অজন্মা-দেশ

খাঁটি সম্পাদক এজরা পাউন্ড-এর কর-কমলে


১. শবদাহ


এপ্রিল নিদয়া মাস, গজাচ্ছে লাইলাক মৃত জমিতে, উথাল-পাতাল স্মৃতি ও কামনা, জীবন জাগছে মৃত কন্দরে বসন্ত বর্ষণে। শীত আমাদের রেখেছিল ওমে, ঢেকে দিয়ে ধরণীরে ভ্রান্ত তুষারে, খাবার দিয়েছিল একটি জীবনের তুচ্ছ শুষ্ক মূলে। গ্রীষ্ম আবাক করেছিল আমাদের, স্টার্নবার্গাসিতে এসে তুমুল বৃষ্টিতে আমরা থেমেছিলাম থামের আড়ালে আর রোদ উঠলে ঢুকেছিলাম হফগার্টেনে, আর পান করেছিলাম কফি, কেটেছিল ঘণ্টাখানেক আলাপনে আমি রুশ নই, লিথুনিয়া-ফেরত খাঁটি জর্মন আর যখন আমরা শিশু ছিলাম, থাকতাম আর্চডিউকে তুতো ভাইয়ের কাছে, সে আমাকে বেড়াতে নিয়েছিল স্লেজগাড়িতে আমি তো ছিলাম ভয়ে, সে বলেছিল, মেরি, মেরি, ধর শক্ত করে, আর আমরা নেমে গিয়েছিলাম নিচে পর্বতে, সেখানে তুমি ছিলে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে আমি পড়তাম বই রাত-অব্দি, যেতাম দক্ষিণে শীত-মৌসুমে। শিকড়-বাকড় কিভাবে আকড়ে ধরে, কিভাবে কাণ্ডে পল্লব গজাবে এই শুষ্ক পাথুরে সুরকিতে? ওহে, মানবপুত্র! তুমি বলতে পারবে না, কিংবা অনুমান করতেও, তোমার জ্ঞান কেবল একটি ভাঙা চিত্রকল্পে আবদ্ধ, সূর্যের প্রখর তাপ যেখানে মৃতগাছ সেখানে দেয় না কোনো ছায়া, মুখরিত নয় ঝিঁঝিঁর ডাকে শুকনো পাথরে জাগছে না গান জলের কল্লোলে। কেবল রয়েছে ছায়া এই লাল পাথরের নিচে, (আসো, এই লাল পাথরের নিচে), আর আমি তোমাকে চাই আলাদা কিছু দেখাতে তোমার ছায়া সকালে দাঁড়িয়ে থাকে তোমার পেছনে কিংবা অপরাহ্ণে তোমার ছায়া যায় তোমার সম্মুখে আমি তোমাকে ভয় দেখাব একমুঠো ধুলোর ভেতরে

