তীব্র ৩০ : আহমেদ স্বপন মাহমুদের বাছাই কবিতা

আহমেদ স্বপন মাহমুদ বাংলাদেশের নব্বইয়ের দশকের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি ও প্রাবন্ধিক। ভাটিবাংলার মায়াবী টান ও মরমি সুর তাঁর কবিতাকে উন্মূল আধুনিকতার প্রেক্ষাগৃহ থেকে সরিয়ে এনে স্বাতন্ত্রিক বিশিষ্টতা দান করেছে। আজ, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, তাঁর পঞ্চান্নতম জন্মদিনে পরস্পরের পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো কবি-নির্বাচিত ৩০টি কবিতা...


যখন কিছুই ছিল না

১. ওখানেই নামতে চাই যেখান থেকে এসেছি।

নাই থেকে আজব-রঙা অ-জীব স্বপ্নঘোর শূন্য থেকে

নাই হয়ে যাব পুনরায়।

বিপুল শূন্য সমারোহে পূর্ণ পরমে হরিহরে লা মোকামে—

নীলে, লীলায় শূন্যতায়—

নাই হয়ে যাব।—

লা শরিকে।

২. দম ফুটা করে করে বের হয়ে যেতে চাইছে বাতাস—

কোথাও কোথাও না—

শূন্যতার কাঁধে ভর দিয়ে দমে দমে ওড়ে যাচ্ছে পাখি

ডানা মেলে যেসব পাখি উড়ে যায় তারা জানে না প্রাণের বায়ুর উদাস পলায়ন

কী কারণ পাখিরা উড়ে গিয়ে শূন্যতার অশেষে বসে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া দেখে—

আর কাঁদে আর হাসে—

হাসিও মিলায় পৃথিবীর ভরকেন্দ্র লুপ্ত হয়ে যায় কিছুই থাকে না

না অন্তিম অণুকণা

কেবল আদিরূপে চৈতন্যরূপে বহু বহু গ্রহের অনাদি রূপে ঝলমল করে চির আলো চির অমা!

শূন্যতায় ঝুলে থাকে—

রাব্বি জিদনি এলমা।

৩. আমার বাসনা তোমার। সংবেদনশীল।

তোমার বাসনা অপর।

ছবির অপর পাশে, শূন্যতা তোমাকে বাসনা করে।

বাসনায় সম্পর্ক সহজ থাকে না সে-ও ওড়ে,

মন কি পুড়ে না সোনার শহরে।

অপরে বাসনা করে আপনায়।

৪. আমি লীলা পরাই ছন্দে ছন্দে ভাব; আমি মরি মরি হেসে। পরাই ছন্দে হাসি, নৃত্যে ছড়াই গান সন্ধ্যাভাববিলাসে। আমি লীলা আমার পায়ে পায়ে মদ, মত্ত চোখের উন্মাদনা আমার কণ্ঠে উথাল ঢেউ, গন্ধে বর্ণ ভাসাই অভিলাষে। আমি লীলা আনীলা পরানসখী, জড়াই বায়ু দেহে, সস্নেহে বিষ পুড়াই অন্তর, ভাব অভিনব, উড়াই অনায়াসে। আমি লীলা দুর্লভ সংকেতে রেখে যাই হরেক বরণ, আগুন-আন্ধার, আলোর তিয়াসে। আমি লীলা সর্বনামে আপনায় আপন মদে, আপনার মাঝে আমি অরূপে রূপক সাজাই সকাশে।

আমি লীলা করি। হাসি। ভাসিয়া বেড়াই।


চোখ বন্ধ, মন সহজ

১. কাছে বসিয়া থাক না তোমাকে বিনা না মন বসে।

বেঘোর চোরা মন অধরা সুদিন আসিবে তোমাকে নিয়ে আষাঢ়ে নায়রে যাই

নাই নায় নায়রে মায়া বাড়ে পাড়ে পড়ে থাকে কত মুখ অসুখ

আর কলিজায় বিঁধে যায় কষ্টের তির আমার দুর্গতির দূর গতি নাই

তুমি নাই বিনা তুমি মানে মন না সকল ঋণ না শুধিতে হবে

সকল কান না ফিসফিসে আশেপাশে রটে কত ঘটনা রসময় রটনা

যারা ভালোবাসে কাছে বসিয়া থাক না মন মানে না উনুনে রান না হয় অত্যল্প আগুনে তেলেবেগুনে জ্বলে শুনে কান না

এত এত রটনা রসময় ঘটনা হোক মনের অসুখ সারুক

কাছে বসিয়া থাক না

২. পাখি যাও। সোনার পালঙ্ক ছেড়ে। নদীর দীর্ঘশ্বাসের ওপারে অনাদরে

আদরে বলো তারে কিছু না বলো না ভুলে যেন না আমার অসহায় অন্তর মন্থর কাঁপে

আঁকা পাখি চিত্রমাত্র তুমি।

মায়ার রুমালে। দরদে। মরদের। চুমুর চঞ্চু কাছাকাছি। মিলিবার।

যেন আমাদের কতবার হয়েছিল মিল মিলন, অমিল সলিলে না যায় মোছা দাগ নিদাঘ

তোমার নাক বোঁচা উঁচা উঁচা স্তন মনোহর মন হরণ আলো ও বর্তিকা রণ আলোড়ন তুলেছিল মন দেহে

পাতায় ও গাছে পাখি তুমি পাছে ওই গাছে বসে শোন যদি ডাক নির্বাক সন দেহে

কৃষি খামার থেকে অনতিদূর অতিথপুর পার হয়ে থেমে যায় বারেক ফিরিয়া আঁখি চায় পুনরায় মিলিবার

মিলিত শুক্রবার মনে আছে শনিবারের আগে বসন্তে কোকিলায় ডেকেছিল তোমারে চেয়েছিল

মন গোপন অকারণ শনিতে শোণিতে

যাও পাখি বলো না তারে যেতে ভুলে আমারে আমার দায় তার অবসাদ বিষাদ হাহাকার কিছুটা থাকুক না দায় মুক্তি হোক।

