নিজার তাওফিক কাব্বানি (১৯২৩-১৯৯৮) প্রচলিত আরবি কবিতার দুনিয়ায় এক তুমুল আলোড়ন। তিনি যখন কৈশোরে উপনীত, তখন তার বোন অপছন্দের একজন পুরুষের সাথে বিয়ের হওয়ার ক্ষোভে আত্মহত্যা করে। এ ঘটনাটি তার মনে প্রবল দাগ কাটে। আরব জগতে নারীর অবস্থান ও নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভালবাসার বিষয়ে উচ্চকিত হন। আবার তার বেড়ে ওঠার সময়টি আরব-জাহানের জন্য ছিল এক রকমের ক্রান্তিকাল। সিরিয়ায় তখন ফ্রান্সের ম্যান্ডেটরি শাসন। অন্যান্য আরব ভূমির মতো সেখানেও জাতীয়তাবাদ দানা বাঁধতে থাকে।
ইজরাইলের উপস্থিতি পুরো আরব-জাহানের জন্য সতত পীড়াদায়ক। আবার ইজরাইলের সঙ্গে সম্মিলিত আরববাহিনীর পরাজয়ে আরব-নেতাদের অকর্মণ্যতা দৃশ্যমান হয়। এ ব্যাপারটি আমৃত্যু তাকে তাড়িত করে। এইসব নেতা-ই যখন নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে নিপীড়নের স্টিমরোলার নিয়ে এগিয়ে আসে, তখন তার কলম শব্দের হুঙ্কার ছাড়তে কুণ্ঠিত হয় না। তার কবিতা তাই নারী, প্রেম ও মানবতার প্রশ্নে যেমন উচ্চকিত, তেমনই প্রচল অযৌক্তিক-অমানবিক প্রথা, দুঃশাসন ও নির্বীযতার প্রতি শৈল্পিক ঘৃণা ও দলাপাকানো প্রতিবাদ। তার শব্দচয়ন ও বাক্য-বন্ধ সহজ-সরল এবং সংক্ষিপ্ত। প্রাচীন আরবি এবং ইসলাম-ধর্মীয় অনেক ইডিয়মকে তিনি নিজ ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে লীন করে নিয়েছেন অপার কাব্যিক কুশলতায়। এমনটি আরবীয় অন্য কারো লেখায় খুব কম চোখে পড়ে।
আরবীয় প্রথা ও শাসনের প্রতি তার বিতৃষ্ণা ছিল বলে একাধিকবার তার কবিতার প্রকাশ নিষিদ্ধ হয়। তবুও তার কবিতা এখনো পাঠকদের মোহিত করে, মৃত্যু তার কবিতার জনপ্রিয়তা কমাতে পারে নি। বর্তমান অনূদিত কবিতাগুলো তার ‘রাজনৈতিক কবিতা-সংকলন’ থেকে নেওয়া, যা প্রকাশ পায় তার মৃত্যুর এক বছর পর, অর্থাৎ ১৯৯৯ সালে। মূল গ্রন্থ-শিরোনাম কাসাইদু মাগদুবুন আলাইহা—মানে অভিশপ্ত কাসিদাসমূহ।
মুনকাসির ফুয়াদ
অভিশপ্ত কাসিদাসমূহ
কিভাবে?
কিভাবে, হে ভদ্র মহোদয়গণ, গান গেয়ে চলেন শিল্পী
যখন তারা বন্ধ করে দেয় তার দুঠোঁট?
যদি মৃত্যু হয় কোনো আরবীয় কবির
পাওয়া যাবে কি কোনো মানুষ
তার অন্ত্যষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার মতো?
