যদি ঢাকা শহরে ট্রাম চলাচল না করে

১. আজ থেকে ভবিষ্যতের দিকে—পরবর্তী পাঁচ বছর কাটাতে চাই বসন্তের প্রহর। যাদের আমি সংকলিত করেছি এই শ্রমের জীবনে, তাদের দিচ্ছি অনুমোদন : আজ্ঞা হোক শুশ্রূষা সেবনে! বুকে আলো নিয়ে উদ্যান-বাতি আমার সম্মুখ আঙিনা সাজাক। এই রাত্রি প্রলম্বিত লয়ে কালো গজলের ঢঙে অনুরিত হোক কোঁকরানো বাতাসের বেগে, শুভেচ্ছা-প্রবণ উদ্যান—আসবাবের চারিপাশে। এখানে জীবিকা-ফেরত আমি একা বসে লিখব, লিখতে থাকব, লিখিতে থাকিব, লিখিতেই থাকিব কবিতা। আমি নিজেও থাকব। আমাকে লিখিত করিবে এই পাঁচটি বছর! ২. আমি যেন শুই উত্তেজিত রঙের তিনটি নবান্ন নারীর সাথে। ঘুমাই। শ্বাস নেই। আবার। সম্পন্ন নীরবতার গন্ধ টের পাই নাকে, ত্বকে। বাদহীন বিবাদহীন আমরা ছড়াব রোগের মতো নিজেদের ফুসফুসে, লালায়, কর্নিয়ায়, ত্বকে, হৃদয়ে—শুশ্রূষাহীন এক উত্তীর্ণ কাতরতায়। ছড়াব পরিচয়ে, নামব নামের গভীরে, সম্বোধনের শিহরনে। বিছানার ঘাসে জোঁকের মতো নির্জন পরিতৃপ্তি নিয়ে বসন্ত-যুগল। তাহাদের স্তন লাটিমের মতো গোল। এখনো ঘুরিতেছে। ৩. দেহকে ডেকে নিয়ে যাব প্রাতঃভ্রমণে প্রতিদিন। ঘরের বাগানে কিংবা আরো দূর। তাকে ধৌত করব। মাপ নেব কাঁধের, বুকের ঊরুর। তার মাপের বস্ত্র খুঁজব—যেটির রং নীরবতার মতো গাঢ় সেটিরই শুধব দাম। তারপর বাইসেপ। তারপর ট্রাইসেপ। তারপর স্কোয়াট। ব্যায়ামাগারে বর্ধিত করে নিব দেহটিকে নিজের পরিমাপে। তারপর পরে নেব। কী যে দেহের আরাম! ৪. তার সাথে সব বিরোধ রোধ হোক, রোদ হোক, স্পর্শ হোক, হাসি হোক, শোধ হোক! বিস্ময়ে, যুক্তির লয়ে তাকিয়ে থাক অবশিষ্ট চোখ। শুধু তার দিকে। শুধু তারই দিকে। রাতদিন। বোধের নজর যদি ফিকে হয়ে আসে, তবু তার ঋণ ফুসফুসের স্ফীতির মতো অনস্বীকার্য, রয়ে যাবে এই কবির ও ছবির জীবনে। অমলিন। লীন। কৃতজ্ঞতার কৃষক হয়ে ওঠা যায় কিনা, একবার সচেষ্ট হব। অকৃতদার আমার হৃদয় কি ততটা উর্বর? মানবিক চাষের? যে কৃষক শস্য ফলায়— ধান, জব, রাই, চিনা তারও হৃদয় ভূমির মতো নরম, রহমে ভরা। ধরা কণ্ঠে তিনি বলেন। তার সন্দেহটিকে ধুলোহীন করে রাখেন চিনামাটির অন্য সব আসবাবের সাথে প্রতিদিন। দেখা যাক। আকাশে চাঁদ। ভূতলে ফোয়ারা। তাকে তো বলি নি একমাত্র আমার হাতটিই ধরো! সে তো সম্ভাবনা, হতে পারে যে কারো! আমার স্বীকারোক্তির প্রার্থনা— স্বনামে দোষি। তাকে ভালোবাসি। বাসি। বাসি। বাসিতে থাকব। বাসিতেই থাকিব। আর আমিও থাকব। বাসিত হতে। সংসারের অদ্ভুত বোঝা ষড় ইন্দ্রিয়ের অশ্ব ছুটিয়ে তিনিই তো টেনে চলেছেন একা! এবার তার সাথে কার যেন হবে দেখা—ধূসর অবয়বে, এই প্রবল পাঁচটি বছরে। শপথ করিয়া যাই অমর অক্ষরে। ৫. আপেলের রঙে মোহিত হব। আপেলের গায়ে নজর দিলে কাছে চলে আসে আকাশ। গায়ে লাগে আগুনের আঁচ। পৃথিবীতে আপেল ফলে। সুস্বাদু। মনে হয় স্বর্গজাত। অপরাধের স্মারক নতগামী নারীর হাতে বিধাতা তুলে দিয়ে বলেছিলেন—পৃথিবীতে যাও। আপেলের গায়ে নজর দিলে আকাশ নিচু হয়ে আসে। আমি ঈশ্বরের গায়ের গন্ধ পাই। শ্রমের। উৎসাহের। আপেলের রঙে সৃষ্টির স্মৃতি লেগে আছে, বিবিধ। যারা ইতিহাসবিদ, আপেল ভক্ষণের পরের ঘটনাকে ইতিহাস বলেন, আগের ঘটনাকে বলছেন মিথ। এই পাঁচ বছরে আপেলের রসে ঈশ্বরের স্বাস্থ্যপান, নারীর জন্য