পাখি তুমি চিত্রমাত্র আঁকা রাগে অনুরাগে হাসি ঠোঁট বাঁকা।

সোনার পালঙ্ক ছেড়ে ওড়ে ওড়ে পাখি যাও বলো না তারে যেন না মনে লয় আলয় আলোয়

আমারে। তোমারে।

৩. ফুল পাখিকে বিশ্বাস করছে না। পাখি না ডালকে। না গাছ পাতাকে। কদম বর্ষায় না গ্রীষ্মে জন্মে? তুমিও বকুল। ফুল ভালোবাসো। না। না আমি তোমাকে। ভালোবাসি। না বর্ষা ও কদম।

তুমি না কদম ও বর্ষা। না প্রেম ও ঘৃণা। প্রতিহিংসা নাই। না অপ্রেম। তোমাকে ভালোবাসি। বৃষ্টিপাত।

বৃষ্টি হচ্ছে রাতে।

রাতে তোমাকে সুন্দর দেখায়। তোমার হাসি ও চুম্বন। সুন্দর। তোমাকে আমার ভালাবাসা আছে।

রাতে। রাত নীরব। তুমিও জড়িয়ে থাকো। নীরবতায়।

সরবতা না রাতকে বিশ্বাস করছে। না প্রেমে ও চুম্বনে।

৪. তোমাকে দেখতে ভালো লাগে। তুমি সুন্দর। ভালো ও নিরীহ। শাদা কাশফুলের মতো। তোমার প্রতি মায়া রইল।

জানো তো, মায়া সে-ও উড়ালমুখী।

যখন মরা মানুষের মুখ দেখি তোমার চোখের মায়া উদ্‌ভ্রান্ত মনে হয়।

তোমাকে কাঁদতে দেখি নি কোনোদিন তোমাকে হাসতে দেখেছি অনেক তুমি মৃত জবাফুল ভালোবাসো।

জীবিতকে তুমি দেখতে পাও না কিছুতে।

মায়া অদ্ভুত শিকারের মতো। তুমি গভীর শিকারি আমি শিকার বুঝি না।

তুমি জানো। তোমার পাখারা জানে শূন্যতায় ভ্রমণ আনন্দময় আসমান জমিনের তফাত সে জানে না।

গোলাপের কাঁটা নেই কোনো তুমি চিরকাল গোলাপ ভালোবাসি।

তোমাকে। তুমি সুন্দর। মৃত জবাফুল।

৫. আমি একা থাকি। একা ঘুমাতে যাই। একা একা আকাশের মেঘের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে তোমাকে একা মনে পড়ে।

তোমার পাহাড়ের কথা একা একা ভাবি। পাহাড় দেখতে উঁচু। তোমার আকাঙ্ক্ষার সমান।

পাহাড়ের উচ্চতার সমান পানশালায় ঢুকে গ্লাসে চুমু দিতেই তোমার ঠোঁট প্রসারিত হতে হতে আমার ঠোঁটে এসে মিশে। একা।

আমরা তখনো নিঃসঙ্গ নদীর মতন। নদী তীরের একাকিত্বের মতন। শুকনা বাঁশপাতার ওড়াউড়ির মতন, একা।

একাকী উড়ে উড়ে সে কোথা যায়? আমি একা থাকি। একা মরে যাই। একার হাওয়ায়।

৬. অঙ্গ সঙ্গ করো মন।

ত্রিকালে ত্রিভঙ্গ ভাঙ্গো, জয়গানে আপন মনে

ধেয়ে যাও ফিরাও আপনারে লা শরিকে

ইলাহা বিনা কারণে যে করণ মানব মরণ

অকারণ তুমি বন্ধ করো পাখা নয়ন অভিরাম রামনাম জপে

বাকি সব পড়ে থাক অনুতাপে বঙ্গে

সর্বাঙ্গে।

৭. আমার সকলি প্রকাশ্য। তোমরা জানো। আমার প্রেম ও মদ। জীবন ও অনাচার। ভাব ও বিরহ। আমার ক্ষ্যাপামো ও গান। কেননা আমি একাগ্র। আমি নিমগ্ন জল ও স্রোতের সম্পর্ক। বিষাদ ও আনন্দ অখণ্ড রাখি। অখণ্ড ও আলাদা। আমি প্রাণ ও প্রকৃতির ঐক্যের নামতা পড়ি। এই ধারাপাত আমার। আমি সমগ্র। নীরব ও শূন্য।

তোমরা চোখ তুলে তাকাও। কিছুই দেখতে পাচ্ছ না। না দেখার মাঝে আমি। অনুভব। শূন্য ও রহস্য। কলমতালাশে চিনে নিও। আমার ধ্যান ও সমগ্র। শূন্যতার পরতে পরতে।


রেখা

রেখা বিস্তীর্ণ হলে বর্ণ ক্রমাগত নীল হয়। সুদূরের যে পথে তুমি রেখাক্রম সেই পথে ধায়।

একটি ঘোড়া দৌড়েছিল কাল সুতোর ওপরে রোমগুলো তার কাঁপছিল—নীলরঙে মাখা আমি ঘোড়া ভালোবাসি

এবং বর্ণসমেত ক্রম করেছি যাত্রা রেখাপথে।


ঘোড়া

১. তার যাত্রা হলো শুরু—শূন্য এবং অন্ধকার—বিস্তৃতির, প্রাচীন নগরীর স্তব্ধতায়, নীরবতা ও কোলাহলের, আড়ালের—যেন উদাসীনতার প্রান্তরের বিশালতার শূন্যতা, তারও আগে আমাদের চক্ষুকালের, আমাদের সীমানার কালপ্রবাহের শেষবেলার প্রাক্কালে আলো আর ফোয়ারার—সায়রের নহর বহমান—অনন্ত নীরবতাকালের—আমরা ভালোবেসেছিলাম যুগ্মধ্বনি, আমরা গেয়েছিলাম যুগপৎ, আমাদের কান্নার বাঁশি, আমাদের সুরের হাসি আগুনের অশেষ শিখার, আমরা মরেছিলাম সেই বেলা, আমরা বুঝি পুনর্বার জন্মেছিলাম ওই বেলা, আমাদের মৃত্যুর ইতিহাস প্রতিবার জন্মের, আনন্দের, উচ্ছ্বাসের—আমাদের প্রতিবার জন্মের ইতিহাস আমরা—আমরা পরস্পর পৃথিবীর আদিতমা আলোবিন্দু

