এ যেন মঞ্চে দাঁড়ানো কোনো কথকের স্বগতোক্তি। ঝড়ের বেগে যেন বলে চলেছেন কথক। কী বলছেন তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে তাঁর বলাটা। মোহাম্মদ রফিকের দু’টি গাথাকাব্য: ‘এ কোন বেহুলা’ ও ‘সে ছিল বেদেনি’ পাঠের পর আমার প্রথম অনুভূতি ছিল এমনই। দেড় শ পৃষ্ঠায় এক মলাটে দুটি কাব্যগ্রন্থ বারবার পড়তে হয়েছে। পড়তে পড়তে খোঁজার চেষ্টা করেছি দুটি কাব্যগ্রন্থের ১২৮টি কবিতার ভরকেন্দ্র ঠিক কোথায়। সেটা কি মনসামঙ্গল কাব্যে? কবিতার নতুন ভাষা নির্মাণের এক ইশতেহারই কি হাজির করলেন কীর্তিনাশার কবি? নাকি এই কাব্যগ্রন্থ এর চেয়ে বেশি কিছু?
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আমরা বরং প্রবেশ করি রফিকের সৃষ্টির জগতে। ‘এ কোন বেহুলা’ দিয়েই শুরু হোক অভিযান। সাপে কাটার পর লখিন্দরকে ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল গাঙুরের জলে। তবে সে ভেলায় বেহুলাও চড়ে বসে। মৃত লখিন্দরকে নিয়ে দেবপুরীর উদ্দেশ্যে ভেসে যেতে থাকে সে। বেহুলার সঙ্গে আমরাও যদি সে ভেলায় চাপি, তবে দেখব সেখানে শায়িত লোকটি চম্পকনগরের চাঁদ সওদাগরের কনিষ্ঠ পুত্র নয়, সে একালের, এ সমাজেরই প্রতিনিধি। যে নিজের দীর্ঘকালের অভিজ্ঞান মাটি চাপা দিয়ে ফিরে যেতে চায় নরম ভেজা মাটির কাছে।
আমাদের মনে পড়ে মেহিকোর শিল্পী দিয়াগো রিভেয়ারার ম্যুরালের কথা, যেখানে তিনি কেন্দ্রে রেখেছিলেন আজটেক অতীতকে।
এই চাওয়া তো নতুন কিছু নয়। জসীম উদ্দীন সেটা করেও দেখিয়েছেন। আধুনিক মানুষের সমস্ত জটিলতার অবসান ঘটিয়ে নিজের সৃষ্টিকে স্বতন্ত্র এক ভূমিতে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু মোহাম্মদ রফিকের ক্ষেত্রে সেটা ঘটে নি। নিজের মুখের বুলি, ইতিহাস ও রাজনীতিচেতনা সব সমেতই তিনি নিজেকে বেহুলার ভাসানে উপস্থিত করেন। আর ঘোষণা করেন তিনিই লখিন্দর।
আমাদের মনে পড়ে মেহিকোর শিল্পী দিয়াগো রিভেয়ারার ম্যুরালের কথা, যেখানে তিনি কেন্দ্রে রেখেছিলেন আজটেক অতীতকে। কিন্তু একই সঙ্গে শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে তাঁর রাজনৈতিক ইশতেহারও রেখেছিলেন পাশাপাশি। রিভেয়ারার ‘ম্যান এট দা ক্রস রোড’ ম্যুরালের কেন্দ্রে এমন এক শক্তিমান পুরুষের দেখা মেলে যে অতীতের উত্তরাধিকার ধারণ করেও ভবিষ্যতের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার এই জটিল চিত্রায়ণ বিষ্ণু দের কবিতায়ও এসেছে। সাত ভাই চম্পা কবিতায় তিনি লেখেন, ‘চম্পা! তোমার মায়ার অন্ত নেই,/ কত না পারুলরাঙানো রাজকুমার/ কত সমুদ্র কত নদী হয় পার!/ বিরাট বাংলাদেশের কত না ছেলে/ অবহেলে সকল যন্ত্রণাই—/ চম্পা কখন জাগবে নয়ন মেলে।’
স্থানিকতা আর আন্তর্জাতিকতার এই মেলবন্ধন নিকোলাস গিয়েন, পাবলো নেরুদাসহ লাতিন আমেরিকার কবিদের প্রধান চরিত্র-লক্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাঁরা হয়ে উঠেছিলেন একই সঙ্গে আঞ্চলিক, আবার বিশ্ব-নাগরিকও। কিন্তু এই বইতে রফিককে কি ঠিক সেভাবেই পাওয়া যায়? বইয়ের ৯৫ পৃষ্ঠায় ‘যদি বাঁচতে চাও’ শিরোনামে কবিতাটি এমন—
পালাও, পালাও, অতি দ্রুত ময়মনসিংহ গীতিকার পথ ধরে, এখনই বেরিয়ে পড়ো যদি বাঁচতে চাও, শ্বাস নিতে ধেয়ে আসে বিগত শতাব্দী লালাসিক্ত বধির হুংকার লোভ-লালসার রক্ত-ফাঁদ কিমাকার অস্থির সময় প্রতারক নান্দনিক অভিযান অবক্ষয়, নির্বেদ, বিচ্ছেদ, জন-সংহতির অভিশপ্ত বোধ ধার করা হা-হুতাশ, চিন্তন-চেতনা বয়ে নিয়ে চলো দায়ভার নবনির্মাণের, প্রেমাতুর, কালের মন্দিরে ঘণ্টা বাজে, অঙ্গীকার, মানুষ উন্মুখ,...
