সরলা পুবের জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিলে আলোটা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিছানায়। তখনই ঘুম ভাঙে ফারজানার। আফা, ঘুম ভাঙছে? কত বেলা অইছে, উইঠবেন না আইজ? সরলা ফারজানার বাসায় কাজ করছে বছর দুয়েক হলো। বয়স চল্লিশের মতো। কিশোরী বয়সে বিয়ে হয়েছিল। আজ নিজের বলতে কেউ নেই, বাপের বাড়িতে ভাইয়েরা আর বুড়ো মা। ভাইদের সাথেই থাকে। মন ছুটলে শহরে চলে আসে সরলা। মানুষের বাড়িতে কিছুদিন কাজ করে আবার মন ছুটে গ্রামে। এবার এসে কাজ নিয়েছে ফারজানার বাসায়। ফারজানা ততক্ষণে মাথার কাছে রাখা মোবাইলে সময়টা দেখে নেয়। নিজে বিড়বিড় করে, অনেক দেরি হয়ে গেল! সরলা বলে, আফা, কিছু কইছেন? না, তোমাকে কিছু বলি নি। ফারজানার উত্তর। টেবিলে নাস্তা দিমু? সরলা আবার প্রশ্ন করে। এখন না, এক কাপ চা দাও তো, বিস্কিটও দিয়ো। বলতে বলতে ফারজানা বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে ঢোকে। সরলা দ্রুত বিছানাটা গুছিয়ে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ায়। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ভোরের স্বপ্নের কথা মনে পড়ে ফারজানার। ইদানীং প্রায়ই সে স্বপ্নটা দেখছে। স্বপ্নটা দেখলেই চোখের পাতা থেকে ঘুম উড়ে যায়। আবার চোখে এসে বসতে সময় লাগে ঢের। তাতেই আজ এত বেলা। রাফি ভাইয়ের ফোন আসে। গতকাল রাতেই প্রদর্শনীর জন্য গ্যালারি বুকিং দেয়া হয়েছে। হাতে সময় মাত্র তিন দিন। এবারের প্রদর্শনীতে ফারজানার নতুন পেইন্টিংস যাবে। পেন্সিল স্কেচে হিউম্যান ফিগার। ফারজানা করিম। ভাস্কর্য শিল্পী। স্বামী ব্যবসায়ী। কাজের প্রয়োজনে ছুটতে হয় এদিক-ওদিক। একমাত্র সন্তান আবরার। থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছে। ভাস্কর্য শিল্পী হলেও ফারজানার বরাবরই পেইন্টিংস পছন্দ। কয়েকদিন ধরে একটি পেইন্টিংয়ের কাজ করছে সে। সামনে প্রদর্শনী। প্রদর্শনী থেকে ছবি বিক্রির অর্থ শিশুদের জন্য পরিচালিত একটি আশ্রয় কেন্দ্রে দেবে।
কালো কালিতে ফারজানা লেখে, গোপন মমতায় আমাদের সময় হাঁটে অনন্তের পথে...
ছবি আঁকা প্রায় শেষের দিকে। আজকের পুরো দিনটা দিতে পারলে আঁকাটা শেষ হবে। একটা বিস্কিট আর চা খেয়ে ফারজানা স্টুডিওতে ঢোকে। পেন্সিল তুলে নেয় হাতে। একেকটি বিন্দু বড় হতে হতে রূপ নেয় চক্রে। চক্র থেকে বিন্দুটি নিজেকে আবার ছাড়িয়ে নিতে চায়। ছাড়িয়ে নিয়ে সর্পিল পথে হাঁটতে চায়। এ গতি ঊর্ধ্বমুখী নয়; উপরের পথ খুঁজতে গিয়ে বিন্দুটিকে বদলাতে হয় তার চলার পথ। এ চলার পথ নিচ থেকে নিচে। তলানিতে পৌঁছে যাবার ভয় জাগে সে-বিন্দুর। পথটা খুব দীর্ঘ নয়, তবুও খিদে পায়। আমার নয়, বিন্দুরও নয়। তোমার। তুমি এক মানব শিশু। তোমার পায়ের আঙুলের ছোট ছোট বৃত্তাকার রেখাগুলো রঙিন বুদ্বুদ হয়ে বাতাসে ভাসতে চায়। আমার সোনা মানিক! আর দুষ্টুমি