বিন্দু থেকে বিস্তৃতি—বিস্তৃতি থেকে আদিভ্রমণ—কাল থেকে ধ্বনি আর কোলাহলের মোহ থেকে শূন্যতায় ফিরে যাওয়া—শূন্যতা মানে জন্ম, শূন্যতা মানে মৃত্যু ও ইতিহাস—আলোবিন্দু, যার প্রাণে লুক্কায়িত অনাদি প্রেম ও আগুন—বিবিধ ধ্বনি আর ঢেউ; আমরা সেখানেই ছিলাম, সেখানেই আমাদের শুরু, তারপর কোনো সীমা নেই—শৃঙ্গে বসে গান গেয়ে অনন্ত বেঁচে থাকা

আমরা বুঝি মরণের আগে জন্মেছিলাম, শূন্যতার আদি মাতাপিতা, অশেষের হাতের রেখা অগণন কাল থেকে বাঁশি হয়ে কাঁদে—অচিন সুরের পাখি মিশেছে মিলনের মেলায়—গন্ধবনে, আকাশের মতো উদার, আলো ছড়ানো সীমাহীন হাসি—আলোবিন্দু ও শূন্যতা—জন্ম ও মৃত্যুর দোসর—পরস্পর ভাসমান অশেষ প্রেম—অগ্নির—সৃষ্টির ও ধ্বংসের রূপ

তার যাত্রা শুরু ও শেষ, আলো নিভে যায় এবং জ্বলে

২. আজ পৃথিবীর ঘোড়াগুলো আকাশে উড়ছে, তারা বাতাসে ধাবমান—মহাকালের—কোনো শাশ্বত নগরীর খোঁজে অজস্র ধ্বনি ও বর্ণের, ধ্যানের আলোকমালায়, আমাদের ঘোড়াগুলো আজ উড়ে যায়

ঘোড়াগুলো তোমার ভালোবাসার প্রতিরূপ, বুঝি তুমি ভালোবেসে ঘোড়া হতে ভালোবাসো, আর মর্মের পরশ বুলিয়ে গান গেয়ে দূরে সরে গিয়ে আগুনের অন্ধকার পরাও; ভালোবাসা বুঝি দূরে যেতে ভালোবাসে, উড়ে যায় মর্মের আকুতি চাপা দিয়ে—

আকাশ-স্নিগ্ধ-বাতাসে আজ ঘোড়া ধাবমান, আর দিগন্তরেখায় তোমার মায়া-মায়া চোখ, নীরবতার—ঘাসগুলো সবুজ উন্মুখ সরু সরু, তোমার ভালোবাসার তীক্ষ্ণ রূপ—

তুমি আজ ঘোড়া, আকাশ পেরিয়ে আলোনগরীর পথে যাও—

৩. ঘোড়াগুলো ক্রমশ ধেয়ে আসে, যেখানে ওপরে আকাশ, পাখির প্রেম আর জলপাতা ছেয়ে যাওয়া বনের নগর, অথবা কোনো আদিম, কোনো ভবিষ্যৎ সভ্যতার সম্ভাবনা-ঘেরা বর্তমানের—আমাদের কালের মূর্তির ধ্বনি, নাকি বিলুপ্ত নগরীর অভিশাপ—যেখানে কেবল আলো আর গান, নাকি বিধ্বস্ত উত্থান—

তবু আমাদের ভালোবাসা ঘোড়া হয়ে লাল-নীল-হলুদ-সোনালি-রুপালি-সাদা টগবগে ফুটন্ত ফেনার সাশ্রয়ে বুদ্বুদ? ভালোবাসা বৃষ্টি ও মেঘের চিৎকার, আজ মেঘগুলো ঘোড়া হয়ে আমাদের প্রেমের নায়রি হয়ে উন্মুখ যেন উদ্বেল আমাদের কলাবিদ্যার অন্ধশান্তরূপ; এইভাবে কবে যাত্রা হয়েছিল শুরু, কোন কালে কোন নগরীর পিঠে চড়ে, কার রথভারে—

ঘোড়াগুলো যাত্রা করেছিল, আমাদের ভালোবাসা যাত্রা করেছিল, আমরা ভালোবেসেছিলাম মেঘ, বৃষ্টি, আকাশ আর বিশালতা আর আমাদের প্রত্নঘোড়াদের কেশর, টগবগে বাবরি দোলানো প্রার্থনা—আজ বিন্দু থেকে আলো ছড়িয়েছে, আজ আমাদের নগরীর উৎসব, আমরা ভালোবেসে আলো ছড়িয়েছিলাম, ঘোড়াগুলো আমাদের ভালোবেসেছিল মৌনতায়—আমাদের মৃত্যুর জয়গান, আদিতমা শুরুর আর কালহীন নিঃসীমতার আগুনে আগুনে—ধ্বনি ও বর্ণের জয়রথে


সোনালি ধান আর তুমি

উঠানে পড়েছে রোদ আর ধান শুকানোর ছলে তোমার মুখে যে হাসি ফুটে আছে বারান্দার আড়ালে ঠোঁটের তীক্ষ্ণতা নিয়ে প্রস্ফুটিত হও, গাঢ়তর সম্পদের বিভায়;

রোদ আড়াল হলেও সোনালি ধানের রঙে স্পষ্ট হয়ে থাক চক্ষুসীমা-দূরে, আর দৃশ্যের তৃপ্তি নিয়ে অপস্রিয়মাণ ক্ষীণতর আলোর মতো দূরে যেতে গিয়ে কেঁদে ওঠো প্রকাশের ভারে।

রোদের স্পন্দনে তখনো কি ভালোবাসা জমা পড়ে থাকে?


