একটি উজ্জ্বল ভোর, নেমে আসছিল ঠিক পৃথিবীর এই প্রান্তে, বহু দেশে তখন রাতের অন্ধকার। নিশ্চিত কারণ, সবখানে এক সাথে রাত, এক সাথে দিন থাকে না কখনো। আমাকে ভোরের উজ্জ্বলতা ছেড়ে একটি রাতের রোশনিতে যেতে হবে, সমুদ্র গহিনে। কারণ এই যে— দাওয়াত দিল অক্টোপাস, তার বউয়ের বিয়ে, তুমুল আনন্দ হবে, সে-কথা জানাল পত্রে। বউয়ের বিয়ে! কেউ কি নিজের বউ, কোনোকালে বিয়ে দিতে চায়! চাইলে বিপদ, মানে, মানুষের সমাজেতে, অমন বিয়ের রীতি চালু নাই। মুখেও আনতে পারবে না, বউ বিয়ে দেবার তরিকা, না-থাকার ফলে। মানুষের মাঝে আছে, বিয়ে করে স্বামী-বউ হতে পারা। কিন্তু অক্টোপাস, আনন্দের সাথে, তার বউকেই অন্য ঘরে দিবে। এমন ঘটনা কেউ জানে নাই, কখনো হয়েছে বলে; আমাকেও নিমন্ত্রণ এর মাঝে। প্রশ্ন জাগে, কার সাথে বিয়ে দিবে, অক্টোপাস তার বউ? আগে জানবার উপায়ও নাই। যেতে হবে, বিয়ে খেতে, নির্দিষ্ট ঠিকানা, সমুদ্রগহিনে। সেখানে থাকবে, বহু সামুদ্রিক মেহমান; তারা আমাকে কিভাবে নেবে! হাঙরের দাঁত দেখলেই ভয় লাগে; ডলফিন তিমিকেও দাওয়াত দিয়েছে আসতে, আরো প্রায় হাজার অতিথি। যদিও কখনো, হাঙর ধরে খায় অক্টোপাস। হাঙরকে দাওয়াত মানে, শত্রুও আসবে খেতে। পত্রে লিখেছিল, কুদরতি হলো এই, সমুদ্রগহনে আমি খুব সহজেই, যেতে পারবার সুবিধা থাকবে, কোনো ভয় নাই, সামুদ্রিক প্রাণদের জন্যে খোদা, মানুষের জন্যে বরাদ্দ যদ্দুর স্থল, তার ঢের বেশি দিয়েছেন; ভয় নাই, স্থলভাগে যেই মতে, চলাফেরা, উঠাবসা, ঠিক তেমনই, থাকতে পারব, পানিদেশে, কোনো অসুবিধা হবে না আমার, সাহস রাখতে হবে। সিদ্ধান্ত নিলাম যাব, অক্টোপাস বউ, কার প্রেমে, তাও দেখবার বাসনা জাগল; বরটা দেখতে পাই যদি, এক ফাঁকে, জিগ্যেস করব— অন্যের বউকে, নিতে এলে কেন? এমন জিজ্ঞাসা রাখা, অনুচিত যদি হয়, তাদের সমুদ্র-প্রটোকলে! এই ভেবে থামলাম, ওই প্রশ্ন করব না। যাত্রা শুরু করলাম, সুরমা রূপসা নয়, কর্ণফুলী নদী খুব মায়া লাগে, চট্টগ্রামে, আমারও জন্ম সেইখানে, তাই কর্ণফুলী নদী ধরে, সমুদ্রগহিনে যাই, বিয়ের বাড়িতে। কী আজব জার্নি! মনে হলো পানির ভেতরে, উড়ে যাব, ওই মাছপাখির মতো, দুইদিকে দুই হাত মেলে। ইচ্ছে মোতাবেক তাই হলো। বঙ্গোপসাগর মোহনাতে পৌঁছি দেখি, এক পাল মাছকন্যা