শোক, নিজের জন্য গান আর কৃতজ্ঞতা অধিলোকের অধিবাসীদের। উপভোগের তালিকায় থাকছে ঈশ্বরলোক। ৬. মিতুকে খুঁজে নিব আমি। নীরবতার কাছে আমাদের ঘটেছিল পরাজয় পাল্টে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের পথ। দেরি হলে পথের পরিচয় পাল্টে যেতে পারে। পাব না রথ। কোনোদিন যাই নি তার শহরে। ঠিকানা জানি না। কারো কাছে তার ঠিকানা নাই। একমাত্র রেজিস্টারের ৮৭-৮৮ শিক্ষাবছরের খাতায় তার ঠিকানা পড়ে আছে কে জানে কার মায়ায়! যদি অনুতপ্ত আগুনে রেজিস্টার ভবনটিই পুড়ে যায়? কোথায় পাব তারে? শুনেছিলাম তিরিশ বছর আগে, সে নারায়ণগঞ্জে থাকে। নিশ্চয়ই পাল্টে গেছে তার শহরের পথ! তিরিশ বছর তো কুড়ি বছর নয়? একই পরিচয় নিয়ে স্থির হয়ে আছে মিতু আর তাহার শহর? শর্মিষ্ঠা দাস। তার নিবন্ধিত নাম মনে আছে আজো। এই নামও পাল্টে গেছে শুনেছি— মানচিত্রের শেষ নির্দেশনা। করুণ ইশারা নিয়ে জলে ডুবে গেছে বাতিঘর। শাঁখা-সিঁদুরে পাল্টেছে বেশবাস। হয়তো দাস নন। এখন তিনি বোস! তাই তাকে খুঁজে পায় না সামাজিক মাধ্যমগুলো। সেই নিরুত্তর আবেগে ছিল আমারই দোষ। অপরিচয়ের চেয়ে দূরবর্তী কোনো দূরত্ব আর নাই । নারায়ণগঞ্জের পথ যেন সানাইয়ের সুর—করুণ বিধুর। বাজিতেছে, বাজিতে থাকিবে, বাজিতেই থাকিবে। মনের ভিতরে। শরীরের ভিতর। তারপর? যাচ্ছি, যাচ্ছি তবু সে সুর ফুরাচ্ছে না। সে সুর ডাকে। ইশারা দেয়। বাঁক নিতে বলে। দ্রুত যেতে বলে। যাচ্ছি, যাচ্ছি তবু ফুরাচ্ছে না নারায়ণগঞ্জের পথ। এমনটিই হবে যখন গাড়িতে দু’মাসের বাঁচার রসদ নিয়ে নেমে পড়েছি পথে! পথে একটি বিদ্যুতের খুঁটি জানতে চাইবে— ও জেনিস! যাচ্ছ কোথায়? যদি বলি, আমার খুব তাড়া। কথা বলার সময় নাই। তবে আমার কাহিনি হবে এক রকম। আর যদি বলি, যাচ্ছি হারোনো জুটি খুঁজতে, বল কী করতে পারি তোমার কল্যাণে হে বিদ্যুতের খুটি! সে চাইল তার নষ্ট বাতিটা পাল্টে ভালো একটা বাতি লাগিয়ে দেই... দশ জনের মঙ্গল হোক! যাচ্ছি যাচ্ছি ফুরাচ্ছে না নারায়ণগঞ্জের পথ। কিছু দূর যেতে একটি ডানা ভাঙা পাখি জানতে চাইল—জেনিস যাচ্ছ কোথায়? যদি বলি তোমার তাতে কী দরকার, তাহলে আমার গল্পের শেষটা হবে এক রকম। আর যদি থেমে শুনি, একটি উঁচু ডালের নিরাপত্তায় তাকে পৌঁছে দেবার অনুরোধ! তাহলে গল্পের শেষটা অন্যরকম। যাচ্ছি, যাচ্ছি। নারায়ণগঞ্জের পথ ফুরাচ্ছে না। সানাইয়ের সুর বাজিতেছে। বাজিতে থাকিবে। বাজিতেই থাকিবে। ৭. রাষ্ট্রের গায়ে এবার আমিই তুলব হাত! আমি সবার চেয়ে উঁচু চরিত্র। কবি। কর্তব্যগামী। সত্য আর ক্রন্দনের নন্দনের কাছে থামি। দেহে অবিভাজ্য মানবিকতা। আর কোনো জৈব, অজৈব, অধিজৈব উপাদান নাই। শুধু সংবেদ। আমি নীরব কেন! যেন ব্রাহ্মণপ্রিয় সুলিখিত কোনো বেদ! চারিদিকে মিথ্যাচার নাই? মানবিকতার কার্পণ্য নাই? তবু নীরব? কবির নীরবতা ইতিহাসের জঘন্য সমঝোতা! আমি কবি, তোমাদের ঝাঁক থেকে সরে দাঁড়াব। দাঁড়াব। দাঁড়াইয়া থাকিব। দাঁড়াইয়াই থাকিব। দাঁড়াইয়া থাকিতে থাকিব ... অপরাধের মুখোমুখি।
২৬, ২৭, ও ২৮.১০.১৯, ০২.১১.১৯
জেনিস মাহমুন

জেনিস মাহমুন

জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৬৯; ঢাকা। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা : ব্যবসায়।...বিস্তারিত