প্রগতিশীল বলে আমরা কী বুঝি বা বোঝাতে চাই সেটা প্রথমেই পরিষ্কার করা দরকার। প্রগতিশীল মানে প্রধানত ধর্মনিরপেক্ষতা; সাহিত্যে প্রগতিশীল মানে সাহিত্যকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার না করা বা সাহিত্যের বিচার-বিধানে ধর্মকে ব্যবহার না করা। দ্বিতীয়ত, প্রগতিশীল সাহিত্য মাত্রই সে-সাহিত্য হবে নির্দিষ্ট ধর্ম, গোষ্ঠী এবং জাতির ঊর্ধ্বে উঠে পক্ষপাতমুক্ত।—এই হচ্ছে প্রগতিশীল সাহিত্যের প্রাথমিক পরিষ্কার নীতি।
মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ১৮৮৮ সালের ২০ নভেম্বর চাঁদপুর জেলার পাইকারদী গ্ৰামে জন্মগ্রহণ করেন। বলে রাখা ভালো, চাঁদপুর তখন কুমিল্লা জেলার অধীনে একটি থানা মাত্র। ছেলেবেলা থেকেই নাসিরউদ্দীনের সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ জন্মেছিল, যা তখনকার সময়ে দুর্লভ ব্যাপার। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে গ্ৰামে একবার নাসিরউদ্দীন মঞ্চ নাটকে অংশগ্রহণ করে; খবরটা তাঁর বাবার কানে গেলে তাঁকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয় এবং শাস্তিও পেতে হয়। কিন্তু মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন দমবার পাত্র নন! তাঁর আত্মজীবনী বাংলা সাহিত্যে সওগাত যুগ গ্ৰন্থে লিখছেন, ‘কিন্তু শাস্তি হলে কী হবে, আমার কাছে যে জিনিসটা ভালো লাগত, সেটা আর কিছু নয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখা, বই আর পত্রিকা পড়া, নাটক করা, আবৃত্তি করা এইসব। আমাদের ক্লাসে একটু অবস্থাপন্ন ঘরের একটা হিন্দু ছেলে ছিল। সে প্রায়ই কলকাতা থেকে বই, পত্র-পত্রিকা এইসব আনাত। সেগুলো নিয়ে সে ক্লাসে আসত। আমি তার কাছে একবার একটা ছোটদের মাসিক পত্রিকা পড়তে চেয়েছিলাম। সে দেয়নি। উপরন্তু অপমানজনক একটা উক্তি করেছিল। বলেছিল, তোদের মুসলমানদের কী আছে! আমার এসব নিয়ে টানাটানি করিস কেন?’—এটা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের জীবনের প্রথম ধাক্কা এবং এ ধাক্কাই তাঁর জীবনের গতিপথ নির্দেশ করেছিল।
মুসলমানের সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় মেধা ও মুক্তবুদ্ধির যে দীপ্তি লক্ষ্য করা যায়,—তার স্ফুরণ ঘটেছিল মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের হাতে, সওগাতের পৃষ্ঠাতে।
একদিন স্কুলের লাইব্রেরিয়ানকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘স্যার, আমাদের মুসলমানদের লেখা কোনো গল্প-উপন্যাসের বই কিংবা পত্রিকা কিছুই কি নেই?’ লাইব্রেরিয়ানের সোজা উত্তর, ‘বাবা, তোমাদের যদি কিছু থাকত, তবে আমরা জানতাম। স্কুলপাঠ্য কোনো বইয়েও মুসলমানদের লেখা আমাদের নজরে পড়ে না।’ এটা শুনে তাঁর মনে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল তা তাঁর নিজ জবানেই শুনি, ‘সেদিন মনে খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। এত বড় একটা জাতি, এত বড় একটা সমাজ, তারা বাংলা ভাষায় কথা বলে, অথচ তাদের বাংলা কোনো পত্রপত্রিকা নেই! এ নিয়ে ভাবতে গিয়ে মনটা ভয়ানক খারাপ হয়ে গেল। মাথায় কেবলই ঘুরপাক খেত ব্যাপারটা। ওই বয়সেই ছবির বই কিংবা পত্রপত্রিকা প্রকাশ করার স্বপ্ন দেখতাম। রাতে ঘুম হতো না।’ এভাবে বালক অবস্থাতেই সাহিত্যে বাঙালি-মুসলমানের করুণ অবস্থার স্পর্শ পেয়ে আন্দোলিত হন তিনি।
