৮ পর্বের লিংক
ধানশি- ৯
২৪. সকালে মরিয়ম সহজে উঠতে চায় না। তাকে জাগাতে খবর হয়ে যায়। এক সকালে ঠেলেঠুলে কোনোমতে বিছানা থেকে তুলেছে। সে মেঝেতে বসে বসে ঝিমায়। বুড়ি তাকে কাতুকুতু দেয়। মরিয়ম রেগে বলে, বুড়ি।
ওর মা রান্নাঘর থেকে বলে, আমি এলে পিঠের চামড়া তুলে ফেলব। দাদুকে কেউ বুড়ি বলে!
মরিয়ম চোখ বন্ধ করা অবস্থায় বলে, দাদু, মানুষের গা থেকে কী বের হয় আমি জানি।
কী! অবাক হয়ে দাদু জানতে চায়।
মরিয়ম কিছু বলে না। হাসে।
গাছ থেকে পেরেক তুলে নিয়েছিস, খুবই ভালো কথা। কিন্তু গাছে ক্ষত হয়েছে। এই ক্ষত মুছতে পারবি?
মরিয়মের কথা ধানকে জানিয়ে সে বলে, এখন তোর গা থেকেও বিশেষ গন্ধ বেরুচ্ছে। আমি গন্ধটা পাচ্ছি। খুব সুবাস। আমার ভালো লাগছে। শোন, তোর শিকড় ছড়িয়ে দে। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আয়।
বলে, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তোর শিকড় বেরুচ্ছে। শিকড়ের ফাঁকে ঘুমিয়ে আছে মরিয়ম। তার পরনে গোলাপি ফ্রক। আমি তাকে অনেক ধাক্কা দিলাম, কিন্তু সে উঠছে না।
তার কথা শুনে ধান হাসে।
বুড়ি বলে, মরিয়মকে বলেছি, মাটির তলায় হাজার হাজার পিঁপড়া এসেছে। তারা লাইন ধরে হাঁটছে। একটু পর তোর কাছে চলে আসবে। তবুও ওর ঘুম ভাঙে না। শোন, পিঁপড়াগুলো এসে গেছে। ওরা কী বলছে জানিস? বলছে, আমরা বেড়াতে এসেছি।
ধান বলে, আমি একটা গল্প বলব?
অবশ্যই বলবি।
তোমাদের মধ্যে কতগুলো লোক থাকে, তাদের বলে বিজ্ঞানী। সেই রকম এক পাগল বিজ্ঞানী, ও করেছে কী, একটা বোমা বানিয়েছে। মানুষকে ধ্বংস করার জন্য মানুষ সেই বোমা মারল। এ খবর শুনে বিজ্ঞানী পাগল হয়ে যায়। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে, তার মাথাটা হাঁসের মাথা হয়ে গেছে। সে ডাকছে, কোয়াক কোয়াক।
বুড়ি হাসে। এই গল্প কোত্থেকে শুনেছিস?
ধান হেসে বলল, মরিয়ম বলেছে।
দুষ্টুটা আর কী বলেছে?
বলেছে তোমাকে কাতুকুতু দিতে। কাতুকুতু দিলে নাকি তোমার মাথা থেকে বুদ্ধি বের হয়।
ধানের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে ঘুমিয়ে পড়ে। ধান রোপণ করা মাটিতে ছাই উড়ে আসতে দেয় না। এলে সরিয়ে দেয়। এখন ওখানে হাত লেপ্টে আছে। মাটি থেকে কোনো খবর যেন হাত বেয়ে শরীরের অণু-পরমাণুতে পৌঁছে যাচ্ছে। আর ওর শরীর থেকেও গোপন কথা পিঁপড়ার মতো হেঁটে চলে যাচ্ছে মাটির কাছে।
বুদ্ধিমান কোনো পিঁপড়া এসে তার কপালে বসে। বলে, সবচেয়ে বড় কথা হলো ভালোবাসতে পারা। তুমি এক কাজ করো, ছাইকে ভালোবাসতে শুরু করো।
পনেরো-বিশ মিনিট পর তার ঘুম ভেঙে যায়। কপালে একটা ঘা। বেশি চুলকাচ্ছে। সে ভাবে, আরে! তাই তো, আমি তো এই অবস্থা বদলাতে পারব না। এটা মেনে নিয়ে কিভাবে কী করা যায় সেই চিন্তা করা দরকার। কী করতে পারব ভাবতে হবে। একটা পথ নিশ্চয়ই বের হবে। ছাইয়ের মধ্যে জীবনের রহস্য লুকিয়ে আছে! একটা কাজ করতে হবে। প্রাণ কোথায় আছে খুঁজে বের করতে হবে।
দূরে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে! বৃষ্টির পর দখিনা বাতাস বয়। বাতাসে প্রশান্তি। সে গন্ধটা পায়। আশান্বিত হয়। নিজের জীবন তো এখনো আছে। ধানের জীবনও আছে। জীবিত কাউকে নিশ্চয় খুঁজে পাবে। নাক টানে। তার মন আনচান করছে।
একবার বাদশা মামা একটা গল্প বলেছিল। গল্পটা সে ধানকে বলল। এক কৃষকের একটা ছেলে ছিল। খুব রাগী। কথায় কথায় রেগে যেত। তাকে দিয়ে কিছুই করা যেত না। তার বাবা একদিন বলল, এক কাজ কর। যখনই রাগ হবে ওই আমগাছে গিয়ে একটা পেরেক পুঁতবি। ছেলেটা তা-ই করতে থাকে। একদিন দেখে গাছে অনেক পেরেক পোঁতা হয়ে গেছে। সে অবাক হয়। আমি এত রাগী!