করে না। ফিসফিসিয়ে বলে ফারজানা। বুদ্বুদের নেশা ছাড়িয়ে বৃত্তগুলো আঙুলের মাথায় এসে স্থির হয়। স্থির হয় মায়ের হাতের তালুতে, সন্তানের পায়ের পাতা। রেখাগুলো চুমু খায় গালে। আফা, নাস্তা খাওনের সময় তো চইল্যা গেছে, আপনাকে নাস্তা দেই। বলে সরলা। সরলার আসা টের পায় নি ফারজানা। সবে শুরু করেছে আঁকা। না রে, খেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি তোমার কাজে যাও। সরলা নীরবে পা বাড়ায়। শোনো, তোমার হাতে কি এখন অনেক কাজ? ফারজানা জিজ্ঞেস করে। সরলা উত্তর দেয়, কাজের কি শেষ আছে আফা! তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি? ঠিকঠাক উত্তর দেবে? ফারজানার এমন প্রশ্নে কিঞ্চিৎ বিম্ময় জাগে সরলার। আগে প্রশ্নখান করেন, তারপর না হয় ভাবোন যাইব উত্তর কী দিমু। বলতে বলতে মুচকি হাসে সরলা।
ফারজানা জিজ্ঞেস করে, এখানে আসার পর থেকেই তোমাকে খেয়াল করছি, কাজের ফাঁকে বা সুযোগ পেলেই তুমি ড্রইং রুমে ঝোলানো আবরারের ছবির দিকে তাকিয়েই থাক। কী খোঁজ তুমি তার ছবিতে? প্রশ্নটা শুনেই সরলার বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে। পলকে তার দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে রুমে। ফারজানা খেয়াল করে। সরলা বলে, আফা, আমার একটা পোলা আছিল। পোলার জন্মের পর স্বামী মইরা যায়। পোলাটার যখন দুই বছর বয়স তখন তারে ট্রেনে হারাইয়া ফেলি। কেউ একজন ট্রেন থেইক্যা আমার বুকের মানিকরে চুরি কইরা লইয়া যায়। আমি ঠাওর করতে পারি নাই। হেই পোলা যদি আইজ আমার কাছে থাকত তাইলে এতদিনে আপনার পোলার মতোই হইত। আমি এখনও আমার পোলারে খুঁইজা বেড়াই দ্যাশে দ্যাশে। সরলার কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে। ফারজানা সরলার এ উত্তরের জন্য একদম প্রস্তুত ছিল না। তাদের মধ্যে আর কোনো কথা হয় না। চুপ হয়ে যায় ফারজানা। সরলা যায় কিচেনের দিকে। ফারজানা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে কিছু একটা ভাবে। তারপর হোয়াইট বোর্ড মার্কার নিয়ে সাদা বোর্ডটার কাছে যায়। সময় নিয়ে ভাবতে থাকে। কিছু একটা লিখবে। কালো কালিতে ফারজানা লেখে, গোপন মমতায় আমাদের সময় হাঁটে অনন্তের পথে... আবার আঁকতে শুরু করে। পোস্টার পেপারে ফারজানার হাত চালানোর ভঙ্গি এবং চাপের ভারসাম্য বিন্দুর শরীর ভেদ করে পরিণত হতে থাকে রেখায়। চরিত্র খুঁজে নিতে রেখা সব আয়োজনে উজ্জ্বল। চরিত্রের আকৃতিতে তুমি আমাকে খুঁজবে বলে পা বাড়াবে সামনে। সদ্য জন্ম নেয়া কোনো মানব পা নয়। যদি প্রশ্ন করি, তোমার পায়ের পাতার বয়স কত? তুমি কী বলবে, জানি না তো। আমি বলি, বহুদিন ধরে তুমি একটু একটু করে হাঁটছ আমাদের পথে।