ম্যাট্রিক পাস করার পূর্বেই ইন্তেকাল করেন বাবা, পরিবারের ভার উঠে যায় বালক নাসিরউদ্দীনের কাঁধে। বাড়ির কাছে নরসিংহপুর স্টিমার স্টেশনে স্টেশন-মাস্টারের সহযোগী/ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ নিলেন—মাসে বিশ টাকা বেতন। কয়েক মাস এ কাজ করার পর এক লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে ঢুকলেন। লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে খুবই সাফল্যের সঙ্গে কাজ করতে লাগলেন দুই বছর ধরে; উপার্জন করতে লাগলেন কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা। তিন বছরের মাথায় তিনি হাঁপিয়ে উঠলেন! সেই যে মনে সাহিত্য পত্রিকা বের করার স্বপ্ন জন্মেছিল তার বয়স আস্তে-ধীরে বাড়ছিল। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তরিত করতে কলকাতায় গেলেন ১৯১৭ সালে—এক বছর পরিচিতজনদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন ‘সওগাত’ বের করবেন। পত্রিকার নাম ঠিক করে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, কবি শাহাদাত হোসেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, জলধর সেন, যদুনাথ সরকার, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ তৎকালীন বাঘা-বাঘা সাহিত্যিকের সাথে লেখার জন্য দেখা করলেন এবং অনেককে চিঠির মাধ্যমে অনুরোধ জানালেন। এখানে, লেখকদের নিকট লেখা চাইতে গিয়ে নাসিরউদ্দীন হোঁচট খেয়েছিলেন বাঙালি-মুসলমান সাহিত্যিকদের নিকট। এ সম্পর্কে তাঁর আত্মজীবনী থেকে হুবহু তুলে দিচ্ছি, এতে তাঁর প্রগতিশীল মানসিকতা স্পষ্টভাবে ধরা পড়বে : ‘প্রথমেই হোঁচট খেলাম উপযুক্ত লেখা পাওয়ার ব্যাপারটি নিয়ে। আমি চাই জ্ঞান-বিজ্ঞানবিষয়ক লেখা বেশি প্রকাশ করতে। কিন্তু যার কাছেই লেখার জন্য যাই, তিনিই বলেন হযরত উমরের জীবনী লিখে দেব। কেউ বলেন তাপসী রাবেয়ার জীবনীটা লিখে দেব। আমি বললাম, শতকরা ৫০ ভাগ বই-ই এ জাতীয় লেখায় ভরা। আমি চাই, আপনারা আধুনিক সাহিত্য সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করে আমাদের আধুনিক সাহিত্যের চেহারাটা কেমন হবে তা নিয়েই লিখুন।’—সওগাত প্রকাশের পূর্বেই মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের আধুনিক সাহিত্যের ব্যাপারে প্রগতিশীল মানসিকতা আমাদের নিকট সুস্পষ্ট।
সওগাতের সম্পাদকীয় নীতিমালা:
১. লেখকগণকে স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ এবং মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তাসমৃদ্ধ রচনাকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে।
২. প্রথম শ্রেণীর মাসিকের আদর্শে প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস প্রভৃতি ছবি দ্বারা পত্রিকার অঙ্গ সৌষ্ঠব বৃদ্ধি করা হবে।
৩. সমাজের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করা হবে।
৪. পত্রিকার প্রতি পাঠক সাধারণের আকর্ষণ বৃদ্ধির জন্য বিবিধ বিষয়ে সচিত্র প্রবন্ধ এবং মুসলিম জগতের সচিত্র বিবরণ নিয়মিত প্রকাশ করা হবে।
