(আমার সহকর্মীদের...)
এই অসীম নিঃসীম অবরোধদিন-অন্ধকারপথ ধরে আশঙ্কার মেঘের পারে কিছুই দেখতে না পেয়ে পেয়ে আমরা কোথায় যাচ্ছি রে?
এই যে ধু-ধু হাহাকারভরা কংক্রিটজঙ্গলঝাড়; প্রান্তর— উঁকি দিচ্ছে না একটিও ঘাসের দানা, শুধুই অগ্নিদগ্ধ বালিয়াড়ি, এ শঙ্কামেঘপ্রান্তরের কি কোনো সীমা-পরিসীমা নাই?
এই বন্ধ্যাবধিরপ্রান্তর ধরে কোন ভবিতব্যের দিকে আমাদের যাত্রা? এ কি কেবলই এক ঠিকানাবিহীন গন্তব্যের দিকে যাওয়া? ঘর থেকে বের হবার আগে তোর সজল চোখের মণি আমার ভেতর ঠেসে দিয়ে তুই যখন তাকাস আমার দিকে, তখন যদি তোর বিস্ময়ের দৃষ্টি মেলে দিয়ে একবার জিজ্ঞেস করিস আমাকে—‘কখন আসবা?’ — তাহলেই আমি উত্তরহীন বোবা।
অসীম, নিঃসীম এই আঁধারগলিতে একাকী দাঁড়িয়ে, ধু-ধু তৃণহীন ঠিকানাহীন এই পৃথিবীর মাঝখানে নিজেকে স্থাপন করে, যাত্রাপথের শেষটি যে আমার মনে নেই, তাও মনে পড়ে সহসা, আর আমার মাথা নিচু হয়ে যায়—
যাত্রাপথের শেষটি আমার জানা নেই বলেই আমি ব্যস্ত থাকি সারাদিন বোকাবাক্সের স্ক্রিনে, জনচিত্তচাঞ্চল্যকর, জনমনমুগ্ধকর সংবাদের পরিবেশনে—
আমি ব্যস্ত থাকি আমার রুটিরুজির উপায়টিকে ক্রমশ দৃষ্টিনন্দন, শিল্পগ্রাহ্য করে তুলতে আর এর ভেতরই মনে পড়ে, ঘর থেকে বেরিয়ে আসার আগে, এক চূড়ান্ত আত্মদহন আমাকে বাঁধা দিয়েছে তোর দিকে চোখ তুলে তাকাতে...
বাসে আগুন, পেট্রোলবোমার বিস্ফোরণ গণজমায়েতে, অপ্রাপ্তবয়স্কাকে ধর্ষণ, লেখকের ওপর হামলা, প্রকাশক খুন—মানুষ ক্রমশ পশু হয়ে উঠছে রে বউ। ক্রমশ হিংস্র, ক্ষিপ্ত এবং একই সঙ্গে ভীষণ বিষণ্ণ হয়ে উঠছে মানুষ।
গভীর রাতের শেষ ড্রপ ধরে আমি যখন ফিরে যেতে থাকি আমার দুই কামরার ঘরের দিকে, তখন এই হিংস্র, ক্ষিপ্ত, হৃদয়হীন মানুষের মুখ ভিড় করে আসে আমার চারপাশে, সারাদিন সংবাদসূচির রন্ধ্রে রন্ধ্রে যাদের নাম আমি উল্লেখ করেছি— আমার কানের কাছে বাজতে থাকে তাদের উল্লাস। আমার হৃদয়ে এবং মস্তিষ্কে অবিশ্রান্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
আমার ভয় হয়, ভীষণ ভয় হয়—যে হিংস্র এ আঁধার ক্রমশ গ্রাস করে নেবে তোকেও সোনা, আমাদের স্বজনদের যারা আমাকে লিখতে নিষেধ করেছিল, না লিখলে এসব থেকে বেঁচে যাব বলে, তারাও কেউ ধারাল অস্ত্রের আঘাত থেকে বাঁচবে না ।
এই অনন্ত অন্ধকারবিথির ভেতর দিয়ে আমি হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চেষ্টা করি তোকে। আমার জানতে ইচ্ছে করে, তোর অফিস থেকে একা, এই অসীম অন্ধকারের ভিতর দিয়ে একা, অজস্র হিংস্র দানবের ভিড়ের মধ্য দিয়ে পথ চিনে চিনে তুই কি বাসায় ফিরে আসতে পেরেছিস আজ? কোনো বিপদ, কোনো কালো করাঙ্গুল তোকে স্পর্শ করে নি তো!