আরেকদিন তার বাবা বলে, এবার এক কাজ কর, যদি রাগ দমাতে পারিস, তাহলে একটা করে পেরেক তুলে ফেলবি। সে চেষ্টা করে। দেখে রাগ কমে আসছে, একটা করে পেরেকও কমে যাচ্ছে। একদিন অবাক হয়ে দেখে, গাছে আর একটা পেরেকও নেই।
সে বাবার কাছে যায়। বলে, বাবা, গাছে একটা পেরেকও নেই।
বাবা হাসে। তাকে নিয়ে গাছের কাছে যায়। বলে, দেখ বাবা, গাছ থেকে পেরেক তুলে নিয়েছিস, খুবই ভালো কথা। কিন্তু গাছে ক্ষত হয়েছে। এই ক্ষত মুছতে পারবি?
ছেলে কিছু বলে না।
বাবা মৃদু হেসে বলে, ক্ষত মোছা যায় না।
বুড়ি ভাবে, এই ছাই সে মুছতে পারবে!
সুখ তো একটা পাখি। সবুজ পৃথিবী থেকে উড়ে আসবে।
২৫. সারা রাত প্রচণ্ড কুয়াশা। সাথে ঠান্ডা। সকালে চোখ মেলে কুয়াশার জন্য কিছুই দেখে না। এত ঠান্ডা, দাঁত পর্যন্ত গিরগির করে কাঁপছে। হঠাৎ ভাপাপিঠা খেতে ইচ্ছে করল। জাল দিয়ে ঘন করা লাল রসে ডুবিয়ে গরম গরম ভাপাপিঠা। উহ! ভাবতেই মুখে লালা আসে।
তবে তার মুখের ভেতরটা গ্রীষ্মের খরতাপের মতো। এতটুকু রস নেই। কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। যখন জ্ঞান ফিরে তখনো ভাপাপিঠার গন্ধ মনে রয়ে গেছে।
অসম্ভব খিদে। আজ খিদা বেশি লাগছে। ভাবতে চেষ্টা করে, কিভাবে সে মায়ের দুধ খেত? জন্মের পর মুখে মধু দেওয়া হতো। তার মুখে দিতে পেরেছিল? অবশ্য মরিয়মের সময় ডাক্তারের নিষেধ ছিল। ডাক্তার বলেছিল, ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ খাবে।
আদিম মানুষ কিভাবে বাঁচত? কিভাবে খাবার জোগাড় করত? ছেলেমেয়েদের পড়ানোর সময় বইয়ে ছবি দেখে সে আদিম মানুষের কথা ভাবত। তারা থাকত গুহায়। গুহা থেকে বেরুত খাবারের খোঁজে। সে ধানকে বলে, আমার কোনো গুহা নেই, সঙ্গী নেই। আমার সবকিছু চাপা পড়েছে।
যখন খুব খিদে পায়, নিজের প্রতি রেগে যায়। রেগে দাঁত কিড়মিড় করে বলে, জীবনে তো অনেক খেয়েছিস। তবুও কেন এত খাইখাই? একটু সবুর কর।
এরপর ছাই দিয়ে চুলা বানায়। চুলায় মাটি লেপার মতো ছাই লেপে। ছাইয়ের ডেকচি চুলায় বসায়। আউশ চালের ভাত রান্না হচ্ছে। আহ! কী সুঘ্রাণ। মনটা ভরে উঠল। মৃদু হাওয়া থেকে আলু ও কাঁচামরিচ খুঁজে নেয়। ভর্তা বানায়। কাঁচামরিচ কুচি কুচি করে কেটে দেয়। ধনেপাতা দিতে চায়, পায় না। মনে মনে ঘ্রাণটা পায়। সর্ষের তেলও নেই। তার বদলে একটু কুয়াশা মেখে দিলে হয়। আলু ভর্তা আর আউশ চালের ভাত গাপুস গুপুস খায়।