৫. নারীশিক্ষা ও নারী জাগরণমূলক প্রবন্ধাদি এবং ‘চিত্রে মহিলা জগৎ’ বিভাগ অন্তর্ভুক্ত করে মহিলাদেরকে সাহিত্য সাধনা ও সমাজসেবামূলক কাজে উৎসাহিত করা হবে।
৬. নতুন সাহিত্যিক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তরুণ লেখকগণের রচনা প্রকাশ করে তাঁদের উৎসাহিত করা হবে।
৭. নির্ভীক ও নিরপেক্ষ সম্পাদকীয়-নীতি গ্ৰহণ করতে হবে।
[সওগাত, ‘মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন জাতীয় সম্বর্ধনা সংখ্যা’, অগ্রহায়ণ-পৌষ, ১৩৮৬, ৬৭-৬৮ পৃষ্ঠা
এ সম্পাদকীয় নীতিমালা থেকেই কি সওগাত এবং তার কর্ণধার মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের প্রগতিশীল সাহিত্যের মানসিকতা সুস্পষ্ট নয়? প্রথম নীতিতে ‘লেখকগণকে স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ এবং মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তাসমৃদ্ধ রচনাকে অগ্রাধিকার’ প্রদানের অঙ্গীকার তখনও পর্যন্ত যে কোনো বাঙালি-মুসলমান সম্পাদক এবং পত্রিকার জন্য অভূতপূর্ব বিষয়। তৃতীয় নীতিতে ‘সমাজের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা’র যে সোজাসাপ্টা বয়ান তা তো তৎকালীন বাঙালি-মুসলমান সমাজে রীতিমতো দুঃসাহসিকতা! আর পঞ্চম নীতির ‘নারীশিক্ষা ও নারী জাগরণমূলক প্রবন্ধাদি এবং “চিত্রে মহিলা জগৎ” বিভাগ অন্তর্ভুক্ত করে মহিলাদেরকে সাহিত্য সাধনা ও সমাজসেবামূলক কাজে’ একনিষ্ঠভাবে সংযোগের যে নিঃসঙ্কোচ ঘোষণা একে ইসলামি পরিভাষায় ‘জেহাদ’ বললে অত্যুক্তি হবার কথা নয়। পুরো সম্পাদকীয় নীতিমালাটাই তৎকালীন সময়ে বাঙালি-মুসলমান সমাজে বড়সড় বিপ্লবের বেশ ধারণ করে। আর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও তাঁর সওগাত যে বাঙালি-মুসলমানদের প্রগতিশীল সাহিত্যের প্রধান অভিভাবক তার সবচেয়ে বড় দলিল এ সম্পাদকীয় নীতিমালা।
এখন, প্রথম সংখ্যার ‘সওগাত’র সূচি পাঠকসমীপে তুলে ধরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কবিতা: বেগম রোকেয়া; শাহাদাৎ হোসেন; ফজলুর রহিম চৌধুরী; কায়কোবাদ; মানকুমারী বসু; কুমুদরঞ্জন মল্লিক; জীবেন্দ্রকুমার দত্ত; সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত; ভুজঙ্গধর রায় চৌধুরী এবং চণ্ডিচরণ মিত্র।
গল্প: ব্রজমোহন দাস; জলধর সেন; পাঁচুলাল ঘোষ।
প্রবন্ধ: মোহাম্মদ কে. চাঁদ; মাওলানা মনিরুজ্জামান এসলামাবাদী; ওসমান আলী; ইসমাইল হোসেন সিরাজী; ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়; শাহাদাৎ হোসেন; এস হোসেন এবং আবদুল গফুর।
বাঙালি-মুসলমান সমাজের সাহিত্যিক দুর্গতি ঘোচানোর জন্যই এবং উক্ত সমাজের উদ্দেশ্যেই যে পত্রিকার জন্ম সে-পত্রিকার পয়লা সংখ্যাতেই যখন হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের লেখকদের সমানে সমান উপস্থিতি দেখি তখন কিন্তু আশ্চর্যের সীমা পেরিয়ে হতবাক না হয়ে উপায় থাকে না! আধুনিক সাহিত্যের প্রধান শর্ত অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মনিরপেক্ষতার পাল্লায় তখনো পর্যন্ত কি সওগাতের ধারেকাছেও কেউ ঘেঁষতে পেরেছিল?