গোপন মমতায় পায়ের একেকটি আঙুল পেন্সিলের রঙে তোমার জগতে আমার উপস্থিতি জানিয়ে দেয়। গভীর মমতাময় অনুভবে আবার ফিসফিস করে ফারজানা। পেইন্টিংটা করতে গিয়ে প্রথম থেকেই কী এক শূন্যতা ঘিরে রাখে তাকে। অনেক কিছুই আছে আবার মনে হয় কোথাও কিছু নেই। সময় গড়িয়ে যায় দুপুরের দিকে। আজও ওষুধ খাওয়ার কথা ভুলে যায় ফারজানা। প্রতিদিন সময় মতো অনেক ওষুধ গিলতে হয় তাকে। সরলা মনে করিয়ে দিতেই আঁকার এক ফাঁকে প্রেসার আর সুগারের ওষুধ খায় সে। তারপর ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে গভীর দৃষ্টিতে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকে। মৌনী, ধ্যানমগ্ন। হঠাৎই স্বপ্নের কথা মনে পড়ে আবার। একটা শিশু, সদ্য হাঁটা শিখেছে। উঁচু এক পথের দিকে তার যাত্রা। আলতো পায়ে নরম মাটিতে ভর দিয়ে সে সামনের দিকে হাঁটে। হঠাৎ রাস্তার ওপারের সীমানা থেকে অগণিত প্লাস্টিকের ড্রাম শিশুটির দিকে ধেয়ে আসে। দুরন্ত গতিতে অপরিসীম শক্তি নিয়ে ড্রামগুলো ছুটে আসতে থাকে। ড্রামগুলো এসে কি শিশুটিকে আহত করবে, করবে কি ক্ষতবিক্ষত! ভাবনাটা অস্থির করে তোলে ফারজানাকে। সর্বশক্তিতে চিৎকার করে সে। সেখানেই স্বপ্নটা ভেঙে যায় প্রতিবার। প্রচণ্ড আতঙ্ক নিয়ে জেগে ওঠে সে তখন। সরলাকে অনেকক্ষণ হলো দেখা যাচ্ছে না। কোনো সাড়াশব্দও নেই। ফারজানা চেয়ার ছেড়ে উঠে স্টুডিও থেকে বের হয়ে কিচেনের দিকে যায়। যেতে যেতে ডাকে, সরলা...! কোনো সাড়া নেই। কিচেনেও দেখা যায় না তাকে। হঠাৎ চাপা কান্নার শব্দ কানে আসে ফারজানার। কিচেনের পাশের রুমেই থাকে সরলা। কান্নাটা ওই রুম থেকেই আসে। উঁকি দেয় ফারজানা। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে দেখে সরলাকে।
অস্ট্রেলিয়া কর্তৃপক্ষ মৃতদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর ফরমালিটিস শুরু করেছে।
এই প্রথম সরলাকে স্পর্শ করে সে। হাতটা সরলার মাথায় রেখে তাকে ডাকে। সরলা মাথা তুলে তাকায়। তার দুহাতের ভেতর ছোট্ট একটা গেঞ্জি। সেটা বুকে জড়িয়ে কাঁদে সরলা। কী হয়েছে তোমার, কাঁদছ কেন? প্রশ্ন করে ফারজানা। আফা, বাংলা সনের আইজকের দিনে আমার নিলীন জন্মাইছিল। এই দেখেন তার গায়ের গেঞ্জিখান এখনও বুকের মধ্যে আগলাইয়া রাখছি। ফারজানা দেখে। জিজ্ঞেস করে তোমার ছেলের নাম কি নিলীন? হ আফা। বাহ! ভারি সুন্দর নাম। তুমি কি জানো এ নামের অর্থ কি? না আফা। জানি না। জানেন আফা, পোলাকে ফেরত পাওনের আশায় কত পূজা দিলাম। কত মন্দির আর মাজারে ঘুরছি। ঠাকুর মুখ তুলে চায় না। পোড়া কপাল আমার। ফারজানা বুকের কাছে টেনে নেয় সরলাকে। বলে, ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস রাখ, একদিন নিশ্চয় তিনি তোমার সন্তানকে তোমার বুকে ফিরিয়ে দেবেন। সরলা ততক্ষণে চোখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। সরলা, রান্না করেছ? হ আফা। অনেক বেলা হলো। খিদে পেয়েছে। খেতে দেবে না? অ ভগবান, খাইতে দিমু না আবার কী! লন চলেন, আপনারে খাইতে দেই। হুম, তুমি টেবিলে খাবার দাও, আমি ততক্ষণে গোসলটা করে আসি। শাওয়ারে ফারজানার মাথায় ঘুরতে থাকে নিলীন নামটি। নামের অর্থটা সরলাকে বলা হয় নি। সকালে সরলার কাছ থেকে শোনা শিশুর হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা, রেলগাড়ি, শিশু চুরি, এত সব ভাবনা ফারজানাকে ঘিরে ধরে। আহারে বেচারা সরলা। মায়ের মন। কত কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছে সে।