আমাকে থামতে বলে, আমি থামি। বলল আমাকে একজন, 'মানুষের পুত, সারওয়ারই আপনি, রাইট?' জবাব দিলাম, 'হুম'। তারা সমস্বরে বলে— 'স্বাগতম, আপনার সাথে আছি চলতে থাকুন।' চলতে চলতে মানে, জল-দুনিয়ায় উড়তে উড়তে দেখি, মাছকন্যা সব, আমাকে সামনে রেখে, দুই কদম পেছনে ওরা, যেন উড়ন্ত কাফেলা, আমার নেতৃত্বে, জলগর্ভে। আমি নেতা নেতা ভাব পায়ে দলি, তাদেরকে বলি— 'আসুন আসুন, পেছনে পেছনে আপনারা কেন? সমান কাতারে, একটা উড়ন্ত সরল রেখার মতো হই।' ওরা পরস্পর মুখ দেখাদেখি করে। কিছু কথা বলে, বুঝি নাই। একটু থামলে আমি, রেখা হয় বরাবর। আমরা সমান তাল মাত্রা গতি লয়ে, সমুদ্রের গহনে ছুটতে থাকি। ফুটফুটে, টানাটানা, পাতা রং, লাল নীল সবুজ হলুদ, বহু মিশ্রণ রঙের, পরিচ্ছন্ন কারুকাজ বেশুমার ছোট বড় মাছ। কেউ যেন চকচকে নীল সিল্ক ছায়ামায়া, তার মাঝে ময়ূরপালক দিয়ে সাজানো গোছানো। জেব্রাদের মতো দেহ-রং কিছু আছে, রয়েল বেঙল টাইগার— ঠিক তার দেহের রূপ, ডোরাকাটা মাছ, নিশ্চিন্ত বেড়ায় ঘুরে। এত জাত প্রাণের মেলাতে, এত এত রঙের বাহারে, এক চিজ দেখা যায়— বহু জাত বহু রং, পৃথক পৃথক, তবু যার গর্ভে তারা সব, সে হলো সমুদ্র; আর সমুদ্রজলেই সকলের প্রাণ। সমুদ্রেই হাসি কান্না প্রসঙ্গের পালাক্রম। সমুদ্রের দুঃখের সাথে, সমুদ্রের আনন্দের সাথে, সামুদ্রিক প্রাণদের বোঝাবুঝি আছে। আমার পাশের মাছকন্যা, হঠাৎ দেখাল এক দৃশ্য, অবাক হলাম! একটি টিলার পাদদেশে বুনো স্থানের মতন যেন, নীল জোছনার আলো, তার মাঝে বসা চুপচাপ বিশালাকৃতির এক মানুষ। মাছকন্যা জানালেন ইনি সমুদ্রদেবতা পসেডান, অন্ধ কবি হোমার তাহাকে জানতেন। এই পসেডান গ্রিক বীর ওদেসিয়াসকে শাস্তি দিয়েছেন, যাতে প্রজ্ঞার রহস্য বুঝে নিতে পারে পসেডান। ভয় এল কিছুটা মনেতে, আমাকেও যদি শাস্তি দিতে লাগে! মাছকন্যা জানালেন, আমাদের সাথে তার সাক্ষাৎ হবে না। সময় কতটা গেল জানা নেই, কত কিছু দেখলাম, অবশেষে পৌঁছলাম, দক্ষিণ গোলার্ধে, সেই ঠিকানায়, প্রশান্ত সাগরগর্ভে। ইতোমধ্যে জানতে পেরেছি, অক্টোপাস নিশাচর, প্রজ্ঞাবান, বুদ্ধিমান, একা এবং বহুমুখী। এক অক্টোপাস, জায়েন্ট আকার, 'আসুন আসুন বন্ধু' বলে, তার আট হাতের একটি, বাড়িয়ে আমাকে, স্বাগতম দিল। সবুজ পাহাড়ি, ঘাস