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নজরুলের প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’; প্রথম কবিতা ‘কবিতা সমাধি’; প্রথম প্রবন্ধ ‘তুর্কি মহিলার ঘোমটা খোলা’; প্রথম গান ‘উদ্বোধন’—সবই ছাপা হয় ‘সওগাত’ পত্রিকায়।
সওগাত-সম্পাদকের নীতি ছিল একেবারেই নিরপেক্ষ—মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন নিজের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে লেখা প্রকাশের মানদণ্ড হিসেবে কখনোই ব্যবহার করেন নি। তিনি সবসময়ই নজরুলের একনিষ্ঠ শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন, কিন্তু নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র প্যারোডি হিসেবে কবি গোলাম মোস্তফা যে ‘নিয়ন্ত্রণ’ লিখলেন তাও ছাপা হলো সওগাতেই! এ থেকেই মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের পক্ষপাতমুক্ত সম্পাদকীয় নীতির সাথে পরিচিত হওয়া যায়। তিনি কখনোই নিজের লেখাকে প্রাধান্য দিতেন না; চাইলে অনেক কিছু লিখতে পারতেন, কিন্তু সে চেষ্টা তিনি করেন নি। এমনকি সওগাতের সম্পাদকীয় পর্যন্ত সবসময় তিনি লিখতেন না! আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবুল ফজল, আবুল মনসুর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ সাহিত্যিক সওগাতের সম্পাদকীয় লিখেছেন—বলা যায়, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন তাঁদেরকে সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি লেখক বা সাহিত্যিক ছিলেন না এবং চেষ্টাও কখনো করেন নি, কিন্তু লেখক, সাহিত্যিক সৃষ্টি এবং লালন করার এক বিস্ময়কর প্রতিভা তাঁর ছিল—যে প্রতিভাবলে নজরুল, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল ফজলের মতো যুগবিজেতা সাহিত্যিক তাঁরই সৃষ্টি। তিনি কখনোই কুতর্কে জড়ান নি; সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির প্রসঙ্গে অভিমত, পাল্টা-অভিমত করেছেন ছেপেছেন, কিন্তু এমন কোনো বিষয়ে তর্কে জড়ান নি যে তর্কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। এ প্রসঙ্গে নজরুলের ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতা সম্পর্কে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন বলেছেন, ‘তিনি লিখেছিলেন দুর্গা পূজার সময় রক্তাম্বরধারিণী মা। স্বাধীন চিন্তা স্বাধীন লেখা আমি পছন্দ করি। তা সত্ত্বেও ওই ধরনের লেখা আমি ছাপি নি। কারণ, তাতে একটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তখন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার সময় ছিল না।’—আধুনিক বাংলা সাহিত্যে প্রগতিশীল মানসিকতাসম্পন্ন এমনই এক বিতর্কমুক্ত সম্পাদক ছিলেন তিনি। ধর্মীয় বিষয়বস্তু নিয়ে প্রচুর লেখা তিনি ছাপিয়েছেন, কিন্তু সওগাতের কোনো ধর্মীয় লেখা থেকে কুতর্ক, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে এমন নজির ইতিহাসে পাওয়া যায় না। আর এজন্যই গবেষক বলেন, ‘মুসলমানের সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় মেধা ও মুক্তবুদ্ধির যে দীপ্তি লক্ষ্য করা যায়,—তার স্ফুরণ ঘটেছিল মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের হাতে, সওগাতের পৃষ্ঠাতে।’ [মুসলিম সম্পাদিত ও প্রকাশিত বাংলা সাহিত্য পত্রিকা : ইসরাইল খান, ২০০৫, ৮৩ পৃষ্ঠা
