সাজ্জাদ শরিফ বাংলাদেশের আশির দশকের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। পাশাপাশি একজন দক্ষ সম্পাদক। তিনি লিখেছেন খুব কম। লেখার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন বেশি। তার প্রকাশিত কবিতার বই একটিই—ছুরিচিকিৎসা।
এখানে বই এবং বইয়ের বাইরে থেকে সংগৃহীত ৩০টি কবিতা উপস্থাপন করা হলো পরস্পরের পাঠকদের জন্য।
অগ্রন্থিত কবিতা
জন্মান্তর ❑❑
শামুক, তোমার দিকে নির্ণিমেষ দৃষ্টি মেলে রাখি ক্রমশ এগোও তুমি নিরুদ্বেগ, শান্ত, অপিপাসু তোমার নিবিষ্ট গতি আমি ধরে রাখি এই দেহে ওই খোলে, রাজসিক মুকুটের তলে লুকিয়ে রাখছ মৃদু চলনভঙ্গিমা, ক্ষতি, মৃত্যু-সম্ভাবনা নরম পায়ের নিচে ক্ষয়ে যাচ্ছ ক্রমাগত পলে-অনুপলে যত্নে তুলে রাখি আমি ক্ষয়ে যাওয়া শরীরের কণা ভ্রমণ সমাপ্ত হলে পড়ে থাকো দেহমুক্ত উদাসীন খোল তোমার সর্বস্ব নিয়ে আমি হয়ে উঠি দ্যাখো তোমার জাতকখুলনা, ২২ জুলাই ২০০৮
কথার ওপারে ❑❑
কথার ওপারে যেতে চাই সবই দেখি অর্থময়, সবকিছু প্রবল বাঙ্ময়— যা কিছু সচিহ্ন তার সবটাই সশব্দ হুঙ্কার হয়ে উঠছে, ভাসিয়ে লোপাট করছে সমস্ত সংসার। কোথায় সে হ্রদ যার চিরস্থির জলে ঢিল ছুড়লে তরঙ্গ ওঠে না? নিরুচ্চার, তুমি জেগে ওঠোঢাকা, ২৬ জুন ২০০৮
বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট ❑❑
গায়ে বিঁধছে রোদের ফলা, দেখতে পেলাম ঝাউয়ের তলায় তুমি তখন চলেই যাচ্ছ নৌকা গেছে ছেড়ে তাকিয়েছিলে একটু ফিরে কিন্তু তখন তোমায় ঘিরে সূর্য ফেটে আমার চোখে গাঁথিয়ে দিল পেরেক ফিনকিতে উৎকণ্ঠা ছোটে, প্রজাপতির প্রাচীন টোটেম উপড়ে পড়ে গর্জে ওঠা নোনা হাওয়ার তোড়ে তখন আমার ভূলুণ্ঠিত স্বপ্নে আমিই অবাঞ্ছিত তুমি অপসৃত সে কার সবল বাহু ধরে অরণ্য, খাদ, ঝরনাধারার মধ্যে আমি ছন্নছাড়া প্রাণীর সঙ্গে পশুর মতো ছিলাম খানিক বেঁচে ডাইনি, দানো, বামন, পরি আর হারানো সে সুন্দরীর গল্পগাথার জগৎ কোথায়, কোথায় আছে কে যে! রাতের পরে ফিরেছে রাত, রাতের মতো নামে প্রভাত তোমার খবর রটিয়ে হঠাৎ বনের শাখায় চেরি বুকে ঘেষটে আবারও যাই ততক্ষণে তুমি তো নাই তোমায় পেতে আবার হলো এক মুহূর্ত দেরি আবার হামা আবার গুড়ি মাথায় অগ্নিগিরির পুরীষ দিন যে গেল সময় হলো গুহায় ফিরে যাবার সুন্দরী ও পশুর ছলে মুখস্থ রূপকথার তলে আগুনে খাক এই কাহিনি পেছনে থাক চাপাধানমণ্ডি, ২৭ জুলাই ২০১০
ছুরিচিকিৎসা
[প্রথম প্রকাশ ২০০৬; পরিবর্ধিত ২০১৪
