মিথিলার সবুজ বারান্দা
বিকেলের দিকে আকাশ কিছুটা ঝিমোয়; ক্লান্তিহীন শহরের আকাশে ওটুকুই বিরতি যেন!
এসময়েই ঘুমিয়ে পড়ে মিথিলার ছোট মেয়ে সুরভী, বয়স দুই।
গোসলের পর মিথিলা বারান্দায় যায়, তোয়ালে মাথায় পেঁচিয়ে কিছুটা ঘাড় দুলিয়ে মহল্লাটা দেখে নেয় একবার। কত মানুষের আবাস! মিথিলা-সবুজ এখানে থাকছে প্রায় বছর দুই। দক্ষিণে একটুকরো খোলা আকাশ ছিল, ডেভেলপারের অনেক ক্ষুধা, আকাশটা খেয়ে ফেলল। এখন মুখোমুখি আরেকটা বিল্ডিং, চার তলা বরাবর আরেকটি বারান্দা। দুটো বিল্ডিংয়ের মাঝে এবড়ো-থেবড়ো গলি, সারাদিন রিকশার ঝনঝন শব্দ, যেন খুলে পড়ে যেতে চায় রিকশার শরীর-সমস্ত।
বিপরীত বারান্দায় প্রায়ই সারাদিন ঝোলে কিছু কাপড়-চোপড়, অন্তর্বাস আর গ্রিল পেঁচানো ফুলের চারা। সারাদিন বাসায় থাকে না কেউ, দোয়েলের আনাগোনা গ্রিল জুড়ে।
ও বাসায় লাইট জ্বলে সাড়ে সাতটার পর। দুজনেই চাকরি করে, বোঝা যায়।
মিথিলার অবসর দুপুর কাটে মনের কথামালার উপর সাঁতার কেটে কেটে! কথা মালায় ঢেউ ওঠে, উপচে পড়ে। বিক্ষুব্ধ বাতাসে ভরসা পায় না, ভাবনায় দুলতে দুলতে ঘুমিয়ে পড়ে মেয়ের পাশেই।
মিথিলার স্নাতকোত্তর জীবনের মানে হলো এই অবসর, সবুজ চাকরি করতে নিষেধ করে না কিন্তু যথেষ্ট উৎসাহ যে দেয় ঠিক তাও নয়। চাকরি বিষয়ে একটা প্রচ্ছন্ন ‘না’ যেন সবুজের চারপাশে ঘুরপাক খায়। মিথিলা বোঝে কিন্তু না বোঝার মতো করে থাকতে ভালোই লাগে তার।
দু বছরের সুরভীর মুখের দিকে তাকালে মনে হয় না মিথিলা ওকে ছাড়া সারাদিন অফিসে থাকতে পারবে। তবুও!
সবুজ মাসের শেষে তার বাবাকে টাকা পাঠায়, আলাদা করে মিথিলার হাতেই তুলে দেয়। টাকাটা মিথিলা আলমারি চাপা দেয় দীর্ঘশ্বাসসহ।
মিথিলার বাবাও রিটায়ার করেছে দু বছর হলো। খুব যে ভালো আছেন এখন তাও না! উপার্জন করে এমন পুরুষের অবসরকালীন অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব বুঝতে পারে মিথিলা। দেখা হলে বাবার ভেতরের শূন্যতা টের পায় ও। মাস শেষে সেও কি ভাবে-না বাবার হাতে কিছু টাকা দিক!
টাকার খামটা রাখতে রাখতে আলমারির ভেতরে বাবার পাঞ্জাবির গন্ধ পায় যেন! মিথিলার ইচ্ছে করে, নিঃসঙ্গ গন্ধটা গায়ে মেখে নিতে! ছোটবেলার মতো।
মিথিলার ভাবনার নৌকা দুলতে দুলতে সন্ধ্যাপারে এসে থামে। পশ্চিমের আকাশ জানালা দিয়ে দেখা যায় না, বোঝা যায় সন্ধ্যার প্রস্তুতি ভালো।
মিথিলা বারান্দায় যায়।
বিপরীত বিল্ডিংয়ের ফ্ল্যাটে চোখ রাখে।
প্রথম জ্বলে ওঠে শোয়ার ঘরের লাইট, তারপর খুলে যায় জানালা। মেয়েটা বারান্দায় আসে। প্রতিদিনের মতো কিছুটা চোখাচোখি হয়, মেয়েটা স্মিত হাসে, মিথিলা হাসে না। কখনওই হাসে না!