তখনও পর্যন্ত বাঙালি-মুসলমানদের মধ্য থেকে যত পত্রিকা বের হয়েছিল প্রতিটিই ছিল ধর্মকেন্দ্রিক—ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে সাহিত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার মতো ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের সাহস মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের পূর্বে কোনো বাঙালি-মুসলমান দেখাতে পারেন নি। সে-হিসেবে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বাঙালি-মুসলমানদের মধ্য থেকে প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে ‘সওগাত’ এবং তার কর্ণধার মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনকে খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু শিরোনামে ‘প্রধান প্রতিনিধি’ না লিখে ‘প্রধান অভিভাবক’ লেখা হয়েছে—কেন? সন্তুষ্টজনক উত্তর পেতে পাঠককে ধৈর্য ধরে পড়ে যেতে হবে।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বাঙালি-মুসলমানের প্রকৃত যাত্রাকাল ধরা হয় নজরুল থেকে—১৯২০। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নজরুলের প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’; প্রথম কবিতা ‘কবিতা সমাধি’; প্রথম প্রবন্ধ ‘তুর্কি মহিলার ঘোমটা খোলা’; প্রথম গান ‘উদ্বোধন’—সবই ছাপা হয় ‘সওগাত’ পত্রিকায়। একবাক্যে, বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে নজরুলের প্রবেশ সওগাতের মাধ্যমেই। করাচির বাঙালি পল্টন থেকে অনেক কবিতা নজরুল পাঠিয়েছিলেন বিভিন্ন পত্রিকায়, কিন্তু ছাপা আর হয় না! শেষে রেগেমেগে ‘কবিতা সমাধি’ নামে এক অভিযোগমুখর ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখে সওগাত-সম্পাদক বরাবর পাঠিয়ে দিলেন। এ কবিতায় নজরুল লিখছেন:
চাটুবাক্যে লুব্ধ হয়ে কবিতারাশিকে পাঠালাম ছোট বড় সকল মাসিকে।
তৎকালীন ছোট-বড় সকল মাসিকে তিনি নিয়মিত লেখা পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সকল-প্রকার সাহিত্যকর্ম ‘সওগাত’র পূর্বে কেউ ছাপেন নি—সওগাত-সম্পাদক নাসিরউদ্দীন ব্যতীত এগিয়ে আসেন নি কেউ তরুণ সাহিত্যিকের প্রতিভা-প্রকাশে। বাঙালি-মুসলমানের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিককে সাহিত্যাঙ্গনে স্বাগতম জানানোর একক কৃতিত্ব ‘সওগাতেরই’ প্রাপ্য।
আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম একটি অঙ্গ ‘সমালোচনা’—এক্ষেত্রে সওগাতের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯১৭ সালে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ নামক পত্রিকায় সৈয়দ এমদাদ আলী কবি কায়কোবাদের মহাশ্মশান কাব্যগ্রন্থে অশ্লীলতার ঘোরতর অভিযোগ তুলে বিরূপ সমালোচনা করলেন। এর পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন তৎকালীন তরুণ সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন—গল্পটা তাঁর আত্মজীবনী থেকে চয়ন করছি: ‘আমার কিন্তু সৈয়দ সাহেবের প্রবন্ধটি ভালো লাগে নাই। এর প্রতিবাদ হওয়া দরকার, এ-ধারণা আমার হয়েছিলো। কোনো যোগ্য সাহিত্যিকের হাত দিয়ে এর প্রতিবাদ হবে, এর প্রতীক্ষা করছিলাম। কিন্তু কয়েক মাস অতীত হওয়ার পরও যখন কোনো প্রতিবাদ প্রকাশিত হতে দেখলাম না, তখন নিজেই এর একটা প্রতিবাদ লিখতে বসলাম। একটি সুদীর্ঘ প্রতিবাদ-প্রবন্ধ লিখে ফেললাম। তাতে সৈয়দ সাহেবের প্রতিটি আপত্তির যুক্তিসঙ্গত খণ্ডন ছিল। কিন্তু আমার মত অখ্যাত লেখকের এ প্রবন্ধ কে ছাপাবে? “বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা”য় এ প্রবন্ধ পাঠাতে সাহস হলো না। খোদার নাম ভরসা করে এটা দিলাম পাঠিয়ে “সওগাতে”। তাঁরাও এটা ছাপাবেন কিনা, সে-সন্দেহ আমার ছিলো। কারণ ‘নবনূর’ সম্পাদক সৈয়দ এমদাদ আলী সাহেব তখন মুসলিম বাঙলা সাহিত্যের একজন দিকপাল। যা হোক, পাঠাবার সঙ্গে সঙ্গেই ‘সওগাতে’র নয় পৃষ্ঠা জুড়ে প্রবন্ধটি ছাপা