সুশীতল বাতাস বইছে দেশের মাটির পরে কোথায় গিয়েছিস বাছা ফিরে আয় ঘরে

‘তুমি আমাকে দিয়েছিলে কচুরিপানার ফুল বছর-খানেক আগে; তাই তারা আমাকে ডাকত কচুরি-বালিকা বলে।’ অথচ যখন আমরা আসলাম ফিরে, দেরিতে, কচুরি-উদ্যান থেকে তোমার বাহু পরিপূর্ণ ছিল, আর তোমার সজল কেশ, আমি ছিলাম নির্বাক পারছিলাম না কিছু বলতে, ছিল না দৃষ্টির অভিব্যক্তি, আমি না-জীবিত না-মৃত, পারি নি কিছুই বুঝতে, তাকিয়ে দেখেছি নীরবতা আলোর হৃদয়ে হায়! জনমানবহীন কেবল শূন্য সাগর ধায় মাদাম সোসোস্ত্রিস, খ্যাতিমান ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা ভুগছিলেন মারাত্মক ঠান্ডায়, তবু পরিচিতি ছিলেন বুদ্ধিমান নারীরূপে ইউরোপে, সঙ্গে ছিল ভয়ঙ্কর তাসের এক তোড়া। বলতেন, এই তোমার তাস, ডুবন্ত ফিনিশীয় নাবিকের, (এই মুক্তো যা তার ছিল চোখ হয়ে। দ্যাখো!) এই যে বেলাডোনা, পর্বতের রানি ঘটনার রানি। এই যে লোকটি ত্রিশঙ্কু, আর চক্র এখানে, আর এই হলো একচোখা বণিক, আর এই তার তাস, যেটি আছে ফাঁকা, কিছু একটা নিচ্ছে ব’য়ে তার পিঠে যা আমার নিষেধ রয়েছে দেখা। আমি চাই না দেখতে ফাঁসিতে ঝুলন্ত মানুষ। আশঙ্কা রয়েছে সলিল-সমাধির। আমি দেখি জনতার ভিড়, হাঁটছে সবাই এক চক্রে। ধন্যবাদ। যদি তুমি দেখ প্রিয় মিস একুইটন, তাকে বলো, আমি নিজেই আনব বয়ে কুষ্ঠি: এমন দিনে সবারই সতর্ক থাকা অতি জরুরি। অলীক শহর, শীতের বাদামি কুয়াশায় ঢাকা চাদরে জনতার ভিড় চলে লন্ডন ব্রিজের দিকে, অবিরত, আমি ভাবতে পারি নি এত মানুষ এখনো রয়েছে বেঁচে! দীর্ঘশ্বাস পড়ছে, ছোট বড় অনিয়মিত আর প্রতিটি মানুষের দৃষ্টিনিবদ্ধ রয়েছে তার পায়ে। উপরে উঠছে নিচে নামছে উইলিয়াম স্ট্রিটে, যেখানে সান্তা মেরি উলনথ প্রহর গুনছে মৃত্যুঘণ্টা বাজছে শেষ নয় ঘটিকায়। সেখানে এক পরিচিত জনকে দেখে চেঁচিয়ে বলি, ‘স্টেটসন তুমিই কি সে, যে আমার সাথে জাহাজ মাইলেতে ছিলে! যে লাশটি তুমি পুঁতেছিলে গতবারে তোমার বাগানে, সেখানে কি হয়েছে শুরু অঙ্কুরোদ্গম? ফুল আসবে এই বছরে? তছনছ হবে শস্যের খেত আচানক তুষারপাতে? ওহ, কুকুর থেকে সাবধান, ওই মানুষের সুহৃদ, তার নখ দিয়ে পুনরায় তুলে ফেলবে! তুমি ভণ্ড পাঠক! অনুরূপ ভাই আমার!  