সুন্দরবনের গল্প

সুন্দরবনের গল্পে একপ্রকার সম্মোহন আছে। সারা রাত হরিণীর পেছনে চিতাবাঘ চিতার পেছনে আকাঙ্ক্ষা আকাঙ্ক্ষা পেছনে আগুন আগুনের পেছনে সম্মোহন ইত্যাকার গল্পে একপ্রকার ধ্যান নিহিত।

আমি যেই সম্মোহনে তার দিকে তাকালাম যথামাত্র অজস্র জৈব-মেঘ উড়ে এল আর তার চোখের লুকানো আগুন অন্ধ হলো নিমেষে­—আগুনের ভরা অন্ধকার।

এইরূপ গল্পে আমি ও জীবনানন্দ প্রায়শ সুন্দরবনে যাই আর সুন্দরবন ক্রমশ মুগ্ধ হয় আমাদের প্রতিভায়!


আনন্দবাড়ি অথবা রাতের কঙ্কাল

আমি মৃত্যু চেয়েছিলাম, তাই আকাশে লিখেছি নাম মেঘের, যারা সমুদ্রের জলে সন্তরণ করে আর উচ্ছল জোয়ারে রক্তের সাথে বিনিময় করে বিষাদ—তুমি না রক্ত, না বিষাদ—ফলে মৃত্যু হয়ে ধেয়ে আস, যার নাম সর্বনাশ!—আর ছড়িয়ে দাও বিস্তীর্ণ মাঠের নামে আনন্দফোয়ারা, হাসতে থাকো,

কেননা মৃত্যু তামাশা মাত্র—যেমন প্রেম তামাশা হয়ে বেঁচে থাকে তাপবিকিরণে—আগুন একপ্রকার ধ্বনি, সর্বনাশ তার বাক্য হয়ে গেঁথে থাকে মনে—পরাশ্রয়ী; পারো নি স্বাধীন হতে, অথচ কবির হৃদয় স্বাধীন ভূখণ্ড—যাকে তুমি মৃত্যুর খসড়া দিয়ে চলে যাও দূরত্বে—দূরত্ব কোনো কল্পনা নয়, অধিক বাস্তবতা হয়ে আসে, আর খুলে যেতে থাকে উন্মত্ত সকল পাঁজর— অবশিষ্ট পাটাতনসহ জাহাজ ডুবে যায়; তুমি না ডুব না সাঁতার কোনোটাই চাও নি, বরং চেয়েছিলে মেঘের মৃত্যুর দিনে আনন্দ-উল্লাস—অথচ সেই মেঘ আলোর উৎস হতে চেয়ে আকাশে উড্ডীন, আর যত বিদ্যুচ্চমক সে মেঘেদের গর্জন, বৃষ্টি হয়ে বারবার মৃত্যুর পরাজয় নিয়ে বেঁচে থাকে—আর মেঘ মরে গেলে তুমি যখন আনন্দবাড়ির ছাদ ঘেঁষে দাঁড়াও, পাতার আড়ালে পুকুরের জল তোমাকে সম্মোহিত করে—

সম্মোহন একপ্রকার প্রেম, অথবা মৃত্যুর নাম—কেননা মৃত্যু রচিত না হলে প্রেমের যত আয়োজন নিঃস্ব হতে থাকে, নিঃস্ব হতে হতে চঞ্চল অথচ অর্থহীনতার সকল সারমর্ম তোমাকে জীবিত রাখে—এভাবে প্রেম বিষাদ হয়, বিষাদ কঙ্কাল হয়ে ঝুলে থাকে, আর টিকটিকি, যে ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে আছে, পুনরায় দেখে নেয়

মানুষ চিরকাল পরাশ্রয়ী—তুমি খণ্ডিত আশ্রয়ে থাকো—আর সবকিছু পড়ে থাকে মৃত্যুর মতো, অনাস্থায়।


কাঁঠালপাতায়

কাঁঠালের রঙের মতো এত উদাসীন আর কিছু নাই।

না গ্রীষ্ম, না হেমন্ত, না শীত ফলে তোমাকে চেয়ে চেয়ে ভাবি, পাতার আড়ালে, বিশিষ্ট;

তোমার পরনে যে শাড়ি তার নাম মমতা হলেও, চোখে ছুরির তীক্ষ্ণতা আর বারবার ঝলসানো চমক;

চমকে উদাসীন হয় রং আর পোড়া মাংসের কাবাব, শাড়ির আঁচড় ও মাতৃসদন, জ্বলন্ত চুলার উত্তাপ;

আর তুমি জড়িয়ে আছ যে ক্ষুধা— অসামান্য আগুন আর বুকের রোদন চাপা দিয়ে প্রতিদিন ট্রেন চলে যায়—

আমরা চলো কাঁঠালপাতায় লুকিয়ে থাকি!


আমি আর কফি চকলেট

আমি হাঁটছি, আর কফি চকলেট তুমি ভাবছ বসন্ত-উত্তাপ এই শীতে,

হাঁটছি আর ভাবছি মধুপুর গড় মাথার ওপর খর রোদ আর খলখল খুন ছড়িয়ে পড়ছে মুখে,

রক্তাক্ত হাতের সকল লাল আর ওই সূর্যের তাপ জ্বলছে,

কেউ কি খুন হয়ে যাচ্ছে!

কফি চকলেট নেই সন্ধ্যা গড়ায়, আমাদের বসন্তগুলো এলোমেলো—

এই শীতে খুন হয়ে যায়।


সম্পর্ক

সম্পর্ক জলের মতো। তোমার পায়ে পায়ে জলের দাগ দ্রুত মিলিয়ে যেতে থাকে।

তোমাকে গভীর জলের তলে কালো মুখের মায়া মনে হয়।

মায়ারা জলে জলে বয়ে যায়।

মুখ হারিয়ে গেলে জলের কোনো রং থাকে না।

তোমার মুখ রংহীন হলে আমি বুঝতে পারি সম্পর্কের উড়ালে তুমিও ছেড়ে গেছ

জলপুর।


বনমোরগ

আমার পাঁচটা বনমোরগ ছিল। বনমোরগ দেখতে ভালো লাগে। তারা রাতে ফিরে, সকালে ঘুমায় দিনে তিড়বিড় করে ঘুরে।

তাদের ঘোরাফেরা দেখতে ভালো লাগে।

একবার কোনো এক শীতের রাতে একটা বনমোরগ খাদে পড়ে গেল খাদে পড়ার আগে সে উড়ছিল উড়বার আগে সে ডাকছিল ডাকবার আগে কয়েকটা তারা খসে পড়ছিল।

