দৈবকঙ্কালের লেখা

সন্তান

মা কে? কোথায় ফেলেছি তার স্তন? শাখে শাখে, গাছের বিস্তারে বর্ধিষ্ণু সময়                                              বাড়তে বাড়তে সেই ভাঙা ক্ষণ— কাগজের মানিপ্লান্ট আর কানি পয়সা                                              গুলিয়ে হাটে এসেছে সন্ধার ডাকাত তিমির!                                              আরও কিছু ভিড় ফাঁকা হয়ে এলে মৃত মায়ের দুধের কিনারে, এধারে বারেবারে             বলক তুলেছি আমি, পানি মিশিয়েছি এ দুধ কিনবে কে, শাওনের ঘর ভেঙে চরাচরের স্তব্ধতা নেই হয়ে গেলে! যেথা যেখানে আমিও ভাড়া খাটি, শিমুলের মান্যতায় ফাটি                                                                         সেখানে শৈশবে নিজাম মিয়ার পাটের গুদাম ছিল—ভুলে গিয়েছিলাম, রাহু-কেতু কেড়ে নিয়ে সামান্য লুটেরা মাথা কুঁটে পাটের ফেসোর মতো উড়ে উড়ে                                              দেখেছি                                              নিরালা পেরোবার সেতু আছে কিনা ঠিকঠাক; স্বচ্ছ জলের উজ্জ্বল ময়লায় ডুবে গিয়ে                                        আমাদের পাড়া মাকে ফেলে গিয়েছিল চলে, তার স্তন থেকে মুখ ফিরিয়ে রাক্ষস—সেই থেকে                                              আমি, আপন রাত্রির গর্ভ ছিড়ে                        মাতৃ-মাংসে কমড় বসাই, কাঁদলে চোখ ফেটে রক্ত বেরোয়—ডালিম,                                     তোমার অভুক্ত লাল দানা আমি, কে কিনবে আমায়?
২১ এপ্রিল ২০২০, ঢাকা।

আকাশে নোংরা লেগে আছে

স্নেহলতা ফেলে গেছে মরিবার তরে, ঘা-পাঁচড়ামাখা শরীরের তলে ধবল শ্বাসকষ্টের এক ঝাঁক পতঙ্গ-বিমারি, এবং হলদি পাড়ার মধ্যে আমাদের বেদখল জমিতে ছাপড়া তুলে ফেলে গেছে সাতটি নারকেল গাছ সাক্ষী রেখে; স্নেহলতা। বিকলাঙ্গ সেই গাছ তার সরু পাতার আড়ালে রাতের আকাশ নোংরা করা করুণ চাঁদের গোলাকার আকৃতি খেয়ে নক্ষত্রপ্রান্তে আমার দিকে হা বাড়ায়, আর আমাদের জমি উদ্ধারে প্রায়ই আব্বা কোর্টে যায়… মড়কের আগে বিষণ্ন জলের সঙ্গে তরল মিশিয়ে স্নেহলতাকে এসব কিছু নিঃশব্দে বলেছি, শেষ শব্দে সে ‘কে ওখানে, কে?’ বলে চলে গেছে কোথায়? আকাশে অসম্ভব নোংরা লেগে আছে।
২৪ এপ্রিল ২০২০, ঢাকা।