প্রতিবেশী ❑❑
এই ঘুমন্ত নিচু গ্রামে হাওয়া এলোমেলো, বিদেশিনী তাকে ভাষাহীন সঙ্কেতে আমি চিনি না বা ঠিক চিনি দূরে দিগন্ত কাঁটাতার দূরে মেঘে মেঘে মশগুল শাদা উড়ন্ত মিনারের নিচে একাকিনী লাল ফুল বলো ওগো প্রতিবেশী ফুল হাওয়া তোমার কি সন্তান? তার অবোধ্য সঙ্কেতে প্রাণে জ্বলে ওঠে আরো প্রাণ তুমি নর্তকীমুদ্রায় কেন দিচ্ছ অপ্রণামী? কেউ বুঝি না তো এই রাতে তুমি তুমি, নাকি তুমি আমি তবু ভূগোলের সিলেবাসে আজও এ কথা পড়ানো হয় : এই রাতজাগা উঁচু গ্রামে হাওয়া প্রসঙ্গক্রমে বয়প্রথম প্রকাশ : যুগান্তর, ফেব্রুয়ারি ২০০০
চাঁদে পাওয়া গাছ ❑❑
নিষেধ শুনলে না তুমি পাখা মেললে রাতভর উড়ে গেলে এদিক ওদিক তুমি আমাকে নাওনি পিঠে ও শ্যামল দীর্ঘ দেবদারু তুমি শুনলে যমের কান্না রাতপ্রহরীর সিগনালে আর চোখে দেখলে অতীতের সব লাশ জ্যান্ত হয়ে উঠে আসছে আগামীর থেকে তুমি বৃক্ষ হতে চাইছ না আর শুধু আমি আজ তোমার শেকড় থেকে জন্ম নিতে চাইপ্রথম প্রকাশ : অনিন্দ্য, আগস্ট ১৯৯২
অন্ধ শিকারি ❑❑
ভাঙা অন্ধের লাঠি হাতে আমি শিকারের সন্ধানে চলি দিগন্ত পার হয়েপ্রথম প্রকাশ : অনিন্দ্য, আগস্ট ১৯৯২
ধর্মবনানী ❑❑
কামার্ত বন, চলো সাবধানে, সামান্য ছোঁয়া পেলেই কেমন শিউরে উঠছে ঝামরে উঠছে ধর্মবনানী, বলো সাবধানে, জন্ম নিচ্ছে স্বাধীন অঙ্গ... দেহতরঙ্গ...মানুষ...মানুষ... টগবগে এই লাভার ওপরে সন্ন্যাস ভেঙে লক্ষ বছর ঝরাচ্ছি বীজ ঝরিয়ে চলেছিপ্রথম প্রকাশ : অনিন্দ্য, আগস্ট ১৯৯২
বোবা কথা ❑❑
শোনো আজ স্তব্ধ পারাবত কুয়াশার দিগন্তের পারে এখনো ছায়ায় ঢাকা দেশ যোগাযোগ, বোবার অক্ষর দেখেছি নিকষ অন্ধকারে ফুলকি আর ছাই হয়ে ঝরে ডাক-হরকরা, পড়ো ভাষা এখনো নদীর তল থেকে আর্তি আসে ডুবন্ত শিশুর পারাবত, অন্ধ পিতামহী, অর্ধেক পাথর তুমি আজ বালক কবির করতলেপ্রথম প্রকাশ : অনিন্দ্য, আগস্ট ১৯৯২
বংশপরিচয় ❑❑
জন্মটান যদি থাকে তো জ্বেলে ধরো শিখা বংশলণ্ঠন ধ্বংসলণ্ঠন পেয়ে শিকারি নিজে তুমি হয়েছো নিরুপায় শিকার আয়না ভেঙে আজ বেরিয়ে এসে গেছ মেয়ে কোন সে মেয়ে? আর শিকারি সে কেমন? চাকা ঘুরিয়ে ও কে যায়? করো গো পরিচয় করো সবাই একজন। আঁতুরঘরে শিশুডাকাত দেখার পর থেকে রয়েছো তুমি জড়োসড়ো জাতক জড়োসড়ো, জাতক আজ করো পড়া মেয়েও হও আর চালক হয়ে পথে তাকে নামাও আর করো ডাকাত হয়ে দস্যুতা পিতৃহ্রদ থেকে করো গো পান সেই শরাব বংশনদীতীরে বংশঝরনার বাঁকে যেন বা মাঝি হয় তোমার জন্মের স্নেহ খুলেও গাঁথা থাকে একটি অবিরল সুতায় স্বপ্নদেহ আর তোমার কঙ্কালদেহপ্রথম প্রকাশ : মূলধারা, ১৯৯০