আর দু’দিন পরই আবরারের জন্মদিন। গত দুবছর ছেলের জন্মদিন একসাথে পালন করা হয় না। ছেলেটা অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার পর থেকে কেবল ফোনে জন্মদিনে উইশ করা হয়। পেইন্টিংয়ের নামটা ঠিক করা হয় নি। কী নাম দেয়া যায়! মাথার মধ্যে অনেক চিন্তা ঘুরতে থাকে। শাওয়ার শেষ হলে ডাইনিং টেবিলে এসে বসে ফারজানা। সরলাকে বলে, আমার ছবি আঁকার ঘরে ওষুধের একটা প্যাকেট আছে। একটু এনে দেবে? শুনে সরলা ছবি ঘরের দিকে যায়। ফারজানা খাওয়া শুরু করে। সরলা ঘর থেকে ওষুধের প্যাকেটটা খুঁজে বের করতে গিয়ে থমকে যায়। তার চোখ পড়ে অসমাপ্ত পেইন্টিংটার দিকে। একটি নারীর হাতের ওপর একটি শিশুর পা। পায়ের তালু। পুরোটা ছবি জুড়ে পায়ের তালু। পায়ের তালুতে এক নিবিড় মমতা ছড়িয়ে আছে। তালুর এক অংশে একটি দাগ খেয়াল করে সরলা। সরলার মুহূর্তে মনে পড়ে নিলীনের পায়ের তালুতে একটা দাগ ছিল। জন্মদাগ। ঠিক এই ছবিটিতে আঁকা দাগের মতো। ফারজাহার ডাকে তার ধ্যান ভাঙে। ফিরে যায় ডাইনিং টেবিলের দিকে। আচ্ছা সরলা, তোমার ছেলের সে-সময়ের কোনো ছবি কি তোমার কাছে আছে? সরলা উত্তর দেয়, না আফা। ফারজানা বলে, আচ্ছা। আফা, বাবজানের ছোডবেলার ছবি নাই? ফারজানা বলে, থাকবে না কেন। আছে। থাকলে একটু দেখতাম। সরলার চোখে-মুখে আগ্রহ আর কৌতূহল ভর করে।
ফারজানা প্রসঙ্গটা আর এগোতে দেয় না। কেবল বলে, আচ্ছা। দেখাব সময় করে। খাওয়া শেষ করে ফারজানা গরম এক কাপ ব্ল্যাক কফি নিয়ে স্টুডিতে ঢোকে। বিকেল পেরিয়ে গোধূলি নামে। ফারজানার মোবাইলটা তার শোয়ার রুমেই। সমানে ফোন বেজে যায়। রিংয়ের শব্দ সরলার কানে আসে। সে মোবাইলটা নিয়ে ফারজানার কাছে যায়। আফা, ম্যালা সময় ধইরা আপনার ফোন বাজতাছে। ফারজানা হাত থেকে পেন্সিল রেখে মোবাইল নেয়। স্ক্রিনে দেখে আরিফ ডারলিং! ফারজানার স্বামী। সরলা পাশে দাঁড়িয়ে ফোনালাপ শোনে। অস্ট্রেলিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে ফোন, শ্রেণিকক্ষে উগ্রতা, ওপেন ফায়ার, গুলিতে ঘটনাস্থলেই কয়েকজন মারা গেছে, বেশ কয়েকজন হতাহত। হতাহতদের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। আববার তখন শ্রেণিকক্ষে ছিল। একটা গুলি গিয়ে তার বুকে লেগেছে। অস্ট্রেলিয়া কর্তৃপক্ষ মৃতদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর ফরমালিটিস শুরু করেছে। টুকরো কথাগুলো শুনে বিষয়টা আঁচ করে নেয় সরলা। ফোনে কথা শেষ না করেই জ্ঞান হারায় ফারজানা। সরলা হতভম্ব হয়ে যায়। কী করবে বুঝে উঠতে পারে না সে। মোবাইলটা আবারও