যেখানে আঁকিবুঁকি কেটে চুলা বানিয়েছিল, সেখানে ছাই সমান করে। এখন গাছ রোপণ করবে। একটা গাছ, দুটো গাছ, অনেক গাছ। পাতা ছেঁড়া হবে না, ডাল কাটা হবে না। গাছ থেকে পাতা ঝরবে। পাতা পচে মাটিতে মিশে যাবে। এভাবে জমতে জমতে মাটিতে, গাছে ভরাট হবে। গাছ মেঘ ডাকবে। বৃষ্টি হবে। বৃষ্টিতে চারপাশ আবার ভরে উঠবে।
ভেবে সুখ পায়। কিন্তু একটা দুর্ভাবনা আসে। ভাবটা পুরো ধরতে পারে না। ছাইয়ের মতো ওড়ে। এই বিরান ভূমিতে দাঁড়িয়ে কারো বিরুদ্ধে তীব্র রাগে সে থুতু ছোড়ে। জোরে দিতে পারে না। থুতু নিজের গায়ে পড়ে। তার কান্না আসে। মন শক্ত করবে ভাবে, কিন্তু পারে না। আজও কিছুদূর হেঁটে দেখেছে, শক্তি কুলায় না। আপনমনে বলে, দুনিয়ে দইন দুয়ারত গেইয়ি। মানে শেষ হয়ে গেছে।
শরীরের দিকে তাকিয়ে লজ্জা পায়। স্তন দুটো কেমন যেন। একসময় যে সন্তানকে দুধ খাইয়েছে, সেই কথা মনে পড়ল। আপনমনে বলল, আয় আয়, এদিকে আয়। মেয়েকেই ডাকছিল সে।
উজ্জ্বল শ্যামলা এক তরুণী। শক্ত-সমর্থ দেহ। তার মেয়ের বয়স মাত্র কয়েকদিন। কাঁদে। সে বলে, টুক্কুরুস সোনা, কাঁদে না। তারপর তার মুখ স্তনের কাছে আনে। বোঁটার ছোঁয়া পেয়ে কাঁদুনি থামে। চোখ বন্ধ করে মেয়ে দুধ খাচ্ছে। দৃশ্যটা এত জীবন্ত, এত কাছের, যেন কয়েক মুহূর্ত আগের।
তার নিজেরও ছোট হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। ছোট হয়ে বাবার সঙ্গে হাঁটবে। কোথায় যাবে? মেলায়, খেলায় কিংবা বাজারে। অথবা হেলায় হারিয়ে যাবে। সবাই তাকে খুঁজবে। শুকিয়ে ঘরে এনে জড়ো করা কাপড়ের ভেতর লুকিয়ে সে হাসবে।
গভীর রাতে কারো নাক ডাকার মতো এই দুনিয়াও কি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে! শাপলা ফুল বা মিষ্টি কুমড়া ফুল রান্না করলে একেবারে তুলতুলে হয়ে যায়। মানুষও তেমন তুলতুলে থাকলে আজ তার এই অবস্থা হতো না। সে বেশ বুঝতে পারছে। তাহলে মানুষকেও তুলতুলে রাখতে হয়!
সাগরে একটি নৌকা। বুড়ি সেই নৌকার যাত্রী। লগি, বৈঠা কিছু নেই। ঢেউয়ের তালে ঘুরছে। কোথায় যাবে জানে না। এ স্বপ্ন একটু আগে দেখেছিল?
মা একবার বলেছিল, অনেক বছর আগে কিছু মানুষ ছিল। তারা পথে-ঘাটে মানুষের দেখা পেলে জিজ্ঞেস করত, সে ভালো আছে কিনা। মানুষের শুভ কামনা করে ওরা পেট চালাত। তার মনে হলো এরকম কোনো লোক এসে বলছে, সাজেদা, তুমি ভালো আছ?