ঢাকা, উপত্যকা এলাকাটি, ফুলের বাগান নয়, কিন্তু নানা রং ফুল ফোটা দৃশ্য চারপাশে, বহুবিধ রং মাখা, সামুদ্রিক প্রাণী, অনবদ্য শিল্পকর্ম, প্রাণীদের শরীরে মুদ্রিত, ধবধবে শাদা, কিছু প্রাণ বিস্ময়কর! জলজ জীবন পরিবেশ, এতই সুন্দর! নীলাভ আলোয় ভরা। কিসের কারণে এই আলো! বুঝবার সাধ্য নাই। আমি জলে নেই টের পাই, যেন আমি এক গোলাকার, জলহীন বলয়ের মাঝে, স্বাভাবিক, বাকি সব অতিথি পানিতে দেখি। এমন মধুর অভিজ্ঞতা! হৃৎপিণ্ড যেন, এমন আকৃতি সামুদ্রিক লতাপাতা ঘেরা, একটি ঘরের মতো, পরিপাটি, যেন কারা সাজিয়ে রেখেছে। ওখানেই পাত্রী আছে। বর কই? এই প্রশ্ন আমার মাথায়। এরই মধ্যে সামুদ্রিক ঘোড়া দল, সংগীত গাইতে লাগে, সমস্বরে। এমন সুরের ঢেউ! এত মগ্ন নিবেদন! মনে হলো, কিছুই আলাদা নয়, মহাবিশ্ব একাকার, এক সুর ঐকতানে, চেনা সুর নয় তবু, এত মায়া, এত ছায়া, সঘন অনিন্দ্য! তুমুল মিশ্রণ যেন, সব কিছু স্থির, ডুবে থাকা মূর্ছনাতে, সুরে সুরে মুখরিত উৎসব, মিউজিক ছাড়া, বিস্ময়ে আনন্দে আমি আত্মহারা। আজব আজব সব সামুদ্রিক মাছ আর নানা রং প্রাণ, ঢেউ রেখা তৈরি করে নাচতে নাচতে। প্রাণোচ্ছল এইরূপ, এলোমেলো, শৃঙ্খলা এমন হতে পারে, ভাবি নি কখনো! জানিবার স্বাদ হলো— কেন তারা এত আনন্দিত? মানে, বিয়েতে এতটা খুশি কেন? সকল প্রশ্নের সমাধান, আসে না জগতে, যখন তখন; আর জবাবও রেখে যায় প্রশ্নের সুযোগ। এতে আছে জীবন মৃত্যুর মর্ম পাঠ। আসে প্রাণ, আসে প্রশ্নোত্তর এই স্থানকালে, থাকে কিছু কাল, তারপর যায়, যেতে হয়, ধারা বহমান। তারপর, ধুমধাম খাওয়া-দাওয়া, যার যার গোত্রীয় পছন্দ মতে, রাখা আছে আগে থেকে, সব মিলে বিয়ের খাবার ফুর্তি করে খায়; আশ্চর্য আশ্চর্য লাগে! মানুষের মতো সংস্কৃতি চর্চা! একটা মানুষ নাই! শুধু আমি আমন্ত্রিত মেহমান। কেউ কেউ আমার দিকেও চায়, খেতে খেতে। তারাও নিয়ম মানে, যদিও দেখতে এলোমেলো। এক পাশে দর্শক-গ্যালারি যেন, বালু কাটা সিঁড়ি। কিভাবে এমন রূপ! কার দ্বারা এমন পরিপাটি শিল্পের মহিমা গাঁথা! অতিথি তিমিরা বেশ দূরে। তিমিরে দেখিলে মনে পড়ে ইউনুস নবিরও কথা। কিছুকাল নবি ছিলেন তিমির পেটে। আমি বলয়ের ভেতর পেলাম, এক ডিশ নানাবিধ সুস্বাদু সী-ফুড; কার দ্বারা রান্না, পরিচ্ছন্ন বাটি থালা আজব