কমলাপুর স্টেশন পার হয়ে খিলগাঁও রেলগেটের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ‘আসেন খিলগাঁও রেলগেটে নেমে যাই।’ আমি বলি। আর ইঞ্জিনটাও থামে। বয়স্ক ড্রাইভারকে ইশারা দিয়ে আমরা নামতে থাকি। দুজন দুদিক থেকে নামায় ডবল চেম্বারের টি ব্যাগের মতো দুপাশ থেকে আমরা সৌরভ ছড়াতে থাকি। খিলগাঁও রেলগেটে নিত্যদিনকার মতো ভিড় হট্টোগোল লেগেই আছে। ‘খুব অসহ্য লাগত এই হট্টোগোল।’ আমি বলি। বাকিটা বুঝে ফেলে রবীনের বউ বলে, ‘খিলগাঁওয়ে ছিলেন কখনো?’ ‘হ্যাঁ থাকতাম তো, ১১ নাম্বার রোডে একটা বিল্ডিংয়ের চিলেকোঠায়।’ ‘ব্যাচেলর অবস্থায়?’ ‘হ্যাঁ, আমার মাঝেমাঝে আবারও খিলগাঁও এলাকায় এসে থাকতে ইচ্ছা করে।’ ‘সেটা কি ব্যাচেলর লাইফই ভালো ছিল এমন কোনো দার্শনিক জায়গা থেকে?’ ‘হা হা, আপনি এত চালাক বা বুদ্ধিমান তা আগে বুঝি নাই তো!’ বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতে প্রশংসা করি। ‘আগে বুঝবেন ক্যামনে? “রবীনের বউ”—এর বাইরে স্বতন্ত্র কোনো পরিচয়ের জায়গা কি রাখেন আপনারা?’ একটু বিরক্ত ভঙ্গিতে বলার চেষ্টা করি, ‘এই নারীবাদী টোনটা বাদ দেওয়া যায় না? “আপনারা” বলে পুরা পুরুষ জাতিকে এক সুতায় গেঁথে ফেলার এই চেষ্টাটা কেন?’ একটা অখ্যাত মিষ্টির দোকান পার হতে হতে আমার দিকে ভালো করে ঘুরে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, ‘আপনি নিজেকে ব্যতিক্রম বলতে চান?’ ‘আমি আসলে বন্ধুদের বউদের সঙ্গে বন্ধুদের নির্ধারণ করা রক্ষণশীলতা মেনে চলি।’ ‘এবং আপনার বউয়ের নির্ধারণকৃত সীমানাও নিশ্চয়ই ডিঙান না?’ দুষ্টু ভঙ্গিতে প্রশ্ন করে হাসতে থাকে। ‘আমার বউ আমাকে খারাপ চরিত্রের লোক মনে করে। তার ধারণা আমি ছোকছোক করি।’ ‘ছোকছোক ক্যামনে করে?’ সিরিয়াস ভঙ্গিতে জানতে চায় রবীনের বউ, আবার দুষ্টুমির মুডে ফেরত গিয়ে হাসতে হাসতে রিকুয়েস্ট করে, ‘একটু ছোকছোক করে দেখান তো!’ ‘হা হা..’ হেসে বলি, ‘এটা আসলে আমি করলেও বুঝি না, না করলে তো আরো টের পাই না। আমার বউ বোঝে, কার প্রতি আমার কেমন ইন্টারেস্ট এটা নাকি আমার ছোকছোক করা দেখেই স্পষ্ট বলতে পারা যায়।’ ‘আপনার বউয়ের হিশেবে আমার প্রতি আপনার ইন্টারেস্ট কেমন?’ ‘বন্ধুদের বউদের মধ্যে আপনাকে নিয়েই বেশি সন্দেহ করে সে।’ ‘আমার সৌভাগ্য..’ বলে মাথা নত করে রবীনের বউ। আমিও জানতে চাই, ‘রবীন বন্ধুদের কারো সঙ্গে আপনাকে সন্দেহ করে কি?’ ‘বাকিদের কাউকে করে না, কারণ বিয়ের আগে ওরা দলবেঁধে টাঙ্গাইল যেত।’ আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে জানতে চাইলাম, ‘টাঙ্গাইল যেত মানে? তার সাথে সন্দেহ না করার সম্পর্ক কী?’ ‘মানে বুঝলেন না?..’ রহস্যময় করে তাকায়। ‘না, মানে কী?’ আমি সরল অভিব্যক্তি ধরে রাখলাম নিজের। ‘মানে একসাথে টাঙ্গাইল যাওয়ার কারণে বাকি বন্ধুদের কার কেমন পারফরমেন্স রবীনের তা জানা।’ ‘আচ্ছা আচ্ছা এবার মনে হয় বুঝতে পারছি।’ স্বীকার করে নিতে হলো আমাকে। ‘তাই কাউকে সে সন্দেহ করে না, যেহেতু ওদের চেয়ে নিজেকেই সে বেশি সুপুরুষ মনে করে।’ ‘কিন্তু আমি তো এই দলে ছিলাম না, ফ্রেন্ড সার্কেলে আমি অনেক পরে যুক্ত হইছি।’ সহজভাবে আমি যা বোঝাতে চাইলাম তা হলো, আমি টাঙ্গাইল যাই নাই। ‘আর সেজন্যই রবীন শুধু আপনার ব্যাপারেই কিছু জানে না। সুতরাং বন্ধুদের মধ্যে সে শুধু আপনাকেই সন্দেহ করে।’ কিন্তু আমি নিষ্পাপ চাহনি দিয়ে বলি, ‘কই! আমি কী করলাম যাতে সন্দেহ করা যায়?’ ‘কিছুই না, আমার ছবিতে লাইক দিলে, বা আমিও যদি আপনার পোস্টে লাইক দিই, সে রিঅ্যাক্ট করে।’ ‘সর্বনাশ, এটা তো খারাপ হলো,’ আমি বলি। ‘কোনটা খারাপ হলো,’ জানতে চায় রবীনের বউ, ‘আমার ছবিতে লাইক দেওয়া?’ ‘তা না.. কিন্তু রিঅ্যাক্ট করে যদি, না দেওয়াই ভালো ছিল, কিন্তু আমি তো জানতাম না। আপনি আমার পোস্টে লাইক দিতেন সেজন্য আমিও বিনিময়ে আপনার পোস্টে লাইক দিতে গিয়ে ছবি ছাড়া আর কিছুই পেতাম না।’ ‘তার মানে আমার প্রতি আপনার কোনো ইন্টারেস্টই নাই?’ রাগ করার ভঙ্গিতে ঠোঁট বাঁকায় রবীনের বউ। এর জবাবে কী বলা যায়, ‘তা না, মানে আপনাকে তো ভালোই মনে হয়। চুপচাপ থাকেন, তাও একটা বোল্ডনেস টের পাওয়া যায়।’ ‘ধুর, আপনি খুবই সৎ জামাই, সুতপা অযথাই আপনাকে সন্দেহ করে।’ নীরস ভঙ্গিতে জানিয়ে দেয় রবীনের বউ। আর প্রসঙ্গ বদলে জানতে চায়, ‘কয়টা বাজে দেখবেন প্লিজ?’ টাইম দেখতে বের করে মনে পড়ে সুতপার ফোনকলের পর থেকে মোবাইলটা বন্ধ আছে। ততক্ষণে হাঁটতে হাঁটতে রবীনের বউসহ ১১ নাম্বার রোডের মাথায় এসে দাঁড়িয়েছি। ‘ওমা ফোন বন্ধ করলেন কখন?’ চালু হতে থাকা ডিসপ্লের দিকে তাকিয়ে সে জিগ্যেস করে। আমি বলি, ‘সুতপার কাছে ধরা খাওয়ার পর।’ ‘কী ধরা খাইলেন?’ ‘বলছিলাম অফিসে আছি, নিচে চা খাইতে নামছি। কিন্তু আপনার বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিনের হুইসেল শুনে সে বুঝে ফেলছে আপনার সঙ্গে আমি স্টেশনে।’ কিন্তু জবাবে ‘আরে এটাই সেই ১১ নাম্বার রোড না?’ বলে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায় রবীনের বউ। ‘চলুন আপনার স্মৃতি বিজড়িত চিলেকোঠাটা দেখে আসি।’ প্রস্তাব দেয়। ইতোমধ্যে মোবাইল ওপেন হওয়ায় বিড়বিড় করে আমি বললাম, ‘সাড়ে নয়টা বাজে।’ আর সঙ্গে সঙ্গেই রবীনের নাম্বার থেকে কল আসতে থাকলে ডিসপ্লে উঁচা করে ওর বউকে সেটা দেখাই। পাত্তা না দেওয়ার ভঙ্গিতে সে বলে, ‘মিসডকল এলার্ট চালু, ভোরে কল করছিলেন তাই ব্যাক করছে।’ ‘সর্বনাশ! কল তো দিছিলাম আপনি বের হয়ে আসার সময়। দুইয়ে দুইয়ে চার মেলায় যদি?’ সত্যিকার অর্থে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি আমি। রবীনের বউ বলে, ‘বলবেন আমি ফোন করে টাকা চাইছিলাম, আপনি দেন নাই।’ ‘আচ্ছা’ বলে রিসিভ করতে যাওয়ার সময় কল কেটে গেলে আমি ব্যাক করি। ফোন ধরে রবীন বলে, ‘কিরে কল দিছিলি?’ কোনো রকম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া হঠাৎই ক্ষেপে গিয়ে আমি বললাম, ‘অস্ট্রেলিয়ায় এডুকেশন প্যাকেজ না ছাড়লে তোর হয় না?’ ‘মানে কী দোস্ত, কী হইছে?’ ত্রস্ত ভঙ্গিতে রবীন জিগ্যেস করে। আমি বলি ‘তোর বালের ট্রাভেল এজেন্সির কারণেই সুতপা অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। আর এখন স্টুয়ার্টের সঙ্গে যা-তা করতেছে।’ ‘কী বলতেছিস তুই, ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা করি, চাইলে এটুকু হেল্প না করি ক্যামনে? কী হইছে বল।’ আমি বললাম, ‘সমানে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে। ফেসবুকে দ্যাখ।’ বলে লাইন কেটে দিই। আর তাকিয়ে দেখি আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে রবীনের বউ। ‘আপনি তো পুরাই অন্য প্রসঙ্গে ক্ষেপে গেলেন!’ ‘হ্যাঁ।’ আমি বললাম, ‘আসলে ক্ষেপি নাই, মূল প্রসঙ্গটা ধামাচাপা দিতে ট্রাভেল এজেন্সির ব্যাপারটা টেনে আনলাম।’ ‘নাকি ওইটাই মূল প্রসঙ্গ কে জানে!’ ‘লাভ নাই, সুতপা আমাকে শিগগিরই ডিভোর্স দিচ্ছে।’ ‘ওমা, সে কী!’ আঁতকে ওঠার অভিনয় করে সে। আমি জানতে চাই, ‘আপনি যে বের হয়ে আসলেন, এটাই কি শেষ নাকি আবার ফেরত যাবেন?’ ‘একদমই ফেরত যাওয়ার ইচ্ছা নাই।’ জানিয়ে দেয় রবীনের বউ। আর চিলেকোঠাটা দেখতে চেয়ে ১১ নাম্বার রোডের দিকে টেনে নিয়ে যায় আমাকে। আগের দারোয়ান কাকাই আছে, আমাকে দেখে চিনতে পেরে খোঁজ খবর জানতে চায়। আমাদের ইচ্ছের কথা জানালে সে আমাদের সোজা ছাদে চলে যেতে বলে। জানায়, চিলেকোঠাটা খালিই পড়ে আছে, চাইলে আবারও ভাড়া নিতে পারি। ‘তার আর দরকার হবে না।’ সুলভ একটা হাসি দিয়ে আমরা সিঁড়ি ধরে উঠতে থাকি। আর আগেকার চুক্তি অনুযায়ী চা সিগারেট নিয়ে দারোয়ান কাকাকে ছাদে আসতে বলি। চিলেকোঠার দরজায় তালা দেওয়া দেখে বলি, ‘দারোয়ান কাকা আসলে চাবি পাওয়া যাবে।’ ‘সমস্যা নাই, ছাদটাও তো স্মৃতি বিজড়িত।’ রবীনের বউ বলে। ‘কিন্তু অনেক রোদ।’ আমি বলি, ‘আর ছাদে খুব একটা আসতাম না, রুমেই থাকতাম।’ ড্যানিশের কৌটায় করে চা, দুটো ওয়ান টাইম কাপ আর এক প্যাকেট পালমাল সিগারেট নিয়ে দারোয়ান কাকা ফিরে আসে। ‘সিগারেটের ব্র্যান্ডের কথা এখনো মনে আছে!’ বিস্ময় প্রকাশ ও ধন্যবাদ দেওয়ার টোনে আমি বলি। মুখে হাসি ধরে রেখে চা পরিবেশন করে দারোয়ান কাকা। ‘কিন্তু পালমাল তো এখন আর খাই না।’ বলি, ‘বেনসন লাইট খাচ্ছি কয়েক বছর ধরে।’ এবার চোখ তুলে তাকিয়ে সিগারেট বদলে আনতে হবে কিনা জিগ্যেস করে। ‘দরকার নাই।’ আমি বলি, ‘পালমাল সব জায়গায় পাওয়া যায় না, তাই ছেড়ে দিতে হইছে।’ ‘কিন্তু পুরানো জায়গায় এসে ঠিকই পেলেন।’ প্যাকেট থেকে একটা বের করতে করতে রবীনের বউ বলে। চুমুক দিয়ে টের পাই আগেকার হিশেব অনুযায়ী চিনিসহ চা এনেছে দারোয়ান কাকা। ‘এখন চায়ে আর চিনি খাই না।’ বললে জিভ কামড়ে দারোয়ান কাকা স্বীকার করে নিল যে তার আসলে আগেই এসব জিগ্যেস করে নেওয়া উচিত ছিল। ‘ব্যাপার না।’ রবীনের বউ বলে, ‘স্মৃতি থেকে চাইলেও আপনি চিনি বাদ দিতে পারবেন না।’ ‘কিংবা পালমাল বদলে বেনসন খাওয়ার একটা দৃশ্যকে প্রতিস্থাপন করতে..’ হাসতে হাসতে আমি বলি। ইতোমধ্যে দারোয়ান কাকা চিলেকোঠার তালা খুলে দিলে সারা রুমের মাঝখানে শুধু একটা সস্তা চৌকি পড়ে থাকতে দেখা যায়। সিলিংয়ে আমারই লাগানো ফ্যানটা চালিয়ে দিয়ে দারোয়ান কাকা জানায়, ফ্যানটা আর খোলা হয় নাই। যখনই যারা থেকেছে নিজেদের ফ্যানটা খাটের তলায় রেখে এ ফ্যানেরই বাতাস খেয়েছে প্রত্যেকে। রুম ছাড়ার পর কিছুদিন বাদেই ফ্যানটা এসে খুলে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আমার। আট বছর পার হয়ে গেছে। এর মধ্যে একবারের জন্যও কি খিলগাঁও আসি নাই আমি? বিক্ষিপ্ত এসব ভাবনায় বাধ সেধে সুতপার এসএমএস চলে আসে। ও লিখেছে, ‘সরি। আমার ওরকম রিঅ্যাক্ট করা উচিত হয় নি। তোমার যেমন ইচ্ছা তুমি তেমনই চলো।’ এর থেকে কী বোঝা যায়? যা হওয়ার হয়ে গেছে? স্টুয়ার্টের সঙ্গে? রিপ্লাইয়ে লিখলাম, ‘রবীনের বউসহ খিলগাঁওয়ে আমার চিলেকোঠা লাইফ দেখতে আসলাম।’ এদিকে রবীনের বউ সস্তা চৌকিতে বসে চোখ বন্ধ করে ফ্যানের বাতাস খাচ্ছে। আমার আর রবীনের বউয়ের দিকে ইঙ্গিত করে দারোয়ান কাকা জানতে চায়, কী সম্পর্ক? আমি আগেকার লাম্পট্যময় দিনগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে চোখ টিপে দিই। এতে দারোয়ান কাকাও খুশি হয়। এসব সময়ে আমার বখশিসের হাত সম্পর্কে রাখা পূর্ব ধারণাই তাকে খুশি করে তোলে। সুতপা লিখে পাঠায়, ‘অথচ আমাকে নিয়ে যাওয়ার সময় হয় নাই তোমার।’ আমি লিখি, ‘হঠাৎ গির্জার সিস্টারদের মতো কোমল হয়ে গেলা কেন?’
রিপ্লাইয়ে রবীনের বউকে বললাম, ‘রবীনই আপনাকে আমার কাছে পাঠাইছে, তাই না?’