২. চতুরঙ্গ


চেয়ারে নারী সমাসীন, যেন সাড়ম্বর সিংহাসন, ঝলকিত মার্বেল-মেঝেতে আঁটা, কাচের ওপরে দ্রাক্ষাকুঞ্জ আছে ধরে সেখান থেকে একটি স্বর্ণ-মদন চোরা তাকাচ্ছে (অন্যজন তার চোখ রেখেছে ডানায় ঢেকে) দ্বিগুণ আলো জ্বলছে সপ্তশিখার ঝাড়বাতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে আলো যেন টেবিলের ওপরে তার স্বর্ণালঙ্কারের ঝলকানি মিশেছে এক সাথে সাটিনের পাত্র থেকে সুগন্ধের মৌতাত পড়েছে ছড়িয়ে গজদন্তে আর রঙিন আয়নায় অনবরত, তীক্ষ্ণ তার অভূতপূর্ব কৃত্রিম সৌরভে নরম, গুঁড়ো, তরল—পীড়াদায়ক, দ্বিধাগ্রস্ত করে আর চেতনা নিম্নগামী সুগন্ধে; ঊর্ধ্বগামী বাতাসে জানালা দিয়ে এসে করে পরিশুদ্ধ, ঝাপটায় উসকে দেয় মোমবাতিগুলো তাদের ধুঁয়া উড়ে যায় ছাদের সিলিংয়ে তামায় মোড়ানো চারপাশ আন্দোলিত করে বিপুল সামুদ্রিক কাঠ রয়েছে তাম্রে অলঙ্কৃত হরিৎ ও কমলা রঙে, রঙিন পাথরের ফ্রেমে তার বিষণ্ন আলোয় সন্তরণরত এক বক্র শুশুক পুরনো উনুনের তাকে হয়েছিল রাখা যদিও জানালা দিয়েছিল খুলে আরণ্যক দৃশ্যের ভেতরে ফিলোমেন গিয়েছে বদলে বার্বার রাজার রুক্ষ ব্যবহারে; যদিও সেখানে বুলবুলি ভরিয়ে দিচ্ছে শূন্যতা তার করুণ অপরিবর্তিত সুরে আর এখনো সে গায়, এখনো পৃথ্বী তার পিছে ধায় ‘জগ্ জগ্’ শব্দ শোনে নোংরা কানে। আর কোনো বিবর্ণ সময়ের চিহ্ন ছিল প্রাচীরগাত্রে, স্থির চিত্রে ঝুঁকে আছে, বিনীত রুদ্ধ কক্ষে। সোপানে রয়েছে পদচিহ্ন নৃত্যের ভঙ্গিমায় আলোকশিখার নিচে, ব্রাশের নিচে, তার কেশে উড়ছে আলোর বিন্দুতে কথার ফুলঝুরি, তারপর হবে করুণ নিশ্চুপ। ‘আমার স্নায়ু দুর্বল আজ রাতে। হ্যাঁ, বেশ দুর্বল। থাকো আমার সাথে কথা বলো আমার সাথে। কেন তুমি বলছ না কথা? কথা বলো। কী ভাবছ তুমি? কী ভাবছ? কী? আমি কখনো বুঝতে পারি না তোমার ভাবনা। ভাবো।’ মনে হয় ইঁদুরের গর্তে আমাদের বাস যেখানে হারিয়ে গেছে মৃতদের হাড্ডির শাঁস। ‘কিসের হৈ চৈ?’         বাতাস বইছে দরোজার নিচে। ‘কিসের শব্দ এখন? কি করছে সমীরণ? কিছু না, একদম কিছু না                     ‘আচ্ছা তুমি কি কিছুই জানো না? তুমি কি কিছুই দেখ না? স্মরণ করতে পারো না কিছুই?             