কিছিম, জীবনে কখনো দেখি নাই! সামান্য খেলাম, ভয়ে ভয়ে, যেন কেএফসি'র ফাস্টফুড, ঘ্রাণযুক্ত, তাও বুঝলাম। এল মূল পর্ব তারপর, অক্টোপাস বউয়ের বিয়ে হবে, এখনো বরের দেখা পাই নাই; খুশিতেই বিয়ে দিবে অক্টোপাস, নিজেরই বউ। কিছুক্ষণ পর, ধীরে ধীরে, হাসি চোখে, যার বউ, সে এল আমার কাছে। বলয়ের ভেতর বাড়িয়ে দিল আট হাতের একটি। 'শুভেচ্ছা শুভেচ্ছা স্বাগতম আপনাকে!' বলে, বলল গোপন কিছু কথা, গভীর আবেশে। আমি হতবাক! আমি মরি মরি! ওরে হায় হায়! আমি নাকি বর! কোনো মোহর জরুরি নয়, আমাকেই দিবে তার বউ, আমার জীবনে সে আসবে মানুষরূপেই! চুপচাপ হই, কথা খুঁজে পাই না মোটেই! মেরে ফেলবার ফন্দি কি না! ভাবলাম, আর বুঝি স্থলভাগে, যাওয়া হবে না হায়! চিন্তা পাঠ করে অক্টোপাস বলে দিল— 'না না না না, ভয় নাই, মানুষের পুত, আমরা তোমার বন্ধু, শুভ যোগে সায় দেই, ক্ষতি করি না কখনো, আমরা ভুতও নই। মানুষদের কেউ কেউ, ভয় পেয়ে আমাদের আদল-সুরত, অনর্থক, ভুল ব্যাখ্যা করে। ডেভিল ফিশ কে বলে আমাদের? নিশ্চিত মূলত যারা ভয় পায়। ভয়ের কারণে, যুগে যুগে, মানুষ সহস্র ভুল কর্মে ডুবে যায়। তার মানে এই নয়, মানুষেরে তুচ্ছ জ্ঞান করি। নিশ্চিত মানুষ মাননীয়। ভুল করে শুদ্ধও করতে পারে। যেইটুকু শুদ্ধ ধরে, তাতেও ভুলের পরিমাণ কিছু থাকবার সম্ভাবনা রয়। শুধু বিনয়ের সাথে বলি অক্টোপাস সম্পর্কে মানুষ, যা কিছু জেনেছে, তার সবটুকু খুব কম, অধিক অজানা। ওই ডানাঅলা মাছকে ডেভিল বলে কেউ কেউ! ঠিক না ঠিক না, খুব হাস্যকর! মানুষও রাগ করে গালি দেয় মানুষকে—শয়তান। নিজেরই মতলবে অন্যরে লেবেল দেয় শয়তান। দেখা যায়, যারে লেবেল লাগায় 'শয়তান', তার মাঝে 'শয়তানি' নাই, যার দ্বারা লেবেল লাগানো, তার মাঝে 'শয়তানি'। সারাক্ষণ 'শয়তানী' থাকে না মানুষে। 'শয়তানি' 'ভালো কাজ' উস্কে দেয়, এবং এক অন্ধ আরেক অন্ধকে বলে অন্ধ। প্রত্যেকটি বস্তু আর প্রাণী, মানুষের জন্যে প্রতিদিন নব নব আবিষ্কার, আর নিজেকে বুঝতে পারবার পথ।' আমি বললাম— 'আপনি অনেক জানালেন।' জবাব দিলেন— 'আমি কিছুই জানি না। আমি... আমি কিছু না কিছু না, মান্যবর, প্রাণীদের মধ্যে যাদের রয়েছে প্রাণরক্ষা-ভীতি তারও একটা মর্ম আছে। আমারও প্রাণভয় আছে। খুব দ্রুত পালাতেই হয়, ঈল