কবিতার জাদুবাস্তব

‘কবিতার সঙ্গে আদিম মন্ত্র ও ইন্দ্রজালের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন কবি জফির সেতু। তিনি বলতে চেয়েছেন, এই সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও অনপনেয়―নানান রূপান্তর স্বীকার করেও এটি সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত ক্রিয়াশীল। চিন্তা-উদ্রেক করে লেখাটি, পাঠকের সহৃদয় পর্যালোচনাও দাবি করে।’

—সম্পাদক

কবিরা অসম্ভবের আকাঙ্ক্ষা করেন কেন? জন কিটসের কবিতা প্রসঙ্গে টমসন এ-রকম একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন। প্রশ্নের সঙ্গে জবাবের কৌতূহলটিও তিনি সংবরণ করতে পারেন নি। উত্তর দিয়েছিলেন নিজেই, ভিন্নভাবেই। জর্জ টমসন জোর দিয়ে বলেছিলেন, অসম্ভবের আকাঙ্ক্ষাই কবিতার প্রধান ভিত্তি। এমনটা যদি হয় তাহলে মানুষের জৈবপ্রবৃত্তি ও আদিমানবের মনস্তত্ত্বের সঙ্গে কবিতার জন্ম-ইতিহাস সম্পর্কিত হয়ে পড়ে। সম্পর্কিত হয়ে পড়ে ভাষার জন্মরহস্যও। কেননা ভাষাই হচ্ছে কবিতার পদধ্বনি। এই পদধ্বনিতে মানুষ বোধ অর্জন করে, সঙ্গে কবিত্বও। সুতরাং ভাষার বিবর্তন ও কবিতার বিবর্তন একসূত্রে গাঁথা।

মানুষেরই আকাঙ্ক্ষা আছে, আর জীবন হচ্ছে আকাঙ্ক্ষার মূলে। মানুষের সকলপ্রকার আকাঙ্ক্ষা জীবনকে কেন্দ্র করেই। আবার মানুষের এই জীবনটা হচ্ছে এক বাঁচার লড়াই। সেদিকটা দেখলে জন্ম থেকেই মানুষের আকাঙ্ক্ষাকেও লড়াই করতে হচ্ছে। এই লড়াই বিরুদ্ধ পরিবেশের সঙ্গে, বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে। সুতরাং মানুষ নিজেকে ও তার আকাঙ্ক্ষাকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে সচেতন-অসচেতনভাবে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। তার ভেতরে কাজ করেছে নানারকম চেতনা। মানুষের এ-সব আদিম চেতনার মধ্যে ধর্ম, মিথ প্রভৃতি চেতনা প্রধান। উল্লিখিত দুই চেতনার মতো ঐন্দ্রজালিক চেতনাও আদিম মানুষের একটি অলৌকিক অভিব্যক্তি। মিথ ও ধর্মকৃত্যের সঙ্গে এ-ধরনের আদিম চেতনার অভিব্যক্তি কবিতার জন্মরহস্যের যে-আধার তা কেউই আর অস্বীকার করতে পারেন না। অনেকের অভিমত এমনই কঠোর যে, তারা মনে করেন কবিতা নিজেও একধরনের ইন্দ্রজাল। কবিতার ধ্বনিবিন্যাস, ছন্দস্পন্দন, সুর প্রভৃতি এ-ইন্দ্রজালের উপরিকাঠামো। অবশ্য এসব মতামতের পেছনে বেশ যুক্তিও প্রয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু কবিতার যে অন্তঃশীলা ভাব কিংবা তার দ্যোতনা, তাতেও কি কম ইন্দ্রজাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে?


