বর্তমান বাংলা সাহিত্যে পুরুষকারের অভাব রয়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজ মিলে যা নির্মাণ করেছে—অধিকাংশ কবি তারই সহকারীর ভূমিকায় রত আছেন। খুব কম ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তোলা হচ্ছে—এ সবের উদ্দেশ্যবাদিতা কেবল ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থের দ্বারা অন্যকে পীড়ন কিনা। লেখা বিষয়টির প্রতি আমরা যতই মহার্ঘ্য দান করি না কেন তা কবির সময়ের সংঘাতের ফলাফল ছাড়া কিছু নয়। যদিও আমরা প্রায়ই বলে থাকি—কবিকে কালোত্তীর্ণ হতে হবে। কিন্তু কালোত্তীর্ণের শাব্দিক প্রপঞ্চ কবির জন্য প্রায়ই প্রবঞ্চনার কারণ হয়ে থাকে। তেমনি যে সব আপাত নিরপেক্ষ বস্তুসমূহ একজন লেখককে প্রবুদ্ধ করে থাকে সে-সবও পরিণামে সৃষ্টিশীল সত্তাকে সহায়তা করতে পারে না। কারণ একজন লেখককে প্রথমত তার নিজের সত্য আবিষ্কার করতে হয়। যারা নিজের সত্য আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হয়—তারা নিজ সমাজের গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত সত্যকে আঁকড়ে ধরতে চায়। নিজের কাছে সত্য বলে প্রতিভাত না হলে অনুরাগ বা বিরাগের শক্তি পাওয়া যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সত্যকে নিয়ন্ত্রণ করে এমন কিছু কর্তৃপক্ষ যার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়া সাধারণ লেখকদের পক্ষে হয়ে ওঠে না। ফলে একটি ভীতিময় পুরস্কারের ইশারা তাকে পরিতৃপ্তি দিয়ে থাকে। যেমন লোকনিন্দা, নিরস্তিত্ব হবার আশঙ্কা, পুরস্কার প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা পেয়ে বসে। তবু এমন সাহিত্য-লেখকের কদাচিৎ দেখা মেলে যারা জীবনের শুরুতেই নিজের পরাময়ু দর্শনে সামর্থ্য হয়েছে। আমার মনে হয় ‘ব্রাত্য রাইসু’ সেই স্বল্পসংখ্যক সত্যদর্শী লেখকের অন্যতম। যিনি লেখক জীবনের সূচনা পর্ব থেকে নিজের পথে পরিচালিত হয়েও নৈরাজ্যকে নিজের অন্বিষ্ট ভাবেন নি।
বর্তমান ঢাকায় অনেক কবি-সাহিত্যিক আছে কিন্তু রাইসু আছে একজনই।
লেখক জীবনের শুরুতে অনেকের মধ্যে নিজের নাম গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ করা গেলেও রাইসুর জন্য তার অন্য রকম মানে রয়েছে। কারণ ব্যাপ্টাইস্ট হওয়ার পরে যেমন আলাদা আচরণের প্রয়োজন হয়ে পড়ে রাইসুর জন্য ‘ব্রাত্য’ হওয়ার পিছনে তার ভবিষ্যৎ লেখক পরিকল্পনার ইঙ্গিত বহন করে। আমার বিবেচনায় রাইসু যতখানি লেখক ততখানিই মিশনারি। কেবল আনন্দ সৃষ্টি তার রচনার অনুবর্তী নয়। তার নিজের নাম গ্রহণ, পোশাক পরিধান, শব্দ-নির্বাচন ও ক্রিয়াপদের ব্যবহার—সব কিছুর মধ্যেই রয়েছে আনুগত্যহীনতার শক্তি। মানুষের জীবন নানাভাবে দাসবৃত্তির শিকার। এটি কেবল রাষ্ট্রের আইনি ধারণার মধ্যেই সত্য নয়, এটি ব্যক্তির চিন্তার মধ্যেও প্রবিষ্ট। যেমন ভাষার প্রশ্নে রাইসু একত্ববাদিতায় বিশ্বাসী নয়। বাঙালির ভাষা কোনো একটি অর্জনের দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে—এই প্রস্তাবনা রাইসু মানতে নারাজ। তাই ভাষার সজীব চঞ্চলতাকে তিনি ধরে রাখতে চেষ্টা করেন। তার ভাষা যেমন গ্রন্থ দ্বারা আক্রান্ত নয়, আবার উপভাষার সীমাবদ্ধতার দ্বারা আবিল নয়। রাইসু একই সঙ্গে বিষয় ও ভাষার দাসত্ব থেকে ভাবকে মুক্তি দিতে চেষ্টা করেন। তার মানে এই নয় রাইসুর ভাষা তথাকথিত মান ভাষায় স্থিত হয়েছে কিংবা তিনি তা পাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব। আসলে ভাষা ও সাহিত্যকে জীবনের বাইরে যে গুরুতর রূপ দিতে সাহিত্যিকগণের মরিয়া প্রকাশ রাইসু তার সঙ্গে একীভূত নয়। একটু উপহাস, একটু উইট, একটু লঘুতার মাধ্যমে তিনি সাহিত্যের সিরিয়াসনেসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চান। আর এসবই রাইসুর সঙ্গে মানিয়ে গেছে।
