সাধুর আশ্রমে প্রবেশের পর আপনার মনে হতে পারে জবা গাছগুলোতে রক্ত কম, কামিনী গাছের শীতলতা কম কিংবা মেঘ ও রৌদ্রের প্রবাহণে আশ্রমটা এলোমেলো—অথচ যে সাধুর আশ্রমে আপনি আশ্রয় নিতে আসলেন, সে সাধু এক জীবনের নিষ্ঠায় আশ্রমটা গড়ে তুলেছেন। ব্যক্তি তীর্থযাত্রীদের চক্ষু ও চরণ আশ্রমের বিষয় ও মাধুর্যকে স্পর্শ করার চেয়ে অন্তরালের খুঁত আবিষ্কার করল। তবে তীর্থযাত্রী কিংবা কাব্যসমালোচকেরও জানা উচিত যে, জগতে ছিদ্রের চেয়ে প্রবাহের দিকে চোখ রাখা জরুরি। ছিদ্রটা সাধনা কিংবা কবিতা নয়। প্রবাহটাই সাধনা, ধ্যান, জীবন কিংবা কবিতা। বাংলা কবিতার এই প্রবাহেই কবিতা লিখে যাচ্ছেন ফেরদৌস মাহমুদ। আগন্তুকের পাঠশালা কবির চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ। যাপিত জীবনের ভাষায় কাব্যগ্রন্থে একজন সবুজ প্যারট সময়ের ছিটকিনিটাই খুলে দিয়েছেন।
লোহার পৃথিবীতে কবি কিছু আবেগ ও ইশারা ঢেলে দিয়েছেন, কচি ঘাসের মতো সবুজ সবুজ সম্ভবনা ঢেলে দিয়েছেন।
তিনি শুধু কবিতা লিখার জন্য কবিতা লিখেন নি; নতুন কিছু কথা নতুনভাবে বলার জন্য কবি কাব্যনিবেদন তৈরি করেছেন। লোহার পৃথিবীতে কবি কিছু আবেগ ও ইশারা ঢেলে দিয়েছেন, কচি ঘাসের মতো সবুজ সবুজ সম্ভবনা ঢেলে দিয়েছেন। শব্দসহযোগে একটা অনিবার্য আড়াল তৈরি করে চিন্তাকে প্রকাশ করেন তিনি। আশ্চর্য কায়দায় বলেন, এ শহরে তিনি ‘মৃগী রোগ’ বিষয়ে বক্তৃতা করতে এসেছেন। এসে, নষ্ট ফ্রিজের মতন অকেজো সময়টা থেকে বের করে এনেছেন ‘১ জন তরোয়াল, ১ জন পিস্তল, ২ জন চাপাতি, ৩ জন হাত-বোমা আর কয়েক হাজার পাষণ্ড’। একটা মিহিন গদ্যছন্দে আধুনিক পৃথিবীটাকে পুরোপুরি ‘সূর্য ও সিসি ক্যামেরা’র ধ্যানে কাব্যে প্রকাশ করেছেন। চিন্তার স্থাপত্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন ভবিষ্যৎ পৃথিবীর চেহারা।
দুই.