অধর্মবাতাস ❑❑
ধরেছি কর্তিত বাহু নিরুপায়, ক্ষমা করো মোরে শুধায়ো না, অধর্মবাতাসে ওড়ে কাদের ছেলের রামধনু ও তো রাততরবারি—পিপাসার, মানসিংহের তোমাদের ষড়যন্ত্রে মেঘে মেঘে উড়ন্ত প্রাসাদ তাদের বিষণ্ন ছায়া ছুঁড়ে দেয় রেলকলোনির আঙিনায় কোলাহলভরা শীতে, যবনিকাময় এই টেনিসচত্বরে নির্জন তাঁবুর মধ্যে খুঁজে পাই পারদমাখানো নারীদেহ নয় সাবানের হর্ষ অজস্র ফেনায় ভিখিরিভ্রমণে নয় তত ফুটো পয়সানির্ভর হয়তো চলার গতি। কেঁপে কেঁপে জাগে উপবন তার প্রতি রোমকূপে, স্তনতলে নতুন শহর বড় লাভ, ঘুম যায় ঈশপের মূর্খ প্রাণীগুলো শরীর মাড়িয়ে ওঠে দেয়ালে যে জোড়া চটি একা এরও করো মানে আবৃত্তি করো যে মেয়ে, সন্ন্যাসীটিলায় উঠে নাচ শিক্ষা দাওপ্রথম প্রকাশ : মূলধারা
বনপরি ❑❑
অরণ্যে তোমার সঙ্গে দেখা হলো, পরিচয় হলো ছিলে পরি, ডানা ছিঁড়ে মানুষ হয়েছ তুমি জানো সবুজ রহস্যটিলা, গুপ্তশাস্ত্র, এখন মানুষ দেখবার নাম করে আমার সন্ধানে বেরিয়েছ জানো অন্ধকার হলে প্রণয়ীর গলা মুচড়ে সকল রক্ত শুষে নিতে হয় আজ তাই ঝাঁপিয়ে আসছে কালো মেঘ তবু বসি তোমার নিকটে এসে নত সফল গোয়েন্দা তুমি, দৃষ্টিচোর, পদচিহ্নভেদী আমার গোপন সব প্রকাশ করেছ রাজপথে তোমার জানুর কাছে বসি তবু; অরণ্য শহর ঢেকে দিলে ওই কোলে ঘাড় নুইয়ে দেবপ্রথম প্রকাশ : নদী, জানুয়ারি-মার্চ ১৯৯৮
ডানা ❑❑
কেমন ঝাপটে এলে, ডানা, এই জলাভূমি থেকে আমাকে নখরে গেঁথে, ও স্বতঃপ্রকাশ, তুলে নেবে? রাত্রি এলে কেন দূর বনে চলে গেলে অচেনা জন্তুর ঘায়ে ন্যুব্জ হয়ে থাকি, আমি জলে ডুব দিয়ে কাটাই দিবসযাম। হাঙর আমার বাবা-মাকে খেয়ে নিল, আমি তো অনাথ, আমি শ্যাওলার ঝোপে লুকিয়ে বেঁচেছি এতোকাল আমার শরীর থেকে খসে, ডানা, অপরহরণে চলে গিয়েছিলে যদি হাওয়াকে পাঠাই খোঁজে, ঝড় আমার ছেলে জন্তুর খুরের তৃণে বিষ্ঠা ও লালায় ভরেছে সমস্ত দেহ; নিজে নিজে, ও ডানা, ফিরেছ তুমি আজ বাঁকানো নখর নিয়ে এ জলাভূমিতে কেন বলো? নিঘুমজাগর আমি দিগ্ব্যাপী এ জলপাতালে দেখছি উঠছে জেগে সমাধিমহল— একটি সে খালি, তাতে মনুষ্যচর্বির দীপগুলো জ্বলে উঠছে একে একে, আমাকে কী বেছে নিতে বলো ও ডানা, ও পুনরাগমন?প্রথম প্রকাশ : গাণ্ডীব, জুন-আগস্ট ১৯৮৮
কথোপকথন ❑❑