সে বলছে, ভালো আছি, খুব ভালো আছি।
লোকটা বলল, দূর হোক তোমার বালা-মুসিবত।
লোকটার পরনে একটা বড় কাপড়। এক কাপড়েই উপরে-নিচে ঢাকা। ঠোঁটে মোম মাখিয়েছে। হাতে বাঁশি। বাঁশি বাজিয়ে তার জন্য সুখ চাইছে।
সুখ তো একটা পাখি। সবুজ পৃথিবী থেকে উড়ে আসবে। এক ঝাঁক হট্টিটি পাখি কি ডেকে ডেকে উড়ে গেল! আকাশ ভেঙে পড়ার ভয়ে এই পাখিই তো পা উপরের দিকে দিয়ে শোয়। প্রথমে সে পাখিটির নাম জানত না। রাতে কিংবা সকালে দূর আকাশ থেকে ডাক শুনত। একদিন কবিরাজকে জিজ্ঞেস করল, টিট টিট টিট ডাকে, ওই পাখিটার নাম কী?
কবিরাজ বলল, হট্টিটি। তারপর উপরের দিকে পা দিয়ে পাখিটির শোয়ার কথা বলেছিল। আসলে হয় কি, আকাশে ওড়ে চিল বা বাজ। ওদের কাছ থেকে ডিম কিংবা ছানা রক্ষা করার জন্য কাত-চিত হয়ে শোয় এরা।
সে একবার দেখেছিল, ঠোঁট পিঠে গোঁজা। চিকন চিকন পা, কয়েকটা পাখি জমিতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ ভাবে, এ ধ্বংসের পেছনে যারা আছে, তাদের কেউ না কেউ কোথাও বসে আছে। তারা তাকে দেখছে না তো! লজ্জা লাগে। দুই হাতে বুক, শরীরের নিচের অংশ ঢাকতে চেষ্টা করে।
জীবন তো শেষ পর্যন্ত ওই ছাই। কেউ ছাই হয়, কেউ মিশে যায় মাটিতে।
২৬. বিড়বিড় করে বুড়ি বলল,
একদা এক রামছাগল খুঁজছিল তার দাদাকে খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেল ধোপাবাড়ির গাধাকে...
সে ধানকে বলে, জোবায়ের যখন একা একা হাঁটে, এ গানটা গায়। নিজেকে তার গাধা মনে হয়। গাধা খায় আদা। এ কথা ভাবে আর আপনমনে হাসে। তার মনের মধ্যে একটা খাল আছে। খালটার নাম ধুরুং। খালের পাড় ধরে সে হাঁটছিল।
স্লুইচগেট বন্ধ করে পানি জমানো হয়েছে। পানিতে নানারকম শ্যাওলা, পদ্মফুলের বড় বড় পাতা।
স্কুলের চাকরি ওর ভালো লাগে নি। মানুষ কত রকম ব্যস্ত। কিন্তু ওর মধ্যে কোনো ব্যস্ততা নেই। সে হাঁটে, দেখে, অনুভব করে। মানুষের সঙ্গে কী সুন্দর করে কথা বলে! হাঁটতে হাঁটতে হয়তো পেয়ে যাবে জীবনের স্বাদ। জীবন কী? তার স্বাদও-বা কী? জীবনের যে সৃষ্টিকর্তা, মাঝে মাঝে তাকে মনে হয় কানা। এক পাশ দেখলেও আরেক পাশ দেখতে পান না। ফলে একেকজন মানুষের জীবনে অনেক কিছু ঘটে যায়।
খালের পানিতে হাঁসটি খাবার খুঁজছে। সেও কবিতা দিয়ে জীবন খোঁজে। জীবনকে বন্ধুর মতো ডাকে। বলে, পৃথিবী রয়েছে জেগে চক্ষু মেলে। হয়তো ভালোবাসার চেষ্টা করে আর জীবনের ধুলো সরাতে চায়।
বুড়ি শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ ছিল। চোখ খুলে আকাশের দিকে তাকায়। ছাইয়ের কথা তাকে বলেছিল জোবায়ের। বুঝলেন মাউই মা, মানুষ পোড়াতে একবার দেখেছিলাম। জীবন তো শেষ পর্যন্ত ওই ছাই। কেউ ছাই হয়, কেউ মিশে যায় মাটিতে।
জীবনের অর্থ কী? প্রশ্নটা জোবায়ের তাকে করেছিল। সে কোনো জবাব দিতে পারে নি।
এখন নিজেকে প্রশ্ন করে, বেঁচে থাকা কেন? গলা টিপে শেষ করে দেবে নাকি?
ধান হাসে।
সে বলে, হাসছিস কেন?
তুমি মরে গেলে আমি কোথায় যাব?
তাই তো! নিজের ভাবনার জন্য সে লজ্জা পায়।
জোবায়ের তাকে প্রশ্ন করেছিল, মানুষ কিসে বড় হয় জানো?