বাংলা কবিতার রিয়ালিটিতেই আস্থা রেখেছেন ফেরদৌস মাহমুদ। আপন ভূমির একটা মৌলিক কণ্ঠস্বরে প্রাণের হিল্লোলগুলোকে, জর্জরিত অনুভবগুলোকে কবিতায় স্থাপন করেছেন। জসীমউদ্দীন কিংবা আল মাহমুদকে যেমন আমরা একটা ভূগোলের অভিজ্ঞানজাত কবি বলে শনাক্ত করতে পারি; তেমনি বিষয় ভাবনা এবং কিছু শব্দের প্রতি একটা অমোচনীয় পক্ষপাতের জন্য ফেরদৌসকেও বাংলা মুল্লুকের ভাব ও ঐতিহ্য সচেতন কবি শনাক্ত করতে পারি। ভূমির জীবনকে প্রাধান্য দিলেই কবিতায় উঠে আসে ভূমির রক্ত। বাংলার আধা-নাগরিক একটা জনসমাজ—যে সমাজ বিত্ত-বাসনায় আকাঙ্ক্ষিত ও চিরবিষণ্ন, রাষ্ট্রের ভেতরে যে সমাজ কচ্ছপের মতো তাকিয়ে ঘুমিয়ে কাটায়—ফেরদৌস সে সমাজটাকে ভাষায় এঁকেছেন। কবিতা অবশ্যই শাশ্বত জীবনের রঙ ও ভাষাকে ধারণ করে। আগন্তুকের পাঠশালাতেও উপস্থিত হয় সকল ভূগোল। তাই পুরান ঢাকার গল্পে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে বার্লিন শহরের গল্প। তবে প্রত্যেকটি গল্পে মাটির একটা নিজস্বতা থাকে। সে নিজস্বতাই একটা ভূগোলের মৌলিক রঙ। যেমন, কবিতায় আমাদের নানারা ‘মধ্যরাতে লেবুফুলের করতালিতে পড়তেন সুর করে কোরআন’। ফেরদৌস কবিতায় এই সহজ জীবনটাকেই প্রকাশ করেন। সময় কিংবা নিত্য-নৈমিত্তিক, সরকারি-বেসরকারি জীবনকে কবি কাব্যের অধরায় ধরতে চেয়েছেন। যারা বাংলা কবিতার নীল সরোবর থেকে এখনো দূরে সরে আছেন, মনের ভেতরে গোপনীয়তার স্বরে এখনো যারা বলে যাচ্ছেন ‘বাংলা কবিতা দুর্বোধ্য’—তারা ফেরদৌসের কবিতার ছায়াতলে আসুন। দেখুন। পড়ুন। আপনারাই বলবেন, ‘আমরা বাংলা কবিতাকে ভালোবাসি। আমরা বাংলা কবিতা পড়তে চাই। আমরা বাংলা কবিতার কাছাকাছি থাকতে চাই’।
পুরান ঢাকার দালানগুলো যেন শতবর্ষী নানা, শরীর ভরা . ইতিহাস। নানা আমার হাঁটতেন বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথের মতো কুঁজো হয়ে মধ্যরাতে লেবুফুলের করতালিতে পড়তেন সুর করে কোরান।
আকাশে উড়ত লাল-নীল বাক্স-ঘুড়ি, নানার হাতে শোভা বাড়াত . বাকরখানি; নানাবাড়ি বহুদিন হলো হয়ে গেছে মামা বাড়ি। মামাবাড়ি হয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে মামাতো ভাইয়ের... পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে, বাড়ির ছাদে হাসনাহেনার ঘ্রাণে . আজ সন্ধ্যায় উঠেছে মস্ত টিনের চাঁদ। পঙ্গু ভিখিরির গানে ওই চাঁদ যেন বাজছে ঠন ঠন। মনে হয়, নানার মতো ওই দালানগুলোও লুটিয়ে পড়বে হঠাৎ।
[পুরান ঢাকা
আত্মজীবনীর শেষে এসে লিখেন, ‘কেবল সহ্য করার মধ্যে নেই মনুষ্যত্ব।’
তিন.
প্রকাশন : চৈতন্য ।। প্রচ্ছদ : দেওয়ান আতিকুর রহমান
‘আগন্তুকের পাঠশালা’ এই শিরোনামের ভেতরেও কবি স্থাপন করেছেন তিনটি উপশিরোনাম। ১. ‘শীতপাখি, মোরগ ও ষাঁড়’ ২. ‘মাতাল ছুরি’ ৩. ‘সূর্য ও সিসি ক্যামেরা’—এই তিনটি শিরোনাম থাকার পরও কাব্যগ্রন্থের ষাটটি কবিতা একটা চৈতন্যকেই ধারণ করেছে। এই চৈতন্য লঞ্চের ভিখিরির মতো সমকাল নিয়ে গাইছে। এই চৈতন্যটাই কবির শক্তি ও আত্মজীবনী। আত্মজীবনীর শেষে এসে লিখেন, ‘কেবল সহ্য করার মধ্যে নেই মনুষ্যত্ব।’ প্রায় প্রতিটি কবিতার ভেতরেই এমন একটি দুটি পঙ্ক্তি থাকে—যা পুরো কবিতার অর্থকেই নিয়ন্ত্রণ করে। কবিতার এমন পঙ্ক্তিগুলোই কাব্যগ্রন্থের মূলস্বর কিংবা প্রগাঢ় জীবনের ছায়া।
এবার ১৪ এপ্রিল এলে লাল চক দিয়ে দেয়ালে দেয়ালে ইলিশ মাছ আঁকব, তারপর মাছগুলোকে বলব মেঘনা নদীতে চলে যেতে।
মেঘনা প্রতি বর্ষাতে আমার গ্রাম ভাঙে, আমরা শহরে চলে আসি।
শহরে প্রতি তিন মাসে একবার ভূমিকম্প হয়, আমরা নিজেদের বাদ দিয়ে কেবল অন্যের মৃত্যুযন্ত্রণার কথা ভাবি। আমাকে ভ্যাক্সিন দিতে আসা নার্স ভূমিকম্পের সময় শাদা হাসপাতালের ফ্লোরে ডিগবাজি খায়।
ইনজেকশান দেওয়ার সময় ভূমিকম্প হলে শরীরে চলে টিয়া পাখির নৃত্য!