‘কীভাবে এলি রে? তুই এলি কোথা হতে?’ ‘ছিলাম প্রাণ নিয়ে বেঁচে বরফশিলায় বেঁধে ঘর এসে গেছি ভেসে ভেসে হেডিসের স্রোতে।’ ‘ওখানে কেমন ছিলি? সঙ্গী ছিলো কারা?’ ‘কুমিরজননী দিত দেহতাপ, তীক্ষ্ণ বর্শা হাতে নররাক্ষসেরা দিত আমাকে পাহারা।’ ‘কপালে কিসের চিহ্ন? কী হলো দু’ পায়ে?’ ‘সূর্যদেবতার ছেলে; শরীর বইবার জন্য শত সন্ততিকে দিয়েছি পা দুটো বলি, ছিল না উপায়।’ ‘সহস্র সাপিনী কেন চুলে, বল, তোর?’ ‘প্রজার ধিক্কার সব গ্রহণ করেছি মাথা পেতে নিলাম তাদের এই শাস্তি ঘনঘোর।’ ‘কেন এ দুর্দশা তোর? কেন এই ক্লেশ?’ ‘সন্ধানে শোণিতপাত; শতজন্ম হিম বনবাসে কাটালাম, তবু তার পাইনি উদ্দেশ।’ ‘কোথায় যাবি রে শেষে? কী জলধারায়?’ ‘মরজগতের পারে যেখানে শৈবাল-সরোবরে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিদের লাশ ভেসে যায়।’প্রথম প্রকাশ : গাণ্ডীব, জুন-আগস্ট ১৯৮৮
উপাখ্যান ❑❑
যে দ্বীপে বসত করি তার নাম ক্ষণপরিত্রাণ সীমানানির্দেশ দেখে ভীত নাবিকেরা জাহাজ ফিরিয়ে নেয়। এই দ্বীপ ছয়মাস মোমসমুদ্রের মধ্যে ভেসে থাকে আর বাকি ছয়মাস অগ্নিপরিখার পেটে। মেঘ এসে উদরে চেপে রাখে ধাতুর ডিমের মতো এই জতুগৃহ, এর ঘন কালিমার ক্রন্দন-আকুল দিন—বেদনাশিখর কখনো হঠাৎ ঝড়—কোমরে পালক গোঁজা দ্বীপবালিকারা ফেনার জোয়ারে ভাসে। মানুষের বীজ দু’ পায়ে থেঁতলে দিয়ে অতিকায় দানো দাঁড়ায় সামনে এসে; আরো চায় ভোগ, করোটির পাত্র ভরে আরো চায় পানীয়, ক্ষরণ কী আছে আমার, বলো, প্রসারিত দুই হাত ভরে তোমাকে কী দেব আর? দেহের কলম পারিনি লালন করতে, দাওনি সুযোগ, দেব, তোমায় তোষণ এতই কঠিন, তাই অবশিষ্ট বীজ ভাসিয়ে দিয়েছি আমি তরঙ্গশীর্ষের জলে জলেপ্রথম প্রকাশ : গাণ্ডীব, জুন-আগস্ট ১৯৮৮
মৎস্যপুরাণ ❑❑
আবার এসেছ যদি মর্মব্যথা নয়, কোনো ঘৃণা তোমাকে দেব না, তিমি, গর্ভপালিতার মতন রেখেছ পেটে, যদিও গনগনে তীব্র ক্ষার দিয়েছে শরীর দগ্ধ করে ঝাপসা অতীতের কথা আজো ভাবো কিনা জানতেও চাইব না, এই দগ্ধদেহ কুষ্ঠদেহ নিয়ে জনে জনে করেছি তোমারই খোঁজ। শ্বাসরুদ্ধ মাতাল সাগরে আমাকে আশ্রয় দিলে, এরই গর্বে বৎসরে দু’ মাস রেখো মনেপ্রথম প্রকাশ : গাণ্ডীব, জুন-আগস্ট ১৯৮৮
অন্নপ্রাশন ❑❑
