টোটো
❑
মন আসলে একটা সার্চলাইট...
অন্ধকার হাইওয়ে জুড়ে অ্যাঙ্গেল খোঁজাই তার ধর্ম
নিষ্কর্মা বেকার সে বসতে শেখে নি
আমাদের শিক্ষাই আমাদের ধর্ম হয়ে ওঠে...
মনেরও তাই হয়েছে...
সর্বত্র অ্যাঙ্গেল খুঁজে চলেছে, সর্বসময়ে...
অ্যাঙ্গেল ডিপও হচ্ছে , শ্যালোও হচ্ছে
টানেলের হাঁ-এর মধ্যে হলোও হচ্ছে
দূরে বর্ণময় আলো...
ডাক...
পিছুটান...
নিয়তি...
ভবি...
সর্বত্রই দুই বিপরীত...
তবু
সহজে ভোলাবার নয় এই
টায়ারের নিচে সরে সরে যাওয়া পথ...
পথের শিক্ষা... পথের ধর্ম...
মায়ের ঘাট
❑
একবার উত্তরে ঢুকে পড়লেই দেখেছি আর নিঃসঙ্গ লাগে না! প্রশ্নের ডালপালা কাঠকয়লা সব দাউ দাউ করে পুড়তে থাকে... কাছেই কোথাও একটা খাঁটি-বাতাসের ঘাঁটি আছে... পথচলতি মানুষজন বলাবলি করছে, শুনি... আবার পথের ভাষা নিজের বলে বোধ হয়...
হয়তো সে ঘাটের নাম উত্তরার্ধ... হয়তো মায়ের ঘাট... মৌসীমগঙ্গার চরে কুণ্ড ঘিরে ছ'জন বসেছে... ওরা, জাতে দস্যু, মজ্জায় মানুষ... এক বেনাম্নীর পাখার বাতাসে উড়ছে অপরাজিতার রুদবা...
আকাশ যে এত নীল... বাষ্পমতীর নীল আঁচল যে এমন বিস্তীর্ণ... টের পাই অনেকদিন পর... অনেকটা শ্বাস বুকে টেনে নিই একটানে... অনেকটা গভীর জল... ডুবসাঁতার কে শেখাবে! আদ্দেক জীবন জলে গেল…
ধুলোট
❑
বসন্ত ফিরিয়ে দিচ্ছে কী জানি কী ক'রে আজ
আবহমানের মতো নষ্ট শব্দ!
কে আসছে শহরে, তোমরা চিনতে পারছ কেউ?
জিগ-স্য পাসল কিছু নেই আজ,
ঢেউ, শুধু ঢেউ...
অনায়াসে উঁচু উঁচু টাওয়ার টপকে গিয়ে
অকাতরে নিচু হয়ে পাতা ঝাঁট দিতে দিতে
হাওয়া ঢুকছে...
দূরের আগুন লাগা পলাশের মাঠাবুরু...
শিমুলের রক্তে ধোয়া কোপাই, যে যার বুক
পেতে দিয়ে বলছে, এসো নাথ...
কার
পায়ের তলায় পথ পিষে-মিশে হয়ে উঠছে সোনা!
আহা কী মধুর প্রতিশোধ!
দেখতে দেখতে যক্ষপুর হয়ে উঠছে ধুলো-মায়াপুর...
আর আমি অটোর পর অটো পাল্টে, কখনো ট্রেকার
কখনো ভেসেল, হাঁটা, ঘুরে মরছি, কাঠবেকার...
অকারণ নেশা-লাগা রোদ...
লাইনের লেখা
❑
অন্তর্লীন জীবন আমি আর-তেমন বাঁচতে পারি না, সুধাকর...
নিজের সঙ্গে একা হয়ে যেতে পারি না...
কেউ না কেউ এসে ঠিক জুটে যায়!
সময় এত সস্তা নাকি?
নিজের বলে কিচ্ছু থাকবে না?
তোমায় এদিক ওদিক খুঁজে বেড়াই, সুধা...
হাতড়াই...
অনলাইন?
অনেকদিন বেলাইন হয়ে পড়ে আছি...
তুমি কোন লাইনে থাকতে? মেইন না কর্ড?
কূর্ম
❑
সমস্ত শক্তিই শেষে তাপে লীন
সমস্ত সংবেদ এসে ছেড়ে যাচ্ছে ফুটপ্রিন্ট,
ইমেজে...
এভাবেই জড়ো হচ্ছে ছেঁড়া-খোঁড়া স্মৃতি হয়ে,
আঁচলের খুঁট ধরে টান দেওয়া হরিণশিশু...
আবার বিস্মৃতি হয়ে, খোলা-চুল শকুন্তলা হয়ে,
ছড়িয়ে পড়ছে দূরে
অভিজ্ঞান...
আমরা দু'চোখ বুজে নিজেদের পুড়তে দেখছি
ক্রমাগত, বিষ-বেগুনির ঝাঁঝে তাতাপোড়া...