টেলিভিশনের পর্দায় এক এক করে উঠে আসে কপাল বড় করে তোলা চাঞ্চল্যকর সংবাদ। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আমি চেষ্টা করি উইংস এর আড়াল থেকে সংবাদ পরিবেশনে যেন কোথাও কোনো ত্রুটি না থাকে। ভাষার ব্যবহারে কোনো ভুল না হয়। যেন প্রতিটি সংবাদ মানবিক হৃদয় আছে এমন মানুষদেরকে উৎকর্ণ, উদ্বিগ্ন করে তোলে, আর উদ্বিগ্ন হয়ে তারা কেবল আমারই টেলিভিশন দেখতে থাকে। টিআরপি নামের অদ্ভুত এক অশ্বমেধের ঘোড়ার পেছনে কর্তৃপক্ষের ইশারাপুতুল হয়ে আমি দৌড়াতে থাকি। আর আশঙ্কা, ভয়, তোর জন্য চিন্তা সব ভুলে গিয়ে আমি প্রচণ্ড পেশাদার হয়ে উঠি।
আমার মস্তিষ্কে, আমার হৃদয়ে, আমার শরীরের সমস্ত কোষে, আমার দৃষ্টিতে, আমার শ্রবণে ক্রমশ আচ্ছন্ন হতে থাকে সংবাদের এক-একটি ‘আইটেম’— প্যাকেজ, উভ, সট, ইনভিশন সট, অ্যাজ লাইভ, লাইভ— সংবাদ এসে পৌঁছতে থাকে একের পর এক।
চৌকস প্রতিবেদকদের পাঠানো সংবাদে, কণ্ঠে, অনুভূতির উচ্চাঙ্গ প্রকাশে ভরে ওঠে রানডাউন, মুহূর্তের পর মুহূর্ত। আমি উল্লসিত হই। আমরা ক্রমশ উল্লসিত হতে থাকি, আমাদের উল্লাস ফুটে ওঠে টেলিভিশনের স্ক্রিনে, সেই উল্লাসের ভেতর হাজারো মানুষের শঙ্কাদীর্ণ মুখ দেখা যায়।
অথচ জানিস, রানডাউন সাজাতে সাজাতে আমার মনে পড়ে, আমি কতদিন কোনো প্রতিবাদ করি নি। কতদিন সোচ্চারে চেঁচিয়ে উঠতে পারি নাই আমি—কতদিন, একান্তে, আমি আবিষ্কার করেছি, চেষ্টা করলেও কোনো প্রতিবাদের ভাষা আমার কণ্ঠ দিয়ে ভেসে আসে না আর এখন— কতদিন আমার মুষ্টিবদ্ধ হাত মিছিলের গতি, রোষ দেখে নাই। কতদিন আমার বজ্রমুষ্টি স্পর্শ করে নি প্রতিপক্ষের নাকমুখবুকপেট।
হাজারো মানুষের, বিজ্ঞাপনদাতার, সম্পাদকমণ্ডলীর আদেশ, আবদার শুনতে শুনতে আমি এও আবিষ্কার করেছি, ক্রমশ আমি সরীসৃপে, একটা কুণ্ডলীপাকানো সাপে পরিণত হচ্ছি। মাটি খুঁড়ে খুঁজে নিচ্ছি নিজের জন্য, নিরাপদ একটা গর্ত। ক্রমশ শীতঘুমের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছি আমি। দুপুরে, সন্ধ্যায় এবং রাত্রে, তোর অমন স্পষ্ট চোখের ভেতরে বহুদূর থেকে তাকিয়ে থাকি, তুই কি একবারও বুঝতে পারিস আমার এই শরীরের অভিনব পরিবর্তনখানি!
