সনেটগুচ্ছ : এক গুপ্ত ঘাতকের ছুরি

মুখোমুখি বসি চলো

কী এমন অপরাধ—খুঁটিনাটি ভুলের মহিমা
সহসাই সচকিত—যে-রকম কপালের টিপ  
দুচোখের সীমানায় ধরে আনে দূরের প্রদীপ 
মুখরিত বিকেলের এই সুখ—স্মৃতি-মধুরিমা

মুছে দেয় পৃথিবীর পরিচিত গলিপথ—আর
ধুলোর অদৃশ্য দ্যুতি চুপচাপ ধরে রাখে নাক
মাঝরাতে মনে হয়—শহরের বুক-ভরা ট্রাক
দানবের প্রতিনিধি—তবু এই ব্যথিত ভাগাড়

ব্যবহৃত গেলাসের গতিবিধি—পরিণত ঠোঁট 
নাগরিক আরামের আদি-অন্ত পরম যতনে
স্মৃতিচিহ্ন এঁকেছিল—প্রথাগত প্রকৃতির মনে
এসব কিছুই নয়—বুকে খুব লেগেছিল চোট 

কিছু কিছু অপরাধ দুইভাগে ভাগ হতে পারে 
মুখোমুখি বসা যাক ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে

 

স্তব্ধতা—কথার সাঁতার

তোমার কথাই আমি বালিশের কানে কানে বলি 
চোখের তরলে তার অনুবাদ—কাক-ভেজা বাণী 
সুখপাঠ্য নয় মোটে—আঙুলের অগ্রভাগে পানি 
টুপ করে ঝরে যায়—ফুলের শৈশব—কিছু কলি 

ব্যর্থ  হলে বোঝা যায়—জীবনের তীর্থ কত দূরে
মাটির বুকের কাছে শিশু-বৃক্ষ গুঁজে রাখে ঘাড় 
টেলিফোন মরে যায়—স্তব্ধতা কি কথার সাঁতার  
কার জলে ডুবিয়েছ—মরা নদী—নিহত পুকুরে 

মাছে ভাতে ভাঁড়ামির ভুলপাঠ—প্রাচীন কাহিনি 
গ্রামের উঠোন থেকে উড়ে গেলে যৌথ-পরিবার 
ভাঙনের শব্দ শুনি—আমি সেই ‘হার-মানা হার’ 
পরানোর কেউ নই—হারানোর কিছুটা তো চিনি

দুজনের দুটি পথ—আঁকাবাঁকা—রেলের উপমা
আঙুলের অনুবাদ—প্রিয় কোল-বালিশের ক্ষমা

 

তবুও অসভ্য চাবি

আমার ভালোই লাগে এইসব ভাঙাচোরা গান 
বাণীর বিচিত্র বাঁক খুঁজে নিয়ে শিমুলের তুলো
কানের স্বীকৃতি চায়—মুছে দেয় চশমার ধুলো
পরিমিতিবোধ ভুলে খুলে দেই দ্বিধার দোকান 

ঘুমের অরণ্য চেনে পাখির পৃথিবী—তবু তালা 
শাসনের ভান করে—অথবা তা নেশার নহর 
বটের ছায়ায় বসি—ফেসবুকে দেখেছি শহর  
বুকের চরেই দেখি কাশফুল—এই নদী-নালা 

যদিও স্মৃতির কাছে ফিরে যায়—খলবলে মাছ 
আঁচলের অভিমান মুছে দেয়া বালিকার গাল 
হয়তো স্বপ্নের মতো গীতিময়—টসটসে লাল 
পলাশের প্রতিবেশী—তবু কার নতুন জাহাজ 

ঘাটের গল্পের মতো মাঝরাতে নড়েচড়ে ওঠে 
এখন অসভ্য চাবি বিষ ঢালে পাখিদের ঠোঁটে

 

মধ্যবিত্ত বাতাসের টান  

কেন তুমি ফিরে যাও প্রিয় সিঁড়ি—পরিচিত ছাদে 
ওখানেই ঝুলে আছে স্যাঁতস্যাঁতে চোখের রুমাল 
বাতাসের বাহাদুরি বড়ো গাছে—ঊর্ধ্বগামী ডাল 
শাড়ির সাহস দেখে—বেহুলা নদীর মতো কাঁদে

আরো কিছু পোশাকের পিতৃভূমি—মগ্ন হাহাকার 
তোমার কি মনে পড়ে—কতদিন—এতদিন পরে 
বেহায়া বৃষ্টির গান—লিখে রাখো বুকের ভেতরে 
বোশেখের আঙুল কি মন্ত্র জানে—নিষেধের দ্বার 

ভেঙে দিয়ে চলে যায়—তারপর শুধু খোলা মাঠ 
সরিষার ক্ষেত থেকে উড়ে আসে হলুদ-আরাম 
ছাদের বাতাসে দেখি নাকের—নাভির কিছু ঘাম 
খুঁজে নেয় সোহাগের পীঠস্থান—যৌতুকের খাট 

নড়ে ওঠে—তাহলে কি মধ্যবিত্ত বাতাসের টানে  
বেসামাল বালিকারা সুখ খোঁজে ছাদের বাগানে

 

গুপ্ত এক ঘাতকের ছুরি

তুমি অতি সহজেই বুক আর পিঠের ফারাক 
মুছে দাও—নিমেষেই গুপ্ত এক ঘাতকের ছুরি 
বুক-পিঠ ভেদ করে বাজাও মৃদঙ্গ-তালে তুড়ি 
ক্ষতি নেই—বেকুবেরা ভুল করে সর্বস্ব হারাক 

লোকজন অকারণ দুই হাতে মেখে নিয়ে বিষ 
আনমনে চেটে চলে—ধীরে ধীরে শরীর অবশ 
তোমার ভেতরে আছে মনসার মায়াবী কলস 
মন্ত্র ভোলা সাপুড়ের ব্যর্থ বীণ বাজে অহর্নিশ 

ফুলের কাছে তো যাও—মুখে নেই মধুর সুনাম 
ঘ্রাণের আবেশ নেই—অবসৃত ঠোঁটের কিনার
চুম্বনের অভিজ্ঞতা শিখিয়েছে দাঁতের কী ধার 
কাঁটার অরণ্য তুমি—তবু আমি ফুলের গুদাম 

ভাবি আর দেহ-মনে বেশুমার আঘাতের দাগ 
ছুঁয়ে যাই—নিশিদিন পাঠ করি তালাক তালাক 

 

মূর্তিমন্ত—হিরন্ময় মিথ

কীভাবে জাগাও তুমি মিনার মন্দির ও চৌকাঠ 
তোমাকেই পেতে চায় শিশু বৃদ্ধ যুবকের দল 
তোমার দখল চায় রাজপথ—মিছিল কোন্দল 
তুমি হলে জমে ওঠে ক্রিকেট ও ফুটবল মাঠ 

সভা আর সেমিনার—শ্রেণিপাঠ শুধু তুমিময় 
অফিস আড্ডায় তুমি মূর্তিমন্ত—হিরন্ময় মিথ 
মদের আসরে যত গালাগাল—উদ্ধত সঙ্গীত  
তোমার জলেই দেখি নাবিকের সমুদ্র-বিজয় 

তোমার টিপের রঙে কবি আর গল্প-কারিগর 
সিনেমার মালিক বা চিত্রকর—বই-প্রকাশক 
জাদুর কাঠির কাছে অনুগত শোষিত-শাসক 
তোমার উঠোনে আজ শুনি সমবেত কণ্ঠস্বর 

জীবনের মূলমন্ত্র—যৌবনের বিশুদ্ধ গেলাসে 
আমিও দিয়েছি ডুব—ভুলভাল বসন্ত বাতাসে

 

অনুবাদ সুখপাঠ্য নয়

শব্দের অতীতে এই কথামালা—নড়েচড়ে ওঠে
চোখে ঠোঁটে—গল্প আর কবিতায় তার অনুবাদ 
কখনো কি হতে পারে—ব্যবধান দিন আর রাত 
তুমিও কি পারো তা বলে দিতে—শব্দের দাপটে 

সবাই কি কুপোকাত—কিছু থাকে শব্দহীনতায় 
ধরার ধৃষ্টতা শুধু—দেখানো যায় না—তাতে খুব 
লাভের ইশারা নেই—মনে মনে দিতে হবে ডুব 
সাঁতার বিমুখ—তাই স্নানে ব্যর্থ—ভুল হয়ে যায়

কোথায় কথার ঘর—কথাশিল্পী শব্দ নিয়ে বাঁচে 
কবির দরোজা ঠেলে শব্দাবলি—বাজায় তবলা 
শব্দের অভাবে যত স্বপ্ন প্রেম অনাথ—অবলা 
জল তো জীবন—এই প্রবাদের ভাষা বোঝে মাছে

ঠোঁট ছুঁয়ে জেনে গেছি—অনুবাদ সুখপাঠ্য নয়
নীরবতা হিরন্ময়—চোখে চোখ—ভালোবাসাময় 

তারেক রেজা

তারেক রেজা

জন্ম ৯ নভেম্বর ১৯৭৮, গঙ্গারামপুর, হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ। বাংলায় স্নাতক...বিস্তারিত