ধাতুসুধায় লালনপাঠ

ঋষিমতে শব্দ পরাশক্তি বিশেষ। মানবিক বিভিন্ন চেতনা বর্ণকে আশ্রয় করে শব্দে রূপান্তরিত হয়। তাই শব্দ ও চেতনা একে অপরের পরিপূরক। কারও শব্দসংস্কৃতি থেকে তার চেতনা পরিমাপ করা যেতে পারে। শব্দ সংস্কৃত হয় তার অখণ্ড রূপ থেকে; আবার এই অখণ্ডতা বা সম্পূর্ণতা নির্মিত হয় মূলানুগ হলে। গোটা ভাব বা বস্তুকে যা দিয়ে ধরে রাখা যায় সেটাই তার মূল বা ধাতু। দেহ নানাপ্রকার প্রাণরস ধারণ করে টিকে থাকে, সেগুলোই দেহের ধাতু। ঠিক তেমনই শব্দ একটি ভাব বা চেতনার কাঠামো যা ধাতুকে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে। শব্দের গোটা ছবি দেখতে হলে ধাতুবিচার খুবই জরুরি। ধাতু বা মূলের বাইরে থেকে শব্দকে দেখা অনেকটা কুয়াশার ভেতর কিছু অস্পষ্ট দেখার মতো। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে শব্দার্থবোধ অনমনীয়, ভঙ্গুর, সঙ্কীর্ণ, অবৈজ্ঞানিক ও অসম্পূর্ণ হতে বাধ্য। যেমন দেহ ও শরীর—এই দুটো শব্দ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। আমরা প্রায়শ দেহকে শরীর আবার শরীরকে দেহের সঙ্গে সমার্থক করে একাকার করে ফেলি। স্থূল বা প্রতীকী অর্থে তা সঠিক বটে। তবে মূল বা ধাতুবিচারে দেহ কিন্তু শরীর নয়, শরীরও দেহ নয়। দেহ শব্দকাঠামোর ভেতরে দিহ্ ধাতু উপস্থিত। এর অর্থ বৃদ্ধি, প্রসারণ; জীবসত্তা ভ্রূণাবস্থা থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় ততক্ষণ সেটা দেহ নামধারী। জৈবিক নিয়মে এই বাড়ন্তভাব আবার উল্টোদিকে ধায় অর্থাৎ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে; কায়াসত্তার এই ক্ষয়ে-যাওয়া-দশার নাম শরীর। শৃ বা শর ধাতুযোগে শরীর শব্দটি সাধিত। এর অর্থ হিংসা, বধ, পীড়ন। দেহের সীমানা পেরিয়ে জীবসত্তা শরীরের চৌহদ্দিতে ঢুকলে শর দ্বারা আক্রান্ত হয়। শরের একটি অর্থ তির। তিরের কাজ বিদ্ধ করা। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, হতাশা, অবসাদ, ক্লান্তি ইত্যাদির নাম মানসিক শর। উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র, কর্কট (ক্যান্সার), বাত প্রভৃতি হলো কায়িক শর। অসংখ্য নমুনা থেকে মাত্র দুটো নমুনার ধাতুবিচার করে দেখা গেল শব্দ নিছক শব্দ নয়, এর পরিধি অনেক বিস্তৃত ও তলগামী।

লালন সাঁইজির পদাবলি বাংলা তথা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে একটি বিরাট সম্পদ। তাঁর পদ বিভিন্ন সাধক ও সারস্বত সমাজ মূল্যায়ন করেছেন। আমি তাঁর পদগুলো ধাতুবিচারে দর্শন করার সযত্ন প্রয়াস অব্যাহত রেখেছি। 'ইটিমোলজি' (শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণায়ক শাস্ত্র) আমার একটি সর্বাত্মক অনুসন্ধানের বিষয়। দীর্ঘ প্রায় দু-দশক এই সন্ধানক্ষেত্রে চষে বেড়াচ্ছি। এতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ভাষার শব্দের আন্তরিক ঐশ্বর্য আমার চোখে পড়ছে। দশকজোড়ের অভিজ্ঞতায় এই বিশ্বাস জন্মেছে মূলবিচারে শব্দের স্বরূপ যেভাবে উন্মোচিত হয় অন্য কোনো উপায়ে তার রূপ সেভাবে ফোটে না। এ প্রসঙ্গে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করা যেতে পারে। শাস্ত্রালোচনায় অনেক সময় তিনি তাঁর ভক্তদেরকে বিশেষ বিশেষ শব্দের তাৎপর্য বোঝাতেন মূল বা ধাতুবিচার করে। মরমি সাধক লালন ফকিরের পদও মরমি যা মর্ম (ধাতু) থেকে অনুভব করতে হয়। লোকপ্রিয় কথা লোকজ সুরে পরিবেশিত হয় বলে সাধারণ লোক স্রেফ কথা ও সুরের চটকে মুগ্ধ হন। ভেতরের বার্তা তাদের কাছে হয় ভাসাভাসা থাকে নতুবা একেবারেই বোধগম্য হয় না। তাই এই পদ অনেক সময় সম্পদ না হয়ে বিপদ তৈরি করে। এই সম্পন্নপদকে কৌতূহলী পাঠকের দরবারে পদস্থ করতে আমি ধাতুসুধার আশ্রয় নিয়েছি যা 'ধাতুসুধায় লালনপাঠ' শিরোনামে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। এতে তাঁর পদাবলির প্রত্যেকটি চরণ ও পারিভাষিক শব্দাবলি মূল থেকে অর্থাৎ ধাতুবিচারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। 

তিন পাগলে হলো মেলা নদেয় এসে
তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে॥

একটা পাগলামি করে জাত দেয় সে অজাতেরে দৌড়ে গিয়ে
আবার হরি বলে পড়ছে লুটে ধুলোর মাঝে॥

একটা নারকেলের মালা তাতে জল তোলাফেলা করঙ্গ সে
পাগলের সাথে যাবি পাগল হবি বুঝবি শেষে॥

পাগলের নামটি এমন বলিতে অধীন লালন হয় তরাসে
ও সে চৈতে নিতে অদ্বয় পাগল নাম ধরে যে॥

‘তিন পাগলে হলো মেলা নদেয় এসে
তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে॥

উল্লিখিত শব্দমালার 'তিন পাগল' ও 'নদে’ শব্দজোড়ের রহস্য উদ্ঘাটন হলে এর ভেতরের অর্থ আমাদের বোধগম্য হবে। 'নদে’: এটিকে অনেকেই একটি স্থাননাম হিসেবে অনুবাদ করে থাকে। মধ্যযুগে শ্রীচৈতন্যসহ তিন আত্মতত্ত্ববিদের নদীয়া ভূখণ্ডে যে মিলনমেলা রচিত হয়েছিল তাকে কেউ কেউ ‘তিন পাগলে হলো মেলা নদেয় এসে’ বলে অভিহিত করে থাকেন। এই অভিমত মেনে নিলে সাঁইজির পদনিহিত বার্তা একটি বিশেষ স্থান-কাল-পাত্রে আবদ্ধ হয়ে যায়। একজন কালোত্তীর্ণ পুরুষের বাণী কখনও সীমিত স্থানকালে বন্দি হতে পারে না। তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী সনাতন ও শাশ্বত হওয়াই স্বাভাবিক। এই পদাবলির অন্তিমে সাঁইজি তিন পাগলের নামগুলি সুস্পষ্ট ঘোষণা করে তাদের সর্বজনীন স্বরূপ নিশ্চিত করেছেন। সুতরাং এই নদ যে ভৌগোলিক নদীয়া নয় তা সুনিশ্চিত। এখানে প্রবাহ অর্থে ‘নদ’কে বোঝানো হয়েছে। মানবদেহে ঈড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না নাড়ির ধারা প্রবাহিত। তাদের সম্মিলিত ধারা মিলেছে কুলকুণ্ডুুলিনীতে—এটাকে সাঁইজি ‘তিন পাগলে হলো মেলা নদেয় এসে’ বলে বর্ণনা করেছেন। ‘তোরা কেউ যাসনে ও পাগলের কাছে’—এটি হলো একধরনের প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি। ঈড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না নাড়িত্রয়ের সাধন অসম্পূর্ণ থাকলে দেহ সংস্কার হয় না, বিকারগ্রস্ত থাকে। এই বিকৃত মানসিকতায় পরমপ্রেমে আত্মহারা পাগলের কাছে ভেড়াটা ঠিক নয়।

একটা পাগলামি করে
জাত দেয় সে অজাতেরে দৌড়ে গিয়ে।

পাগলের ‘আমি’ (Self)-র মধ্যে যে ভাব তার নাম পাগলামি। লালনঘোষিত পাগলত্রয়—চৈতে, নিতেই, অদ্বয়—এটা মূলত উপনিষদের সৎ-চিৎ-আনন্দ বা সচ্চিদানন্দ সত্তা। চিৎস্বরূপ সত্তা চৈতে, নিতাই হলো নিত্যানন্দ এবং অভেদ দ্বৈততাহীন ব্রহ্ম সত্তাই হলো সাঁইজি নির্দেশিত অদ্বয়। আবার সাঁইজির এই তিন পাগল রামকৃষ্ণের ভাবসঙ্গীতে মূর্ত হয়েছে এভাবে—

বামে অদ্বৈত আর দক্ষিণে নিতাই
তার মাঝে নাচে আমার চৈতন্য গোঁসাই।

উক্ত ভাষ্যের আলোকে এটা সুনির্ণীত যে ‘চৈতে-নিতে-অদ্বয়’ এই ত্রয়ীসত্তা একে অপরের পরিপূরক। নিত্য চেতনায় একাকার হলে মানুষের উত্তরণ অর্থাৎ দ্বিতীয় জন্ম বা দ্বিজপ্রাপ্তি ঘটে। এটাকে সাঁইজি ‘জাত দেয় সে অজাতেরে’ বলে পদায়ন করেছেন।

আবার হরি বলে
পড়ছে লুটে ধুলোর মাঝে।

চৈতে, নিতে, অদ্বয়-এর যে কোনো একটি আহরিত হলে মানুষ হরিদশায় পৌঁছে যায়। তখন নমঃ নমঃ ভঙ্গি তার নিত্যসঙ্গী। নিজেকে মনে হয় মহাপ্রভুর একান্ত দাস। নিবেদন তার অস্থিমজ্জায়।

একটা নারকেলের মালা
তাতে জল তোলাফেলা করঙ্গ সে।

নারকেলের মালাই হলো করঙ্গ। এটি সাঁইজির একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দভেদ। মাথার খুলি, শরীরাস্থি, দেহ ইত্যাদি অর্থে শব্দটির প্রচলন আছে। করঙ্গ ও কমণ্ডলু সমার্থক। সন্ন্যাসী বা ব্রহ্মচারীর ব্যবহৃত কাঠ বা মাটি দিয়ে তৈরি জলপাত্রকে কমণ্ডলু বলে। তাহলে দেখা যাচ্ছে নারকেলের মালা—করঙ্গ—কমণ্ডলু একই দ্রব্যসামগ্রী। কমণ্ডলুর মধ্যে যে মুণ্ড্ আছে তার ধাতুগত অর্থ হলো হর্ষ বা আমোদ। ‘নারকেলের মালাতে জল তোলাফেলার’ আগমিক অর্থ সাধক দেহের বীররসের প্রবাহ শক্তি কুলকুণ্ডলিনীর মাধ্যমে জাগিয়ে তুলে মুণ্ডু অর্থাৎ মস্তিষ্কও সহস্রারে চালনা করে প্রসাদ লাভ করতে পারে। অন্যদিকে রসের স্খলনে অবসাদগ্রস্ত হতে পারে। তবে এ সাধনকর্মের ভেদ বুঝতে হলে চৈতে-নিতে-অদ্বয় পাগলের সঙ্গী হতে হবে। অন্যকথায় সচ্চিদানন্দ বিহার জরুরি। যাকে সাধক লালন ‘পাগলের সঙ্গে যাবি/পাগল হবি বুঝবি শেষে’ অভিধায় ভূষিত করেছেন। 

পাগলের নামটি এমন
বলিতে অধীন লালন হয় তরাসে।

ভণিতায় যথারীতি খাস লালন আমদরবারে আত্মতত্ত্বের খবর দিতে ভয় পাচ্ছে। এই ভীত হবার কারণটি পূর্বেই আলোচিত হয়েছে।


সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি :
১. বঙ্গীয় শব্দকোষ, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্য অকাদেমি
২. A Sanskrit English Dictionary : M.Monier. Williams 
৩. Online Etymological Dictionary
৪. Wikitionary
তারিফ হোসেন

তারিফ হোসেন

জন্ম ১৪ অক্টোবর ১৯৬৬; কুষ্টিয়া। এম.কম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা :...বিস্তারিত