এও আমি আবিষ্কার করেছি—ক্রমশ খসে পড়ছে আমার অস্থি-মজ্জা। নমনীয় হয়ে উঠছে আমার মেরুদণ্ডখানি। চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখ তুই, তোর চোখেও ধরা পড়বে আশপাশের সব মানুষের শরীরের এই আমূল পরিবর্তন। তুইও বুঝতে পারবি, মানুষ কত নমনীয়, কত শান্ত, কত ভীত, কত একা হয়ে উঠছে ক্রমশ।
মানুষের উচ্চতা ক্রমশই কমে আসছে।
এই নমনীয়, শান্ত মানুষেরাই ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের চারদিকে। তুইও যদি, আমার মতোই বুঝতে পারিস এই পরিবর্তনগুলি, তাহলে দেখবি তোর বুকের কাছেও উঠে আসবে এক জমাটবাঁধা ভয়। যে ভয় কুরে কুরে খাবে তোকেও, রানডাউনে মনোযোগ নিবদ্ধ করে রাখা পলাতক তোকেও।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা, যখন আমি ব্যস্ত ছিলাম দৃষ্টিনন্দন একটি বুলেটিনের রানডাউন তৈরিতে, যখন আমার মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন করছিল লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি শব্দ, ঠিক তখনই, এই শহরে, এই বর্ণময় আলোকছটার ভেতর এক যুবক লাঞ্ছিত হচ্ছিল, ক্রমাগত লাঞ্ছিত হচ্ছিল, একদল অতি আধুনিক যুবকের হাতে, ওই যুবকেরা তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে কোপাচ্ছিল আর আমাদের ফটোসাংবাদিকও ছবি তুলছিল, পাশে দাঁড়িয়ে ছিল পুলিশ, একই সময়ে এই বর্ণময় আলোকছটার ভেতরে ব্যস্ত রাস্তায় এক যুবতী লাঞ্ছিত হচ্ছিল একদল যুবকের দ্বারা, তাদের মুখের ভাষা কার্যত ধর্ষণ করেছিল ওই যুবতীকে।
শহরের আলোর ঠিক সীমান্তেই আরেকটি বাসে পেট্রোল বোমার আগুনে দাউ দাউ পুড়ে যাওয়া মানুষগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছিল আমাদের সমাজ অত্যন্ত সুশীল সভ্য একটি সমাজ!
সেদিন দুপুরবেলা, যখন আমি ব্যস্ত ছিলাম অভূতপূর্ব একটি সংবাদ প্রতিবেদনের জন্য খবর সংগ্রহে, সংস্কৃতিমন্ত্রীর সাথে কথা বলছিলাম অলিয়ঁস ফ্রঁসেজে বসে, আমার মগজে ভাসছিল আসন্ন নিউজরুম সিচুয়েশন, তখন একযোগে এই শহরের দুটি স্থানে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী চার লেখক প্রকাশকের ওপর হামলা করেছে তাদের কুপিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছে বিশ্বাসের ভাইরাসে আক্রান্ত কিছু হাত-পা-মাথাওয়ালা মানুষ নামের মানুষ। তারা একজনকে মেরে ফেলেছে কুপিয়ে, অন্যদের হত্যা করতে না পারলেও পাঠিয়ে দিয়েছে মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ে, হাসপাতালের ধবধবে বিছানায়।
আমাদের রাষ্ট্রের মহীরুহরূপ লেখকদের মতোই সুশীল সমাজের অধিবাসীবৃন্দ আরো সুশীল ও ক্ষমতাসচেতন। তারা হাসেন মেপে, কথাও বলেন মেপে। তারা কখনো ক্রোধান্বিত হন না। সেদিনও তারা ক্রোধান্বিত হন নি— তাদের কারো বোন, কারো স্ত্রী কিংবা কারো প্রেমিকার মতো যুবতীটিকে ক্রমাগত লাঞ্ছিত হতে দেখেও তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন নিজেদের নিরাপদ স্বপ্নের দিকে, ঠাণ্ডা আলো ঘেরা লেখার টেবিলের দিকে, একটি নিখুঁত উচ্চাঙ্গ সঙ্গমের বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে কী প্রচেষ্টা তাদের!