আমার কোনো বনমোরগ নাই।

আমরা তারাদের বোন, তারাদের ভাই আমরা মরে গিয়ে শূন্যে মায়ার তারা হয়ে যাই।


টাকার গাছ

টাকার গাছ লাগিয়েছি আমি।

টাকাকুড়ানিরা তাই প্রতিদিন আসে। মুঠ ভরে টাকা নিয়ে যায়। তারা দরকারের চেয়ে বেশি নেয়। একদিন ঘর ভরে যায় টাকা।

তাদের আরো আরো টাকা দরকার। নতুন ঘর বানাবার দরকার। তারা লোভী হয়। আরো আরো চায়। টাকার গাছটি তারা কেটে নিতে চায়।

একদিন ঝড় আসল। গাছ ভেঙে গেল। শিমুল তুলার মতন উড়ে গেল সব টাকা।


শ্রীমতি প্রজাপতি রায়

                                জীবন সুন্দর। আসেন, জীবন উদ্‌যাপন করি। আনন্দ করি।

১. তামার সাথে দেখা। তুমি ঝলসানো সুন্দর। ব্রজেশ্বরী তুমি। মায়া ও প্রেমিকা। আকারে এসেছ। অন্তরে। মন হরে।

মনোহর বৃক্ষ তুমি। গহন বেদনা। কায়াসঙ্গী তুমি। সাধনা। রূপ ও পরম।

রূপমাত্র বিভীষিকা। আগুন। আমি আগুনে ঝাঁপ দিলাম।

                                অতলের ভাব ধরতে পারেন চাষি। ইন্দ্রিয়ের ভাব ও বুদ্ধির ভাব একক যখন হয়, তখন একজন চাষি প্রেমিক হয়ে ওঠেন।

২.

মায়া লাগে তোমার জন্য। তুমি উদয়ে থাকো। তুমি ভালো। মায়া নায়রির নাওয়ের তক্তার তলের মতন ভিজে থাকে জলে। মায়া অনলে সবসময় জ্বলে ছাই হয়। ছাই উড়ে যায় প্রজাপতি রায় হাওয়ার দীর্ঘশ্বাসে সে মিলায় ঝরাপাতা হয়ে কোত্থেকে কই যায়! কেউ জানে না দূরের ট্রেনের কলিজা কতটুকু জ্বলে জ্বলে চোখের নিমেষে অশেষে হারায় তোমার মিতা ট্রেন আর তুমি প্রজাপতি রায়

                                প্রকৃতির সাথে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক। প্রকৃতিই মানুষের অন্তর।

 ৩.                           

একটি পাতা ঝরে পড়ার কালে একটি গাছের সরল অক্ষমতা তোমার হাসি থামতে পারে ক্ষণে গভীর শিকড় জাগাও মমতা। মাটির দেহে বিষ মিশিয়ে দিলে সোনার ফসল বিষেই জারেজার নীরবতার ব্যথায় কাঁদে রং সবুজ ঘন পাতার হাহাকার। দ্বিধার কালে কেমন যেন ভয় ভয়েই থাকে সকলি বিস্ময় এবার বলো সন্ধ্যারাতের চুম সরল পাতায় ছড়াও দেহের উম। তুমিই বলো পরম হাওয়ার রাত ঘোরের কালে পরশের উৎপাত নির্দ্বিধায় একটি রাতের ঘোর তোমায় করে এমনি ভাঙচুর!

                                বন্ধুভাব মায়ার ভাব। সেই ভাব শ্বাসপ্রশ্বাসের মতোই অপরিহার্য।


পরানের পুত্তলি

সে এবার মুক্তি পেল সে একটা আকাশ পেল নিজে সে একটা পাখি হলো কী যে!

আগুন খেয়ে মুখ পোড়ালো বৃষ্টি ভিজে গা ধোয়ালো বাতাস খেয়ে হাওয়া হলো সে একটা আকাশ হলো নিজে।

সে এবার উড়াল দিল সে এখন শূন্য একা নির্জনতার ব্রিজে সে তার কপাল খেলো নিজে

সে একটা পাখি হলো কী যে!


জেরক্স

তোমাকে জেরক্স করে দেখি, চাখি।

ফটোশপে, সেজেগুজে দিয়ে অনাবৃত রাখি স্তনভার; চিবুকে ও বুকে টোকা মেরে দেখি লালাভায়, মনামার।

রেখে দেই আঙুলের কারসাজি গুপ্তদেহের অঞ্চলে যথা চঞ্চলে সে কত কথা বলে কোমল, সহজিয়া, প্রাপ্ত-অভীপ্সার মতন তাজা তাজা ভাব, ঊরুসন্ধি, উদ্দীপ্ত স্তন।

অপ্রত্যক্ষ এই দেখা সরাসরি হলে ছেলেটিকে দিতে কি কিছুটা আদর জেন্ডারজ্ঞানে, নারীবাদ টেনে এনে কোলে!

তোমাকে জেরক্স করে দেখি, চাখি। অনাবৃতায় লেগে থাকে চোখ, গোপনে একাকী।


কান্না

কান্না থামছে না নামছে না বুক থিকা ভারী পাথরের বোঝা গরু হারালেই বিষাদের এত পথ খোঁজা!

খান খান বুক লয়া অযথাই তারে দোষা বাদামের খোসা কেমন অবহেলা লয়া পড়ে রয় বেবাক নিশ্চয় দেখে না তারে চোখ মেলে এত এত মনেদের ভিড়ে, মনের কঙ্কালে।

কান্না থামছে না বলি, আদিমন্দিরের দোহাই আর না সকলি ভেক, মিথ্যা ও ভুলচুক তামাশার বাণে মন আজ নাচের ভালুক।

রংঢং করে যাও, ওহো তুমি ম্যাজিক ম্যাজিক জগজ্জয়ী, টোটকা চালে করো বিশ্ব জিত— অগোচরে যাও বালির পিরিতে, যথা চিকচিক করলে যে সোনা হয় না সকল ধাতু, হিতাহিত কাণ্ডে কী করে রাত্রিকে ঘিরে ছিলে, কিঙ্করে, এত চালাকি ফসকা গেরোয় গিঁট খুলে গিয়েছিল, এ আর এমন কী!

