পাণ্ডুলিপির কবিতা : ধানমন্ডি হ্রদ

ধানমন্ডি হ্রদ

  জন্ম যদি অনিবার্যতর পৃথিবীর গোলোক আবাসে মৃত্যুকে ততোধিক উপেক্ষা করাই শ্রেয়তর তার সম্ভাবিত আগমনে আমাদের কোনো স্তব্ধকরণ মন্ত্র জানা নেই। সময়, স্রোতের অনন্ত উৎসে ভাসমান আশ্চর্য প্রহেলিকাময় যদিও জন্ম-মৃত্যুর সহোদর ধন্দ লেগে আছে ধন্দ লেগে যায় আমরাও একই খেলা খেলি, তিনি খেলনা শিকারি মহাজন বনগুলোতে আলো, বনগুলোতে অন্ধকার উজানভাটির পুনরাবৃত্তিময় স্রোতসকল মুখস্থ বিদ্যায় লিখে চলে প্রকৃতির নিয়মের পৃষ্ঠাগুলি— আমরা দেখি, দেখতেই থাকি, আমাদের দেখায় কী আসে যায় স্রোতের প্রান্তবর্তী পর্বতশীর্ষে অলৌকিক ঘূর্ণি অবয়বে সকলেই দেখে এই আমিই আলোকোজ্জ্বল এই আমিই জ্যোতিপূর্ণ আমার প্রসারিত দুই হাত ঊর্ধ্বে বাড়ানো আমার এক হাতে সূর্যোদয় অন্য হাতে চন্দ্রাবসান আমরা ঊর্ধ্বমুখী, কিছুই দেখি না—তুমি চক্ষুষ্মান তুমি আমাদের আয়ু দাও, মহাজন শুধু পুরোটাই চিনতে দাও নি মানুষের মন— আমরা যদিও একসাথে থাকি কিছু কমন ফ্যাক্টরে তবুও পরস্পরকে বুঝতে বুঝতে আমাদের দিন চলে যায় আমরা সকাল দেখি আমরা দুপুর বুঝি আমরা সন্ধ্যা এবং রাত্রি জানি শুধু মানুষকেই বুঝি না, যেমন নারীও অগম্য বোধের। হাতের তালুতে অজস্র রেখা, রেখাগুলি সব তো আমি চিনি না অদৃৃশ্য মায়াবলে মিশে থাকে যে জীবন—সেও তো যাত্রীবাহী বাসের আয়না বৃষ্টিকালে আমাদের বেশি দূর দৃষ্টি চলে না তবে কি আমাদের কোনো লক্ষ্য নেই, জীবন কি অর্থহীনতার পিছনে ধাবমান কিছু? নভোমণ্ডলে মহাজনের কারখানায় বিরচিত চিত্রনাট্যে আমরা চলি, বলি, করি আর ধানমন্ডি হ্রদ দেখে দেখে বড় হই লক্ষ্যের সন্ধানে— কর্তিত-খণ্ডিত সত্তার আমি কিছু নই, আমি পূর্ণতর মানুষ এই মতো মর্যাদা আমাকে দিও মহাজন আমরা সকলেই তোমার নভোমণ্ডলের পূর্ণতার; লক্ষ্য সন্ধানে এখানে এসেছি লক্ষ্য আছে লক্ষ্যহারা ছন্নছাড়া—চতুর্দিকে কারার প্রাচীর দূরমায়াবী শিকল সকল ধকল বহা দ্বন্দ্ব কালের— এই নিশুতির স্বপ্ন ভাঙা রাঙা উদ্যানে একলা চাঁদের গান সঙ্গিনী তার নিছক ভূমণ্ডলে সকাল আসে, রোদ-সূর্যের ক্রমিকে পাখিরা জাগে অতি প্রত্যুষে ভোরেরও আগে বিষণ্ন প্রকৃতি পাখিদের কাছ থেকে এই ভোরটুকুই ধার নেয়। আর নিয়তির ডাক হরকরা কড়া নাড়ে দরজায়, সূর্য ধার নেয় চাঁদ সেই