হলো। প্রবন্ধটি পড়ে সৈয়দ সাহেব যে খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তা বুঝা গেলো তাঁর সুদীর্ঘ প্রতিবাদ পড়ে। তাঁর প্রতিবাদও “সওগাতে”ই ছাপা হয়েছিলো। তবে আমার সমর্থনে একজন শক্তিশালী হিন্দু লেখক কলম ধরেছিলেন। তিনি তখনকার ঢাকা মিউজিয়ামের কিউরেটর প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নলিনীকান্ত ভট্টশালী। তিনি “সওগাতে” এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীও এ-ব্যাপারে “সওগাতে” একটি প্রবন্ধ লেখেন। তাঁর আলোচনাটি ছিল অনেকটা মধ্যস্থতা-ধর্মী।’ [অতীত দিনের স্মৃতি : আবুল কালাম শামসুদ্দীন, ৩৩-৩৬ পৃষ্ঠা
আবুল কালাম শামসুদ্দীনের উক্ত বয়ান থেকে ৩টি পয়েন্ট গুরুত্বপূর্ণ:
১. সৈয়দ এমদাদ আলী তখনকার ‘মুসলিম বাংলা সাহিত্যের দিকপাল’ হওয়াতে আবুল কালাম শামসুদ্দীন ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় প্রতিবাদ-প্রবন্ধ পাঠানোর সাহস পেলেন না; কিন্তু কিঞ্চিৎ আশা নিয়ে ‘সওগাত’ বরাবর পাঠিয়ে দিলেন। এখানে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ এবং ‘সওগাত’র মধ্যকার সাহিত্য-প্রাধান্যতার পার্থক্য স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়।
২. ‘নবনূর’ পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ এমদাদ আলী তখনকার ‘মুসলিম বাংলা সাহিত্যের দিকপাল’ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সমালোচনার বিরুদ্ধে এক আনাড়ি সাহিত্যিকের প্রতিবাদ-প্রবন্ধ দীর্ঘ নয় পৃষ্ঠা জুড়ে প্রকাশ করল ‘সওগাত’।
৩. সৈয়দ এমদাদ আলী, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, নলিনীকান্ত ভট্টশালী এবং মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী প্রত্যেকের লেখাই ‘সওগাত’ প্রকাশ করেছে। আমরা অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করছি, কবি কায়কোবাদের মহাশ্মশান নিয়ে বিতর্কে প্রতিবাদ, পাল্টা প্রতিবাদ, মধ্যস্থতা—সকল প্রবন্ধ প্রকাশ করল ‘সওগাত’। এখানে ‘সওগাত’র পক্ষপাতমুক্ত সাহিত্যমানস প্রকটরূপে ধরা পড়ে—যে পক্ষপাতমুক্ত সাহিত্যমানস বর্তমান সময়েও দুর্লভ।
সাহিত্য-সমালোচনায় মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও তাঁর সওগাতের উৎসাহ সম্পর্কে জানতে আমাদের আবার ফিরে যেতে হয় আবুল কালাম শামসুদ্দীনের আত্মজীবনীতে: ‘কবি গোলাম মোস্তফা তখন বালিগঞ্জে এক স্কুলে মাস্টারি করতেন এবং থাকতেন কারমাইকেল হোস্টেলে। কিন্তু এ খবর আমার জানা ছিল না। ইতিমধ্যেই তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস রূপের নেশা আমার হাতে এসে পড়ে—সম্ভবত “সওগাতে”র নাসিরউদ্দীন সাহেব ওটা আমাকে দিয়েছিলেন “সওগাতে” সমালোচনার জন্য। আমি রাত জেগে বইখানা পড়ে এর একটা দীর্ঘ সমালোচনা লিখে ফেললাম। উপন্যাসখানার শিল্পগত ত্রুটি-বিচ্যুতি কিছু কিছু আমার নজরে পড়েছিল। সমালোচনায় সে-সব কথা উল্লেখ করেছিলাম। যথাসময়ে “সওগাতে”র এক সংখ্যায় সমালোচনাটি প্রকাশিত হলো।’ [আবুল কালাম শামসুদ্দীন, প্রাগুক্ত, ৪০ পৃষ্ঠা
‘কয়েক মাস ধরে “সওগাতে” আমার লেখা “কাব্য সাহিত্যে বাঙালি মুসলমান” শীর্ষক লেখাটি প্রকাশিত হয়। এ-প্রবন্ধে আমি পুঁথি সাহিত্যের যুগ থেকে নজরুল ইসলাম পর্যন্ত বাঙলার মুসলমান কবিদের কাব্য-সাধনার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছিলাম। সেকালে এ-লেখাটি মুসলিম সাহিত্যিক মহলে যথেষ্ট আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। অনেক বিরূপ মন্তব্যও এজন্য আমাকে সহ্য করতে হয়েছিল বৈ কি! কবি শেখ হাবিবুর রহমান আমাকে তীব্র আক্রমণ করেছিলেন এবং আমি তার যথাযথ উত্তরও দিয়েছিলাম। “সওগাত”ই এই বাদ-প্রতিবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।’ [আবুল কালাম শামসুদ্দীন, প্রাগুক্ত, ১১৮