ঘামতে ঘামতে আমাদের ভেঙে যাচ্ছে কাঁচা-ঘুম...
সারাদিন ধরে আমরা ঢুলতে ঢুলতে
ঘুমের ওষুধ খুঁজছি শুধু...
চোখ-টানা কিশোরের চোখের টলটলে দিঘি...
ঠোঁট-টানা কিশোরীর কাঁচা-মিঠে ঠোঁটের বউল...
মন-টানা দিগন্তের মাঝমাঠে সমুদ্রস্নান... ধুলো... রামধনুর আভাস...
যদি আরেকবার লীনতাপ হয়ে
নিবিড় অন্তর্ধূম হয়ে
অবস্থান্তরের পেটে চোখ-বুজে, গা-ঢাকা দেওয়া যেত...
অভী
❑
আপনহারা, যারা তোমায় শুধু দূরে দূরে খুঁজে গেল
সমস্ত দূর আজ তাদের কানে বাতাসের ফিসফিসানিতে বলে গেছে, তুমি নেই...
অথচ এইবেলা তোমার কাছটিতে বসার কথা
কে যেন মন্ত্রণা দিয়ে গেছে আমার কানে!
ঘাটের সিঁড়িতে ঝরে রয়েছে রাধাচূড়া... ধুলো ওড়া সোনার বিকেলে
আমি নেমে দাঁড়িয়েছি এই দিঘির বুকে বুক ডুবিয়ে...
সোনায় ছাইরঙের পোঁচ, দেখতে দেখতে মিশে যাচ্ছে...
ছাইয়ের মধ্যে একদিন সংস্কার ছিল আগুনের...
রহস্যভেদের সেইদিন থেকে সে শুধুই পুড়িয়েছে
অথচ নিজে অদাহ্য অভিশপ্ত... কাউকে মুখফুটে বলতে পারে নি
তারও ছাই হতে চাওয়ার বাসনা...
ওদিকটা কালো করে আসছে...
ঝড়?
বিদ্যুৎঝলকমাত্র ফুটে উঠছে ভরসার কথা...
যেদিকেই ভাসিয়ে নেবে, আলো ফুটবে... ঢেউ উঠবে...
যেনবা কোথাও আমি নেই... আজ...
যেনবা এমন দিনে
আমায় তুমি খুঁজতে বেরিয়েছ...
অন্নদা
❑
চোঁয়াঢেঁকুর কান্না শোনো, আধপেটারও শুকনো হাসি
শুনতে পাচ্ছ বহাল তবিয়তে
বাঞ্জারাগ্রাম, দড়িতে প্যাঁচ দিচ্ছে দেবে আলুচাষী
বুটের শব্দে সাত ঘোড়া এক রথে...
এমন একটা আকাশ মাথায় বাঁচতে হবে তোমায় জীবন
উঠতে বসতে ভেঙে পড়বে মাথায়
আবার কোমর বাঁধতে হবে, পুড়িয়ে দিয়ে মাথার রিবন
ফাঁদতে হবে আড়াল, লেখার খাতায়...
কে রাঁধে! দূর চৈত্র-আকাশ... চুল্লি জ্বলে তারায় তারায়...
ঐ ঘরে কেউ অভুক্ত আজ রাতে?
কে হাতপাখায় মুহুর্মুহু জগজ্জ্বালার মাছি তাড়ায়!
পাত তোলে আর ভাত বেড়ে দেয় পাতে?
শবরী
❑
মা গো, যদি চলেই যেতে হবে
মায়ার ফাঁদে জড়াও কেন তবে!
জংলা কাজল কবোষ্ণ এই ঘ্রাণের
পাকে পাকে জড়িয়ে থাকা প্রাণে
বাঁকে বাঁকে দেহনদীর ধারা...
ভবদেহে নভোদেহের সাড়া
পেতে পেতে তোমায় খুঁজি, কই!
শহরনদীর ছাদনৌকার ছই...
ভাসছে সেও, অশান্ত দক্ষিণে...
বিবশ মাঝি ব্যাথায় রিনরিনে
ছাই কর্ মা, চিন্তাদাহের কুটো
রাখিস নে আর জগন্নাথকে ঠুঁটো
নেই কিছু তার দুরূহ কল্পনা
চোখের দেখা আর এই কানের শোনা—
সে দেখছে দ্যাখ্ তারারা ওই ক্রমে
যুদ্ধঘোড়ায় সাজাচ্ছে অশ্বমেধ...
সে দেখছে ঝড়! তিনভুবনের ধুলো
যুদ্ধ-জ্বালা-যাতনা-পরচুলো
উড়ছে দুলছে... জগজ্জোয়ারভাঁটা...
গলায় বেঁধা অমীমাংসার কাঁটা
চুলের কাঁটায় দিচ্ছ মা গো তুলে
আলোয় কালোয় অনন্ত চুল-খুলে...