কবি শামীম কবীর : সত্তা ও সংকটের হাইফেন

কবি শামীম কবীর আত্মহত্যা করেন ১৯৯৫ সালের দুই অক্টোবর। বগুড়ায়। আগের দিনগুলিতে তার সঙ্গে প্রায় নিয়মিতই দেখা হতো, আড্ডা হতো বগুড়া শহরের শহিদ খোকন পার্কে, শিশু পার্কে, পড়ুয়ায়, শ্যামলী রেস্টুরেন্টে, মালতিনগরের কোনো চায়ের দোকানে, আজিজুল হক কলেজের পাশের রেললাইনে হাঁটতে হাঁটতে। মাঝেমধ্যে গোবিন্দগঞ্জ থেকে কবি মজনু শাহ আসতেন। শুধু সেই অমোঘ সন্ধ্যায়ই কেউ ছিল না। তার আগের কয়েকদিন দারুণ অস্থির ছিলেন। এক দুপুরে রাজনৈতিক পোস্টার লিখবার জন্য ওর থেকে ধার নেয়া জলরং আর তুলি ফেরত দিতে যাই। জানালার পর্দা টেনে শুয়ে ছিলেন। বললেন, রেখে যাও। আর কোনো কথা হলো না। তার ওই উপেক্ষার ভঙ্গিতে মনটা খারাপই হয়েছিল। তারপর কয়েকদিন আর দেখা হয় নি। কয়েকদিন বোধহয় বাড়ির বাহিরও খুব একটা হন নি। ২ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঘর থেকে বেরিয়ে আমাদের খুঁজেছিলেন। কিন্তু আমি বা কবি মাইনূক ফারুক কেউই সেদিন শহরে ছিলাম না। সেই আক্ষেপ দিনে দিনে অনুশোচনা হয়ে গেছে। ভাবি, যদি সেদিন আমাদের দেখা হতো, তাহলে কি উনি পিছিয়ে দিতেন মৃত্যু তারিখটা? আত্মহত্যাও কি একধরনের দৈবাঘাত নয়, একবার পেরুনো গেলে হয়তো তাকে অনেক দিনের জন্য ঠেকিয়ে রাখা যায়! এই দুঃখের কোনো নিদান নাই।

যা হোক। প্রায় চার বছর পর বগুড়া থেকে প্রকাশিত হয় কবিতার ছোট কাগজ ডামি এডিশন। পত্রিকাটির পরিকল্পনা শামীম কবীরের, তারই হবার কথা ছিল প্রথম সম্পাদক। ট্র্যাজেডি এই, সেই মৃত্যুদাগ লাগা পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যার পুরোটাই ছিল শামীম কবীরকে নিবেদিত। সম্পাদনা করেন কবি মাইনূক ফারুক এবং সহ-সম্পাদক হিসেবে কবি অমিত রেজা চৌধুরী। ১৯৯৯ সালের আগস্ট মাসে সেই পত্রিকার জন্য লেখা প্রবন্ধটাই কিছুটা মার্জনা করে এখানে প্রকাশের জন্য দেয়া হলো। আজ কবি শামীম কবীরের জন্মদিন। এটাও চৈত্র মাস। জন্ম মাস নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘সেখানে এখন চৈত্র মাসে/ বসন্তের পাতা ঝরে কিছুই পাবে না’।


shameem 2

যে চাঁদ মাস্তুলে বাড়ি খেয়ে ভেঙে গ্যালো যে চাঁদ সাগরে টুকরো টুকরো হ’য়ে                                 ঝ’রে পড়লো যে চাঁদ সমুদ্রের নিচে শুয়ে আছে                         খণ্ড বিখণ্ড হয়ে (ও চাঁদ/ শামীম কবীর)

‘সে নয়, অথচ তারই মধ্যে যেন কেউ বিলাপ করে করে কাঁদছে, অন্ধকারে মৃদু ভাষায় জ্বলজ্বল করছে যেন। তার জন্য খিন্ন হলো তার আত্মা, সে নিজেও শোকার্ত হলো নিজের জন্য’।