[ম্যাডনেস
মরা ভাষায় কবিতা লেখা যায় না। চিন্তার ভেতরে বহমান কবি নিরন্তর একটা জীবন্ত ভাষাতেই কবিতা লিখেন। প্রকৃত কবি-সত্তা ঠিক ঠিক বুঝতে পারেন কী তাঁর লেখনী! কী তার ভাষার প্রবাহ! নিত্য-নৈমিত্তিকতায় কল্পনা কিংবা ধারণা যতই বিবিধ প্রসঙ্গের অবতারণা করুক না কেন, জীবনের শেষ কাব্যগ্রন্থে এসেও এই ভাষার সান্নিধ্যেই কবির মুখটা চেনা যায়। যেহেতু কল্পনা ভাষা তৈরি করে, সেহেতু কল্পনাই নির্ধারণ করে ভাষার গন্তব্য। মন ও মননের দীর্ঘ পরিক্রমায় ঢুকে যায় কল্পনার উপাদান। প্রসঙ্গ যেমন ভাষা তৈরি করে তেমনি প্রসঙ্গকে তাজা রাখে ভাষা। কল্পনা ও মননের সহবাসে একটা নিজস্ব কাব্যভাষায় কবি ঘোষণা করেন :
শেষ রকস্টার আমি, এসেছি আগন্তুকের নীল জ্যাকেট গায়ে সাত আসমান থেকে তারার সাথে উল্কার সাথে হ্যান্ডশেক করে। এসেছি সমুদ্রের তলদেশ থেকে বেগুনি সাবমেরিনের আলো মুঠোয় ৫০০ হাঙরের চুমু খেয়ে। আজ যুদ্ধ বিমানে না বলা কথারা নৃত্য করবে, উত্তর-দক্ষিণে ছুড়ে ফেলা গোলা-বারুদ হয়ে যাবে ফুল।
আমি জানি, শেষ পর্যন্ত আমি মানে আমি নই। সৃষ্টির ধাঁধা!
[রকস্টার
টেকনিকের চেয়ে ভাষা ও প্রসঙ্গ জরুরি। কালিদাসের টেকনিক কে মনে রেখেছে!