বুড়ি তার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। জোবায়ের বলেছিল, ভালোবাসায়। বুঝলে? ভালোবাসতে পারা হচ্ছে আসল কথা।
বুঝি না তোমার এসব কথা।
কেন বুঝবে না, অবশ্যই বুঝবে।
জোবায়ের বলে, পৃথিবীর ওপর এত অত্যাচার হচ্ছে, বেশিদিন টিকবে বলে মনে হয় না। আচ্ছা, কোন সাপের বিষ সবচেয়ে বিষাক্ত?
সে হেসে বলে, মানুষ-সাপের।
জোবায়ের চোখ বড় করে বলে, আশ্চর্য কথা বলেছ তো!
কয়েকদিন আগে পেপারে পড়া সাপের কথা সে মাউই মাকে বলতে চেয়েছিল। ওর মনে পড়ে, মাটিতে বসবাস করা সাপের মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত সাপ তাইপান। এরা থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। এর এক ছোবলে যে পরিমাণ বিষ বের হয় তা দিয়ে একশজন মানুষকে মারা যাবে। তবে এখন পর্যন্ত এই সাপের কামড়ে কোনো মানুষ মারা যায় নি। সাপটি লাজুক। থাকে দুর্গম জায়গায়।
সাপের কথা জোবায়ের ভুলে যায়। সে মানুষ-সাপের কথা ভাবে। আসলে বলতে চেয়েছিল, শুধু নিজেকে জানলে হয় না, অন্যকেও জানতে হয়। কিন্তু বলে না। তার মন খারাপ হয়। সে বাইরে বেরোয়। গাছের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। কাছেই একটা নিমগাছ। নিমকে বলে, আচ্ছা তোমার মন খারাপ হয়?
নিম হয়তো বলল, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে না।
কেন? অবাক হয়ে জানতে চায় জোবায়ের।
মানুষের শরীর যেমন চর্মরোগে ভরা, মনটাও তেমন।
এসময় মাটির নিচে একটু কেঁপে ধানটা মৃদু কণ্ঠে বলে, সাপের কথায় আমার ভয় করছে। ফুলের পাপড়ির মতো কোমল তার কণ্ঠ।
বুড়ি বলে, ধুর, সাপ কি গাছকে কামড়ায়?
ধান বলে, সাপ না কামড়ালেও পোকামাকড়ে কামড়ায়, মানুষে কামড়ায়।
শরীরটা ছাই হয়ে যাচ্ছে। ছাই উড়তে উড়তে চলে যাচ্ছে বহু দূরে। হয়তো কোনো মেঘের ভেতর ঢুকে যাবে।
বুড়ি কিছু বলতে চায়, কিন্তু বলে না। মনে পড়ে, ঘরের পেছনে কোনায় একটা আমগাছ আছে। ওখানে একবার বিড়াল চড়ুইয়ের বাসা থেকে বাচ্চা কামড়ে ফেলে দিয়েছিল। তখন প্রতিবেশী এক দাদি ছড়া বানিয়েছিল :
আগা রসে ঢুলুঢুলু পাতা রসর বাসা আঁধারে ছা (ছানা) খাইয়ি ছ-ছে (দেখরে) বাছার টঁসা (কাণ্ড)।
দাদিটা বলত, এক ছিল বাদশা। তার ছিল সাত ছেলে। একদিন বাজার থেকে একটা কাঁঠাল কিনে এনেছে। প্রাসাদে এসে রানিকে বলল, সাত রাজপুত্রকে সাতটা কোয়া দাও আর তুমি বিচি খাও।
সে ধানকে এসব কথা বলবে ভাবে। অনেক বছর আগের কথা তার মনে পড়ে। তখন সে ক্লাস সিক্সে পড়ত। স্কুলে যাওয়ার সময় নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকত একটা ছেলে। তাকে দেখলে তাকিয়ে থাকত। ও তাকালে চোখ ফিরিয়ে নিত। কোনোদিন কথা হয় নি।
ধান জিজ্ঞেস করে, ছেলেটার মনে অনেক কথা জমা ছিল?
ও কিছু বলে না। ওর মনেও অনেক কথা জমে গেছে। এত কথা ধানকে বললে সে হয়তো ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। যদি ঘুম না ভাঙে! তাই সে ধানের সঙ্গে বেশি কথা বলতে চায় না। তবুও বলে, বলতে বলতে মনে হয় তার মুখটা, শরীরটা ছাই হয়ে যাচ্ছে। ছাই উড়তে উড়তে চলে যাচ্ছে বহু দূরে। হয়তো কোনো মেঘের ভেতর ঢুকে যাবে।