নদী
❑
নদী মৃত। তাই নৌকা অপ্রাসঙ্গিক এখন
ততোধিক অপ্রাসঙ্গিক আমাদের সঞ্চিত দম, সন্তরণকৌশল
পরিত্যক্ত নদী-খাদে নামি, চলো খুঁজি
সুপ্রাচীন নোঙরখানি—আমাদের অকূলে পাড়ি
দড়ি-কলসি—আমাদের নদীমাতৃকতা
পাথরবাঁধা কংকাল—আমাদের নদীভীতি
নদী মৃত
অবদমিত অট্টহাসির মতো সেতু ঝুলে আছে শূন্যে
সুড়সুড়ি দিতে দিতে ফাজিল বাতাস বইছে তার বগলের নীচ দিয়ে
পিতা-পুত্র আর...
❑
১
কিছু একটা আঁকড়ে উঠে এলাম ঘুমের অতল থেকে
কী? তা জানি না
দেখি—অন্ধকারে আমার পোয়াতি বউ
বসে আছে মেঝেতে, পা ছড়িয়ে
আমার কবিতার খাতা খাচ্ছে
২
বউ বলল—নড়ছে, দ্যাখো
আমি হাত রাখি ঢিপির ওপর
ইঁদুর মাটির ঢিপি
শ্বাসরুদ্ধ, অপেক্ষা করি
জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে ফসলশূন্য মাঠ
আমরা দুই আদিবাসী দম্পতি ইঁদুর শিকারে এসেছি
৩
আমি জন্ম দিয়েছি এক পুত্রের
পুত্র জন্ম দিয়েছ এক পিতাকে
আমরা দু-জন মিলে জন্ম দিয়েছি এক নতুন ঈশ্বর
পিতা-পুত্র-ঈশ্বরের বয়স সমান
৪
আমি আমার ছেলের জন্য কিনে এনেছি
প্যাঁ-পুঁ জুতোর ছলনাময় এক পথ
অভয়ারণ্য
❑
একটি গাছ যেন অন্যটির প্রতিবিম্ব
যেন একজনকে নকল করেই অন্যদের বেড়ে ওঠা
সারল্যই টেনে নিয়ে এসেছে আমায় এত গভীরে
একইরকম গাছের একইরকম ফুল-ফল-পাতা
দেখে দেখে বিভ্রম জাগে
মস্তিষ্ক অবশ হয়ে আসে
তুমি সরল, তাই সুন্দর—আমি চিৎকার করে উঠি
দেখি ঝরাপাতায় ঢাকা সব রাস্তাও একইরকম
ফেরার কথা ভাবতেই
শিকারি অন্ধকার নেমে এল ঝুপ করে
পাখি
❑
রঙিন পালকের আড়ালে ঘুমিয়ে থাকে পাখি
জেগে উঠে মাথা তোলে দৃশ্যমান হয়
বন্দুকের পিছনে লুকিয়ে থাকা শিকারি জানে
মুখ ঢুকিয়ে নিলেই আবার অদৃশ্য হয়ে যাবে পাখি
বহুকৌণিক মাংসটুকরো ঘিরে
আমাদের গোলাকার দিকশূন্য খিদে
(খিদেই সংঘবদ্ধ করেছে আমাদের
আমার ডানদিকের সাথে অন্যের বাঁ-দিক
আমার বাঁ-দিকের সাথে অন্যের ডানদিক মিলিয়ে দিয়েছে)
মাংস নয়, আমরা সেই ক্ষণটিকে খাচ্ছি
যা পেলে পাখি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারত।
হাওয়ায়
❑
হাওয়ায় ফুলে ওঠে
দড়িতে মেলা তোমার রাত্রিপোশাক
আমি তার ছায়ায় এসে দাঁড়াই
দেখি তোমার আধো-অন্ধকার গঠন—উজ্জ্বলশ্যামবর্ণ
মুখরতাহীন
দুলছে হাওয়ায়
তুমি তখন দাঁড়িয়ে বাইরে
ডাকছ আমাকে
আমি দেখছি তোমায়—যেমন ত্রাণশিবিরের ভেতর থেকে
আকাশ দেখে কোনো বানভাসি
ঝুঁকে দেখি
❑
ঝুঁকে দেখি—
এ আমার বড়ো পুরোনো অভ্যেস
ছাদ থেকে ঝুঁকে দেখছি—পরিত্যক্ত বাগানের অব্যবহৃত অংশ
বৃদ্ধ মালি-ঘর, বাঁধানো কুয়োতলা, পিছল
খাট থেকে ঝুঁকে দেখছি—নদীর ঘোলাজল
ভাসমান পোড়াকাঠ, মাছেদের ফুৎকার
মাটিতে শুয়ে ঝুঁকে দেখছি—ধরাশায়ী পুরুষ এক
মরে গেছে নাকি?
এত উঁচু থেকে বুঝতে পারছি না
হাসি এসে পড়ে আছে
❑
হাসি এসে পড়ে আছে রাস্তায়, আড়াআড়ি
তুমি লাফিয়ে ডিঙিয়ে যাচ্ছ, সন্তর্পণে—যেন নোংরা
মরা কুকুর-দেহ, জমে থাকা পুরোনো বৃষ্টির জল যেন
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কতদিন ফিরেছ বাড়ি। গভীর রাতে, একা—
পেছন পেছন একটা কুকুর ছিল, ছিল না কি!
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই যে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল
নুড়িপাথরের সাথে
❑
নুড়িপাথরের সাথে পড়ে ছিলে তুমি, পর্যটন
জুতোর আঘাতে আঘাতে এসেছ এতদূর
আমি এসেছি আমার ছায়ায় চড়ে
এর নাম বাদামপাহাড়
এখানে খুঁজে পাবে তুমি তোমার হারিয়ে যাওয়া চটি
আর আমি খুঁজে পাব এক নতুন লিখনভঙ্গিমা
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওই গড়িয়ে পড়ছে
এক অশরীরী আর্তচিৎকার
কার চিৎকার—জানতে চেয়ো না
সাদা পাতায়
❑
সাদা পাতায় অন্ধকার এক বৃত্ত
এঁকে দিয়েছে টেবিল ল্যাম্পের আলো
ভেতরে একটি পেন
কুঁকড়ে আছে ঘুমে
ঘুম নেই, শুধু এই অযুহাতে জেগে আছ তুমি
মশারির ভিতর থেকে শরীরের সামান্য বের করে রেখে
পেতেছ ফাঁদ
মশাদের জন্য অপেক্ষা করছ
মালিক-না-ফেরা পোষ্যদের আর্তকান্নার সাথে
রাত্রি নিজেকে টেনে দীর্ঘ করতে গিয়ে
ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে
গোলাপের বাগান
❑
গোলাপের বাগানে এলে কে যেন চিৎকার করে ওঠে :
‘সৌন্দর্য কখনোই দৃষ্টিনির্ভর নয়!’
জলের ধাক্কায় পাড়ের ভেঙে পড়া—
ঘটনাটি দৃশ্যত অসুন্দর নয়।
আবক্ষ ডুবে থাকা জেলের কপাল থেকে গড়িয়ে নামছে ঘাম
মাঝির ধু-ধু তৃষ্ণা দেখছি জলে ভাসমান—সুন্দর
সুন্দর আমাদের ফিরে যাওয়ার ওই ছোট্ট নৌকাটি
‘নৌকা তোমার জলাতঙ্কের চেয়ে মোটেও বড় নয়’—কে যেন বলে উঠল!