ফজলুল কবিরীর কবিতাগুচ্ছ

সংক্রান্তির জলে ভেসে যাই

১ নেই কোনো ঘুমের মন্ত্রণা তার চোখে তাই জোছনার ওমে জমা করে ভোর বুদ্ধের কিশোর শিষ্য এক—এই ফাঁকে মাথার খুলিতে তার মগ্নতার ভার যে-ঘরে লুকিয়ে আছে এই ঘনশ্যাম নির্জন বুদ্ধের শিষ্য, সে-ঘরেই সঁপে সে তার আনত দেহের ভার, নিষ্কাম বুনে চলে ফসলের বীজ—বিপ্রতীপে লেকের বাতাসে ওড়ে মায়াবী বাবল জেগে থাকে একা করুণানন্দ শ্রমণ সাধকের ঘর আজ আলোয় উচ্ছল দূরের পাহাড় সারে পরমায়ু স্নান ২ জলের ঘোমটা সরিয়ে পাহাড়ি রোদ নামে রাজার বাড়ির ছাদে—নিরুচ্চার যারা জানে ভুলেছে তারাই ফের—মেদ জমেছে তাদের লতাকুঞ্জময় দেহে শরীরে আগুন জ্বলে জলের কল্লোলে মৃত্যুর মতন মেঘ কেন তবু ওড়ে? রোদ ওঠে—তবু মৃত্যুমেঘ চোখ মেলে ভেসে যাওয়া খড়কুটো দেখে আনমনে যারাই ছড়ায় আলো পুণ্য ও মঙ্গলে বিলায় ফুলের মধু ঈশানে-নৈর্ঋতে আঁধারে কুয়াশা ঝরে তাদের  ভূগোলে জলের অতলে রাজা কার কথা ভাবে? ৩ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছড়িয়েছে যারা বুদ্ধের সুবাস, তাদের মাড়িয়ে যায় একপাল হাতি—সাধকের ছদ্মবেশে সবুজ টিলায় কারা ঘুরপাক খায়? রাজার ঘুমের ঘোরে মৃতপ্রায় জল উঁকি মারে সংক্ষোভে—বুদ্ধের শিবিরে জলের গভীরে রাজা আড়মোড়া ভাঙে দেখে—বিষজলে নেয়ে ছোটে মেঘ দূরে পায়ের পাতায় জমে পরিযায়ী বিষ ফুলের সৌরভে তবু নেশার ফোয়ারা সন্ধ্যা নামে অবশেষে পর্যটক জলে রাতের সুঘ্রাণে কাঁপে অন্ধ শুকতারা  

প্রণতিগুচ্ছ

১ সরে থাকি গোপন বেদনা থেকে—দূরে বিষাদ ও বিস্ময়ের পুলসিরাতের ওপারে তোমাকে দেখি, উঠে আসো নিষিক্ত বিষের ঘূর্ণিপাক ভেদ করে গোপনে লিখে রাখো                         রক্তহীম বেদনার সারাৎসার তোমার লীলার রক্তিম আঁচড় আগুনের আঁচ পেয়ে হয়ে ওঠে বিষ দেখি—ছড়িয়ে পড়ছে ঘৃণার গভীরে জমে ওঠে আরক্ত জিবের কোণে ফোঁটা ফোঁটা রক্তের হাহাকার গোপনে লিখে রাখি                         তামাম বিষের হইচই দূরের দূরতম রেখায়                 থির হয়ে আছে প্রণয়ের ঘোর অভিশাপ ২ বহুদিন প্রণয় নেই, প্রণতি তবু রেখে যাই ফসলের ভোজে, অঘ্রানে কী কথা বলেছিল কুমারখালী বিল মাটির গোপন ঘরে—ইঁদুরের উৎপাতে কী বিষ ছড়িয়েছিল মফজল চাষা কোথাও পাই না খুঁজে, সদুত্তর তবু লিখে রাখি ফলনের ভার দাঁড়িয়ে থাকি, প্রতীক্ষায় কোথাও পাই না খুঁজে তোমার মুখের ছায়া ফুলে ওঠা, পুঁজে গলা নগরের বিলবোর্ড পেরিয়ে দাঁড়িয়েই থাকি—মানুষের ভিড়ে দেখি থাকে না গোপন কিছুই জিইসি মোড়ের কাছে শুধু বিলবোর্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ে আদিম রস—নোয়ানো কাঁধে ৩ দাঁড়িয়ে থাকি, তোমার প্রণয় থেকে খানিকটা দূরে উঁকি দিয়ে দেখি জানলা গলিয়ে ছুটে—বেদনার ভার ভেসে যাচ্ছে প্রণয়ের দাগ                         সরে যাচ্ছে দূরে আড়ষ্ট প্রেমিকার গোপন চুমুর গ্লানি চুরি করে দেখি একটি চোখ নিয়ে যায় চিল একটি চোখ ভেসে যায় জলে তবু প্রণয়ের স্বাদ লেগে থাকে                                 রসভর্তি মানুষের চোখের তারায়—জিভের ডগায় রক্তের গোপন ইশারায়  