আমার মনে পড়ে এইসব মুক্তো ছিল তার চক্ষুদ্বয় ‘তুমি কি বেঁচে আছ, না মরে গেছ? তোমার মাথায় কি কিছু নেই                             তবে ও ও ও ও ওই সব শেক্সপেহেরীয় হুল্লোড় বড় অভিজাত অনেক বুদ্ধিদীপ্ত ‘এখন আমি কী করব? কী করব আমি? আমি বেরিয়ে পড়ব যেভাবে আছি, আর হাঁটব রাস্তা ধরে আমার খোলাচুল নিয়ে, যেভাবে আছি। কী করব আমরা আগামীকল্যে? আসলেও কি কিছু করব আমরা?         দশটায় গরম পানি। আর বৃষ্টি নামলে, চারটায় বন্ধ গাড়ি। আর আমরা একদান দাবা খেলব, অপলক চোখে থাকব কড়া নাড়ার অপেক্ষায়। লিলের স্বামী সেনাবাহিনীর পাঠ চুকে দিলে, আমি বললাম, সোজাসুজি বলেছিলাম, আমি নিজেই তাকে বলেছিলাম, জলদি করো ভাই, সময় বেশি নাই আলবার্ট আসছে ফিরে, নিজেকে একটু রাখো প্রস্তুত করে। সে তো জানতে চাইবে, তুমি করেছ কি তার টাকার শ্রাদ্ধ দিয়েছিল যা দাঁত মেরামতে। সে চাইতেই পারে হিশেব, আমিও তো রয়েছি সাক্ষী। যাই করো না কেন লিল, ভালো দেখে একপাটি নাও কিনে, বলবে সে, নিশ্চিত, আমি তোমার দিকে পারছি না তাকাতে। আর আমিও পারি না, আমি বললাম, বেচারা আলবার্টের কথা ভেবে চার বছর ধরে সে আছে আর্মিতে, কিছুটা ভালো সময় চাইতেই পারে আর যদি তুমি তাকে না দাও, সে অন্যত্র যাবে, তাই নাকি, সে বলল। বললাম, তা নয় তো কী। তবে আমার জানা আছে কে ধন্যবাদ দেবে, আর সে বলল, আমাকে দ্যাখো জলদি করো ভাই, আর সময় নাই যদি তুমি পছন্দ না করতে, আমি বললাম। আর তুমি না পারলে অন্য কেউ করে দিতে পারে। আলবার্ট বিগড়ে যেতে পারে, তাই বলার রাখছি না বাকি তোমার লজ্জার কী আছে, আমি বললাম, হয়েছ তো বুড়ি (আর তার কেবল বয়স এক দেড়কুড়ি) আমি কিছুই পারব না করতে, বলল সে ব্যাদান মুখে এই দশা হয়েছে খেয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, সে বলল। (এর মধ্যে পাঁচটি হয়েছে, শেষবার জর্জ হতে তো গিয়েছিলাম মরে) ডাক্তার বলেছিল, এবার দাও ক্ষ্যামা, যথেষ্ট হয়েছে, তুমি আসলেই একটি গাধী, আমি বললাম। আচ্ছা, আলবার্ট যদি তোমাকে না ছাড়ে, বললাম, এতে কী করার আছে, কেন বিয়ে করেছিলে তবে, যদি বাচ্চাই না নেবে? জলদি করো ভাই, আর সময় নাই আচ্ছা, যে রোববার আলবার্ট বাড়িতে ছিল, তারা করেছিল গরম গ্যামন— আমাকেও ডেকেছিল রাতের খাবারে, গরম গরম কী যে মজা লেগেছিল জলদি করো ভাই, সময় নাই জলদি করো, সময় চলে যায় শুভরাত্রি বিল, শুভরাত্রি লু, শুভরাত্রি মে। শুভরাত্রি। টা টা। শুভরাত্রি। শুভরাত্রি। শুভরাত্রি, ভদ্রমহোদয়া, শুভরাত্রি, শুভরাত্রি মিষ্টি মেয়েরা, শুভরাত্রি, শুভরাত্রি।  

