আন্দ্র্রেই ভজনেসেনস্কির কিছু কবিতা

আধুনিক রুশ কবিতার অন্যতম প্রধান পুরোধা আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কির জন্ম ১৯৩৩ সালে মস্কাউতে। স্থাপত্যের ছাত্র আন্দ্রেই শেষ পর্যন্ত কবিতাকেই পূর্ণকালীন পেশা হিশেবে বেছে নেন। এটা সম্ভব হয়েছিল স্বদেশ ও বিদেশে তার বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে। আর এই অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তার কারণ সম্ভবত তার কবিতার অন্যতর আঙ্গিক ও বিষয়ের নতুনত্ব। আধুনিক সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক নগরজীবনের তিক্তমধুর অভিজ্ঞতা ও অভিঘাতসমূহকে তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ভাষায়, বিচিত্র ছন্দে এবং মৌলিক অলঙ্কারে মুড়ে উপস্থাপন করেছেন পাঠকের সামনে। তার কবিতায় একদিকে যেমন রয়েছে লিরিক্যাল আমেজ ও গভীর দার্শনিকতা, অন্যদিকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও ব্যক্তির নিজস্ব প্রতিবাদ। তবে সব সময়ই তার উপস্থাপনায় পরিলক্ষিত হয় সপ্রতিভ সৃজনশীলতার ছাপ। ২০১০ সালে তার জীবনাবসান ঘটে। তার প্রধান কাব্যগ্রন্থ সমূহ হলো, Mosaica, The Triangular Pear, Nostalgia for Present, Story Under Full Sail, Antiworlds, The Fifth Ace ইত্যাদি।


টেকনোলজি

আমার দিদিমা একজন পুরনো বিশ্বাসী, বিজ্ঞান-বিপ্লবী, তিনি, হরমোন দিয়ে তাগড়া করেন তার প্রিয় শূকরদের।

তার বিজ্ঞানসম্মত গরুবৃন্দ টিভিতে বরফ-হকি দেখে। আর রাতের বাতাবরণে গোটা মফস্বল শহরকে তার বুক আর প্রসারণশীল প্যান্টির ভেতর নিয়ে তিনি এক যৌনবিপ্লবীও বটে, পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং রাষ্ট্রের ভিত্তিকে যিনি ফেলনা ভাবেন। সরকারি কারিগরী বিনিময়, সেও এক মজাদার চিজ; আমরা তাদের ভেট দিই আমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যালেরিনা বিনিময়ে পেয়ে যাই পেপসির চালান। তবু তা বিপ্লব—মানুষের মনে ও জীবনে মাঝরাতে ঘড়ির দু’হাত চুরি হয়ে যায়, আমরা অবশ্য ডিজিটাল পরি, হাত নেই যাহাদের। এই বিজ্ঞানবিপ্লবের আমিও এক সহযাত্রী। সামোভার, তোমাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করি, তবু এই এঁদো মফস্বলে আমি জলের মিস্তিরি আর চিন্তার স্বাধীনতাকে খুঁজি। কিন্তু এই বিপ্লব বিপদাপন্ন। আমাদের আত্মাকে বাঁচাও। বিজ্ঞান প্রতিবিপ্লবীগণ, প্লাস্টিকের ক্যাভিয়ার খেতে রাজি হবেন না যেন।

শুসকিনের মৃত্যু

মস্কাউ শুসকিনকে কবর দিচ্ছে, কবর দিচ্ছে একজন শিল্পীকে; জাতি একজন মানুষকে কবর দিচ্ছে কবর দিচ্ছে তার বিবেককে।

প্রবেশ অসাধ্য, তিনি এখন ফুলে ফুলে আধঢাকা হয়ে শুয়ে আছেন, কোনো এক হিট সিনেমায় জনসমক্ষে তার মৃত্যুর আগাম ঘোষণা দিয়ে। রুপালি পর্দায় উল্লম্ব ভঙ্গিতে শয়ান তিনি প্রত্যেক শহরে; লোকেরা সেসব ছবিঘরে আসে ছবি দেখতে নয়, নিছক কিছুক্ষণ থেকে তাকে বিদায় জানাতে। তিনি যেন তার সময়ের যমজ ছিলেন যখন তিনি কেঁপে উঠে সিগারেটে টান দিতেন ট্রেনে কিংবা কাঠের বেঞ্চিতে গোটা দেশ কলার খাড়া করে তার সঙ্গে কেঁপে কেঁপে উঠত। ফার গাছ আর বার্চ বৃক্ষের দেশে তিনি ছিলেন ঘরের রাজা, বৈকাল হ্রদকে কালো কাপড়ে ঢেকে দাও, যেভাবে আয়নাকে মুড়ে রাখা হয় শোকের সময়।

খাদ্যরীতি

আঙ্গুলে করে পিঠা খাও লবণে ডোবাও মুরগির ঠ্যাং, তোমার কাছে শুধু মিনতি : গানের দিকে হাত বাড়াবে না।

বয়মের তলায় হাত চালিয়ে আচার তুলে আনো, কিংবা ডান দিকে বসা তরুণীর পাছায় চিমটি কাটো, গানের দিকে হাত বাড়াবে না। সংগীত আর আত্মা সমার্থক। রুবল আর ডলার কুড়াও, তোমার হাত যতই পরিষ্কার হোক সংগীতকে কব্জা করতে যেয়ো না। প্রগতিমনা কিংবা প্রতিক্রিয়াশীল, আমরা সবাই বস্তুবাদী, সংগীত সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তু, জিব নয়, তাকে ছুঁতে হয় হৃদয় দিয়ে। ইচ্ছে হলে হাত দিয়ে স্যুপ খাও, কিন্তু প্লিজ, গান নয় তাহলে তোমার হাত ছিঁড়ে নেয়া হবে। তোমার হাতে সংগীতকে স্পর্শ করো না।
আলম খোরশেদ

আলম খোরশেদ

জন্ম ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৬০; কুমিল্লা। যন্ত্রপ্রকৌশলী, বুয়েট, ঢাকা। এই মুহূর্তে...বিস্তারিত