আর হাঙরের ক্ষুধা থেকে বাঁচবার জন্যে। অথচ বাঁচি না অবশেষে, মানে এই জীবনের রূপ থাকে না, প্রজন্মের বীজ রেখে ইন্তেকাল করি। স্থলভাগে বনের হিংস্র সিংহ আর বাঘেরাও ভয় পায়, যদিও প্রবল শক্তিশালী অন্যদের তুলনায়। দেখতে পেলাম, ওই হৃৎপিণ্ড ঘর থেকে বের হলো, এক অক্টোপাস, ধীরে ধীরে, আমারই দিকে। আমি স্তব্ধ! কী হবে আমার এখন! বুঝি না বুঝি না, কেন যে অমন, হায় হায়, ফেঁসে গেল জীবন আমার! ধীরে ধীরে, কাছে আসে, তারপর, পলকেই দেখি, বলয়ের ভেতরে এলেন, এক নারী অপরূপা! হাসি হাসি খুশি খুশি, পোক্তা প্রণয়ের মর্ম সাথে যেন, মনোহর; আমি শুধু, সমুদ্র গহিনে, এলাম বলেই, অনুপম উপহার! অমন সুন্দর মুখ, হুঁশহারা আমি, দেওয়ানা দেওয়ানা। মহাত্মা রুমির কথা মনে এল, বলেছেন, 'নারী আলো-রশ্মি পরম খোদার'। জায়েন্ট আকার অক্টোপাস, বললেন— বিদায় হে বন্ধু, সুখে থাকো। পাখির মতো তিন মাছ উড়ে এসে, বিয়ে পড়ালেন—'পাতাকুশি বিমাতুন, পাতাসুক পাতাসুক'। কিছুই বুঝি নি আমি! শুধু বললাম—'হুম' ডানাঅলা তিন মাছ এক সাথে বলে দিল—'মানুষের পুত, মান্যবর, বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। শুভ যোগ সাথে নিয়ে আপন দেশেতে যান।' ফেরবার পালা, নির্দিষ্ট পথের কথা নাই, যেদিকেই যাব, সেদিকেই পথ হবে, ফিরবার। সমুদ্রের গর্ভে সকল পথেরা সমুদ্রময়তা ধরে। বলল সুন্দরী— 'সারওয়ারই নিশ্চিত আপনি, হতবাক বুঝি! ধরাতে বিস্ময় ভরা!' জানালো আমাকে। আমি তো আগেই জানি, দুনিয়াদারিতে আছে, দুই চার ছয় আনা বুঝে চলতে থাকা, কখনো হয়তো আট দশ থাকে; ষোল আনা নাগালে থাকে না। দৃশ্যদের ভাঁজে ভাঁজে হতবাক হওয়ার উপলক্ষ। বললাম তাকে— 'কী নামে ডাকিব আপনারে বউ?' জবাব দিলেন— ''নামেতে কি আসে যায়, যে-নামেই ডাকবেন নিকটে পাবেন খুব। না-ডাকলেও আছি; যেমন না-পেলে ভালোবাসা কবি কখনো প্রেমের কবিতা লেখা থামিয়ে দেন না। ভাষার ভেতরে ভালোবাসা সীমার ভেতরে সীমাহীন, কিছু জ্বলজ্বল বিকিরণ এর মাঝে কবি আর কবিতার মর্ম অফুরান।'' কিছুক্ষণ চুপ, চোখে হাসি, বললেন— ''বউ না বউ না আপনার, অক্টোপাসেরও বউ ছিলাম না। সে জানে তারই বউ ছিলাম। খুব ভালো তার আচরণ। বউ রূপে প্রকাশ পেলাম, ধরিত্রীর রংমঞ্চে, সারাক্ষণ সাথি আপনার আজ থেকে, হাত বাড়ালেই নাই; তবে আছি, আছি খুব কাছে কিন্তু নাই, এমনই আমি এমনই আমি এক...'' 