৩. অগ্নিবীণা


নদীর আশ্রয় গেছে টুটে: পত্রের শেষ আঙুলে আঁকড়ে ধরেছে বালি ভেজা তীরে। বাতাস বইছে পিঙ্গল পৃথ্বীর পরে, কেউ শোনে নি কোনোকালে। পরীরা গেছে চলে প্রিয়তমা টেমস, যাও মৃদু বয়ে, আমার গান যতক্ষণ না থামে। নদী বইছে না খালি বোতল, কুকড়ানো কাগজ নিয়ে, রেশমি রুমাল, কাগজের ঠোঙা, বিড়ির মোথা দিয়ে কিংবা গ্রীষ্মরাতের আর কোনো স্বাক্ষর। পরীরা প্রস্থান করেছে আর তার সখীরা, বসেছে নগরকর্তাদের বিচল সিংহাসনে; চলে গেছে ঠিকানাবিহীন। লেমনের পানির কিনারে বসেছি, আর ফেলেছি অশ্রুজল... প্রিয়তমা টেমস, যাও মৃদু বয়ে, যতক্ষণ না আমার গান থামে অবশ্য আমার পিঠে বাজছে ঠান্ডা হাওয়ার ধ্বনি হাড্ডিতে ধরছে কাঁপন, তামাশার হাসি ছড়ায় কানে কানে। একটি ইঁদুর শব্জির খেতে হামাগুড়ি দিয়ে চলে টেনে নিয়ে যায় ছোট পেটখানা নদীর সমতলে আমি যখন মাছ ধরছিলাম এই মরকুটে গাঙে শীতের সন্ধ্যায় গ্যাসহাউসের পিছে রাজার মনে ভেসে ওঠে আমার ভাইয়ের পরাজয় রাজায় ভাবনায় আমার পিতার মৃত্যু যেন অন্তত তার আগে হয়। শাদা দেহ নগ্ন রয়েছে নিচু স্যাঁতসেঁতে মাঠে আর হাড্ডিগুলো রাখা আছে ছোট্ট নিচু শুষ্ক চিলেকোঠায়, বছরের পর বছর কেবল ইঁদুর-দৌড়াদৌড়ি। তবে মাঝে মাঝে আমার পিঠে শুনি মোটরভেঁপুর ধ্বনি, নিয়ে আসবে সুইনিকে মিজ পোর্টারের কাছে, কোনো এক বসন্তে জ্যোৎস্নার আলো ছড়িয়েছিল মিজ পোর্টার আর তার তনয়ার পরে পদযুগল ধুতো তার সোডা-ওয়াটারে বাহ! শিশুদের সুরে গান বাজছিল গির্জার গম্বুজে চুক চুক চুক চুক জগ জগ জগ জগ জগ তাই রুক্ষ হতে বাধ্য তেরিউ অলীক শহর শীতের বাদামি কুয়াশায় মোড়া দুপুর বেলা মিস্টার ইউগেনিডেস, স্মর্নার বণিক খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, পকেট ভর্তি কিসমিস সি. আই. এফ লন্ডন: সব দলিলপত্র রয়েছে তার সাথে আমাকে ডাকলেন গেঁয়ো ফরাসিতে মধ্যাহ্নভোজে, ক্যানন স্ট্রিট হোটেলে পরের সপ্তাহ শেষের মেট্রোপোলে বেগুনি প্রহরে যখন চোখ আর পিঠ টেবিল থেকে তোলে, যখন মানব-ইঞ্জিন থাকে ট্যাক্সির মতো কম্প্রমান অপেক্ষায়, আমি তাইরেসিয়াস, যদিও অন্ধ, দুটি জীবনের মাঝে দুরুদুরু ধ্বনি ঝুলন্ত নারীবক্ষ নিয়ে এক বৃদ্ধ পুরুষ-রমণী, দেখতে পারি বেগুনি প্রহর, সন্ধ্যার ক্ষুৎকাতরতা ঘরফেরতা, মাঝিরা ফিরছে সমুদ্র থেকে ঘরে, চায়ের সময় টাইপিস্ট মেয়ে তার প্রাতঃরাশ টেবিল পরিষ্কার করে, আলো জ্বালায় তার চুল্লিতে, কৌটার খাবার বের করে। জানালার শার্শিতে উড়ছে তার পুরনো অন্তর্বাসগুলো শুকাচ্ছে অস্তগামী সূর্যের মৃদু তাপে রাতের শয্যা এলোমেলো ডিভানের পরে মোজা শেমিজ আর বক্ষবন্ধনী রয়েছে পড়ে। আমি তাইরেসিয়াস, বুড়ো মানুষ, কুঞ্চিত-বুক এই দৃশ্য ধরেছি হৃদয়ে, আর করেছি ভবিষ্যৎ-বাণী আমিও অপেক্ষায় ছিলাম প্রত্যাশিত অতিথির। সে তরুণ রক্তবর্ণ যুবক পৌঁছাল শেষে ছিল সে ক্ষুদ্র কোম্পানির