আধুনিক সাহিত্যে এমন পক্ষপাতমুক্ত প্রগতিশীল সাহিত্যমানস সওগাত এবং তার কর্ণধার মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের পূর্বে বাঙালি-মুসলমান সমাজে আর দেখা যায় নি।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর ‘সওগাতে’ অন্তর্ভুক্তি নিয়ে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন বলেছেন: ‘কাগজ বন্ধ রেখে দ্বিতীয়বার যখন তার প্রকাশনা শুরু করি, তখন প্রথম পেলাম মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীকে। তিনি মোহাম্মদী অফিসে চাকরি করতেন। ওখানে চাকরি করলেও তিনি স্বাধীনভাবে চিন্তা করতেন। স্বাধীনভাবে লিখতেন; কিন্তু সে লেখা মোহাম্মদীতে ছাপা হতো না। এই নিয়ে তিনি খুব মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করছিলেন। কোনো সাহিত্যিককে যদি ক্ষুদ্র গণ্ডির বৃত্তে ধরে রাখতে চান, এবং তাঁকে যদি বলেন, কেবল এ ধরনের লেখাই লিখবেন, তাহলে সারাজীবনেও তিনি আর সাহিত্যিক হতে পারবেন না। আমার মনে সবসময় এ ধরনের একটা বিশ্বাস কাজ করেছে। মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী তখন মোহাম্মদী অফিস থেকে আমার এখানে চলে এলেন।’ [বিরুদ্ধ স্রোতের মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, ২০৫ পৃষ্ঠা
উক্ত সাক্ষাৎকারেই আবুল মনসুর আহমদের ‘সওগাতে’ অন্তর্ভুক্তি নিয়ে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন বলেছেন: ‘আবুল মনসুরের কথা ছিল, আমি অনেক বিষয় নিয়ে চিন্তা করি। আমার মাথায় এসব চিন্তা সবসময় কিলবিল করে। কিন্তু কথা হলো আমার লেখা কেউ ছাপবে না। আমি বলি, কেন ছাপবে না? তিনি বললেন, মুসলমান সমাজে এমন কোনো কাগজ নেই যারা আমার লেখা ছাপবে। কারণ, আমি প্রথমেই আক্রমণ করব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, ভণ্ডামির বিরুদ্ধে, এই সংসারে যত ভণ্ড আছে, তাদের বিরুদ্ধে। বলুন ভণ্ডরা কি তাদের কাগজে ছাপবে এ রকমের লেখা? এসবই বললেন আবুল মনসুর আহমদ। আমি বললাম, আমি ছাপাব আপনার লেখা। আপনি আমাদের সঙ্গে থাকেন। তিনি বললেন, আপনি যে ছাপবেন আপনাকে তারা পিটুনি দেবে। আমি বললাম, তাহলে তো আর সাহিত্যকর্ম করা যাবে না। পিটুনির ভয়ে যদি সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা না বলি, তাহলে এ পথে আমার চলাই উচিত হবে না। মনসুর সাহেব কতক্ষণ ভেবে বললেন, আপনি বেশ সাহস করেছেন। ঠিক আছে, আমি লিখব।’
ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পূর্বে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে আধুনিক চিন্তাশীল তথা প্রগতিশীল মানসিকতার যে কোনো বাঙালি-মুসলমান সাহিত্যিকের প্রধান ‘আশ্রয়’ ছিল সওগাত এবং তার কর্ণধার মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন।
পারস্য প্রতিভা গ্ৰন্থের বিখ্যাত লেখক মোহাম্মদ বরকতুল্লাহর ব্যাপারে সওগাত-সম্পাদক উল্লেখ করেন: ‘মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ সাহেবের কথাই ধরুন। দার্শনিক গোছের মানুষ। আমাকে তিনি বলেছিলেন, “আমার অনেক লেখা আছে মুসলমানদের ইতিহাস এবং তাদের দার্শনিক সাধনা বিষয়ে। কিন্তু আমার লেখা কেউ ছাপে না। কারণ, আমার লেখায় অনেক জিজ্ঞাসা থাকে। জিজ্ঞাসা থাকে সৃষ্টির বিষয়ে, সৃষ্টিকর্তার বিষয়ে।” আমি তাঁকে বললাম, “আপনি লেখা দিন, আমি ছাপব। সে দায়িত্ব আমার।” তারপর উনি লেখা দিলেন। দিলেন তাঁর দার্শনিক প্রবন্ধগুলো। তাঁর পারস্য প্রতিভার সব কটা প্রবন্ধই আমার সওগাতে ছাপা হয়।’