কবিতা আমার দেয় না চুমো কারো হাতে
বাদশাদেরই উচিত চুমো খাওয়া আমার কবিতায়
সুইস চড়ুইপাখির প্রতি
সখি গো, লেখালেখি একটি অভিশাপ
নড়বড়ে নরক থেকে মুক্ত হও তুমি নিজেই।
ভাবি, খাতা-ই তো আমার একমাত্র আশ্রয়।
আবিষ্কার করি পরক্ষণেই,
কবিতাই আমার ঘাতক।
বোধ করি, তোমার ভালোবাসাই
নিঃসঙ্গতায় আমার একমাত্র প্রতিষেধক
তাই জলের মতো বয়ে চলি দু-আঙুলের মাঝে
সুসংবাদ বয়ে আনি প্রেমধর্মের
কিন্ত মুহূর্তেই ওরা হত্যা করে আমার বুলবুলিদের
সখি, ধুলোর নগরে পার্থক্য নেই কোনো
কবি ও ঠিকাদারের মাঝে
প্রভু, যে কোনো ক্ষতেরই আছে কোনো উপকূল
শুধু আমার ক্ষতগুলোই কূল-কিনারাহীন।
তাবৎ নির্বাসনও ধ্বংস করতে পারে না আমার নিঃসঙ্গতা
যখন আমার ভেতরেই জাগরূক মহা নির্বাসন।
কালো তালিকায়
আমার পাসপোর্টের পেশার বিবরণ
ছোট্ট একটি শব্দ :
‘লেখক, কবি’।
শুরুতে বিশ্বাস হতো,
তা জাদুকরী বেশ,
দেবে খুলে সামনেকার সকল দরোজা,
দ্বাররক্ষী সবাই অবনত হবে আমার সমুখে,
মোহিত হবে সেনা ও পুলিশ।
আবষ্কার হলো অনেক পরে, এ আমার অপমান, বড় লজ্জা
অভিযোগ ভয়ঙ্কর...
সে এক তলোয়ার, যা লম্বা করে দেয় আমার মুণ্ডুকে,
মনস্থ করি যখনই বাইরে যাবার।
দরোজা
বাদশা যখন তুলে ধরেন ক্ষোভের তলোয়ার
নিক্ষেপ করি নিজেকে কালির দোয়াতে
অথবা যখন নির্দেশ দেন জল্লাদকে আমার মুণ্ডুপাতের
পেরিয়ে যাই গোপন দরোজা
যা বয়ে চলে প্রাসাদ-স্তম্ভের নিচ দিয়ে।
সেখানে ফারাওদের রোষ থেকে পালানোর পথ উন্মুক্ত সদাই
আর সে হলো কবিতা, কবিতা, কবিতা....
কেন লিখি?
লিখি...
বস্তুনিচয়ের বিকাশের উদ্দেশ্যে
লেখালেখি একটি বিস্ফোরণ
লিখি...
আঁধারের বিরুদ্ধে আলোর জয়ের আশায়
কবিতা নিজেই একটি বিজয়
লিখি...
যেন আমাকে জানতে পারে গমের শিষ,
প্রকৃতির গাছ-গাছালি
লিখি...
যেন চিনতে পারে আমাকে ফুল, তারা,
চড়ুই, বিড়াল, মাছ, শামুক-ঝিনুক।
লিখি...
যেন জগৎ মুক্তি পায় হালাকুর কবল থেকে
দলনেতার উন্মাদনা থেকে
লিখি....
মুক্তি দিতে নারীদের জালিমদের তাঁবু থেকে
মৃত্যুর শহর থেকে
একাধিক বিয়ের শৃঙ্খল থেকে
কাল-আকালের সাদৃশ্য থেকে
শীতলতা ও একঘেয়েমি থেকে
লিখি...
যেন কথা মুক্তি পায় তদন্ত কমিশন থেকে
কুকুরের ঘ্যানঘ্যানানি থেকে
ফাঁসির মঞ্চ থেকে
লিখি
প্রেয়সীর মুক্তির নেশায়
অকবিতা, অপ্রেম ও দুশ্চিন্তামুক্তির আশায়
লিখি, যেন তা দূত হয়
লিখি, যেন তা প্রতীক হয়
লিখি যেন তা মেঘ হয়
মৃত্যু থেকে আমাদের রক্ষা করার কেউ নেই
নারী ও কবিতা ছাড়া
শিক্ষিত কুকুরের ডায়রি থেকে
প্রভু, আমার আর্কষণ নেই কোনো
মণি-মুক্তা ও সোনা-রুপায়,
চাই না আমার দামি কাপড়, বিলাস-ব্যাসন।
আমার সামান্য আর্জি, একটু শুনুন :
আমি বহন করি আমার কবিতা
আরবের সকল ধ্বনি,
সকল অভিশাপ...
প্রভু, যদি অসহ্য লাগে আমার কবিতা, আমার চিৎকার—
তা শুনতে না চায় আপনার মন,
অন্তত বলুন আপনার জল্লাদকে,
কোনো হস্তেক্ষেপ না করতে
আমার ঘেউ ঘেউ স্বাধীনতায়...