এ যে অনেকটা প্রমিত ভাষায় লেখা কোনো প্রবন্ধে, স্থানিক ভাষা-ভঙ্গিতে লেখালেখির ঘোষণা দেওয়ার মতো!
তবে কি রফিক রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু এঁদের কাব্যভাষা বাতিল ঘোষণা করছেন? কবিতার নবতর নির্মাণের আহ্বানও জানাচ্ছেন! কিন্তু তাঁর কবিতায় নতুন ও ভিন্নতর কোনো ভাষার ইশারা পাঠক পায় না। উদ্ধৃত কবিতাটিতে নতুন ভাবনা থাকলেও ময়মনসিংহ গীতিকার পথে হাঁটার লক্ষণ নেই। বরং পড়তে পড়তে বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত তিনটার সনেট'-এর কথা মনে পড়ে।
বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, ‘এ নয় তোমার জন্য। ফুল, ফল, ঋতু বারো মাস/ ঘুরে ঘুরে শিখে নাও। ঠিকানা রেখ না আর/ কোনোখানে;—বাষ্পলীন, ধবল, সরল ডিসেম্বরে...’
প্রকাশন : কথা ।। প্রচ্ছদ : ঢালী আল মামুন
বলা যায় এই স্ববিরোধ ও দ্বন্দ্ব আধুনিক কবিতারই লক্ষণ। অর্থাৎ মোদ্দা কথা, রফিক কখনোই ময়মনসিংহ গীতিকা বা মনসামঙ্গলের পথে হাঁটবেন না। কেবল এর স্রোতোধারায় ভাসতে ভাসতে নিজের প্রেম, কামনা ও আকাঙ্ক্ষার কথাই শুনিয়ে যাবেন।
সেই অর্থে ‘এ কোন বেহুলা’ কাব্যের কোনো পরম্পরা নেই। অভিজ্ঞতার বিবরণ নেই, নেই ধারাবাহিকতা। সকাল, বিকেল, সন্ধ্যা নেই। সব কাল ও সময় মিলেমিশে একাকার। কেবল এক অচরিতার্থ আকাঙ্ক্ষার কথাই আছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যে রসায়নে জারিত হয়ে স্ফটিক-স্বচ্ছতা নিয়ে পাঠকের কাছে ধরা দেয়, তাও এখানে দেখতে পায় না পাঠক। তার বদলে আছে এক কৌম বাস্তবতা। যেখানে আমির মাঝেই বহুল স্বরের ধ্বনি শোনা যায়।
‘বেহুলা’ কবিতাটি পড়া যাক—
আমি তবে লখিন্দর তোমারে অমর করে যাব, ভাসতে দাও ঢেউয়ে-ঢেউয়ে নিম্নগামী স্রোতে গলিত মাংসের পিণ্ড ঝরে পড়বে জলে, আনন্দে মাতাল হবে মৎস্য-পরিবার, কামনা দংশিছে যারে কাকে-বা সে দোষারোপ করে, বজ্রবিদ্যুতের শিখা বিদ্ধ করে শস্যের ভাণ্ডার নয় সর্প দুর্ভাগ্যের কালচক্র নয়; ফিরে চলো, কাজ নেই দেবতাকে তুষ্ট করে, স্বর্গ বড়ো পরিহাস-পরায়ণ, তোমার নৃত্যের মুদ্রা আলোকিত করুক ব্রহ্মাণ্ড, বেদনার্ত পিচ্ছিল দেহের ভাঁজে-ভাঁজে কলকণ্ঠ প্রকৃতির পাখ-পাখালির কলতান দু-ঠোঁটের ফাঁকে বসে থাক নক্ষত্রের মেলা মুক্তি পাক মানুষের দমিত বাসনা ঘাটে-মাঠে উচ্চারিত আকাঙ্ক্ষার নাদ...