কথাসাহিত্যিক আবুল ফজল, যিনি পরবর্তীতে দেশভাগের পর বাঙালি-মুসলমানের সাহিত্যকে পাকিস্তানিকরণের তীব্র বিরোধিতা করে ‘জাতির বিবেক’ বলে খ্যাতিমান হয়েছিলেন তাঁরও শুরুটা হয়েছিল ‘সওগাত’র মাধ্যমেই। আত্মজীবনীতে আবুল ফজল লিখেছেন: ‘মেসে বসে আমি অনেক ছোট গল্প লিখেছি—‘‘ইসলাম কী জয়”, “সংস্কারক”, “অনুক্ত কাহিনী” (বর্তমান নাম “মা”) ইত্যাদি গল্প যতদূর মনে পড়ে ওখানে বসেই লেখা। আমার প্রথম উপন্যাস চৌচিরেরও প্রথম খসড়া ওখানেই শুরু। আমার ঐ যুগের সব লেখাই সওগাতে ছাপা হয়েছে আর তখন সওগাতে লেখা ছাপা মানে লেখক বলে স্বীকৃতি পাওয়া।’ [রেখাচিত্র : আবুল ফজল, ১২৫ পৃষ্ঠা
আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখলাম, কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আবুল মনসুর আহমদ, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ এবং আবুল ফজলের মতো আধুনিক সাহিত্যিকদের জন্য মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও তাঁর সওগাত অবশ্যই ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালন করেছিলেন, সন্দেহ নেই। আর সেজন্যই আবুল কালাম শামসুদ্দীনের কণ্ঠে শুনি, ‘সে-সময়ে “সওগাত” এমন একটা সাহিত্যিক আবহাওয়ার সৃষ্টি করেছিল, যাতে সে-সময়ের ছোট-বড় প্রায় সব মুসলমান সাহিত্যিক ও সাহিত্যামোদী ব্যক্তি এসে “সওগাত” অফিসে ভিড় করেছিলেন। নজরুল ইসলাম কিছুদিন “সওগাতে” এসে আস্তানা গেড়েছিলেন। তাঁকে কেন্দ্র করে তখন “সওগাতে” একটা বিশিষ্ট সাহিত্যিকগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল। বুদ্ধির মুক্তি, নারী-স্বাধীনতা, দেশের আজাদী ছিল এই সাহিত্যিকগোষ্ঠীর মূলমন্ত্র।’ আর আবুল ফজলের বিশ্বস্ত কণ্ঠে শোনা যায়, ‘সে যুগের বহু নবীন লেখকই সাহিত্যের আসরে ঠাঁই পেয়েছেন স্রেফ সওগাতের পৃষ্ঠপোষকতার ফলেই। নাসিরউদ্দীন সাহেব নিজে খুব কম লিখতেন, তবে বুঝতে পারতেন, যে কোন লেখার মান আর মূল্য।’ যে কোনো বিষয় সম্পর্কে স্বাধীন চিন্তাধারার ব্যাপারে সওগাত সে-সময়ে লেখকদেরকে যে অবাধ স্বাধীনতা প্রদান করেছিল তা নিঃসন্দেহে বিপ্লব—দুঃসাহসী বিপ্লব। বাদ-প্রতিবাদে প্রত্যেকের মতামত হুবহু প্রকাশ করা, পক্ষপাতমুক্ত সাহিত্যমানসে পত্রিকা পরিচালনা করা তখনকার সময়ে বাঙালি-মুসলিম সমাজের জন্য একেবারে নতুন, অভিনব, অভূতপূর্ব বিষয়। বলা যায়, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দরবারে বাঙালি-মুসলমান যেন নিজেদেরকে উপস্থাপন করতে পারে সেজন্য এক চরমতম সুযোগ মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সৃষ্টি করলেন। ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পূর্বে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে আধুনিক চিন্তাশীল তথা প্রগতিশীল মানসিকতার যে কোনো বাঙালি-মুসলমান সাহিত্যিকের প্রধান ‘আশ্রয়’ ছিল সওগাত এবং তার কর্ণধার মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। আর সেজন্যই কবি সুফিয়া কামাল সরল বাক্যে লিখেন, ‘তিনি ছিলেন নির্ভর করার মতো আশ্রয়।’ কবি আলাওলকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া ঐতিহাসিক কোরেশী মাগনকে স্মরণ করে খ্যাতিমান গবেষক মোহাম্মদ আবদুল কাইউম মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনকে নির্দেশ করেন ‘একালের কোরেশী মাগন’ বলে। যিনি ‘আশ্রয়দাতা’ তিনি নিঃসন্দেহে ‘অভিভাবক’—এদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করছি, ‘বাঙালি-মুসলমানের প্রগতিশীল সাহিত্যের প্রধান অভিভাবক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন এবং তাঁর সওগাত।’