হাসি পায়, তবু যে পাথর বুকের উপর বসে গেছে খসে চাপা পড়ে প্রাণ, এত অ-পরান মুখোশ ও মিথ্যায় গেছে ধসে।


এই মর্ত্যে এই ধামে

এই মর্ত্যে এই ধামে বেঁচেবর্তে দিন কাটছে দুর্গন্ধে প্রায়-অন্ধে অনুভূতিটা ভোঁতা হচ্ছে

বলি, কাটছে কিছু ভারে বলি হচ্ছে কিছু ধারে জনারণ্যে খুন হচ্ছে কেহ দেখছে কেহ চুপসে ধীরে যাচ্ছে মহানন্দা

দিনমন্দা তবু চলছে ঢিমে তালে তালে তালে হাঁক ডাকছে মেঘ ভাসছে ভোর হচ্ছে না

হুতাশনে ঘি ঢালছে দিনে দিনে ভরে যাচ্ছে ঋণে দেশটায় কলাগাছটা আরো ফুলছে লাল রক্ত কেঁদে উঠছে আলো ফুটছে না

গণমান্য হীনমন্য কেহ ধন্য কারো অন্ন কেহ লুটছে

যারা দেখছে তারা ছুটছে লোভলালসায় ভাগ দিচ্ছে ভাগ নিচ্ছে যোগ হচ্ছে কেউ গুনছে না

যত বিত্ত যত কীর্ত নিশিনৃত্য ক্রমে বাড়ছে ওই ক্ষমতার বেশি দাপটে ওই শোষণে যেন কাঁপ ওঠে নাশ হচ্ছে যত শক্তি যত ভক্তি তিলমাত্র অনুরক্তি কুশাসনে নাশ হচ্ছে

কেহ কাঁদছে ভরে যাচ্ছে আহাজারিতে কারো চোখটায় জল আর না কারো বুকটায় চাপা কান্না কেউ শুনছে না

এই মর্ত্যে এই ধামে বেঁচেবর্তে কত শর্তে?


দশ হাজার তারার মানুষ

১. আমাদের বাড়ির সামনে উঠান, তার সামনে পুকুর। পুকুরে জল আছে, মাছ নাই। আমরা বাজার থিকা মাছ কিনে খাই। গরিবেরা মাছ বিক্রি করে, টাকা জমায়, জমি কিনে। তারা ধনী হয়।

সেই ধনে ব্যবসা করে। সড়ক বানায়। ফিশারি করে। আমাদের বাড়ির সামনে সড়ক, সড়কের সামনে বিল। বিলে নানা জাতের মাছের চাষ। লোকেরা ধান চাষের বদলে মাছ চাষ করে। ঢাকায় পাঠায়, টাকা রোজগার করে। বড়লোক হয়।

সড়কে পাথরের টুকরা। অকাল মরণের মতো তারা মরে মরে যাচ্ছে। ভাঙা সড়কে হাঁটতে গিয়ে পাথরের টুকরাগুলো পায়ে লেগে ছিটকে পড়ে। তারা ব্যথা পায়। মানুষের পা তথাপি অক্ষত থাকে! সে-ও অদ্ভুত!

বিলে অনেক পানি। আমাদের চোখে কোনো কান্না নেই। পানির কাছে কান্না জমা রেখে আপাত ভুলে গেছি তাকে। বিল আমাদের প্রেম ও আবেগ দেখাশোনা করে। নিশ্চিন্ত মনে আমরা বিলের পানির দিকে তাকায়া থাকি। সে-ও ভুলে যায়।

পানির তলে মাটি, মাটির তলে পাতাল। আমাদের কেবল পাতালে যেতে বাকি। বাকি সব আমরা সাবাড় করেছি। এখন হাট থিকা গঞ্জ, গঞ্জ থিকা বাজার। বাজারে রুই কাতলা ওঠে। ছোটলোক বেঁচে, রুই কাতলারা দাঁত বের করে হাসে।

বিল পার হলেই রেলপথ। রেলের ধারে বন। ভুত ছিল বনে, পেত্নী ছিল। এখন বিদ্যুতায়িত। ভুত-প্রেতহীন, ভীতিহীন। এখন কেবল রেলপথ ও স্টেশন খেলা করে। স্টেশন অদ্ভুত ভিড়ের মানুষের মুখের মতো অচেনা। তবু তাকে কত বছর দেখি। ট্র্রেন চলে যায়। স্টেশন পড়ে থাকে। সে-ও নীরব, গুপ্ত গুহার মতো একা হয়, অদ্ভুত পরিখার মতো শুয়ে থাকে।

আমাদের বাড়ির কাছে রেললাইন যেখানে শেষ হয় তার নাম মোহনগঞ্জ। মোহন আমার বন্ধু ছিল। সে আত্মহত্যা করেছে। জেনেছি অনেক পরে। সে প্রেমে পড়েছিল মোহিনীর। মোহিনী নামে কাউকে চিনি নাই আমি। তথাপি জেনেছি, মোহন স্ত্রী-লিঙ্গ-বিশেষে নিপাতনে সিদ্ধ হয়েছিল, কিছুটা বায়ুসেবনে। আত্মহত্যার কথা ভাবতে ভাবতে আমি সেখানে যাই নি। মোহন গিয়েছে। ট্রেন কোথায় চলে যায়, আবার আসে; মানুষ ফিরে না। অদ্ভুত!

আমাদের বাড়ির পেছনে নদী, সামনে বিল, পাশে রেলপথ। সেখানেও মানুষেরা ঘুমায়, প্রেম করে। মোহনেরা মরে গিয়ে রেলের অদূরে নুয়ে পড়া আসমানে তারা হয়ে ঝুলে থাকে।

২. স্টেশনে হরেক মানুষ আসে। ভিড় করে। ঋতুবিশেষ শীতে বাষ্পীয় ধুঁয়া ওড়ে কুয়াশার মতো। কত মুখ কুয়াশা হয়ে ফিরে নাই আর। সাময়িক-প্রেমে পড়া মেয়েরাও বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ধুঁয়ায় মিলায়া গেছে। আর রিপুকাতর মন স্টেশনে ঘুমিয়ে পড়ে। নির্জন স্টেশন মাস্টারের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো নীরব, একা জেগে থাকে নিকট-দূরত্বের হাওর। হিজলের জল। আমাদের মন ভার হয়।

জল অদ্ভুত! কলকল। বিনাশী চুরির চঞ্চল পড়ে সে-ও গভীরে মমতা পুষে। হাওরের ঢেউ কত মনে কত ভয় দিয়া ভাসায়া নেয় নায়রের নাও। পিছনে যে-ফেনাশ্রিত পথ তাতে লেগে থাকে মায়া। জল কী মায়ার অসুখ, সম্পর্কের আগুনে পুড়ে আমাদের প্রিয় প্রিয় মুখ!