বিপরীত বিল্ডিংয়ের জ্বলে ওঠা বাতি আর জানালায় ফ্যানের বাতাসে দুলতে থাকা পর্দার ওপাশে অফিস ফেরত ক্লান্তি মাখা ঘরের আবহ বুঝতে বুঝতে বা বোঝার চেষ্টা করতে করতে মিথিলা সবুজের অপেক্ষায় বসে থাকে।
বারন্দায় বাঁধা থাকে ফারহানা’র মন
ফ্যানের বাতাসে জানালার পর্দার কোনাটা নৌকার পাল হয়ে বেঁকে যেতে চায়, ভালো ফ্যান, বাতাস ভালো।
জানালার পর্দা সরে যাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে বিপরীত বারান্দাটা দেখে নেয় ফারহানা।
ফারহানা তাবাসসুম, চাকরি করে, গুলশানে অফিস। ঠেলাঠেলি ৬ নাম্বার তারপর রিকশা না পাওয়ার ধকলটা সারাদিন অফিস করার চেয়ে বেশি ভোগায়। চার তলা হেঁটে উঠে বাসায় এলে এই ফ্যানটাই ভরসা। ফ্যানের বাতাস এত প্রশান্তি দেয় কেমন করে জানে না ফারহানা।
সে আরো অনেক কিছুই জানে না। অত জেনেই বা কী হবে! ফারহানা বাসা ভাড়াটা দেয়, জাভেদ বাজার খরচ আর আনুষাঙ্গিক! জাভেদের বেতন তার থেকে কম বলে সেটা নিয়ে আক্ষেপ বা মনখারাপের কিছু দেখে না সে! সমস্যা হলো, জাভেদ আসে আরো পরে, মানে সাড়ে আটটার আগে নয়।
ফারহানার রান্নাঘরে যেতে ইচ্ছে করে না। সারাদিন ক্লায়েন্টের ফোন আর ইনভয়েস আর বসের ‘কোনো কাজই হচ্ছে না’ টাইপের মনোভাব সামলাতে সামলাতে কড়াইয়ের তেলের পরিমাণ, চালের পানি এসব মাপতে ভালো লাগে না ফারহানার।
রান্না কেন মেয়েদের কাজ!
জানালার পর্দাটা আরেকটু সরে গেলে ফারহানা দেখে বিপরীত বারান্দায় বাচ্চাটার খেলনা রিকশা, দড়িতে নেড়ে দেয়া দারুণ রোমান্টিক শাড়ি, একটা পরম যত্নে ধুয়ে দেয়া সুতি শার্ট দু হাত নিচে দিয়ে ঝুলে আছে!
ফারহানা প্রত্যেকদিনের পরিচিত বারান্দার দৃশ্যটা বেশ উপভোগ করে।
উঠতে ইচ্ছে করে না।
ক্লান্তিতে ধেয়ে আসে মাসের হিশাবের কাটাকুটি, জাভেদের নিরুপায় অবয়ব, ধেয়ে আসে প্রশ্নবাণ—‘ভাবে আর কতদিন...’
দুজনের পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার হিশাবের কাটাকুটি করে তবুও হিশাব মেলে না আর! সারাটা মাস সেই পাঁচ তারিখের বেতনের তারিখের দিকে উপুড় হয়ে চেয়ে থাকে!
লোডশেডিং শুরু হলো।
চেয়ারটা টেনে নিয়ে বারান্দায় চলে আসে ফারহানা। জাভেদ এখনও আসে নি।
বিপরীত বারান্দায় একটা চেনা ছায়ামূর্তি ঠায় দাঁড়িয়ে ফারহানার দিকে চেয়ে।
অন্ধকার আলোয় দুই বিপরীত বারান্দার নিচ দিয়ে একটা মাত্র এবড়ো-থেবড়ো গলি, বয়ে চলে নিরুপায়!