ডা. জিভাগো/ বরিস পাস্তারনাক


চেতনার অন্তরঙ্গ পোশাক, আত্মার অপলাপ : এই পথ, আকাশ, নক্ষত্র, রাত ও দিনের সমস্ত রৌদ্র-ছায়া, আলো ও মায়ার মধ্যে মিশে থাকা এক অন্তর্বাসী ভালুকের মতো মন। সব স-ব ব্যর্থ মনে হয় তার। কুহকী ফাঁদ মনে হয়। একদিন রোদে রোদে প্রচুর উত্তেজনা এসেছিল। তার ও ধুলাদের। আজ জীবনের অঢেল রোদ তাকে শান্ত করে এনেছে। ধুলারা তবু অশান্ত, পথে পথে কণা-কণা মনে ছুটে ফেরে। সঙ্গীহারা হয়ে প্রতিরূপ খোঁজে। ঘূর্ণিপাকে উথলিয়ে ওঠে শূন্যে ধুলার শরীর বানায়। বায়ু পড়ে গেলে আবার ভেঙে পড়ে সে মূর্তি। শরীরহারা হয়ে আবার বিন্দু বিন্দু মনে ছুটে চলে, ‘অথচ বিন্দুটি জানে না আসলে সে অস্থির’।

কাঁদে বালিহাঁস কাঁদে উঁচু চিল কাঁদে মধ্যবর্তিনীরা আর সবুজ ফাঙ্গাস আমি জানি না আমি কী খুঁজি আমি ক্যানো যে কাঁদি না                 (দেহ পেয়ে গাইবার জন্য গান)

সবকিছুর শেষে জল যখন স্থির হবার সময় পায়, নম্র হয়ে আসে রোদ। যখন জীবনের প্রাণ-শুকানো ফলামুখে মানুষ ও বৃক্ষের ত্বক খর হয়, অস্তিত্ব তখন নিজের ভেতর থরথর কাঁপতে থাকে। কোথাও সন্তাপ খুঁজে না পেয়ে হয়তো প্রখর হয়। তখন হয়তো জন্ম হয় সংগীতের—অস্তিত্বের অতলান্তিক সুরের। তা যদি না পারে তো নিজেই নিজের শিখার দিকে চেয়ে অহংকারের তর্জনী উঁচিয়ে জ্বলতে থাকে। চৈতন্য একটা শিখার মতো।

যে মতে ধুলার স্মৃতি হ’লো ছারখার সে মতে ফিরিলা তুমি ফিরিলা আবার অশরীরী পুড়ে খাক শরীরী অনলে আর তার বায়ুঘের ধিকিধিকি জ্বলে... না দেখো চর্মের চক্ষে সেই সঙ্গপনা নকল ঘরেতে নিশি দিবস যাপনা                                 (রেডিয়োতে গান)


জীবন তবু অবিস্মরণীয় সততাকে চায়। কখনো জানানো যায় না এমনতরো দুঃখে ও তাপে আমাদের বুক বসে যায়।


কবির সত্তার মধ্যে এক চিরকালীন ‘হোমলেসনেস’ কাজ করে। ব্রিটেনের ওয়েলশ ভাষায় ‘হিরায়েথ’ (hiraeth) নামে একটা শব্দ আছে। ইংরেজিতে এর অনুবাদ হয় না। বাংলায় বললে হয়তো লম্বা করে বলা যায়, ‘ঘরের জন্য মন পোড়ানি’। এই ঘর কেবল বাড়ি নয়, রাষ্ট্র নয়, মানচিত্র নয়, ভূমি নয়, এই ঘর হলো সত্তার বিচ্ছেদ ঘুচানো নিজস্ব জগৎ। এটা এমন এক ঘর বা হোমের জন্য আকুল আকাঙ্ক্ষা, যা কখনো নিজের ছিল না কিন্তু তার বিচ্ছেদ সহ্য করা কঠিন। গীতিকবিকে যেমন ভোগায় এড়াতে না-পারা বিচ্ছেদের দহন। পৃথক পালঙ্ক কবিতায় আবুল হাসানের যেমন লেগেছিল। শামীমের মনে হয় :