ছেলেটিকে মারতে দেখে তারা না দেখার ভান করে চলে গিয়েছিলেন, যুবতীটিকে মুখের চাবুকে নগ্ন করতে দেখে তারা না শোনার কিংবা ফোনে কথা বলার ভান করছিলেন, লেখক প্রকাশকদের উপর হামলায় তারা দুর্বার গতিতে, এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যেতে থাকা বাংলাদেশের উপর আস্থা রেখেছিলেন।
আমার মতন অনেকগুলো সুশীল সেদিন বাসের জানালা দিয়ে উদাস তাকিয়ে ছিল রাস্তার পাশে মোবাইল ফোন কোম্পানির সুদৃশ্য আকাশ-ছোঁয়া হোর্ডিংটির দিকে, যেখানে চলছিল হালের একজন হার্টথ্রব আইটেমগার্লের নাইটির বিজ্ঞাপনে উপচে ওঠা বুকের প্রদর্শনী।
আমাদের এই হর্ম্যশোভিত নগরটিকে পাহারা দেওয়ার জন্য, তাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য সরকারি রক্ষীর দল রয়েছে, যারা চাষ করে ধান, মুখে যোগায় অন্ন তাদের চেয়ে ঢের ঢের বেশি সরকারি সুবিধা পান তারা। সেদিন সেই সন্ধ্যায় তারাও কেমন অবলীলায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।
খুন খুন খুন। খবর, খবর, খবর। আমার শরীর গিলে খাচ্ছে খবর। শুক্রবার সন্ধ্যায় এই খবরটি বার্তাবিভাগে এসে পৌঁছানোর পর সে কী উন্মাদনা আমাদের আমার শরীর জুড়ে। সে কী তুমুল উল্লাস আমাদের, আমার মস্তিষ্কে। সে কী উত্তেজনা আমাদের, আমার স্নায়ুতে স্নায়ুতে, রক্তে রক্তে। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় এই খবর সাজিয়ে তোলার সে কী মনোমুগ্ধকর পরিকল্পনা আমাদের, আমার।
সংবাদ আসলে পণ্য—এই তত্ত্বে সে তো কবে থেকেই বিশ্বাসী আমি। আমি তো কবে থেকেই আস্থা রেখেছি এই বাজার-অর্থনীতিতে। সেদিনের সেই সংবাদ রাঙতা কাগজে মুড়িয়ে পরিবেশন করার কী আকুলতা আমাদের!
সেদিন রাতে, বাসায় ফিরে যাওয়ার আগে, আমার রক্তাভ চোখের ভেতরে তাকিয়ে, তুই কি সত্যিই একবারও বুঝতে পেরেছিস, আমার দেহেও বিবর্তনের অভূতপূর্ব ছোঁয়া লেগেছে। আমার মুষ্টিবদ্ধ হাতে এখন আর উঠে আসে না প্রতিবাদী মিছিলের আকাশ। যেকোনো অবস্থায় আমি আর আহ্বান করি না প্রতিপক্ষকে। তুই কি একবারও বুঝতে পেরেছিস, আমার হৃদয়ে, আমার মস্তিষ্কে, অনবরত হয়ে যাচ্ছে রক্তক্ষরণ। আমি একটা সুবিধাবাদী সমাজে ক্রমশ তাল মিলিয়ে চলতে শিখে ফেলছি...
বিদগ্ধ পাঠকসমাজ, আমাদের সুশীলদের জন্য একটি নয়নাভিরাম চিত্তমুগ্ধকর বুলেটিন সাজিয়ে রেখে সেদিন রাতে যখন আমি বাসায় ফিরছিলাম তখন আমার সত্যিই ভয় করছিল। ভীষণ ভয় করছিল। আমার শুধু মনে হচ্ছিল ক্রমশ এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে আসা কালো ঘূর্ণির ভেতর, এক অজানা-অচেনা অন্ধকারের সুড়ঙ্গ-ভেতরে তোকে ফেলে রেখে আমি যেমন প্রতিদিন অফিসে চলে আসি, সেভাবেই তোকে রেখে চলে যেতে হবে না তো!