কেরানি, উদ্ধত এক অধস্তন বসে যার আসনে যেন রেশমি টুপি ব্যাঙ্কফোর্ড কোটিপতিদের মাথায়। সময় এখন অনুকূলে, ভেবেছিল সে খাবার শেষ, মেয়েটি বিরক্ত ক্লান্ত, তবু তাকে জাগাতে চাইল সে প্রণয়-আদরে সেও দেয় নিকো বাধা, ইচ্ছা তার যদিও না-থাকা। অবাধ ছেলেটি ঝাঁপিয়ে পড়ল অবশেষে হাত দুটি ব্যস্ত তার বাধা না পেয়ে তার চেতনায় আছে মুদ্রাবিহীন খাওয়া উদাসীনতাই কাম্য তার কাছে (আমি তাইরেসিয়াস, এইসব যন্ত্রণা আমার জ্ঞাত কর্ম যা চলছে এই একই বিছানা বা খাটে যে আমি বসেছিলাম থেবিসের প্রাচীরের নিচে হেঁটে গেছি মৃত্যুর নিম্নতম দেশে।) একটি চূড়ান্ত চুমু দান শেষে আর তার পথ নিল খুঁজে সিঁড়িগুলো অন্ধকার বলে... মেয়েটি ঘুরল নিজেকে দেখল আয়নায় কেবল চলে গেছে তার প্রেমিক-প্রবর; তার মাথায় কী যেন এলোমেলো চিন্তার খেলা ‘ঠিক আছে, যা হবার হয়েছে: এতেই খুশি আমি, হয় নি বিপত্তি।’ যখন সুন্দরী নারী বোকামিতে মজে আর পুনরায় রাখে খুলে কক্ষের দ্বার, একা, হয়তো সে মসৃণ চুলে হাত রাখে নিজে নিজে আর কলের গান শোনে। ‘এই সঙ্গীত আমার কাছে এসেছিল ভেসে পানির ওপরে’ আর আমি একা রানি ভিক্টোরিয়া সরণিতে ও শহর, ও শহর আমি যে এখনো মাঝে মাঝে শুনি পাশে নিচু টেমস সরণিতে বাড়ে জনতার ধ্বনি আর ম্যান্ডোলিনে বেজে ওঠে রুনু রুনু ধ্বনি সেখানে জমায়েত জেলেরা অপরাহ্ণে: যেখানে ম্যাগনাস মার্টারের প্রাচীর রয়েছে দাঁড়িয়ে যেখানে আয়োনিয়ান মর্মর ও স্বর্ণের উজ্জ্বলতা। নদী-ঘর্মাক্ত তেল ও আলকাতরায় বজরারা ছোটে সামুদ্রিক স্রোতে লাল পাল বিস্তর অনুকূল বাতাসে ধায়, কাঁপে বজরার তল ধুয়ে যায় টেউয়ের আঘাতে ভাসমান কাঠের গুঁড়ি পৌঁছায় গ্রিনিচের কাছে ডগ-দ্বীপ ছেড়ে             ওয়েআলালালা লেইয়া             ওয়ালালা লেইলালা এলিজাবেথ ও লেইস্টার দাড় টানছে দেখা যাচ্ছে গলুই সোনালি আচ্ছাদন লাল আর সোনা আনন্দে উদ্বেলিত উভয় তীরে দক্ষিণ-পশ্চিমা বায়ু ভাটিতে ভেসে যায় স্রোতে ঘন্টার ধ্বনি শ্বেত গম্বুজ             ওয়েআলালালা লেইয়া             ওয়ালালা লেইয়ালা ‘ট্র্যাম আর ধূলিধূসর গাছগাছালি। আমাকে জন্ম দিয়েছিল হাইবেরি। রিচমন্ড আর কিউ নষ্ট করেছে অকারণে। রিচমন্ড তীরে তুলেছিলাম হাঁটু কর্মহীন ছিলাম বসে একটি সরু নৌকার মেঝেতে’ ‘আমার পদযুগল মুরগেটে, আর আমার হৃদয় রয়েছে পায়ের তলে। কাজ যা হওয়ার হয়ে গেলে শেষে কেঁদেছিল সে, প্রতীজ্ঞা করেছিল নতুন সূচনার।’ মন্তব্য করি নি আমি। করারই-বা কী আছে?’ মার্গেটের বালির উপরে আমি যুক্ত করতে পারি শূন্যতার সঙ্গে শূন্যতারই। নোংরা হাতের আঙুলের ভাঙা নোখ আমার লোক, অগণিত জনতা যাদের নেই কিছু যাচ্ঞা কিছুই না।’                     লা লা অবশেষে কার্থেজ পৌঁছলাম জ্বলে গেল পুড়ে গেল জ্বলে গেল পুড়ে গেল হে প্রভু তুমি কাছে ডেকে নাও আমায় প্রভু হে কাছে ডেকে নাও জ্বলছে সমানে।  