এই ঘরে একজন কবি আছে রক্তমাখা গালিচায় শুয়ে ...ভীষণ অস্থির হাতে সে ক্যাবল বিষণ্ণ খুঁড়ে চলে শব্দের গোপন তিমির।                                                         (এই ঘরে একজন কবি)

সর্বপ্লাবী এই বায়ুপ্রবাহের চাপে সব তলিয়ে যায়। যেন মন্থন শেষ হলো, শেষ হলো সমুদ্রস্নানে অঙ্গারচিহ্ন ধোয়া। সবকেই ক্ষয়িত পুতুল ভেবে, বিশিষ্টতার অযোগ্য ভেবে নিয়ে আবার সাজায় নিজের পৃথিবী। আভরণে আর পরিচ্ছদে আবার সংকেত মেলে ধরা। তাই ফুসফুসের সবটুকু বালি ঝেড়ে প্রবল শ্বাসটানে চাপা পড়া মনকে তুলে আনা। এক জীবনের সামান্য সুষমাকে আবার আকাশের ঘুড়ির মতো উড়িয়ে সঞ্জীবনী সুরা চেয়ে আনা। কিংবা নিঃসীম জলে একটাই দ্বীপ জাগাতে চাওয়া; যেখানে পরিভ্রমণ শেষে, গান শেষে, আয়ুর মলিনতা ধুতে পা ভেজানো যায়। ভাবা যায় ‘এখনও জীবন’! তা যে হবে না সে তো জানিই। বলে তো রেখেইছিল সে, ‘আমি শিখতে জানি না পুড়ে হওয়া’। কেন না—

‘তার ভয় লাগে, কী রকম উঁচু মন চারদিকে, ভাঙা মই, দশদিকে, প্রেম থেকে ওড়া মাছি, ক্যানো... আমার অদৃষ্ট আমি হারিয়েছি আর আমার অদৃষ্ট আমি হারিয়ে ফেলেছি’

নৈঃশব্দ্যের কথাকার সে—কবি। সে আবার ব্যক্তিও। শামীম কবীর নাম যার। ব্যক্তি, মানে যে ব্যক্ত হতে চায়। কিন্তু কোথা তার ভাষা কোথা বা চেতনা? দুটি উচ্চারণের মধ্যকার যে নীরবতা, দিগন্তবন্ধনীর বৃক্ষের মতো তার হাত উঁচিয়ে থাকা। তার তো ভাষা নাই—কেন না, ব্যবহৃত হতে হতে, ব্যবহৃত হতে হতে তা আজ লাঞ্ছিতার পোশাক। তাই শুধু প্রতীক আছে, ভঙ্গিমা আছে। হয়তো এও সত্য, ভাষার পবিত্রতা বাঁচাতে সে চোরাভাষায় সিদ্ধহস্ত হচ্ছিল! অস্তিত্বের অতলান্ত ফলার মুখে মুখোশ লাগিয়ে নিজেরই সংগোপন রোখে ঈপ্সিত সুযোগ সন্ধান করছিল। আর নিজেরই পাঁজর ছুড়ে দক্ষযজ্ঞ ঘটবার অপেক্ষায় নিচ্ছিল প্রস্তুতি!