মড়াটানা চৌকিতে ভরে উঠছে অন্নপ্রাশনের দিন পা পেঁচিয়ে গরুর নাড়িতে হুমড়ি খাচ্ছে এদের শিশু ওদের শিশু বস্তুত খালি খামই পোস্ট হয়েছে ক্রমাগত ভুল ঠিকানায় গভীর জ্যোৎস্না তাতে জটিল হয়ে পড়ল কথাবার্তা, মুখ দেখাদেখি মফস্বল থেকে কলকলিয়ে আসছে বেশ্যারা মাজারে তাদের মানত, সন্তানভাগ্যের যেন নিজেরই কাঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সবাই রেলিং থেকে ধোঁয়াবাগানের মধ্যে গান গাইছে স্কুলছাত্রীরা ভর সন্ধেবেলা টেনে আনছে শঙ্কর শঙ্কর বাতিল কাগজে পূর্ণ হয়ে গেছে আমাদের বৈঠকখানা শুধু গত মেলায় মুখোশ কিনে উপহার দিয়েছি বন্ধুদের বুদ্ধপুর্ণিমায় শানিয়েছি ধর্মনিরপেক্ষতার চাকু আসলে মরা চোখ থেকেই ঠিকরে পড়ছে অতর্কিত দ্যুতি যেমন হেস্টিংসের ভূত চলে যেতে ‘বাঙ্গালা মা, বাঙ্গালা মা’ কেঁদেছিল নীলকৃষকেরাপ্রথম প্রকাশ : গাণ্ডীব, জুন-আগস্ট ১৯৮৮
ঘোড়া ❑❑
ঘন রাত, আর শুধু ডানাহীন ওড়াপ্রথম প্রকাশ : গাণ্ডীব, নভেম্বর ১৯৮৭
ছুরিচিকিৎসা ❑❑
কেটে নেয়া মাথা, রক্তের ফোঁটা, পিরিচে দু’ চোখ নড়েচড়ে উঠে দ্যাখে চুপচাপ: দু’ ফাঁক যোনির ভেতরে সাপের মোচড়ানো লেজ, গহ্বরে ছোটা। রাত, সাবধান! ঘুমের মধ্যে অস্ত্রোপচার— পোড়া ছাই, ধার অস্ত্রের ফলা, সুতো, যকৃৎ; সুনসান ফাঁকা: ছুরি...‘চুপ করো’...ছুরি...চিৎকার... শবাধারে চিৎ, ছুরিচিকিৎসা। অদৃশ্য গলা, ‘যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা যাঁর শেষ রাত্তিরে আসবেন তিনি; ততক্ষণ আমি দেখি বুক চিরে, তুমি তো কখনো আস্ত ছিলে না।’ আলগা শরীর চান্দ্র হলুদে কেউ নয় চেনা হাজার ঘোড়ার দামামা পিটছে আবহবাতাস...মাতাল গন্ধ... আধো জাগা শব...দেহহীন ভার... আর নীল লাল রুপালি নীরব।প্রথম প্রকাশ : গাণ্ডীব, নভেম্বর ১৯৮৭
সদ্গুরু
তপন (বড়ুয়া) দা-কে
❑❑
পরের জন্যে গড়েন প্রাসাদ ফুলের বাগিচায় নিজ বাড়ি রাস্তায় দু’ টুকরো চাঁদ একটি জটায় অন্যটি তাঁর হাতে অমাবস্যা রাতে তিনি তো সদ্গুরু আমার মৃত্যুজমজ ভাই তাঁরই কাছে ঠাঁই হাত ধরে যান নিয়ে যে পথ সবার জন্যে মানা নিজের দু’ চোখ কানা দশতলা-বিশতলা আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে পরে ঢোকেন তার ভেতরে গেলেন যেন আপন নিবাস এমন সৃষ্টিছাড়া বওয়ান ঝরনাধারা পায়ের গর্ত থেকে ভুখা আগুনশর্ত থেকে শিখারা যান বেঁকে গেলাশভরা জলকে মধু করেন শুধু ফুঁয়ে বৃক্ষ জাগান ভুঁইয়ে তিনি আমার রক্তপিতা স্বপ্নজাতিস্মর তাঁর ভেতরে ঘর বানিয়ে থাকি কিন্তু মরেন যখনই সদ্গুরু ভনিতা হয় শুরুপ্রথম প্রকাশ : গাণ্ডীব, নভেম্বর ১৯৮৭
ছাড়পত্র ❑❑