রবীনের বউ বলে, ‘আবার খিদা পেয়ে গেছে।’ বলে ব্যাগ থেকে আমার কাছ থেকে নেওয়া ধারের টাকা বের করে চা সিগারেটের বিল মিটিয়ে দিল প্রথমে। তারপর তিনজনের জন্য মুরগির স্যুপ আর রুটি আনতে বলে আরো এক হাজার টাকার নোট এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘যা ফেরত আসে ওটা আপনি রেখে দিয়েন।’ এতে স্বাভাবিকভাবেই দারোয়ান কাকা অবাক হয়ে গেল। কারণ এর আগে কোনো মেয়ে তাকে এভাবে বখশিস দেয় নাই। আমার দিকে অর্ধেক প্রশ্নবোধক দৃষ্টি ফেলে রেখে সে বের হয়ে গেল। ‘আপনি ফোনে গেম খেলতেছেন?’ জানতে চায় রবীনের বউ। সুতপা লিখে পাঠায়, ‘জানি না।’ কপি করে আমিও রবীনের বউকে বললাম, ‘জানি না।’ ‘কী হইছে আপনার? চিলেকোঠায় এসে মনমরা হয়ে গেলেন কেন?’ লিখে পাঠাই, ‘রবীনের বউ খুব রহস্যময় আচরণ করতেছে।’ স্বল্পায়ু হাসি দিয়ে রবীনের বউকে আশ্বস্ত করলাম, ‘কই না, ঠিক আছি।’ ‘দশটা বেজে গেছে।’ ইনফর্ম করার ভঙ্গিতে সে বলে। ‘মুরগির স্যুপ আর রুটিটা খেয়ে যাই?’ সম্ভাব্য ব্যাংক সংক্রান্ত ব্যাপারটার দিকে ইঙ্গিত করে বলি। লজ্জা পেয়ে মাথা নাড়ায় রবীনের বউ, ‘আরে না না, আমি এমনিই বললাম। এক্ষুণি ব্যাংকে যেতে বলতেছি না।’ সুতপা লিখে পাঠায়, ‘আমিও স্টুয়ার্টের সঙ্গে অনেক রহস্যময় আচরণ করে আসলাম।’ রিপ্লাইয়ে রবীনের বউকে বললাম, ‘রবীনই আপনাকে আমার কাছে পাঠাইছে, তাই না?’ অবাক হয়ে গিয়ে সে জানতে চাইল, ‘মানে?’ আমি বললাম, ‘মানে আপনার প্রতি আবার তার আকর্ষণ কমে গেছে বলতেছিলেন না? সুতরাং আবারও কারো সঙ্গে আপনাকে হাতেনাতে ধরে ফেলতে চায় সে।’ ঠান্ডা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে রবীনের বউ। বলে, ‘তার মানে ভোরবেলা থেকে আপনার সঙ্গে নাটক করে যাচ্ছি আমি? তাও আবার রবীনের স্ক্রিপ্টে?’ আবারও নারীবাদী অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে সে। ‘হতেই পারে।’ আমি বলি, ‘আপনাকেই-বা এত বিশ্বাস করার কী আছে?’ ‘তাহলে টাকা ধারের প্রসঙ্গটা কেন আসলো? টিকেট করলাম কেন?’ জানতে চায় রবীনের বউ। ‘নাটকটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য।’ আমার আত্মবিশ্বাসী জবাব। ‘আপনারা আসলে.. কী বলব..’ বিড়বিড় করে রবীনের বউ। ফোন আসে রবীনের। ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে রিসিভ করে সরাসরি ওকে বললাম, ‘তুই তোর বউ পাঠাইছিস আমার কাছে নিজের আকর্ষণ ফিরানোর জন্য?’ ধারণা করি হতভম্ব হয়ে যায় রবীন, আর এদিকে উঠে দাঁড়ায় রবীনের বউ, মুখ হা করে থাকে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলে, ‘শোন শোন, ওর কথা বিশ্বাস করিস না। সাইকো হয়ে গেছে পুরা। সবার কাছে আমার নামে এই বদনাম করে বেড়ায়।’ ‘তুই এসব করিস না?’ রাগতস্বরে জিগ্যেস করি। ‘একদম না একদম না, সবই ওর মনের কল্পনা। এসব নিয়েই তো ঝামেলা।’ উল্টো আমি হতভম্ব হয়ে যাই, ‘বলিস কী!’ ‘হ্যাঁ, তোরা কোথায় আছিস বল, আমি আসছি।’ আমি রবীনকে খিলগাঁও ১১ নাম্বার রোডে আসতে বলে ফোন রেখে দিলাম। আর সাথেসাথেই রবীনের বউ বিজাতীয় একটা গোঙানি দিয়ে নিজেই নিজের শাড়ি ছিঁড়তে উদ্যত হলে আমি গিয়ে ওকে থামানোর চেষ্টা করি। এতে ক্ষেপে গিয়ে নিজের গায়ে নিজে আঁচড় দিতে শুরু করে রবীনের বউ। অনেক ধস্তাধস্তি করেও নিবৃত্ত করতে পারি না, নিজেকে ও রক্তাক্ত করে ছাড়ে আর অপ্রকৃতস্থ হাসি দিয়ে ব্যাগ থেকে বাকি টাকাগুলো বের করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে রুমে ছিটাতে শুরু করে। ‘কেন এসব পাগলামি করছেন?’ অসহায়ের মতো জিগ্যেস করি আমি। ‘তুই আমাকে ধর্ষণ করছিস।’ বলে মুহূর্তের মধ্যে মোবাইলটা বের করে নিজের ও আমার কয়েকটা ছবি তুলে ফেলে। ‘কী করতেছেন?’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে মোবাইলটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাই। কিন্তু উঁচা লম্বা রবীনের বউয়ের সঙ্গে পেরে উঠি না। ‘শক্তি আছে আপনার।’ বলার চেষ্টা করি। ‘হা হা’ করে হাসতে থাকে রবীনের বউ, বলে, ‘তুই আমাকে ধর্ষণ করছিস কেন? এখন এসব ছবি আমি ফেসবুকে দিব। সুতপাকে ট্যাগ করব।’ হালকা কথাবার্তার শিথিল মুহূর্তে মোবাইলটা নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিই যদিও, কিন্তু সম্পূর্ণ আমাকে জাপটে ধরে রাখে রবীনের বউ। উপায়ান্তর না দেখে মেঝেতে বাড়ি মেরে মেরে মোবাইলটা ভেঙে ফেলি। আরো কয়েক দফা ধস্তাধস্তির পরে নিজেকে ছুটিয়ে রুম থেকে বের হয়ে দরজা বন্ধ করে দিই। পাশবিক সব লাথি দিতে থাকে সে দরজায়। দারোয়ান কাকা ফিরে আসলে দুয়েক বাক্যে তাকে ঘটনার ব্যাখ্যা দিই। কিন্তু ক্রমাগত লাথি খেতে থাকা দরজার শব্দ ও ওপাশ থেকে রবীনের বউয়ের মিথ্যে অপবাদগুলো দারোয়ান কাকাকে প্রভাবিত করে। শতাব্দীর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনাটা ঘটে যায়। দারোয়ান কাকা আমাকে প্রকাণ্ড এক ঘুষি দিয়ে বসে। তারপর ধারাবাহিকভাবে আরো কয়েকটা। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গিয়ে ওই পাশ থেকে ছাদের গেটে তালা মেরে দেয়। আমি দৌড়ে গিয়ে ঘটনাটা আরো বিস্তারিতভাবে বলার সুযোগ চাইলেও সে আমাকে লম্পট দুশ্চরিত্র ও ধর্ষণকারী বলে গালাগাল দিয়ে লোকজন আনতে নিচে নেমে যায়। ওইপাশ থেকে হাসতে থাকে রবীনের বউ, আর রবীনকে ফোন দিতে গিয়ে আমি টের পেলাম আমার মোবাইলটাও রয়ে গেছে রুমের ভেতর। মোবাইল উদ্ধার করতে দরজা খুলব কি খুলব না ভাবতে ভাবতেই রিংটোন শোনা গেল। রিসিভ করে রবীনের বউ বলল, ‘একটা বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিন আমাকে ছিন্নভিন্ন করেছে।’