কপিলা কাব্যগ্রন্থে যেমন কপিলা, এখানেও বেহুলাকে আমরা এই কাব্যের কেন্দ্রে স্থাপিত দেখতে পাই। এমনকি কপিলার স্বরও শোনা যায় একটি কবিতায়। ‘কচুরিপানার ফুল’ কবিতার শেষ দুই লাইন এমন—‘আমারে নেবে না মাঝি সাগর অবধি,/ পাটাতন ভিজে ওঠে জলে!’
সেই আত্মজ্ঞান লাভের পর কবি বুঝতে পারেন লখিন্দরকে যে সাপে কেটেছে তার জন্ম তারই শরীরে।
‘সে ছিল বেদেনি’ কাব্যেও ঘুরে ফিরে সেই প্রণয়াকাঙ্ক্ষাই প্রধান হয়ে উঠেছে। কবি লখিন্দর কিংবা নদ্যার ভেতরে নিজের পুনর্জন্ম চেয়েছেন। চেয়েছেন আবার নতুন করে বাঁচতে। জরাগ্রস্ত শরীর থেকে বেরিয়ে কেবলই সহজ ও দেহজ প্রেমের নদীতে সাঁতরাতে চেয়েছেন। যৌনতা কেবল সম্ভোগ বা কামজ আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নি। বরং সরল জীবনের বীজমন্ত্র হয়েও এসেছে। ‘দূর’ কবিতায় রফিক লেখেন—
তুমি তবে কবির হৃদয় হেসে ওঠো আকাশে-পাতালে, দু-পায়ের ফাঁক জুড়ে গজিয়ে উঠছে ঘাস।
সুতরাং যৌনতার চেয়েও এটা বেশি কিছু। বরং যৌনতাকে জীবনের নতুন সঞ্জীবনী যেন ভাবা হচ্ছে। ‘শুধুই তোমার জন্য’ কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি এমন—
আমি তো পুরুষ নই, ক্লীব, পুরুষত্বহীন, আমাকে করেছে রোদ, ফাটা খেত অঙ্গহীন, বিদেশি শাসন, তাই কাউকে জাগাতে পারি না, না, নিজেও জাগি না কখনো...
কবি এভাবে বেহুলার স্পর্শে জাগতে চান। জাগাতেও চান অন্য সবাইকে। পেতে চান বেহুলার মাংসের আত্মজ্ঞান। এ যেন বুদ্ধের বোধিলাভের মতোই পরম কাঙ্ক্ষিত। সেই আত্মজ্ঞান লাভের পর কবি বুঝতে পারেন লখিন্দরকে যে সাপে কেটেছে তার জন্ম তারই শরীরে। উতলা কবি বলেন—
পুরুষাঙ্গ মাথা তোলে সাপ ছোবল মারবেই অবশেষে ঢেলে দেয় বিষ সাদা-সাদা উষ্ণ ও পিচ্ছিল...
কথা শেষ, পুষ্ঠা ৫৬
প্রশ্ন তোলা হয়েছিল রফিক এই কাব্যগ্রন্থে নতুন কোনো ইশতেহার কি ঘোষণা করেন? নাকি এ কেবলই মনসামঙ্গল কাব্যের আড়াল থেকে নিজের প্রণয়াবেগের কথা জানিয়ে যাওয়া। মুশকিল হলো এর কোনোটাই পাঠকের কাছে একমাত্র বিষয় হয়ে আসে না। বরং গোটা কাব্যগ্রন্থ জুড়ে একটাই আকুতি ধ্বনিত হয়েছে। বেহুলা বা মহুয়া হয়ে কেউ আসুক নতুন করে। আর সেই আগমন হবে প্রচণ্ড-উন্মাতাল। মনে হয় এমনকি চরাচর ও প্রকৃতিও এই আবেগে মথিত হচ্ছে সর্বদাই। আর এখানেই রফিকের কবিত্বের জয়। পাঠক বিহ্বল হয়ে পড়তে থাকে—
রাত কত, ঘণ্টা বাজল দূরে। তোমার নিশ্বাস শব্দ শুনি দেখি, দু-স্তনের ওঠা-নামা পাশ ফিরলে বুকের পাঁজরে মুড়মুড় ঊরুর দিকের বেনারসি আলগা হয়ে আছে, ডেকে উঠল দুটি ব্যাঙ ঘরের কোনায় ওরাও মেতেছে তবে বিপন্ন সম্ভোগে...