ফ্রি স্কুল স্ট্রিট রাতে

ক্ষত, সে আজ  সরিয়ে দেখে মুখ                                   মায়ের উদর মতো—যা কিছু কাঁপিছে তির তির, পুঁজের ঢিবির চূড়ায় ত্রি-চক্ষু স্থির                                                   গুঁজে খুঁজে আর কিছুই দেখিব না,                        অনেকেরই ছিল জানা অজানা কাহিনি, হাঁচি-কাশি                                     জ্বরভোগ                                                 ভয়— রোগে মরতেই হয়, প্রেমেও বিছানা নাকি হাতড়ে চোখ বোজে বেশুমার! শরীরের মধ্যে সালিশ-বিচার, জটলা চলে অহরহ আজ্ঞাবহ চামারেরা গরম শাবল ছুড়ে আম্মার চোখকে নিশানা করেছে; মহারোখে বুজিয়ে দেবেই শানঘেরা আমাদের বাড়ির পুকুর, ঘুরপথে সেখানে দিলেও আমি ডুব,                                     হাভাতে বেকুব খুঁজে বের করবে ঠিকই আমারে—                                     আমাকেও কেউ দেখে নি ফিরেও, মাঠের সীমায় কাতরে এবং পানিপুঁজ সাঁতরে যে মুড়ির টিনে ওঠা গেল, গাড়ি কি মা চলে? অপনার জলে          তাকিয়ে বিবর দেখি দেহের ভেতর নিজের মুখটি নেই একদম! ভূতসন্ধ্যার জ্যেস্নায়          কোনো লাশ ঠেলা যম সে নাকি ডোমের বেশে বাটাম খুলিয়া নেয় আর ভুলভুলাইয়া গানবাগানে, শরীরের ভেতর বাজায়                                                                         কটকটি সরকার? খুলে নিয়ে দ্বার মেয়েমানুষেরা আমার মুখটি মায়ের উদর থেকে ছিড়ে নিয়ে যায়…
২৭ এপ্রিল ২০২০, ঢাকা।

দৈবকঙ্কালের লেখা

ভেসে উঠছি গুপ্ত বসবাস নড়েচড়ে নাটবল্টু খুলে যাচ্ছে কাকে খাচ্ছি কে-বা খাচ্ছে? বুঝছি না কিছুই ভোরের আগে-পরে বহমান রাত জটাধারী জ্যান্ত এক আচারের বোয়ামে চুবিয়ে রেখেছিল বড় বেদনা আমার এ ছাড়া আমাকে হাট খোলা জগতের বারান্দায় দৈবকঙ্কালের মতো নিঃসঙ্গ ঝুলিয়ে রেখে পাশেই সিলিং ফ্যানে ঝুলে যাওয়া বোনের ঘুর-ঘুরন্তি...আত্মহত্যার সংবাদ পৌঁছে দিলি? দোজখে মুখরা লুবসন্ত ফুটিয়ে গরম ভাটফুলে ক্লান্তচোখে ঘুমিয়ে পড়ল আব্বা নাকি আগুনবমির কৃপায় বৈদ্যুতিক শকে সমস্ত সাতসকাল দাঁত মাজলাম আমি? এবং আমিও সেখানে পেরিয়ে গেলাম কাঁটাঝোপ হরিতকী আর গ্রামসালিশের বিকট আড়াল টুটে সিলিং ফ্যানের আত্মার মধ্যে... ঝুলেছিল কে আমার বোনরক্ত না তার জংলিকালের বাতাসেরা? দীর্ঘ ফ্যানে ঝুলে ঝুলে ঝুলতে ঝুলতে অফুরন্ত গভীর কর্কট রশি কেটে চলা— ফাঁকে ফাঁকে কতবার কতবার দেখেছি সে শ্বাস নেয় কি না হা হৃৎসহোদরা ভেসে ওঠা ঘুরে ওঠা আমার মথার ঘিলু নড়েচড়ে ওঠা লাইনের পর লাইন কবিখ্যাতির ইলেকট্রিকাল উপমায় জ্বলে যাওয়া এই বুড়ো নাটবল্টু জাগ্রত দুপুর অনায়াসে এভাবে তুই-ই খুলে নিলি?
৩ মে ২০২০, ঢাকা।
আলতাফ শাহনেওয়াজ

আলতাফ শাহনেওয়াজ

জন্ম ২৫ জুন ১৯৮১, ঝিনাইদহ জেলাশহরে। লিখতেন নির্লিপ্ত নয়ন নামে। এখন আলতাফ...বিস্তারিত