কোন কাল থেকেই জ্যোৎস্না বানাবে বলে বড়ই অস্থির আকাশ ধার নেয় মেঘ—সেইক্ষণ থেকেই রাত্রি গভীর কবির চিত্তে অন্তরা সঞ্চারী মীড় নাটোর উড়িয়ে নিচ্ছে নীড়ভাঙা চোখ আর বনলতা সেন নইলে অপূর্ণ এই লেনদেন, শ্মশান ছাইয়ে মাখামাখি আকাশের বৃদ্ধাঙ্গুলি খুলিতে এবার মদ ঢালুন লর্ড বায়রন রণঢাক দ্রিমিকি দ্রিমিকি দ্রাক জংলি ও নজরুল, ফুল সবারই প্রিয়— ম্রিয়মাণ একটি এমন রাতে বুকে বহমান আপন আপন অঙ্গন শোভা হয়ে ধানমন্ডির হ্রদ ওই পারে রায়েরবাজার বধ্যভূমি, রক্ত অশ্রু বিশদ এই পারে মানুষ আজন্ম মুক্তিকামী, কেবলই ভালোবাসে পাপ! সাপ জীয়ন্ত—বরাবরই ওঝার প্রিয় লাঠি অক্ষুণ্ন একই জীবিকার। মা’র হাতে বানানো খাবার—কত দিন, কত দিন ভাজি ভর্তা ভাত আলু চিংড়ি ইলিশ অমৃত কী রকম, বুঝি বুঝি সাধ্যকৃত বাজারের থলে হাতে ভালোবাসার রিনরিন কথার মাতৃমূর্তিখানি, ধানমন্ডির হ্রদে নিভে যাচ্ছে রোদে গলা চাঁদ ভাড়া বাড়ির ছাদ বরাবর গাছের ডাল : কাল বৃক্ষে গজাবেই ফল আর জমিতে হাল লাঙল নাল, ঢাল ভাঙা চূর্ণ তলোয়ারে ওহে, নিধিরাম সর্দার গাঁয়ে না মানা আপনি মোড়ল শোরগোল শেষে এক স্তব্ধতা অসীম... আপন বিবরে বিভোর চ্যাংদোলা রাতে বিদ্যমান সসীম হ্রদ ধানমন্ডিতে সাত রাত ছয় দিন ঋণহীন একলা জীবন, বাকি একরাতে সাজাব বাসর ঘর জুড়ে ডাংগুলি ফুর্তির ছেলেবেলা কাল শাল গায়ে শীত বউ, উষ্ণ হ্রদের কিনারে এক স্বপ্ন-উত্থাপিত জর্নালে লাল শাড়ি বেনারসি অসীম স্বপ্নের গান ধানভানা শিবের গীত ‘তিতাশ একটি নদীর নাম’ ঋত্বিক বহমান ধানমন্ডি হ্রদে একলা বনের মতো। রাতের কতটা বাকি, কখন সকাল হবে ? মানুষ মেশিন হলে ছিটকে পড়বে দ্রবীভূত হৃদয় সমূহ সংকটে এই তীর্থ উঠোনে আমাদের কবির সাদামাটা ঘর, একটি লক্ষ্যে ধাবমান হ্রদ ধানমন্ডির— ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে মুঠোভর্তি সাহস নিয়ে গুলির মুখোমুখি যখন তিনি তখনই কেঁদে ওঠে ভোরের পাখিরা, দিগন্ত ছুঁয়ে উড়তে থাকে উদভ্রান্ত বাতাসের বিলাপ ফোঁটায় ফোঁটায় নেমে আসে উপর থেকে আকাশের নীল রং সেই থেকে বজ্রাহত আমাদের অন্তর্লোক আজও ঘোর স্তব্ধতায় রোরুদ্যমান, আজও ডুকরে কাঁদতে থাকে নিঃসীম প্রান্তরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা অনন্ত বিবেক; লাল রক্ত অশ্রুসজল ধানমন্ডির