'তার মানে? আপনার পরিচয়?' প্রশ্ন করি। বললেন ছোট্ট হাসি দিয়ে— ''আমাকে কী রূপে দেখছেন? আপনার চোখে মায়া আছে বেশ।'' জবাব দিলাম— 'আপনাকে নারী রূপেই দেখছি? নারী নন? আগে তো ছিলেন অক্টোপাস। কেন তবে আমার জীবনে আসলেন?' বললেন হাসিমুখে— ''নারী ঠিক আমি কিন্তু অন্য ধরনের। ত্রিমাত্রিক দৃষ্টি দ্বারা ধরলেন শুধু, বস্তু স্পর্শে পাওয়া যাবে না। তার বেশি আর কিছু জানি না জানি না। শুনুন প্রিয় হে, ইংরেজি কথা—অক্টোপাস টেইকস পার্ট অন মেনি লেবেলস, দে হ্যাভ অ্যান্ডলেস এ্ট্রিবিউটস।'' 'একটি কবিতা বলি?' ওর প্রশ্ন। বললাম—'হুম অবশ্যই'। পড়লেন— ''নিজেকেই স্পর্শ দিতে অন্য স্বপ্নে যাও তবু হয় না যাওয়া, তবু হয় না পাওয়া কেউ যায় নি কখনো, কেউ পায় নি কখনো কোনো অন্য, কোনোখানে। এইখানে ক্লোরোফিল আছে, রোদ আছে সালোকসংশ্লেষণ অনিবার্য অথবা না বয়ে যায় কাল, বয়ে যায় তত্ত্বদের ঢেউ যেতে থাকে লীলাচূর্ণ ছোঁয়া। নিজেকেই স্পর্শ দিতে, নিজেকেই স্পর্শ দিতে থাকা, বার বার, ঘুরে ফিরে, বহু রূপে বহু রং, জনম জনম, অন্তহীন অবিরাম।'' বিস্মিত হলাম আমি! ওর কাছে প্রশ্ন রাখি— 'নিজেকেই স্পর্শ দিতে, নিজেকেই স্পর্শ দিতে থাকা'! একটু বুঝিয়ে দিলে ভালো হয়। আপনি কবিতা পড়লেন! শিখলেন কোথায় কবিতা? আর দেখি অনেক অনেক জানা আপনার! সমুদ্রে ভার্সিটি আছে! আমার সম্ভব নহে আপনাকে বুঝে নেয়া! কিছু আগে আপনি ছিলেন অক্টোপাস, এখন সুন্দরী নারী! আবার সুন্দর আবৃত্তি কবিতার!' জবাব দিলেন— ''আপনার হৃৎপিণ্ড কি করছে দেখুন একটু, পাম্প করে পাম্প, রক্ত সঞ্চালন হয়, রক্ত সঞ্চালিত তাই হৃৎপিণ্ড পাম্প করে। নিজেতেই ঘুরে ফিরে চলে ও চালায়। এর মাঝে মর্ম আছে। নিজেকেই স্পর্শ দিতে নিজেকেই স্পর্শ দিতে থাকা। এই দুনিয়াতে শুধু বুঝে নিতে হয় মজা, আর মজা নেবার ফিকির। পুনরায় বলি, আমি জানি না জানি না আমার আসল পরিচয়। বুঝে নিন, মান্যবর, আমি আনপ্রিডিক্টেবল। আর সমুদ্র সমগ্র পুরো এক ইউনিভার্সিটি, সব কিছু পাঠের বিষয়, পাঠবস্তু আর দৃশ্যও পাঠক, একে অন্যে নিশিদিন নিরন্তর। তারপর উড়ে উড়ে জলগর্ভে, ফিরলাম এক সাথে স্থলভাগে, কর্ণফুলী পারে, তখনও ভোর, অনিন্দ্য উজ্জ্বল ভোর।