ফেরদৌস টেকনিক সচেতন কবি নন। বিষয় ও কল্পনার নিবেদনই তার শক্তি। কল্পনাকে যেভাবে তিনি খাতায় নামান কিংবা কল্পনার সাথে যেভাবে সহবাস করেন—সেটাই তাঁর টেকনিক। সময়ের সাথে সাথে টেকনিকের মৃত্যু হয়। তাই টেকনিকের চেয়ে ভাষা ও প্রসঙ্গ জরুরি। কালিদাসের টেকনিক কে মনে রেখেছে! ‘মেঘদূত’-এর ভাব ও কল্পনাকে সবাই মনে রেখেছে। প্রসঙ্গের শক্তিতেই কালিদাস নবাগত দুনিয়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। বিষয় ও প্রাসঙ্গিক পৃথিবীর তাড়া খাওয়া মানুষগুলোই ফেরদৌসের কবিতার শক্তি।
এবারের শবেবরাতে কলোনির ছেলেদের সাথে মোল্লাপাড়ার ছেলেদের মারামারি হলো।
সারা রাত আমি তারাবাতি জ্বালালাম, নিজ হাতে বানানো মরিচা বোম ফুটালাম। ভিখিরিদের দিলাম ৫০ টাকা। নামাজ পড়লাম ১২ রাকাত।
আমার একটি তারাবাতি উড়ে গেল চাঁদের দেশে, তিনটা মরিচা হারাল গোপালদের বাড়ির উঠোনে। গোপাল আর আমি পেট ভরে খেলাম সুজি-গাজরের হালুয়া, গরুর মাংস, চালের রুটি।
এবারের শবেবরাতে হারিয়ে গেল আমার গোল টুপি, পাঞ্জাবিতে লাগল মাংসের ঝোল। তবু ওই পাঞ্জাবি পরে পরদিন কিনলাম বউবাজারের পাঙ্গাস। নিজের কণ্ঠস্বরকে মনে হলো অন্যের কণ্ঠস্বর।
আগামী শবেবরাতে চাঁদে যাব খুঁজতে উড়ে যাওয়া তারাবাতি।
[শবেবরাত
একটা সচেতন অভিপ্রায়ে কবিতা লিখেন তিনি। কবিতার ভেতরে শর্টফিল্মীয় ধারণায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছবি ও অনুসঙ্গ থাকে। থাকে রহস্য ও শান্তির আহ্বান। কাহ্নপা যেমন নগর-বাহিরের ডোম্বীর গল্পটা ধীরে ধীরে উন্মোচন করেন তে্মনি কবিও সময়ের অভিঘাতগুলোকে কল্পনা সহযোগে কবিতায় উপস্থিত করেন।
বিশ্ব ইতিহাস নিয়ে তর্ক করতে করতে শীতের অতিথি পাখি হয়ে যাই বান্ধবীর জন্য কেনা পারফিউম ছড়ায় পারিবারিক সমাধির গন্ধ।
একাকিত্বের অনুভূতি জগতে সর্বজনীন।
[‘বসন্তের এরোপ্লেন’
প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে শেষ কাব্যগ্রন্থে এসেও কিছু শব্দের প্রতি একটা অমোচনীয় পক্ষপাত আছে কবির। গাছকে কাকা ডাকতে ডাকতে কবি একটা পারিবারিক ইতিহাস লিখেন। সে ইতিহাসের বিবিধ রহস্যে মুগ্ধ হতে হয়।
সামনে এগুলে চিংড়ির পুকুর। তারপর পাকা রাস্তা। রাস্তার কিনারে আম-জাম-শাল আর সারি সারি নারকেল গাছ।
এই গাছ সব লাগিয়েছিলেন আমাদের বুড়া দাদা। তিনি গাছেদের সঙ্গে কথা বলেন, গাছেরা নাকি তার ছেলে-মেয়ে। গাছেরা নীরবে তাকে বাবা বলে ডাকে।
আমিও সুযোগ পেলে তাই এ গাছগুলোকে কাকা বলে ডাকি।
[গাছ কাকা
ভাষাতেই কবিতার ছন্দ, ভাষাতেই কবিতার রূপানন্দ। ছন্দ ছাড়া কবিতা প্রায় অসম্ভব। এমনকি প্রচল ছন্দের বাইরে এক ধরনের বেসরকারি ছন্দ থাকে—এই ছন্দই কবিতাকে রক্ষা করে। কবিতার স্বভাব নির্ধারণ করবে, সে ছন্দটা কী হবে? ছন্দের কায়দা–কানুন ফেরদৌস ঠিকই জানেন। তাঁর কবিতায় একাডেমিক ছন্দের ছায়া যেমন আছে, তেমনি আছে অক্ষর গণনার ননএকাডেমিক নান্দনিক ফর্ম।