হ্রদে এসে অবশেষে মেশে, ৩২ নন্বর বাড়ি সেই থেকে আমাদের ধমনী স্পন্দনে অবিরাম। এই বাড়ির সামনে দাঁড়ালেই আমার শরীর শিরশির করে কেঁপে ওঠে আমি স্তম্ভিত বিস্ময়ে প্রতিবারই আকাশ দেখি, এই বাড়ির সামনে যতবার দাঁড়াই ততবারই সমুদ্র বাতাসের ঝাপটায় আমার ভিতরটা আর্তনাদ করতে থাকে : কৃষ্ণ গহ্বর থেকে উঠে আসা সরীসৃপের নিঃশ্বাসে দগ্ধ বাংলার প্রান্তরে ঘুমান তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। বাড়ির কাজের মানুষেরও কিছু মায়া থাকে এইখানে সেনা-সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিতান্তই তার বিপরীত। এইখানেই বাতাসে ভাসে তাজা বারুদের ঘ্রাণ শিশু-নারী-পুরুষের রক্ত মৃত্যু অশ্রুপাতে ঘাতকের নির্বিকার উল্লাস। আমি উল্টোঘূর্ণনে দেখি ইতিহাস বিকৃতির অবিমৃশ্যকারী সূচনা আত্মার ক্রন্দনে সেই থেকে আমি অভিশাপ দিয়ে যাই— এভাবে ঘুমানোর কথা ছিল না জাতির জনকের! দেখ, দেখ ঐ তো ঈশান কোণ মা-বাবার ফোন দীর্ঘপ্রান্তরকে উড়িয়ে নিয়ে আসে ত্রাসে নয় পাখিরা আনন্দে পাগল, ফুটবল চ্যাম্পিয়ন আবাহনী—রনি, রনি, যাসনে ওখানে ভাঙচুর-মারপিটে আহা ছেলেটা গেল কই? হট্টগোল গুলি গ্যাস লাশের স্তূপে অপরাজেয় বাংলা মানে ভার্সিটি মানে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ইট কাঠ প্লাস্টার সিমেন্ট; ডাস্টার হাতে ন্যুব্জ ম্যাজিসিয়ান তিনি কী শেখাবেন ভালোবাসা মানুষের কোনো বুদ্বুদ নয়? সেই বিরতিতে তীব্র টিয়ার গ্যাস পানি জমা চোখে ফারাক্কার বাঁধ নেই, ওই উদ্গত অশ্রু আত্মীয় বিধুর পরিজন স্মরণে। হ্রদ-ধানমন্ডি চলমান বর্জ্য উপকরণে পূর্ণ ক্ষরণ ব্যতীত পৃথিবী উর্বর নয়, রুমের আড়ালে গ্রিনরুম—সুস্থতার অভিনয়ের অজ্ঞতায় মুষড়ে পড়ার মানে জানে না কেউ কেউ প্লিজ পর্দা ফেলুন—প্লিজ ড্রপ...  ড্রপ সিন। আলোর বেলুন মঞ্চে—চলুন, চলুন ওদের মতন চিনচিনে বেদনায় উড়বার আগেই আকাশে ফুটটুশ ফাটব না। আমাদেরও কিছু ঋণ স্বপ্ন দেখার, উশখুশ প্রয়োজনে কারবারীর না আসাই ভালো— জোৎস্নার কালো আড়াল ছেড়ে খানিকটা অবসর হইচই কারো পাকা ধানে দেই নি কখনো মই কই, ওগো শর্বরী রাধিকা চর্যা নায়িকা শ্রমণভিক্ষু রমণ ভালো, ভালো তার আয়োজনে চিনচিনে হৃদয়ের উপশম ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য’ সূর্যের মধ্যগগন ধানমন্ডির হ্রদে... পদে পদে বালির চোরা ফাঁদ, চাঁদ কতটা অসহায় শুধু আকাশই জানে তা জানে না ভূমণ্ডল—মানুষ, ফানুস ওড়ানোয় দক্ষ বাজিকর ঘর, একটি বালিশ, জোড়া জোড়া ঘুম নিজুম একলা প্রতিবেশী মশাদের ব্যর্থ আনাগোনায়, শোনা গেছে ধানমন্ডি হ্রদে আগের মতো আর নামে না বিকেল, ফেল করা এসএসসি পরীক্ষার্থিনী ধ্বংসের কিনারা নয় সে তবু দোল খায় কিনার ধরে; খেতে খেতে দোল ভারসাম্য দোলক টপকেই দ্রুত সে স্বপ্নকে সাজায়... চিল বাজায়, বাজাক না ডানা ছন্দের গতিতে আকাশে বন্দিবিহীন শঙ্খনীল কারাগার, ভরা ও মরা কোটালের টানে অন্তহীন মহাশূন্যের গান ওইখানে পাহারাদার নিরুপায় দেখতে থাকে নিচে বয় ধানমন্ডির হ্রদ আমারই বুকে আলো চকচকে আবশ্যিক বরাভয়— অভিনয় বলি না তাকে, বাকি একরাতে সাজাব বাসর, বাজি ধরছি শূন্যতা ভাঙার, ডিগবাজিতে ঝংকৃত অশ্বক্ষুরের দ্যোতনা যদিও ফাৎনা অনড় তবু গুটোয় না সুতো মৎস্যশিকারি ভয় পায় ভুতও—ডুববে না, স্বপ্ন নাও, ধরো চাও জানি, খণ্ড নিরিবিলি একটু অবসর এটাই সেই অতিনন্দিত সুখবর ভর্তি পকেট বুক, কবিতার পঙ্‌ক্তিতে অ-যতির জীবন ভোর দাওয়াত পায় বনমোরগের ডাকে— নীড়ভাঙা বাজনার শব্দে ফের অন্ধকারের মুখোমুখি বনলতা সেন। জীবনানন্দের সংসার ধানমন্ডির হ্রদে ভাসমান নয় কোনো, এই আকস্মিকেই সকল উন্নাসিক যাক উচ্ছন্নে আমার জন্যে থাকুক শুধু ধানমন্ডির হ্রদ, বুকভরা জলে কালের কল্লোল। প্রজ্ঞার টোল থেকে পালানো পণ্ডিত আমি রৌদ্রের ঝিকিমিকিতে পাই দূরযাত্রার ধ্বনি। সেইখান থেকে সময় ডিঙিয়ে ব্যাধ আমাকে সঙ্গে নিয়েই যাবে, খাবে না ঘুষ সে যদিও-বা আমার ফুসফুস তার রিমোট কন্ট্রোলে। আগন্তুক সে ধাপে ধাপে আগুয়ান ধানমন্ডি হ্রদের বুক চেরা কিনারায় শস্যের ফলন; দখলদার উচ্ছেদ যদি হয় দলন মুছে গিয়ে আসবে জলের কল্লোল স্বপ্নের বাতিঘর একটি ঘর বালিশ একজোড়া জোড়া ঘুম নয় বুম ফুৎকারে উড়াধুরা— জলাঙ্গীর বুকে ডোবা সম্পদ যদি নাও চাও, চাবে তো বটেই ঠিকানাবিহীন তিনিই ঈশ্বর মাঝে মাঝে আসেন আমার ঘরেও ভাসেন পাদ্রীর কথায় ধর্মগ্রন্থের অক্ষরে এতটা সুনামের কাঙাল তিনি আমি মানি ঢের। ফের শস্য ডানা মেলা যুবতী ফড়িং রিং করে রিসিভার থ্রুতে বারবার হ্যালো হ্যালো হ্যাঁ, আমি তার কথাও ভাবি— চাবি চলে গেছে প্রচণ্ড বিরহ তাপে, মরচে পড়া ঝাঁপ খুলবার দিন কি আছে আজও! ভাবি তাকেও; সেও কল্লোলিনী হতে চেয়েছিল ধানমন্ডি হ্রদের ওদেরও স্মরণ করি, গড়ি যে উদ্যান তার আজ বুঝি ভগ্ন কারুকাজে লেপ্টে থাকে বেদনার ঝাঁঝ; তাকেও প্রথম সে চুমু রবীন্দ্র উপন্যাসের নায়িকার নামে নাম কুমু ঝুমুর ঝুমুর হাতে পায়ে জীবন ছন্দ শ্যামলীর শিশুর ; ব্রা’র বন্ধনে প্রথম জেনেছি যাকে তাকেও প্রণাম নাম, সমস্ত নাম—যাক ভুলে যাওয়া যাক বাঁকের সম্মুখে জল ঘুরে যায়, এদিক ওদিকে সর্পিল প্যাঁচে বহমান ধানমন্ডির হ্রদ বর্ণিল ঝকমকে একটা বিকেল আর চা একজোড়া কাপে পাশাপশি বারান্দায় দিলখোলা বাতাস আর অন্তরের আকাশ থেকে চুয়ে পড়া ফিলিংস; আরও সত্য বাস্তবের বৃষ্টি বাতাস চালচুলোহীন ভবঘুরের আশ্বাসে বিকারগ্রস্তের নির্ভীক বেদনা চঞ্চল; অঞ্চল রয়ে গেছে নিভৃত নদীর বহুদূর গুপ্ত উৎসে আমাকে চিনবার অবকাশ তার কোনোদিন হবেও কি শেষ, দেশ আমার হৃদয় মৃত্তিকা তার সার ওইখানে দুগ্ধবতী নারী আর শিশুদের মা। ওইখানেই আমি, আন্দোলিত ইতিহাস— নাশ করো সকল অপমান, বাস করো স্বপ্নকর্ষিত চেতনে হাঁস রোস্ট করো শীতের রাত্রিতে বাঁশবাগানে উঠিয়ে দিও কাজলা দিদির চাঁদ উন্মাদ দিনগুলো স্বপ্নদের তাড়িয়ে দিচ্ছে—বাধা দিও বাদ বিসম্বাদ ধুলিধূসরিত দিন। তার থেকে বাষ্প করে দাও, উড়াও। জনারণ্যে সাক্ষী তুমিই হবে কবে কি করে সব কিছুই ধারণকৃত ধানমন্ডির হ্রদে! বনেবাদাড়ে হাটেবাজারে নৌ ও হাওয়াই বন্দরে আর দোতলার বারান্দায় সর্বত্রই পদচ্ছাপ তার যার নামে উদ্গত অঙ্কুর শোভায় ভালোবাসবার ঋণ আমার অধরা দিন কার দেহের টইটম্বুর বর্ষাপ্রবাহে অবগাহনের অপেক্ষায় চিনচিনে বেদনায় বীজবোনা বুক হয়— সুখ খাঁচামুক্ত পাখির স্বপ্নের মতো প্রেমকীর্তিত কোনোকালে; ঘরের চালে চালকুমড়ো পুঁই ডাটা এপার্টমেন্টের আরও উঁচুতে সাদ্দাম যুগের সেই সিএনএন খবর পাঠিকার প্রিয়দর্শিনী মুখ ধুকপুক মানে ভালোবাসা; উন্মুখর রাত্রিরও মানে তাই সম্মুখীনে হাওয়ায় উড়তে থাকো প্রেম ফ্রেম বাঁধাই ছবি যদি দেখো, হয় নি আঁকা বলে করো না উৎপাত আদম কোনোকালে কেবা দেখেছে কবে! বলো, বলো ধানমন্ডি হ্রদ, বলো বাসনাগুলি, বলো জন্মান্তর, বুক আমার রুখো, উস্কো মুখাবয়ব জানো সমস্তই, বলো চিত্ত বিক্ষেপে জানে সকলেই আমার এই বুক ধানমন্ডির