নিসর্গ ও প্রার্থনার কবিতা

১ ঐ দূর নির্জন দুপুরে মাপছি শোকের পথ শুকনো ঘাসের উপর ছড়িয়ে আছে সেই ঘ্রাণ কেমন উদাস বাতাস ভাসিয়ে নিচ্ছে তোকে তুই কি নিবি না আমাকেও? কতদিন দিয়েছি এ-পথ পাড়ি সবকিছু ছেড়ে-ছুঁড়ে পালিয়েছি গণিকার গৃহ ছেড়ে— মনে পড়ে? নিষ্ফলা বনের শিরা মেপে মেপে—একদিন প্রতিবেশী বাতাসের শোক বুকে নিয়ে আমিও কি হই নি প্রেমিক                         বাড়ন্ত দিনের? তুই  তো জানিস এই ঘোর মিনতির কালে পথ শুধু মাপি ভুল শুধু কাছে ডাকি—মৃত্যুসুধা পান করি যাই থাক বিরহ ও বেদনার মূল্য ২ কুয়াশায় ভোরের নোলক গেঁথে কে যেন যায় পা টিপে-টিপে—বাতাসে বোনে বিষণ্ন নিশ্বাস সবুজ মাটিতে চাপা এই গুপ্তলিপির ভাষা ভেসে আসে হাওয়ায় হাওয়ায় কত পথ পেরিয়ে এলাম—নিসর্গের খোঁজে আজও এসেছি এমনই গভীর এক অচেনা সবুজে জানিস কোথায় এই জুম-ঘর? সুয়ালক পাহাড়ের কোলে যে-সোনালি ধানের সৌরভ ভেসে আসে পলকা-বাতাসে গড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ের খাদে সে-ই ঘ্রাণ করছে মাতাল তোকে? আমাদের ফেলে আসা পথের ক্ষয়িষ্ণু দাগ ইশারায় ডাকছে আমাকে—কেমন আকুল স্বরে আজই কি নয় সে-সুবর্ণ দিন মৃত্যুরও অধিক কোথাও পৌঁছে যাওয়ার? ৩ ঘুমোতে যাই না আমি প্রতিদিন তবু ভোরবেলা জেগে উঠি টবের সবুজ ফুলগাছে মৃতপ্রায় হলুদ পাতার ঘ্রাণ শুঁকি দেখি—যেসব ফুলের গাছ কখনও পায় নি রোদের আস্বাদ যাদের জিবের ডগায় কখনও লাগে নি বৃষ্টির ফোঁটা তাদের হলুদ পাতা কখনও গায় নি বর্ষার গান বেঁচে থাকা তাই মৃত্যুরও অধিক নিয়তি তার—নগরের কোলাহলে ৪ মৃত কাছিমের দেহে বালু জমে একদিন জেগেছিল চর সমুদ্রের দেশে কখনও পড়ে নি মানুষের পদচ্ছাপ কখনও নামে নি মানুষ সে-জলে পর্যটক বেশে তারপর একদিন— আকাশে উড়তে থাকে শাদা পরিযায়ী পাখি সমুদ্রে নামায় বারুদের বৃষ্টি শত শত ডিম ভেসে এসে ঠাঁই নেয় চরে সমুদ্র পাড়ের কাঁকড়ার দল দু-হাতে কুড়িয়ে নেয় সেইসব বারুদের ডিম তাদের মাতাল দেহে উল্কি হয়ে গেঁথে যায় স্যাঁতসেঁতে বারুদের দাগ সেই থেকে সমুদ্রের চরে যাদের শরীরে লেপ্টে গেল উল্কির কালিমা নোনতা বাতাসে যারা পেয়েছিল বারুদের  ঘ্রাণ তাদের স্মৃতির কোনো দাগ রাখে নি কেউ—এই চরাচরে
ফজলুল কবিরী

ফজলুল কবিরী

জন্ম ৯ অক্টোবর ১৯৮১; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ও...বিস্তারিত