রাইসু তার অভ্যাস ও পোশাকের দাসে পরিণত না হয়ে তার সকল শৈলীকে অনুগত করার চেষ্টা করেছেন। তার স্টাইল এতটাই তার নিজস্ব যে অন্য কেউ তা করতে গেলে হাস্যকর হয়ে উঠতে পারে। ঢাকার সাহিত্যঙ্গনে রাইসুকে আমার গোঠের রাখালের মতো মনে হয়। রাইসু সারাক্ষণ সজাগ থাকেন, লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, মুখ দিয়ে হেঁট হেঁট করেন, বাঁশি দিয়ে গান তোলেন—আবার বাঁশিকে বাঁশাবাঁশি করতেও তার দেরি হয় না। আমার মনে হয়, বর্তমান ঢাকায় অনেক কবি-সাহিত্যিক আছে কিন্তু রাইসু আছে একজনই। রাইসুর কবিতা নিয়ে অনিকেত শামীমের ‘লোক’ পত্রিকায় নব্বইয়ের কবিতা আলোচনায় কয়েক ছত্র লিখেছিলাম সেটিও এই লেখার সঙ্গে যুক্ত করে দিলাম :
‘নব্বইয়ের কবিতার কিছুটা অহংকারী, দ্রোহী ও স্বতন্ত্র স্বর নির্মাতা ব্রাত্য রাইসু। কবিতা রচনার জন্য যে ধরনের সাহস ও আবিষ্কার প্রবণতার প্রয়োজন—রাইসুর মধ্যে তা আছে। সমকালীন ভাষা ও বিষয়ের ধারণাকে মান্য না করেই তিনি কাব্য রচনায় ব্রতী হয়েছেন। ভাষা ও বিষয়ে রাইসু কতখানি আলাদা তা হয়তো বলা যাবে না; হয়তো তার কবিতার ভাষার ধূম্রজাল থেকে মুক্তি দিলে বিষয় গৌরবের মাহাত্ম্য কিভাবে টিকে থাকবে তার বিচার যদিও সম্ভব নয়। আবার যে ভাষাকে তিনি কবিতার ভাষা হিশাবে মান্য করতে চেয়েছেন তার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত না হলেও বাংলা কবিতায় এর উদাহরণ বিরল নয়। কিন্তু রাইসুর ইউনিকনেস হলো, প্রচলিত ভাষা কাঠামো ও বোধকে চ্যালেঞ্জ করেও টিকে থাকার ক্ষমতা; এবং তার সমসাময়িক কবিতা পাঠককে বুঝিয়ে দেয়া—আমাকে উপেক্ষা করবার উপায় নেই।
রাইসু কবিতায় প্রচুর স্ল্যাং ব্যবহার করেছেন; আর এই স্ল্যাং তার পাঠকের সঙ্গে এক ধরনের সংহতির প্রকাশ করেছে।
গদ্যের ভাষা নিয়ে যে বিতর্ক ফোর্ট উইলিয়ামের কাল থেকে চালু আছে; কোনটি আসলে বাঙালির ভাষা হওয়া উচিত ছিল; ইংরেজ নির্দেশিত পথে নাকি সমকালীন জনজীবনের চর্চিত আলালী ভাষার ভেতর। রাইসুর মনোগঠনে সেই প্রবস্তবনা কতটুকু দৃঢ় প্রথিত—সেই বিবেচনার বাইরে তিনি তার প্রায়োগিক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। অবলীলায় বলতে পেরেছেন, কালিদাসের লগে মেঘ দেখতেছি; অথচ এই বাক্যটি তার শতাধিক বছর আগে পোস্টমাস্টার গল্পে বলেছিলেন, ‘আজ সন্ধ্যায় কালিদাসের সঙ্গে এঙ্গেজমেন্ট করা গেল।’ রবীন্দ্রনাথের স্বপ্ন ছিল কালিদাস হওয়ার। কিন্তু কালিদাসের ভাষা রবীন্দ্রনাথ গ্রহণ করেন নি। বলেছেন, ‘সে ভাষা ভুলিয়া গেছি।’ এই ভাষা ও শ্রেণি কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসা, কিংবা উপেক্ষা করার ক্ষমতা রাইসুর মধ্যে বরাবরই লক্ষ করা গেছে। বাংলার লোকজীবন ও বাউলিপনার সহজ প্রকাশ রাইসু তার নাগরিক জীবনের মধ্যে চারিয়ে দিয়েছেন। রাইসুর এসব হয়েছে কিনা-র চেয়ে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি তার পাঠকদের এসব মান্য করাতে পেরেছেন, এবং এ সময়ের কবিতার একটি ধরনের নির্মাতা হিশাবেই নিজেকে ধরে রেখেছেন। তবে এ কথাও সত্য তার ভঙ্গিটির প্রকাশ ও অনুষঙ্গ অপ্রতুল হওয়ায় হেলায় হারিয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। তার দুএকটি চরণ এখানে উদ্ধৃতি করা হলো, যদিও তার কবিতা চরণের সৌন্দর্যে বন্দি নয়।
১. ভঙ্গিতে যার সাধন হইল শিল্প জীবন
২. কে কে আসছে ঘরে বলো কে কে আসছে ঘরে আর
৩. কুকুর ও ঠাকুর আসছে একটি একটি করে
৪. পোষা বারান্দা পোষা বারান্দ/ ঘুরছেন মোর ক্যান চারপাশে
৫. তাই ভাই মডারেট তাই ভাই সাচ্চা সেক্যুলার
রাইসু কবিতায় প্রচুর স্ল্যাং ব্যবহার করেছেন; আর এই স্ল্যাং তার পাঠকের সঙ্গে এক ধরনের সংহতির প্রকাশ করেছে।’ এতেই বোঝা যায় তিনি একা নন, তিনি মৃত নন।
রাইসু আজ পঞ্চাশ বছরে পা রাখছেন। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তার জন্য এ বয়স মানানসই নয়। কারণ রাখাল বুড়ো হয়ে গেলে কেবল গরুগুলোই সীমানা পেরুবে না, রাধারাও বৃহন্নলার ঘরে বন্দি হয়ে থাকবে।