তার একটি মুখ। মুখের রংয়ের নাম হাসি। আমরা গরিমার হাসি ভালোবাসি। হাওরের বিছানো জলের ঝিকমিক রোদেলা হাসির মতো সূর্যাস্তের আভা। মুখে নেমে আসে ছায়ার আন্ধার। জীবন ছায়াদের কান্নার নাম। হাসি তার মোড়ানো চমক। তামায় সোনার প্রলেপের মতন। তথাপি প্রলাপ-প্রেমে আমাদের লোভ। ভালো লাগে। কত যে কিছু ভালো লাগে মনে। তথাপি মুখেদের প্রতি আকর্ষণহেতু যে প্রেম তার হাসি মিলায়া যাবার মতো ক্ষণস্থায়ী। কেন যে সারাক্ষণ হাসতে পারে না মানুষ!

তার দুটি হাত। হাতের রং তামাটে। তাতে বিভিন্ন উচ্চতায় পাঁচ পাঁচ আঙুল। আঙুলগুলা সোজা করা যায়, বাঁকা করা যায়। বাঁকা বাঁকা কথার মাস্তুলে মাংসাশী আঙুল অর্থবোধক হয়। বাঁকানো হাসির সাথে আঙুলের যোগসাজস আছে। তর্জনীর কথা ভেবে বিমর্ষ হয় কনিষ্ঠা। বৃদ্ধাঙ্গুল পাত্তা দিচ্ছে না ওসব। অধিক উচ্চতা নিয়া মধ্যমা কেন জোড়া লেগে আছে ভাবছে অনামিকা। আঙুলের কলহ দেখছে চোখ। তাতে জল এসে চুবিয়ে দেয়। সবুজ রংয়ের চোখে অনেক ক্ষুধা। সে হঠাৎ লাল হয়ে ওঠে। লাল চোখ দেখে ভয় পাচ্ছে ধারাপাতের শিশু। শিশুদের চোখ সবচেয়ে সরল। হাওরের ঝিরঝির হাওয়া-জল।

সরল অঙ্ক না বোঝে চিরদিন পিছিয়ে আছে মনোরমা। তার নাম রমা হলেও মন্দ হতো না। রমারা খুলনায় না ঢাকায় আছে, মনোবেদনায়! শান্তিকে পেয়েও সে অশান্তি আঁচলে বেঁধেছে। আর মনোরমা সরল হতে হতে হারায়া গেছে দূরগামী ট্রেনে-চাপা ভিড়ের তরল সন্ধ্যায়।

আঙুলের বিভিন্ন উচ্চতার মতো উঁচু-নিচু হয়ে হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা নামে। আমাদের উঠানেও সন্ধ্যা আসে। হাঁটতে হাঁটতে সে-ও ক্লান্ত হয়। তার মুখেও পড়েছে ভাঁজ হালকা হাওয়ায় দোলা জলের ঢেউয়ের মতো। ক্লান্তি নিয়া রবীন্দ্রভাব বুঝতে না পেরে রমাদের দেয়ালের টিকটিকির লেজ খসে গেছে গেল বুধবারে। বুধবার কেন যে বারবার আসে! সে-ও অদ্ভুত!

অদ্ভুতুরে কত কী যে আছে! তার নাসিকা এক, রন্ধ্র দুই। তাতে চুপচাপ আসা-যাওয়ার পথে গুল্ম ও বিষের উত্তাপ। উনুনের শব্দহীন উত্তাপ থিকা আলাদা বলে সেসবের তাপপরিবাহী ক্ষমতা নাই। ক্ষমতাও বিশেষ কাঠামো। মিনারের পাদটিকা হয়ে সে-ও বিভ্রমে বাহবা কুড়ায়। আঙুলেরা এসব বলাবলি করে টিপ্পনি কাটে।

দুটি পা। দৌড়াবার ক্ষমতা না থাকলে পা অযথাই পা। পায়ের পাতারা অধিক কষ্টসহিষ্ণু। রেলপাতের সহনশীলতায় চাকারা যেমন অনায়াসে যায়। তার পায়ে ক্ষুর নাই। ঘোড়াদের ক্ষুরের শব্দে তাই রাজনের ঘুম ভাঙে। ঘুম ভেঙে গেলে সম্রাজ্ঞীও স্থির হয়ে বসে। স্বদেশ অস্থির তাতে কী! তার প্রেম বাদামের হালকা খোসার মতন কৃত্রিম-মায়া ও অভিমান ভরা। বহুকাল ধরে সে অভিমান গলাগলি করে আছে। আমরা তবু ঠায় দাঁড়ায়া তামাশা দেখি। সে-ও অদ্ভুত!

