কালো এলবাম কিংবা কড়ুইতলার চিঠি

আপন মাহমুদ (১ জানুয়ারি ১৯৭৬ - ১২ সেপ্টেম্বর ২০১২) প্রথম দশকের একজন প্রতিভাবান কবি। আজ তার চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। অকালপ্রয়াত এই কবির স্মরণে কবি সরোজ মোস্তফার কবিতা...


এক

আপনকে কবরে নামিয়ে ঘরেই ফিরেছি। মন্টুর দোকান থেকে কাঁচা সুপারির পান চিবুতে চিবুতে সারা রাত সমস্ত শহরে হেঁটে সেই ঘরেই ফিরেছি। পলিথিনভর্তি মুগডালের সুবাসে একে অন্যের মাথায় পেরেক বসিয়ে এই ঘরটায় ফিরতেই হয়। ছিদ্র ফুসফুসকে বুঝতে না পারার অপরাধে তোর শিথানে বসেছি। ঋতুর পাখিরা ঠোঁটে ঠোঁটে তোর নাম ছড়িয়ে দেয়ার পরে তোকে কবরে নামিয়ে মুখের উপরে মাটি ঢালতে ঢালতে কড়ুই গাছের ছায়া গুনতে গুনতে এই বাড়িতে ফিরেছি।  

দুই

আপনদা, রক্তের ভেতরে স্থবির থাকে না মদ ও বন্ধুত্ব। ধূপ-সমতল মিহিন সন্ধ্যায় জীবন থেমেছে একটা ছায়ায়। ঈর্ষা-মহল্লায় ঢুকে মন কোপানোর আদিম তরঙ্গে আমিও দরখাস্ত লিখেছি। শিখেছি আহার গ্রহণের পৌরাণিক অপরাধ। এই কলমি ফুলের বাঁকানো বিকালে মহিষের শিং দেখানো বন্ধুরা ড্যাগার বসিয়ে দেয়। কাতল মাছের পেটে রেখে দেয় কৈবর্ত বংশপরিচয়। ফ্রিজের ভেতরে আত্মগোপনের পর ঠান্ডা ও বদলে যাওয়া মুখে আপনকে ডাকি। গাছের গুঁড়িতে যে পাখি হাঁটছে তার নাম আপন মাহমুদ। গন্তব্য নির্ভর কর্মনিকেতনে যে মানুষ কবিতা লিখছে তার নাম আপন মাহমুদ। বাংলা বিলের নরম কাদায় এখনো যে পদ্ম ফোটে সেই পদ্মের বাতাসে সাঁতরাচ্ছেন কবি আপন মাহমুদ। আপন কাউকে ড্যাগার মারে নি।  

তিন

রাষ্ট্রের আপেল গাছে ঝুলে নেই আপনের নাম। তাই, বুঝিয়ে বলার দরকার নেই রাষ্ট্রের দানবাক্সটা কে কখন খোলে। ক্ষরণচিহ্নিত চক্ষু দুই আর জীবন-হাইকুর ছোট্ট তরীটা উঠিয়ে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই রঙ-প্রকৃতির গোপন হরিণ চলে গেছে। বিকালের রঙ গোপন করার অনুতাপসহ মাটির আড়ালে ছিদ্র ফুসফুস, পালানোর গন্ধ ও কথা-ইশারা। আপন হয়তো কোথাও যায় নি। টাঙ্গাইলের কবি-সম্মেলনে পা ভেঙে উঠেছে রহমান মাসুদের আস্তানায়। এখন সন্ধ্যায় কড়ুইতলায় জোনাকির মতো পাগলামো করে। ইস্ত্রি করা জামার ভেতরে কিংবা কলারের চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখে কবিদের অনুতাপ। দানবাক্সের ছোট্ট সে ছিদ্রে ঢুকবে না আপনের নাম।  

চার

পিতার মুখটা মুখস্থের পর পৃথিবীর লাল দরগায় মেদ ও মেহগনি চত্বরে কয়েকটা রাত জাগরণের শান্তিতে মাকে নিয়ে কবিতা লিখে আপন। জিরাফের উঁচু অভিমান দেখানোর ঐ সন্ধ্যায় বিথির সৌন্দর্য সে হাতার নাগালে পেয়েছে। এখন সন্ধ্যায়, ফুটো ফুসফুসে তুই কিভাবে ঘুমাস! তবে, কবিদের কিন্তু কবর হয় না। জুয়েল, মাসুদ, রাব্বানীরা আপনকে শুইয়ে রেখেছে কড়ুইতলায়।  

পাঁচ

সাইকেল চালিয়ে কবি আপন মাহমুদ গেছেন কড়ইতলায়। খুব ভোরে বেল বাজিয়ে অনেকেই দূরে চলে গেছে । রাস্তার ধারের বটগাছ সাইকেলের বেল শুনলেই তাকায়। দেখে মানুষটা আপন মাহমুদ কিনা। মানুষটার দু'চোখে খোড়ল রয়েছে কিনা...

ছোটবেলা থেকে দূর-পাহাড়কে দেখে ভাবি, দূরত্বের রঙ নীল। দেখি, মানুষের চোখের ভেতরে নীল। হাতের তালুতে নেমে আসে নীল। সেই নীল রঙের ধাক্কায় নদীর সামনে বসে থাকি। অনেক দিনের পুরনো একটা নিস্তব্ধতায় বসে থাকে চোখ। আমাকে নিস্তব্ধতায় পেয়ে আপন মাহমুদ পাশে এসে বসে। বলে, আজ বিকাল পাঁচটায় আমার স্মরণসভা আর জলের উপরে এসে আপনি কী ভাবছেন...। ভেবে কী হবে সরোজ। স্মরণসভায় গেলে আপনি আমাকে দেখতে পেতেন। দেখতেন কতটা সমতল বন্ধুদের চোখ।

আমি আপনের দুই চোখ দেখি...। কবি রুদ্র আরিফের তোলা সোয়েটার পরা ছবিটার দিকে তাকাই। শীতের মাঠের মতো হাসছে আপন...। রাজহাঁসেদের চোখের ভেতরে ঢুকে গেছে আপনের চোখ...॥

সরোজ মোস্তফা

সরোজ মোস্তফা

জন্ম ১১ ডিসেম্বর, ১৯৭৬; নেত্রকোণা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশায়...বিস্তারিত