৪. জলকবর


ফিনিশীয় ফ্লিবাস, পক্ষকাল আগে মারা গেছে, ভুলে গেছে সামুদ্রিক চিলের ডাক, সাগরের স্ফীতোদর কিছুতেই নেই তার লাভক্ষতি আর                     গভীর সামুদ্রিক স্রোত গোপনে কুড়িয়ে নিয়েছে তার হাড়। যেহেতু সে ওঠে আর পড়ে জরা ও যৌবন তার গিয়েছে জীবনের তরে ঘূর্ণি স্রোতে পড়ে।                         কাটা কিংবা অকাটা তোমরা যারা ঘোরাচ্ছ চাকা বাতাসের গতিবিধি দেখে ভুলো না ফ্লিবাসকে, সেও ছিল তোমাদের মতো রূপবান, লম্বাটে।  

৫. বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি


ঘর্মাক্ত মুখে লাল বজ্রবাতি চমকানোর পরে বাগানে বরফশীতল নীরবতার পরে পাথুরে ভূমিতে সন্তাপের পরে কারাগার আর মুক্ত মাঠের প্রতিধ্বনি দূর পাহাড়ে শোনা যায় বসন্তের বজ্রবাণী যে ছিল জীবিত সে এখন মৃতপ্রাণ জীবন ও মৃত্যুর সামান্য ব্যবধান এখানে পানি নেই আছে শুধু নুড়ি পাথর পানিবিহীন আর বালিময় পথ চলে গেছে এঁকেবেঁকে দূর পর্বত পাথরের পাহাড় সেখানেও নেই পানি আর পানি পেলে আমরা ঠিক থেমে করতাম পান শুষ্ক পাহাড়ে নেই কারো থামার টান ঘামও শুকিয়ে গেছে বালিতে আটকানো পা পাথরের মধ্যে যদি যেত পানি পাওয়া মৃত পাহাড়ের মুখে ক্ষয়িত দাঁত দেবে কি সন্ধান এখানে কেউ পারবে না দাঁড়াতে, বসতে, করতে অবস্থান এই গিরিকন্দরে নেই কোনো নীরবতা কেবল শুষ্ক বজ্রধ্বনি নেই বৃষ্টির বারতা এমনকি এখানে নেই পাহাড়ের নির্জনতা বরং রয়েছে লালা ফোলা মুখের উপহাস ক্রুরতা আসছে চৌচির মাটি ঘেরা ঘরের দরোজা থেকে                     তবু যদি থাকত পানি আর না থাকত পাথর পাথরও যদি থাকত তবু যদি সেখানে পাওয়া যেত পানি আর পানি এক বসন্ত এক পাহাড়ি ঝর্না আর সেখানে যদি থাকত পানির কল্লোল কেবল ঝিঁঝিঁর একঘেয়ে ডাক শুনতে হতো না শুকনো ঘাসের খসখস স্বর যদি বয়ে যেত ঝর্নার কুলুধ্বনি থাকত যদি দেবদারু বনে ময়নার কানাকানি টুপ টাপ টুপ টাপ টপ টপ টপ টপ হায়! এখানে তো পানি নাই কে সেই তৃতীয়জন আমার পাশে যে হাঁটে সর্বদা? অথচ যখন গুনি, তখন দেখি তুমি আর আমি রয়েছি সদা তবে যখন আমি তাকাই শুভ্রপথের দিকে দেখি আরো একজন হাঁটছে আমার পাশে আমি জানি না, সে কি নারী না পুরুষ কিন্তু কে সে-জন, যে তোমার অন্য পাশে হাঁটে? বাতাসে বাজে কিসের হৈচৈ বাজে কি তবে মাতুলের বিলাপ-ধ্বনি কারা এইসব মুখ ঢাকা যাযাবর চলে সীমাহীন সমতলে, টক্কর খায় চৌচির মৃত্তিকায় চারপাশে কেবল ছাদহীন দিগন্ত কিসের শহর পর্বতগাত্রে ফাটছে, বুজছে আর ছড়িয়ে যাচ্ছে বেগুনি বাতাসে পতিত মিনারগুলো জেরুজালেম এথেন্স আলেকজান্দ্রিয়া ভিয়েনা লন্ডন পরাবাস্তব সুন্দরী এক কষে বাঁধছে পশ্চাতে তার লম্বা কালো চুল আর বেহালার ফিসফিসে সুর বাজছে এইসব