আমার শুধু মনে হচ্ছিল তোকে ঘিরে এগিয়ে আসছে কিছু হিংস্র ক্ষুধার্ত থাবা। তারা ছুঁতে চাইছে তোকে। তারা ছিঁড়েখুঁড়ে দেখতে চাইছে তোকে। আর তখনও আমি ব্যস্ত রয়েছি সংবাদ পরিবেশনে, মঞ্চের মাঝখানে। তোর লাঞ্ছনার ভেতর দিয়েও আমি বোধহয় খুঁজে নিতে চাইছি মনোমুগ্ধকর গালভরা চিত্ততোষানো হেডলাইনটিকে।
অনেক রাতে, বাড়ি ফিরে, আমাদের দশফুট বাই বারোফুট শোবার ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে, তোর বুকের ভেতর থেকে ভেসে থাকা চোখ দুটি আমার মনে পড়েছিল। তোর চোখে দু’কূল ছাপিয়ে ওঠা অশ্রু যেন সেই রাতে, একান্তে, প্রত্যক্ষ করেছিলাম ভেতর থেকে মরতে মরতে থাকা আমি।
তুই কি তাও আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করবি না, কেন এখন আর আমার হাতে উঠে আসে না সেই মুষ্টি। কেন আমি প্রতিপক্ষকে আহ্বান জানাই না আগের মতো? কেন এখন আমার শরীর দুলে ওঠে না ক্রুদ্ধ চিতাবাঘের মতন? কেন এখনো আমি সারাদিন ব্যস্ত থাকি সংবাদের ভেতর? কেন সংবাদের খোলস ছাড়িয়ে একবারও আমি এসে দাঁড়াই না সেই ছেড়ে আসা মিছিলের ঢেউবাতাসের নিচে?
আমি জানি, কতদিন আমি কোনো অসহায় বৃদ্ধকে বাসে বসার জায়গা ছেড়ে দেই নাই, কতদিন আমি কোনো অন্ধ কিশোরীকে হাত ধরে পার করে দেই নাই রাস্তা। কতদিন আমি কোনো শিশুকে কোলে তুলে নিয়ে তার কপালে আঁকি নাই স্নেহচুম্বন। কতদিন আমি দেখি নাই ভোরের আকাশ। যখন ঘুম ভাঙে আমার চোখ বুজে থাকে আঠায়। সমস্ত শরীরে যন্ত্রণা নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠি আমি। আমি বুঝতে পারি, আমার সমস্ত শরীর জুড়ে গোপনে এক রক্তক্ষরণ হয়ে যাচ্ছে শুধু। রক্তে ভেসে যাচ্ছে পুরো শহর...
সভ্যতা পাল্টায়। বোমা মেরে মানুষ গুঁড়িয়ে দেয় হাসপাতাল, স্কুলবাড়ি, জাদুঘর, ঐতিহ্যমণ্ডিত পাঠশালা। আমি দেখেছি, বাসের চাকায় থেঁতলে পড়ে থাকা মৃতদেহ দেখতে মানুষের সে কী ভিড়, সে কী উল্লাস।
এই অন্ধকারের ভেতর দিয়ে তাহলে শেষ পর্যন্ত আমরা কোথায় চলেছি? কোন অনন্তের দিকে আমাদের এই যাত্রা? আমি সত্যিই জানি না, এই অন্ধকার সাঁতরে সাঁতরে তোকে শেষ পর্যন্ত কোন আলো-কণার সন্ধান দিতে পারব। বা আদৌ, কোনো স্নিগ্ধ ভোরের সন্ধান দিতে পারবে কি এই পৃথিবীর কেউ তখন তোকে!
পরস্পরকে ছুঁয়ে সেই অনন্ত যাত্রাপথের শেষে হয়তো সত্যিই অপেক্ষা করে থাকবে একটি ছোট্ট আলোকণা, কিন্তু তার আগ পর্যন্ত কি দুটি উদ্বিগ্ন সরীসৃপের মতো একটি নিরাপদ অন্ধকার গুহায় কম্পমান হৃদয় নিয়ে কান খাঁড়া করে বেঁচে থাকব আমরা?