সাজানো তাসের সব শয়তানি ছিঁড়ে একাকী বেরোয় মহান ইস্কাপনের টেক্কা। দোজখের গোপন ফাটল দিয়ে ঢুকে পড়ে স্বর্গের বাতাস! সমুদ্রের স্রোত গুণে জন্ম নেয় প্রাচীন গণিত। মৃতদের ড্রয়িং খাতায় বৃত্ত বানাতে বানাতে যাই ঝলমলে নতুন সি-বিচে। পশ্চিমের দেশে ঘুরে বেড়ানো কুয়াশা ঢেকে ফেলে চুপে আদিম সূর্যোদয়ের গল্প! হরিণীর মতো অধ্যাপিকা পাখির কূজন বন্ধ করে চালায় ভাষাতত্ত্বের ক্লাস। পাহাড়ি পাঠশালায় নামে শিমুল ফুলের নীরবতা গভীর বনের ঝরনার সুরে ক্যামেরার আলো পড়ে। ভাঙা চাঁদ হাতে নিয়ে নীল দার্শনিক হাসে। শীত পাখি গাছের পাতায় লেখে, ‘খ্যাতি চমক সৃষ্টিতে পায় বৃদ্ধি।’ দূতাবাসে-দূতাবাসে কড়া নাড়ে তেজি লাল ঘোড়া, বিদেশি বাঘের ভিসা নিয়ে ওড়ে আকাশে হেলিকপ্টার।
[নক্ষত্রের দূতাবাস
জগতে দৃষ্টি ছাড়া কিছুই অনুভবে আসে না। পাঠকেরও তাই দৃষ্টি থাকা লাগে।
নাগরিক মধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্তের একটা জীবনই লিখে যাচ্ছেন তিনি। শেকড়হীন সোসাইটির এইসব নাগরিক সত্যকে শ্লীল ভাষাতেই উপস্থিত করেছেন তিনি। বলতে চাই, জীবনের ভেতরে যে আরেকটা কুরূপ, ঢাকনায় ঢাকা না-দেখানোর জীবন আছে সেখানে তিনি হয়তো হাত দিতে চান না। একটা শুদ্ধচারী, শ্লীল কল্পনায় রত আছেন তিনি। তবে ইঙ্গিতে কিংবা আভাসে একটা শ্রেণির মঙ্গলকাব্যই লিখতে চান তিনি।
দুরবিন পেতেছি সন্ধ্যা-শেষের ছাদে। সকল নক্ষত্রের নামকরণ করা হয় নি এটা বুঝে বহু নক্ষত্রের নামকরণ করি নিজে। আমার বাড়িতে নক্ষত্র দেখতে আসে কালকেতু আর ফুল্লরা। কাঠকুড়ুনির বনে আগুন লাগিয়ে আসা বণিক হাততালি দেয়। আমাকে ডাকে মহাকালের ঠোঁটকাটা নদী আর ছোট্ট টঙ ঘর। নক্ষত্র চেনার বই আমার হারিয়ে গেছে খেজুরতলার হাটে!
[মঙ্গলকাব্য
ইতিহাসবিদ কিংবা সমাজবিজ্ঞানী সময়কে সম্পাদনা করেন, কিন্তু কবি সময়কে যাপন করেন। হৃদয় বিস্তার করে সময় সমাজ ও রাষ্ট্রের হৃদয়টাকে লিখতে থাকেন কবি। কবিতায় জীবন-যাপনের ধরা-অধরা সত্যরূপটাই প্রকাশিত হয়। সেই সত্যরূপের অধরা পাখিকে বুঝতে হলে পাঠকেও কবির কাছাকাছি প্রার্থনার মুডে বসতে হয়। কবির কাছাকাছি আসা মানে কবিতার শান্তি- ও সাধন-মন্দিরে প্রবেশ করা। জগতে দৃষ্টি ছাড়া কিছুই অনুভবে আসে না। পাঠকেরও তাই দৃষ্টি থাকা লাগে। বিভাজিত মনকে দৃষ্টি দিয়েই সংযুক্ত করা লাগে। দৃষ্টি দিয়েই পাঠক অনুভব করেন কবির সাধনা-মন্দির। এই মহৎ জীবনে একজন কবি অনেকগুলো কাব্যগ্রন্থ লিখেন। নির্মাণকলায় প্রত্যেকটি কাব্যগ্রন্থই কবির ভিন্ন সাধনা-মন্দির। কল্পনা কিংবা প্রসঙ্গ কাব্যগ্রন্থের ভাষা ও স্থাপত্যকে আলাদা করলেও কবির অন্তর্গত মৌলিকত্ব ও মর্মটা পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে টের পাওয়া যায়। সময় যাপনের এই সত্যরূপটাই আমি খুঁজে পেয়েছি ‘আগন্তুকের পাঠশালায়’।