তার দুটি কান। গাধাদের কান চারটি হলে তারা কি অধিক শ্রবণপ্রবণ! কান ধরে টানলেই নাকি মাথা আসে। তথাপি চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনি। শব্দহীনতায় শুয়ে আছে বুকজল সারি সারি দোদুল্যমান হিজলবাহিনি। রাতের হাওর। জল কী কানে কানে বলে যায় কিছু তার। হারানো হাহাকার। আমাদের বাড়ির উঠান ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে।

আমাদের বাড়ির সামনে বিল। বিলের সামনে সড়ক। সড়কে বিড়াল ও বাঘ খেলা করে। আমরা তাকায়া দেখি। ভাবি, মানুষ বিড়ালের মায়া ও বাঘের চামড়া কেন পুষে রাখে বহুদিন।

৪. আমার গ্রামের নাম পালেহা হলেও এই নামে আমার কোনো প্রেমিকা নাই। পালেহার পাশে কত কত গ্রাম। জঙ্গল নাই। লতা ও গুল্মের সবুজ উত্তাপের রং নাই। খর রোদে চিকচিক করা টিন আর ইট-সিমেন্টের বাড়ি খাঁ খাঁ করে। গ্রামে গ্রামে পল্লীবিদ্যুতের খাম্বা একা একা অন্ধকারের অসহায়ত্ব নিয়া দাঁড়ায়া থাকে। তারা মানুষের সরলতার সাথে কটাক্ষ করে। শীতের আগুন পোহাতে পোহাতে কতদিন কুয়াশার দিকে চেয়েছিল দশ হাজার মুখ। এখন তো মুখের অসুখ! ঘন কুয়াশা ঢাকা আঁধারের মতো মুখগুলো হারায়া গিয়া মুখোশে ভরে গেছে!

আমরা গ্রামে কদাচিৎ যাই। আমাদের উপরি মায়াদয়া উপচায়া পড়ে ঈদ ও পূজায়। আমরা বাঁধভাঙা জলের তোড়ের মতন উপচানো বাস-ট্রেনে করে গ্রামে যাই। আর বলি সেইসব গ্রাম আর নাই! লঞ্চডুবিতে হারানো মানুষের কথা মনে করে রং ও বিমর্ষতার দিকে তাকায়া দেখি গ্রাম কি পীড়ার সমার্থক না মধুুলতিকার! এসব ভাবনার আগেই মোহনেরা মরে যায়, ভীড়ের স্টেশন একা হয়ে পড়ে।

আমাদের বাড়ি থিকা নিকট দূরত্বে হাওর। বর্ষা না হলে হাওরে গরু চড়ে; ঘাস খায়। শুয়ে শুয়ে জাবর কাটে। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের জাবর কাটা দেখে গরুগুলান উলান বিছায়া দিয়া মনে মনে হাসে। হাওরের বুক চিরে যে-লম্বা সড়ক চলে গেছে দূরগ্রামে তার দিকে সেই কিচক হাসি মিশে যায়। আর দিগন্তমোড়ানো মাঠ শূন্য পড়ে থাকে। এদিকে হাওর নীতি হচ্ছে নগরের উঁচা দালানে। কী করে বর্ষার হাওরের জল বাঁধ দিয়া পুকুর কাটা যায়, কী করে পুকুরে রাজা ও উজির, দাসানুদাসরা একসাথে মিলে দুুধের নহর বানাবে তার জন্য পরিকল্পনা করে।

আমাদের গরুগুলো তখনো কী কান্না করে মাঠে শুয়ে পড়ে!

হাওরের কলকল পানির তোড়ে নায়রে যায় বঁধু ও মাসিমা। নায়রের পেছনে তারা রেখে যায় নিশ্চুপ কান্নার মতন সংগোপন মায়া। নীরবে যে অশ্রু-ফোঁটা পড়ে জলে সে-ও ভুলে যায় নয়নের দাগ। তথাপি পাখির আকাশ, হিজলের জল, হালকা হাওয়ায় শাদা শাদা বকেদের সারি অস্থির ওড়াউড়ি করে।

মানুষ আসে, ভিড় করে, ট্রেন চলে যায়। শূন্যতায় তাকায়া তাকায়া দশ দশ হাজার মুখ জলের বুদ্বুদের মতো মিলায়। বৃৃৃষ্টির ফোঁটায় যে-সামান্য জল তার তল থাকে না কোনো। সমুদ্রের তলদেশ থাকে। সেখানে পোঁছানোর আগেই অসামান্য মায়ার আগুন রেখে মানুষ মরে যায়।

আমাদের স্টেশন বেঁচে থাকে তবু। নতুন মাস্টার আসে। নতুন চেয়ার টেবিল পুরাতন হতে হতে মাস্টার চলে যায়। নতুন তারার মানুষেরা চিরমৃত্যু নিয়া বেঁচে থাকে নতুন পোশাকে।

৩. আমাদের গ্রাম বয়ে গেছে নদীতীর ঘেঁষে। শুনেছি বিস্ময়ের উড়াল ও কলমীলতার কথা। বাবুইয়ের নিরাশ্রয় বেদনা মাটিতে লুটায়া কিভাবে অহাজারি করে ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবু ডুবু ডিঙার মাঝির নিরুপায় হতাশার মতন তা দেখে দেখে কেটে গেছে বহুকাল।

আমাদের নদী ধরে চলে গেছে বহু গান তবু। বহু নায়রীর কষ্টের প্রাণ ফেটে গেছে কান্নায়। তারাও বেদনা পেয়েছে বিবাগের, বিরহমাখা নয়নের অশ্রুর দাগ কষ্টের মাস্তুলে চড়ে চলে গেছে দূর গাঁয়ে। তথাপি মুছে নাই দাগ, মুছে নাই দিবস ও রাত্রির ভাগ। সেসব বেদনামাখা অনুরাগ ও কাতরতার ছায়া জলের অন্ধকার স্রোতে ও তোমার মুখেও পড়েছিল একদিন। তার পর ম্লানমুখ চঞ্চল কিশোরীর অন্ধকার ঊরুসন্ধির ভেতর হারায়া গেছে।

সেসব খুঁজে লাভ নাই। তথাপি সকল নিঃস্বতা ও হাহাকার নিয়ে কিশোরীর শ্যামা মুখের মতন বেঁচে থাকে গ্রাম । বেঁচে থাকে সহজ কৃষক, সহস্র তারার আলোক, লাঙলের ফলা আর মাটির বরণ; বেদনাকাতর নায়রীর নয়নের দাগ দশ দশ হাজার মানুষের মুখের কষ্টের হাহাকার হয়ে বাজে।

আমাদের বাড়ির সামনে উঠান, তার সামনে পুকুর—তারার মানুষ নিয়ে মাদারের গান গায়।

আহমেদ স্বপন মাহমুদ

আহমেদ স্বপন মাহমুদ

জন্ম ২১ মাঘ ১৩৭২, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬; নেত্রকোনা। বিএ (অনার্স), এমএ। পেশা:...বিস্তারিত