বহমান হ্রদ, এই হ্রদের উপরেই হুমায়ূন আহমেদের সেই বিখ্যাত শঙ্খনীল কারাগার আমাদের সকলের গ্লানি চিলের পাখনায় উড়ে যায় হ্রদের পাড়ে নিতান্তই পলিমাটি আর গভীর জলের মাছ ছুঁ মন্তরে ছুঁ কেউ বলে নি। মুণ্ডুমালা কাপালিক, জটাধারী সন্ন্যাসী নেই গাছ দু’পাড়েই—সুপুরী, ডাব গাছ, ক্ষিপ্ত কাঁটালতা ঝোপঝাড়, দু’একটা কুঁড়েঘর কিম্বা আচানক তারই পাশে একদিন বৃক্ষমুণ্ডু ছাড়িয়ে উঠে যাওয়া ছ’তলা বিল্ডিংগুলি সাজানো ফিল্ডিং নিয়ে মাঠে সাদা পোশাকের ক্যাপ্টেন আছে, আছে আরো দু’দল ক্রিকেটার— মার চার ছয় আর উইকেট ভাঙার প্রতিযোগিতার সবই নিয়মমাফিক। বলেছে প্রকৃতি কান কানের জায়গায় থাকে আকাশে উড়ে চিল, যদি সে হয় গড্ডল ঘিলুবিহীন তাহলে পিছু পিছু দৌড়াবে জুতোর তালিকায় খালি পা মানুষের নাম লেখা নেই তার পেট মার্কেটের শূন্য শো-কেস, দু’পাড়ে হুন্ডি কারবারি-স্মাগলার মিশেমিলে জমজমাট ঘাটে ঘাটে কত যে সন্ধি, বশ্যতা-মান্য স্বপ্নীল তরুণেরও অক্ষম আপোস পাপোষ কমবেশি সমস্ত ঘরেই— কাল ছিল কিছু না, আজ গাড়ি নীল রঙিন কত মালিকের এক নাম হুক্কা মহাজন কুখ্যাত ফিলিংস বিক্রেতা, কমলাপুর টিটি বস্তিতে কত নাটকে আটক মোটা মোটা বকশিশ ফিস যায় দানবাক্সেও আজম খানের পাঁজর চাপড়ানো গান —‘রেললাইনের ওই বস্তিতে জন্মেছিল একটি ছেলে’ স্বস্তি ও অস্বস্তিতে ফিসফাস আমাদের ছেলেগুলি বেঁচে থাক মায়ের কোলে— বাতাসে গুমোট, শিরায় নীল প্রবাহ বিবিসির কমেন্ট্রি নয় ‘নয় ছয়’ উদ্ধারের গণ্ডিতে আলোক ঝলক চাঁদ খাদে প্রতীয়মান বসিয়েছে ফাঁদ নো, নেশা নো, অলরাইট—নাইটকামার গড়ে স্বপ্নের খামার, অশ্রুতপূর্ব তার কান কোনোদিন শোনে নাই ‘রেললাইনের ওই বস্তি’র গান; কান আছে মান নেই, গান নেই আছে দান বাক্সখানি যাও বৃত্তান্তের কাছে প্রজন্ম নগ্ন নত শির— এই তব জন্মের ঋণ আবার দেখ ভোর, ভোর তুমি দেখো নি বহুদিন এবার যাও আর বাড়িও-না ভিড়, নীড় আমার পিপাসার নাম বুকে ধানমন্ডির হ্রদ বহমান ...

[ধানমন্ডি হ্রদ কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ শিল্পী  উত্তম সেন। বইটি পাওয়া যাবে যুক্ত প্রকাশনীতে। 

শেখ ফিরোজ আহমদ

শেখ ফিরোজ আহমদ

জন্ম ১ আগস্ট ১৯৬৩, চাঁদপুর। অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, রাজশাহী...বিস্তারিত