কই সে অভাব কই যাতে লঘু মাছের বুদ্বুদ বেড়ে ওঠে আকাঙ্ক্ষায়, পাতার আশ্রয়ে? ছিপ ফেলে জলের সুদূরে গিয়ে নীলিমাকে গেঁথে ফেলা শুধু। সুতো ছিঁড়ে গেছে তবু ডাঙায় উঠেছ এসে তুমি হে মকর, প্রাচীন সমুদ্রতরী, বেদনার্ত মীন অসম্ভব কৌতূহলে, ভুল করে, নত পাপবোধে। কামনা, স্মৃতির কণা, বিস্রস্ত অলক অদ্ভুত দাঁড়ের শব্দ ফেলে রেখে জলে ডুবে যায় হৃদয়ে করুণা রেখে, গ্লানিহীন বিষণ্নতা রেখে। যদি বা এসেছ ছলে, দেখা দিলে ছদ্মমমতায় মাস্তুলে আঘাত লেগে সূর্য ঝরে গিয়েছে পশ্চিমে। হরপ্পার ছড়ানো মোহর জ্বলে মাথার ওপরে পায়ের ধুলোর নিচে সোডমের বিচূর্ণ প্রাসাদ, লবণ, শিশুর হাড়, অশ্মীভূত খুলি। বাতাসে তরঙ্গ নেই—পরাগ, পাখির ডানা নেই কোথায় রক্তাভ গন্ধ? তবু বলি, তবু, হে মকর, যেথা খুশি চলে যাও। অবিমৃশ্যকারিতার দিন শুরু হলো।প্রথম প্রকাশ : সংবেদ, নভেম্বর ১৯৮৬
বিপ্রতীপ ❑❑
বিজলির ঝলকানি শিরায় শিরায় গাঢ় ছায়া এঁকে যায়।প্রথম প্রকাশ : সংবেদ, নভেম্বর ১৯৮৬
আত্মলীনা ❑❑
যদিও থাকে একলা ভিড়ে সারাটা বেলা ঘরে তবুও তার তরল বুকে আকাশ ঝরে পড়ে মাদুরে বসে আদুরে মেয়ে ব্যথার ভঙ্গিতে অসহ জল নেয় কেবল এবং তার ধার স্রোতস্বিনী ভাবনা থেকে শ্যামল কচি চিতে তপ্ত নদী উথলে ওঠে শীতল দেহে তার চিরুনি রাখে সংবেদনে, আয়না অন্তরে সন্ধেবেলা পৌরুষের গন্ধে তার মন ছটফটালে কেউ জানে না কেন অচেনা স্বরে কাকে যে ডাকে, ডেকেই চলে, হৃদয় উচাটন তরুণ বুকে দিঘল বেণী তীক্ষ্ণ ছেনি হানে কিন্তু তার ব্যথার ভার নির্বিকার থাকে যদি সে নিজ অতীত আর ভবিষ্যৎ জানে এখনি ডেকে আনুক তার স্মৃতির হন্তাকে কেন সে থাকে একলা ভিড়ে সারাটা বেলা ঘরে যেখানে তার তরল বুকে আকাশ ঝরে পড়েপ্রথম প্রকাশ : সংবেদ, নভেম্বর ১৯৮৬
রাত্রি ❑❑
একটি ত্রিশুল রাত্রি করেছে ভেদ ছিটকে পড়েছে দু’ চোখ দিগ্বিদিকে শেকড় ঢুকেছে গূঢ় মজ্জায় পাথর মেলেছে ডানা আমার লাশ কাঁধে আটটি লোক আদিম জান্তব হিংস্রতায় ভাঙছে রাতভর আঁধার জল রেশমি রুমালে আধখানা টকটকে কম্পিত লাল হৃৎপিণ্ডের ফালি বাকি অর্ধেক কুয়াশার বনে শোচনার নিচে চাপা আমার লাশবাহী আটটি লোক ক্রমেই মন্থর শিথিল হয় ক্ষুদ্র নিঃশ্বাস ক্লান্তপদ ভেঙে তছনছ জ্যোৎস্নার দর্পণ কাচে ঘুরে যায় অতীত ভবিষ্যৎ চুমুর গোলাপ ভেসে চলে যায় বেদনার মৃদু স্রোতে হঠাৎ কাঁধ থেকে লাফিয়ে নামি আদিম উৎসাহে নিজের কাঁধে নিজেরই লাশ নিয়ে এগিয়ে যাই (রক্তমাখা রোমশ বিশাল বিভৎস এক চোখ সকল কিছু ওপর থেকে লক্ষ্য করে যায়)প্রথম প্রকাশ : অনিন্দ্য, জুলাই-সেপ্টেম্বর ১৯৮৫