এত আড়াল আর কেউ খোঁজে নি কখনো। বাক্যের বদলে ভঙ্গির, কথার বদলে ইশারার। উচ্চারের অনীহা, নিরুচ্চারের বিষ দিযে জানানোর চেয়ে বেশি কিই-বা করার থাকে কবির, যে কিনা ক্রান্তদর্শী? বলছে সে, ‘না আমি জেনেছি স্বপ্নমধ্যে অনুষ্ঠিত জাগা’, তাই অন্তিমের জন্য অপেক্ষা করা। তাই তার মুখই আড়ালে ঢাকা। অন্যেরা তো বাজারে উপস্থাপিত। মোহের দরজায় উৎকন্ঠিত। কেন না মুখবিভা বলে যে কিছু নাই তাদের। বৃক্ষের ত্বকের মতো তাদের মুখরেখা স্বাভাবিক-পরিবর্তনরহিত।

‘ফিকে বাতাসের মধ্যে ছড়িয়ে বেড়ায় সংক্রামক গাঢ় স্বচ্ছ ফিলামেন্ট’

কিন্তু এই কবি যখন লোকসভায় চরে বেড়ান, মুখের খোঁজে মুখ ফেরান তখন কিছুতেই নিজেকে ছাড়া আর কিছু পেতে পারেন না। এতই শৈশবিক, এতই অসহায়। সময়গ্রন্থির জরাজটিল ছাপচিত্র ধারণ করতে করতে তার চিন্তা ও আবেগের দূরত্ব কমতে কমতে একই পত্রে এসে সাক্ষর রেখেছে মস্তিষ্কের সঙ্গে রক্তসংঞ্চালনের ঘনিষ্ঠতার মতো।

‘আর অবাধ উর্বর কুয়াশাভেদী মধ্যমার পরে আর আমরা কিছু দেখি নি আমরা কে কে যে কজন বা কতো ভুলে হয়ে গেছি আমাদের মতো’

জীবন তবু অবিস্মরণীয় সততাকে চায়। কখনো জানানো যায় না এমনতরো দুঃখে ও তাপে আমাদের বুক বসে যায়। অন্ধকারের বন্ধুর হাত খুঁজি। মায়ের মুখ খুঁজি একটি শক্তিময়ী চুমুর প্রত্যাশায়। শুধু ‘মধ্যবর্তিনী প্রেমিকাকে’ বলা যা—

‘জানো না আমার মনে কতো কথা পড়ে আর ঝড়ে উড়ে যায় মনোনিবেশিক হাওয়া ব্যগ্র হলে ঝড় হয় তবে’

তারপর একদিন,

‘খেলতে খেলতে ধুলা হয়ে গ্যালো আমাদের খেলা’

কিন্তু তাকে শুধু একজনই,

‘শ্বেতরোগী সেবিকা

মা বুক দিয়ে মুখ ধুয়ে...’

মুখোমুখি বসিবার...সেই,

‘মা আমার যেরকম লাগে চক্রাকারে সে রকম মূর্ছা সিঁড়ি হারিয়ে আর কে কোথায় পেয়েছিল কবে’


শামীমের নাস্তির দুনিয়ায় তো কোনো ঈশ্বর নাই। কিছুই আর হতে পারার আশা সেখানে তিরোহিত।


চেক ঔপন্যাসিক মিলান কুন্ডেরার Life Is Elsewhere উপন্যাসের নায়ক গীতিকবি জেরোমিলের সংকটটা এই, সে মায়ের শাসন–অভিভাবন থেকে যেমন বেরুতে চায়, তেমনি চায় প্রেমিকার সামনে তীব্র হিসেবে প্রতিভাত হতে। আবার একইসঙ্গে সে দুজনের প্রতিই বিচ্ছেদের টানে ভোগে। এই অভিভাবন ও বিচ্ছেদের দ্বান্দ্বিকতাকে কবির উভটান হিসেবে দেখেছেন কুন্ডেরা। তেমনি এক উভটান শামীম কবীরের কবিতার মা ও পিতৃলোক এবং প্রেমাস্পদের প্রতি দেখা যায়। যোগাযোগের সেতুহারা, তবু একমুখী ব্রিজ গড়ে সে ঊর্ধ্বমুখী। তার অপার দশায় তখন একটি মন্ত্র উচ্চারণের প্রস্তুতি চলে। মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে সরে যাবার সময়ও কত কিছু ধরে রাখতে হয়। শিথিল করতলগ্রন্থি ছেড়ে ঝরে যায় কত কত অভিজ্ঞতার শিশির। হায় অভিজ্ঞতা! অভিজ্ঞতাই বিষ, অভিজ্ঞতাই অমেয়, বুঝেছিল শামীম। তাই তো ডায়রিতে লিখেছিল :

‘এই ভাবে সহজ ও সাধারণ অভিজ্ঞতাগুলি তৈরি হয় ও তা গিয়ে দাঁড়াবে নিশ্চিতভাবে কোনো না কোনো সৃষ্টিশীল সূত্রের মুখোমুখি।’

দুই হাতে সব বেড় করে বাঁধতে গিয়েছিল। ‘প্লাবনে সংক্ষোভে আমার সমস্ত জ্ঞান চাই বলে/ আপন শরীর দিয়ে বাঁধ দিতে গিয়েছিল বলে’ (অরুণি উদ্দালক/ শঙ্খ ঘোষ) তাকে ভুগতে হয়। তবুও তো কত স্মৃতি-বিচ্ছুরণ মুহূর্তেরও অতীত শূন্যতায় পড়ে থাকে। এইসব হারানো নুড়ি কুড়িয়ে, অব্যাখ্যাত অভিজ্ঞতার সূত্রই বুঝতে চেয়েছিল শামীম কবীরের কবিতা তার অন্ধ আতুর আঙুলে।

পত্রিকাটির পরিকল্পনা শামীম কবীরের, তারই হবার কথা ছিল প্রথম সম্পাদক।

নতুন আকাঙ্ক্ষা আসে—চলে আসে নতুন সময়


সৃজনশীলতার সীমা বাড়াতে গেলে—তা সাহিত্যই হোক আর অন্য কোনো বিজ্ঞানই হোক—পূর্বাপতনের নির্ধারিত এলাকা পরিভ্রমণ শেষে তাকে তা ডিঙিয়ে যেতে হয়, এড়িয়ে না গিয়ে। আবিষ্কারের জেদ এবং অস্বীকারের স্পর্ধা দেখাতে হয়। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়ে এমন একটি মাপনবিদ্যা ও তার কৃৎকৌশল তৈরি করা যা দিয়ে অতীত ইতিহাসের অর্জন তো বটেই এমনকি নিজের কৃতিকেও পরিমাপ করা সম্ভব হবে। শামীমের রচনা সাক্ষ্য—নিজেকে ভিন্ন ভিন্ন তলে, বহু আপতনের বিরুদ্ধে বাজিয়ে দেখার প্রবণতা ছিল তার। এখানাই তার ভরসা এসে ঠাঁই খুঁজেছিল। তার বক্তব্যে ও প্রকরণে, সুস্থতা বা অসুস্থতার ছদ্মবেশে এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ফুটছিল।

তাহলে সে কি করবে? সমস্ত অনিবার্য অপচয়, ইতিহাসের অমোঘ ব্যর্থতার তাপজ্বালা, কোনোভাবেই শোধরানো যাবে না এমন আয়ুক্ষয়, মহাকালিক জমাট স্মৃতির ভার—প্রথনবেদনার সেই অসহ্য ভারে তখন কোনো নিঃসঙ্গ গ্রহচারীর স্নায়ুদাঁড় কেঁপে ওঠে। সুরশলাকার শিহরনের মতো অস্থির আবেগে তার অস্তিত্ব ফলামুখে নিজেকে জাগিয়ে ঘাতক শূন্যতাকে বিঁধতে যায়। তবু হৃদয়চেতন তার মহাজাগতিক বিষণ্নতাকে অলৌকিক আনন্দে বদলে যেতে দেখে। রূপান্তরশীল তার আত্মা অবিচ্ছেদ্য শূন্যতায় যে দমক তোলে, তার অভিঘাত তখন গম্যতার সমস্ত দিকেই নিজেকে চারিয়ে দেয়—ছড়িয়ে দেয়। জলজ নিস্তরঙ্গতা ক্রমাগত ফাঁপতে থাকা সংগীতের মতো বিচলিত হয়। আর মুখোমুখি হয় নিজের, যা ছায়ার মতো পশ্চাদগামী।

একজন অবিকল আমার মতন লোক আজ সারাদিন আমার সামান্য পিছে চলমান, যে রকম বিশ্বস্ত কুকুর যে দিকেই যাই আমি, এলেবেলে ঘুর পথে, খুব শব্দহীন

...ক্যাবল ভিন্ন চলার প্রকৃতি তার; আমি চলি একা, আপন খেয়াল, আর সে আমার নিবিড় পেছনে ধায় জ্বলন্ত শ্বাস কোরে সযত্ন-গোপনে, অদৃশ্য সঙ্গীন হাতে, নিজস্ব সন্ত্রাস।।                                                                 (অনুসরণ)

আবার দেখুন,

‘খুব ক্রুর মুখোশের মতো মনে হয় এই নাম... ... এই প্রিয় সশরীর নাম খুব দাঁতাল মাছির মতো অস্তিত্বের রৌদ্র কুরে খায় রাত্রিদিন; আষ্টেপৃষ্টে কাঁটাতার হোয়ে আছে—শামীম কবীর ইতিহাসে অমরতা নাই।... ... আমার সকল পথে অক্ষয় জালের ব্যূহ কোরেছে আরোপ কোনো দুর্বার শপথে।’

এই আত্মবিকারের তীব্রতার শেষ কোথায়? কাজী নজরুল ইসলামের তীব্র পুরুষকারের সমাপ্তি হয়েছিল চেতনার বিলুপ্তিতে। কীটসের বিষাদ তার আত্মাকে অকালেই খেয়ে ফেলেছিল। আঘাতে আঘাতে সচকিত করতে নিজের এক একটি রচনাকে এক একটি জ্বলন্ত কয়লাপিণ্ডের মতো ছুড়ে দেন শামীম কবীর। পড়তে পড়তে তাই রুদ্ধশ্বাস হয়। আর তিনি থাকেন নির্লিপ্ত। লেখার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে অপূর্ব অভিজ্ঞতার স্বাদ সে পায় রচনাকর্ম সম্পাদিত হওয়ার পর তার নিজের জন্য ঐসবের আর বিশেষ মূল্য নাই যেন। সেগুলো যেন এখন জগৎ-মনের সম্পত্তি। যেন আত্মোপলব্ধির অত্যাশ্চর্য বেদনাই শুধু তার পাওনা, যা সে মিটিয়ে নিয়েছে সংক্ষিপ্ত জীবনে। আর কিছু নয়। সম্ভবত এরকম মনোভঙ্গীই আত্মহত্যার সাহস জোগায়। থাকা না-থাকা সমান বলে গণ্য হয়। হয়তো তার কাছে প্রকাশ আর অপ্রকাশ-এর মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠাগত স্বার্থ নাই। অভিজ্ঞতাকে, স্নায়ুর সংবেদনাকে এরকম চরম কোণে দেখতে পাবার মধ্যে প্রবল অভিমানও কাজ করতে পারে। তাই বলতে পারে :

‘আমি জানি না আমি কি খুঁজি আমি ক্যানো যে কাঁদি না’

অথবা,

এই আমার অসম্ভব স্যাটায়ার আর যন্ত্রণার উৎস তাই উৎসবের থেকে দূরে বসে বন্ধুদের খুঁজি।                                 (ব্যক্তিগত লিখনপদ্ধতি/ ডায়েরি)

কোনো ক্রান্তি দিনে-রাতে ক্ষয় করছিল ওর সংহতি? কিন্তু জীবনের দিকের টানও কি ছিল না? নইলে কিভাবে বলতে পারে যে—

‘পথে বা পথের ধারে শান্ত গ্রাম আছে সেখানে সায়র আছে রাখাল রাত্তির বেলা করুণের তীব্র সুর তোলে’

কিংবা বলে,

এই ব্যূহ সে ভেদ করতে পারে না, কিন্তু আবার বলতে পারে ‘সারাক্ষণ হাতে চাই গানের বাকশো যেতে যেতে গান গাবো তাই...’। লেখে নব্বইয়ের শহিদ নূর হোসেনকে উৎসর্গ করা কবিতা। এই শান্ত সংহতি কেন ছিঁড়ে গেল? কেন সে বলে—

‘আমি তো উন্মাদমাত্র আর সব বাদবাকি শখের গোসল’

ফিওদর দস্তয়েভস্তির ব্রাদার্স কারামজভ উপন্যাসের নায়ক প্রশ্ন করে—

‘‘But what about me? I suffer, but still, I don’t live. I am x in an indeterminate equation. I am a sort of phantom in life who has lost all beginning and end, and who has even forgotten his own name. ...but I repeat again that I would give away all this superstellar life, all the ranks and honours, simply to be transformed into the soul of a merchant’s wife weighing eighteen stone and set candles at God’s shrine”


সিলিংয়ে ঝুলতে থাকা ওর উলম্ব দেহ কি একটু একটু দুলছিল বাতাসে? যেভাবে হৃদয় দোলে?


কিন্তু শামীমের নাস্তির দুনিয়ায় তো কোনো ঈশ্বর নাই। কিছুই আর হতে পারার আশা সেখানে তিরোহিত। তার চিত্রকলায়ও দেখা যাবে মুখোশের প্রদর্শনী। মুখোশ যেমন লুকানোর তেমন আত্মরক্ষারও উপায়। শামীম মুখোশের দুনিয়া দেখতে দেখতে সম্ভবত আর আত্মরক্ষায় ইচ্ছুক হতে চায় নি। কোনো জগৎ তার জন্য কোনো পূর্বসংকেত রাখে নি? কেন তারই আত্মপ্রকাশে এত বাধা! এটা হলো অভিমান। অভিমান জমে জমেই তো স্বেচ্ছামৃত্যুর ইশতেহার হয়। যা দুরূহ তা সমাধানে দুঃসাহস হয়।

‘‘আজ দেখলাম মেঘমন্দ্র উচ্ছ্বলতার দাগ এবং বাহান্ন জন প্রপিতামাতার সেইসব চেহারা আমি আজ আর দেখলাম সেই আজ পুত্র শোকে ছেয়ে যাক আকাশ।’’


জানি না কে কার চোখে কোন অন্ধকার দেখে আলো হতে চেয়েছিলাম


সোমবার ২ অক্টোবর, ১৯৯৫। মনে নাই সেই আত্মসংহারের দিনটা কেমন ছিল। তা-ও নয়, সেদিন সন্ধ্যায় প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। সেদিন বোধহয় তার চরমতায় পৌঁছেছিল শামীম। সন্ধ্যায় ও ওর তিন তলার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তাকে দেখা গেল সাতমাথার আড্ডার জটলা পেরুতে। পরে একজন জানায়, সেখানে সে আমাকে খুঁজেছিল। তারপর থানা রোডে বইয়ের দোকান পড়ুয়ার দিকে যায়। সেদিন আমি গেছি গাইবান্ধায়, ওর আরেক বন্ধু মাইনূক ফারুক তার কোম্পানির কাজে গোবিন্দগঞ্জে। আমরা এখনো জানি না শামীম কেন তখন অমন করে সঙ্গ খুঁজছিল? বর্ম খুলে পথে নেমেছিল সে? আবার পায়ে পায়ে ফেরতও এসেছিল ওই তেতলার ঘরে। শান্তভাবে মরণসজ্জা নিয়েছিল। একটা টেবিল, সিলিং ফ্যান, বিছানার চাদর তার শেষ সহায় হয়েছিল। ওর অনুভব তরঙ্গে তখন কোনো আলোবাদ্য বাজছিল কি না তা জানার উপায় নাই আর এখন। যাই হোক, তারপর প্রতিশ্রুত দেবতার মতো ঝুলে পড়েছিল উলম্বভাবে।