বেজে ওঠে। আরিফের ফোন। সরলা রিসিভ করে। আরিফ তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেয় এ মুহূর্তে কী করতে হবে তাকে। রাতের শেষ ফ্লাইটে চট্টগ্রাম থেকে সে রওনা দেবে ঢাকার পথে। ততক্ষণ যেন সরলা ফারজানার সাথেই থাকে। ওকে যেন এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল না করে। সরলা ফারজানার জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে দ্রুত পানি আনে। ফারজানার মাথায় পানি ঢালে। পানি ঢেলে, নাকের কাছে লেবুর ঘ্রাণ দিতেই ফারজানার জ্ঞান ফিরে আসে।
একদিকে সন্তান হারানোর বেদনা অন্যদিকে সত্যের এক নিষ্ঠুরতম উন্মোচন।
শুরু হয় আহাজারি। সন্ধ্যেটা পেরিয়ে এলে ঝুম অন্ধকার নামে ঘরজুড়ে। সরলা বাতি জ্বালিয়ে দেয়। ফারজানার মনে হয় তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। সে উত্তরের বারান্দায় গিয়ে বসে। এদিকটা ছোট ছোট পাহাড়ে ঘেরা। পাহাড়ের নিচে শ্মশান। সেদিকে তাকায় ফারজানা। চারপাশের অন্ধকারের মধ্যেও শ্মশানটিকে বড় উজ্জ্বল দেখায়। শ্মশান জুড়ে বাতির আলো। নীরবে অশ্রু ফেলতে ফেলতে ফারজানার মনে পড়ে সেদিনের কথা। তারা, নিঃসন্তান এক দম্পতি একটি শিশুনিবাস থেকে আনুমানিক দুবছরের পরিচয়হীন শিশুকে এনেছিল। শিশুনিবাস কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুসারে শিশুটিকে পুলিশ একটি ট্রেন স্টেশনে কুড়িয়ে পেয়েছিল। ফারজানা দম্পতি যেদিন শিশুটিকে তাদের কাছে নিয়ে আসে সেদিনটিকেই শিশুটির জন্মদিন ধরে পালন করে। নাম রাখে আবরার। বাইশ বছর পর আরবার আজ আবার হারিয়ে গেল, চিরতরে। এত শোকের মধ্যেও ফারজানার হঠাৎ মনে হয় সরলাকে ডেকে জিজ্ঞেস করবে তার হারিয়ে যাওয়া নিলীনকে কোন স্টেশনে হারিয়ে ফেলেছিল সে। যদি উত্তর মেলে ধীরাশ্রম! তাহলে আজকের আবরার কি সরলার হারিয়ে যাওয়া সেই নিলীন...! কী করবে ফারজানা ভেবে পায় না। যদি তাই হয় তাহলে এ সত্যটা সরলাকে কি বলতে পারবে ফারজানা! ফারজানা সরলাকে আজই সান্ত্বনা দিয়েছে, একদিন ঈশ্বর নিশ্চয়ই তোমার সন্তানকে ফিরিয়ে দেবেন! তবে কি আজ নিয়তি এভাবেই ফিরিয়ে দেবে সন্তানকে সরলার বুকে! না না। কিছুতেই সরলাকে একথা বলতে পারবে না ফারজানা। একদিকে সন্তান হারানোর বেদনা অন্যদিকে সত্যের এক নিষ্ঠুরতম উন্মোচন। এই প্রথম তার জীবনে হঠাৎ এত সব কঠিন মুহূর্ত কড়া নাড়ে। পাহাড়ের অন্য দিকের গাঢ় অন্ধকার উড়ে এসে ছড়িয়ে পড়ে বারান্দাজুড়ে। ফারজানা বেদনা ভাগ করে অন্ধকারের সাথে আর আবৃত্তি করে কবিতার কয়েকটি লাইন, একটা সুযোগ দাও না আমায় ধরে, আমিও তখন দিয়েই যাব শুধু, তোমাকে রাখব আমারই অন্তরে। কে যেন বলে ওঠে পেইন্টিংটা শেষ করতে হবে আর তার নাম হবে নিলীন। অন্ধকারে ফারজানা খোঁজে কিছু। না, কোথাও কিছু নেই। কেবল অপ্রকাশিত গোপন বেদনা। আর কানে ভাসে চাপাস্বরে বিলাপ। মনে হয় বহুদূর অতীতের পথ থেকে ভেসে আসে সেটা। সরলা কাঁদছে...