তন্ত্রিতে আর বেগুনি বাতাসে বাদুর বাজায় বাচ্চামুখের শিস, আর তারা ডানাগুলো ঝাপটায় কালো প্রাচীরের নিচের দিকে উল্টানো তাদের মাথা আর বাতাসে উল্টানো ছিল গম্বুজগুলা স্মৃতির ঘণ্টা বাজছে, যা রাখত হিশাব সময়ের কণ্ঠস্বরে সুর বাজছে খালি চৌবাচ্চা আর পানির কলে গিরিকন্দরের এই ক্ষয়িষ্ণু গুহায় ধূসর জ্যোৎস্নায় তৃণেরা গান গায় ছড়ানো ছিটানো কবরগাহে গির্জার কাছাকাছি গির্জাটা রয়েছে শূন্য কেবল বাতাসের ঘরবাড়ি। বাতাসবিহীন দরোজায় কম্পন শুষ্ক হাড্ডি ক্ষতির কারণ নয়। কেবল একটি মোরগ দাঁড়িয়ে চিলেকোঠার ছাদে ডাকে কুক্কুরুকু কুক্কুরুকু বিদ্যুতের হঠাৎ ঝলকানিতে। অতঃপর দমকা হাওয়ায় বৃষ্টি বয়ে আনে গঙ্গা ছিল চড়ায়, আর নিস্তেজ পল্লবে ছিল বৃষ্টির অপেক্ষায়, আর তখনই কালো মেঘ জড়ো হয় দূরান্তে, হিমাভন্তের পরে নেতানো জঙ্গল আর নীরবতার কুঁজ। তাই বজ্র বলে ওঠে দত্তা: আমরা কি কিছু দিয়েছিলাম? বন্ধু আমার, হৃদয়ের রক্ত করে তোলপাড় এক মূহূর্তের সমর্পণের মারাত্মক দুঃসাহস ফিরিয়ে নিতে পারে না কখনো বিচক্ষণতার কাল এইসব কেবল এইসব দিয়ে আমরা রয়েছি টিকে এইসব যাবে না দেখা আমাদের স্মরণসভার কালে কিংবা আমাদের স্মৃতি ঢেকেছে এই মাকড়সার জালে কিংবা শীর্ণ-আইনজীবীর ভাঙা সিলমোহরের তলে আমাদের শূন্য কক্ষে দয়ধ্বম: আমি শুনেছি এই চাবির কথা দরোজা ঘোরাতে পারে খুলতে একবারই আমরা সবাই এই চাবি নিয়ে ভাবি, প্রত্যেকে আছে তার নিজ গরাদে চাবির চিন্তা প্রত্যেকের নিশ্চিত গরাদবাস কেবল রাত্রি নেমে এলে বাতাসে ছড়ায় গুজব এক মুহূর্তের জন্য পতিত কোরিওলেনাস পুনরায় জেগে ওঠে দাম্যত:  নৌকা উঠেছিল দুলে অবাধ, পাল ও আর গলুই যাচ্ছিল দেখা নিপুণ করতলে সমুদ্র ছিল শান্ত, তোমার হৃদয় দিয়েছিল ইঙ্গিত আনন্দে, যখন ডাকতে, বাঞ্ছিত আঘাতে ডাকতে দক্ষ হাতের ইশারায়                     আমি বসে ছিলাম তীরে ছিলাম মৎস্যশিকারে, পেছনে ছিল উষর সমতল আমি কি চাইব না অন্তত আমার দেশ চলুক সঠিক নিয়মে? লন্ডন ব্রিজ ভেঙে পড়ছে ভেঙে পড়ছে ভেঙে পড়ছে তাই আমার প্রার্থনা প্রভু যত পুণ্যের বিনিময়ে যেসব নির্দেশ রয়েছে লেখা তোমার আসমানে আমার বেদনার সময় আঁকা থাকবে সেইখানে এই সব খড়কুটো আমাকে করেছিল রক্ষা ডুবে যাওয়া থেকে তোমার কিছু একটা হবে নিশ্চয়। হিয়েরোনিমো গিয়েছে আবার উন্মাদ হয়ে। দত্ত। দয়ধ্বম। দাম্যত।            শান্তি    শান্তি    শান্তি
মজিদ মাহমুদ

মজিদ মাহমুদ

জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৬৬, পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার চরগড়গড়ি গ্রামে। এম.এ (বাংলা),...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা