বাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার গল্প

কম কথায় অনেক কথার ইঙ্গিত। অনেক ঘটনার আবছায়া নিয়ে আসা সামান্য কাহিনিতে। এমন যদি হয় ছোটগল্পের ধর্ম তবে সার্থক গল্পকার হিসেবেই স্বীকৃত হবেন কায়সার আহমদ। বলতেই হবে, গল্পবয়ানে তিনি নিরীক্ষার দিকেও নজর রেখেছেন। যার কারণে এক গল্পের ভেতর থেকে আরেক গল্প পাঠককেই ভেবে নিতে হয়। এই চিন্তার বীজ পাঠকের মাথায় বপন করতে পারাই প্রকৃত লেখকের মুনশিয়ানা। কায়সারের প্রথম গল্পগ্রন্থ শোধ ও অন্যান্য গল্প পাঠ করে এসব হতে পারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। বইখানি প্রকাশিত হয়েছে ২০২২ অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। যেখানে আশ্রয় পেয়েছে বইয়ের শিরোনাম গল্পসহ মোট দশটি গল্প। এদের নাম তুলে দিলে বইটির ধরন সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু ধারণা পাওয়া যাবে আশা রাখি। নামগুলো হচ্ছে : তন্দ্রা, শোধ, ষড়যন্ত্র, নিয়তিনির্ধারিত একটি মৃত্যুর গল্প, ব্ল্যাকমেইল, ছায়ামূর্তি, অমরত্ব, মাতাল, রূপসীর কুহক, প্রতিশোধ।

কায়সারের গল্পের বিষয় যেমন বিবিধ, তেমনি গঠন-কৌশলও বিচিত্র। রহস্য, রোমাঞ্চ, প্রণয়, পরাবাস্তবতার আস্বাদন পাবেন পাঠক। এছাড়া গল্পকার ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, নগরজীবন, সমাজবাস্তবতা—নানা কিছুর সমাবেশ ঘটিয়েছেন গল্পে গল্পে। আপাতত ‘তন্দ্রা’ গল্প থেকেই যদি একটু পাঠ করি, তবে বিষয়টি স্পষ্ট হবে— 

মৃত্যুই মানুষের শেষ পরিণতি। গড ইজ ডেড। সেই এপিকিউরাস থেকে শুরু করে চার্বাক আর সব শেষে মার্কস, স্টিফেন হকিং সবারই একই মত।

এখানে গল্পের আশ্রয়ে আসলে বিজ্ঞানজাত যে মানুষের ইতিহাস, দর্শন, চিন্তা—সেসব তুলে ধরতে চেয়েছেন লেখক। কিন্তু নামকরণে যে গল্প বেশি প্রাধান্য পেয়েছে সেই ‘শোধ’ গল্প এসবের বাইরে একেবারেই জীবনমুখী, একেবারেই সমাজবাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। জীবন যে কল্পনার চেয়ে বেশি নৃশংস সেই বিবরণ যেনবা মিলছে এখানে। কায়সার লিখেছেন—

ইঁদুরটা ফাঁদ থেকে বেরোবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এবার আস্তে আস্তে খাঁচাটাকে বালতির পানিতে ডুবাতে লাগল। খাঁচাটা পানিতে ডুবে যাচ্ছে আর ইঁদুরটা খাঁচার যে অংশ এখনো পানিতে ডুবে নাই সেখানে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু খাঁচাটা আস্তে আস্তে পুরোটাই পানিতে ডুবে গেল। ইঁদুরটা কয়েক সেকেন্ড পানির মধ্যে দম নেওয়ার চেষ্টা করল। তাতে পানি ঢুকে গেল তার ফুসফুসে। আর এভাবেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইঁদুরটা মারা গেল। নিথর হয়ে গেল তার দেহ। ইঁদুরের মৃত্যু নিশ্চিত করে ফাতেমা ওটাকে খাঁচা থেকে বের করে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল।

ইঁদুর নিয়ে ফাতেমার এই আচরণ যে একটা সময় কোনো এক মানুষের দিকে গড়াবে, সেটা গল্পপাঠে স্পষ্ট হওয়া যায়। কিন্তু পুরুষের যে পাশবিকতার শিকার হয়ে তিনি ‘শোধ’ নেন, সেই কাহিনি লেখক স্পষ্ট করেননি। বরং পাঠকের ভাবনার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। এভাবে ছোটগল্পের যে ব্যাকরণ, সেই সূত্রও মানা হয়েছে। আবার মানুষের ভেতরে থাকা পশুত্ব থাকার যে কাহিনি সেটা না লিখেই বুঝিয়ে দেয়া গেছে।

পাঠকদের ধাঁধাঁয় ফেলে দেয়ার মতো ঘটনাও বুনতে জানেন গল্পকার কায়সার আহমদ। ‘নিয়তিনির্ধারিত একটি মৃত্যুর গল্প’ তিনি শুরু করেছেন এভাবে—

মিজান নিজে গুলি খেয়েছে। সে গতরাতে এ স্বপ্নটা দেখেছে। গুলি খেয়ে বেঁচে গিয়েছিল না মারা গিয়েছিল এটা সে বলতে পারে না। শুধু মনে আছে এটুকু যে, সে কুয়াশাচ্ছন্ন একটি দিনে গুলি খেয়েছে।

মিজান যে স্বপ্নে গুলি খেয়েছে, সেটা আমরা ভুলে যাই নি। বরং তিনি বেঁচে আছেন, না মারা গেছেন—সেটা জানতে গল্পের সামনের দিকে এগিয়ে যাই। অল্পকথার গল্প হলেও কায়সার আহমদ শুধু পরাবাস্তবতায় বাস করেন নি। তুলে ধরেছেন রাষ্ট্রের সমাজের সমকালের চিত্রও। ‘রূপসীর কুহক’ গল্পে সেই বর্তমান মেলে। সেখান থেকে পড়া যাক শেষাংশ—

বিল পাস করিয়ে ঝিলিক তার স্বামীর কাছ থেকে হীরের নেকলেস ঠিকই পেল। তবে ব্রিজটি দু মাস পর ভেঙে পড়ল আর একজন মানুষ মারা গেল। পত্রপত্রিকায় অনেক লেখালেখি হলো। টিভি চ্যানেলগুলো রিপোর্ট তৈরি করল। শুভর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হলো। দুর্নীতি দমন কমিশনও মামলা করল। সে জানতে পারল যে কোনো সময় তাকে গ্রেফতার করা হতে পারে। এক ফাল্গুনে সকালে সে যখন ঘুম থেকে উঠছিল না তখন তার মা দরজা খুলে দেখে তার লাশটা ফ্যান থেকে ঝুলছে। লাশটা দেখে তার মায়ের মনে পড়ে গেল যে, আজ দোসরা মার্চ, তার বাবার ষাটতম জন্মদিন। 

এভাবে রেহনুমার জীবনে গণকের ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছিল।

বাস্তবতায় এমন মোচড় টেনে এনে ঘটনার রূপান্তর হয় সাহিত্যে। সেই সক্ষমতা দেখাতে পেরেছেন কায়সার আহমদ। তিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব বিশেষ করে মনোবিকলন খুব ভালভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম। তার অন্তর্ভেদী দৃষ্টি মনের গভীরতম প্রদেশে প্রবেশ করে সেখানকার অস্বাভাবিকতার স্রোতে অবগাহন করে এবং উত্তোলন করে আনে রাশি রাশি বর্ণিল জীবনের নোনাজলে সিক্ত নুড়ি পাথর। 'ষড়যন্ত্র' এবং 'প্রতিশোধ' এরকমই দুটি গল্প। যাদুবাস্তবতার ছোঁয়ায় কখনো কখনো তার গল্প পূর্বনির্ধারিত ভাগ্যের নির্মম ও নিষ্ঠুর চক্রাবদ্ধতার জালে জড়িয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে গল্পের নায়ক কোনো মতেই পালিয়ে যেতে পারে না। 'রূপসীর কুহক' নামক গল্পটি আমাদের সেকথাই মনে করিয়ে দেয়। লেখকের শিল্প সম্পর্কে অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয়েছে অমরত্ব নামক গল্পটিতে। শিল্পের ব্যাপ্তি জীবনের চাইতে দীর্ঘতর করণ তা জীবনকে করে রসে টইটুম্বুর ও বর্ণাঢ্য। তার গল্প, হোক তা পরাবাস্তব, যাদুবাস্তব বা আধিভৌতিক, কখনোই সেগুলো জীবন থেকে বা বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তবে গল্প করতে গিয়ে তিনি ঘটনায় যতটা মনোনিবেশ করেছেন, সে সময়টা হয়তো দেননি ভাষার কারুকাজে। তাই কাহিনি প্রায় ক্ষেত্রে জটিল হলেও ভাষা সারল্যদোষে দুষ্ট হতে পারে। কিন্তু এই ভাষা আবার এক শ্রেণির পাঠকের কাছে ইতিবাচক হিসেবে ধরা দেবে। তবুও যে কোনো লেখকের জন্যেই ভাষার নিজস্ব একটি শৈলী বা চেহারা জরুরি, যেটা একান্তই তার পরিচায়ক। গল্পকার কায়সার ঘটনার ঘনঘটায় যেমন, ভাষার বুননেও তেমন নজর তার কাছে প্রত্যাশিত।

-----------------

শোধ ও অন্যান্য গল্প
কায়সার আহমদ

প্রকাশক : প্রকৃতি (ঢাকা)। প্রকাশকাল : একুশের বইমেলা ২০২২

 

তায়েব মিল্লাত হোসেন

তায়েব মিল্লাত হোসেন

জন্ম ১২ জানুয়ারি ১৯৮১; মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর।  এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব...বিস্তারিত