ঘর ছিল বন্ধ, জানালা-দরজা বন্ধ, সিঁড়ি লোপাট। তখন কী ওর শেষবারের মতো ‘মা’র সাথে বাক্যালাপের’ সাধ জাগে নি? ভাসে নি কোনো মুখ মনে? কে জানে। শিকারি যখন ছিলায় তির বেঁধে টান লাগিয়ে এক চোখ বুজে লক্ষ্যে দৃষ্টি লাগায়, তখন অন্য চোখের বোজানো পাপড়ির নিচে জগতের অন্য সব কিছুও ডুবে যায়। শুধু খর চোখে সে দেখে, পুরো পাখিটাকেও না, সে দেখে শুধু তার মাথা বা বুকটা। সেখানে সে তির গাঁথবে। শামীম সেভাবে হয়তো তার নিয়তির দিকেই সেই সন্ধ্যায় তাকিয়েছিল। আর ছেড়ে দিয়েছিল ছিলার টান, তার জীবনের ছিলা তখন ফাঁস হয়ে চেপে ধরেছিল শ্বাসনালী। নিদায় তির, বিবেকহীন ফাঁসির রজ্জু তার কাজ করেছিল। সিলিংয়ে ঝুলতে থাকা ওর উলম্ব দেহ কি একটু একটু দুলছিল বাতাসে? যেভাবে হৃদয় দোলে? না কি স্থির হয়ে, জড় হয়ে হৃদয়হীন হয়ে শূন্যতাকে লম্বালম্বি চিরে মাটি ও আকাশের মধ্যে দুর্বোধ্য যতিচিহ্ন হয়ে উপহাস করছিল?


shameem 3


ঊর্ধ্বমুখী একটা সেতু বানাতে চেয়েছিল তার গল্পে। সেই সেতু নির্মাণ কি তবে সম্পন্ন হলো ওই সময়? নাকি সত্তার আনন্দ ও সংকটের মধ্যে হাইফেন হয়ে ভেসে থাকল সে?

ডায়রিতে লিখেছিল, ‘ফলাফলটি ইতিবাচক কি নেতিবাচক তাও মুখ্য নয়, বরং মুখ্য হয়ে ওঠে সুপরিণত পরিণতির বিষয়টিই’। হয়তো ও-ই ঠিক মৃত্যুতে ও সুপরণিত হলো। মৃত্যুর আগে কে জানে তার সঠিক পরিণতি? বাংলা কবিতার একটা অধ্যায়ের শীর্ষপাথর হয়ে আছে তার কাজ কবিতা। এ ছাড়া রয়ে গেেছ গল্প আর চিত্রকর্ম। ওর মুখ রয়ে গেছে স্মৃতিচিত্রজ্বলা ফসফরাসের মতো আভাময়। লিখেছিল সে-ই—

‘কিছুই পাবে না জানি সেখানে এখন চৈত্র মাসে বসন্তের পাতা ঝরে কিছুই পাবে না ঝরাপাতা হত তাই

সত্যকারে কিছুই পাবে না

আজ রাত হ’য়ে যাচ্ছে সখি যদি চলে যাই তবে আর কোন দিন দ্যাখা হবে নাই।’

ফারুক ওয়াসিফ

ফারুক ওয়াসিফ

জন্ম ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫, বগুড়া। পেশায় সাংবাদিক। বুদ্ধিবৃত্তিক নানা তৎপরতার...বিস্তারিত