কবিতা আত্মস্থ করেছে প্রতীকধর্মের অন্তর্নিহিত গুণ। এমনকি কবিতায় কবি শব্দে ব্যক্তিগত যে-অর্থ আরোপ করেন তা ওই আদিম চেতনার সম্প্রসারণ বই নয়।


বেদে কবিতা বলতে বুঝান হতো শ্লোককে। ‘শ্লোক’ আবার একধরনের মন্ত্রও। সহজকথায় যেটা দাঁড়ায়, মন্ত্র হচ্ছে ইন্দ্রজালের কবিতা। অর্থাৎ ইন্দ্রজাল থেকে কবিতার উদ্ভুত হয়েছে। বলা যেতে পারে আধুনিক কবিতা ইন্দ্রজালেরই বিবর্তিত রূপ। ইন্দ্রজালের সঙ্গে যেমন মন্ত্র জড়িত ছিল, তেমনি ছিল নৃত্যেরও সদ্ভাব। আদিতে মন্ত্র, ইন্দ্রজাল ও নৃত্য একাকার ছিল। আর এ-সবের সঙ্গেই অনিবার্যভাবে নিত্যতা ছিল ধর্ম ও ধর্মকৃত্যের। কবিতার রহস্যের অন্তরালে এ-সব আদিম অনুভব ও প্রেরণার যে যুগপৎ প্রভাব আজও কবিতার দেহ ও আত্মায় লেগে আছে।

ওঝানৃত্য ও মন্ত্র যে বিশেষ ধরনের নৃত্য ও কবিতা তা আজ অস্বীকার করার উপায় নেই। আধুনিক নৃত্য ও কবিতার সঙ্গে এদের ফারাক শুধু তাদের অতিলৌকিক প্রলেপের কারণেই। এই ফারাকের মাধ্যমটা যে ইন্দ্রজাল তাও কারও অজানা নয়। একজন ওঝা রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রের সুর চড়াতে থাকেন, বাড়তে থাকে নৃত্যের তাল, তিনি উন্মাদ হয়ে যান একসময়। পরনের কাপড় খুলে ফেলেন। সেই কাপড় বা আড়াই হাত গামছাই মন্ত্রের সঙ্গে হয়ে ওঠে ইন্দ্রজালের উপকরণ। রাতের শরীরে হতে থাকে ইন্দ্রজালের বিস্তার। দর্শককে তিনি করে তোলেন মোহমুগ্ধ। দর্শক চোখ দিয়ে অনেক কিছুই দেখতে থাকে। আড়াই হাত গামছা হয়ে যায় আড়াই হাত সাপ। রোগীকে যে-সাপ কামড়েছিল। অথবা, গামছা উড়ে গিয়ে ধরে আনে খোদ সাপকেই। যেমনটাই ঘটুক আদপে ওঝা মনসামঙ্গলের পালাই গাইছিলেন। কিন্তু কবি ও শ্রোতার ধারণায় ছিল আদিম ঐন্দ্রজালিক চেতনাটি। ওইখানে ওঝা কবি ও ঐন্দ্রজালিক দুই-ই। মন্ত্রের মাধ্যমে তিনি অপশক্তির বিরুদ্ধেই লড়েন, দর্শক-শ্রোতা যোগান সাহস-শক্তি-সমর্থন। মন্ত্র বা ইন্দ্রজাল তার অসম্ভব সাধনার সোনারকাঠি রূপারকাঠি।

বিবর্তনের ইতিহাসে মানবশিশু সত্যিই অসহায় ছিল। প্রকৃতির প্রত্যেকটি শক্তিই ছিল তার বিরুদ্ধ। এই বিরুদ্ধ শক্তিগুলোকে সে জয় করতে চেয়েছে, করেছে। পূর্বে বলেছি এই জয়ের ইচ্ছাটাই মানুষের আকাঙ্ক্ষা। মানুষ আত্মরক্ষা করেই দমে যায় নি, যাদের হাত থেকে আত্মরক্ষা করেছে তাদের বশে আনতেও চেয়েছে। শিকার ও কৃষিযুগে মানুষ এইসব অগ্রযাত্রার পথিক হয়। প্রকৃতির দুর্জ্ঞেয় ও নিষ্ঠুর লীলাকে সাধ্যমত বশে আনার কৌশল তাকে অনুসন্ধান করতে হয়েছে নানাভাবে। এরূপ অনুসন্ধানের প্রধান অভিব্যক্তি ছিল ইন্দ্রজাল। মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধলীলার ওপর উচ্চতর শক্তি প্রয়োগ করার কৌশল আবিষ্কার করতে শিখল। দমন করতে চাইল বিরুদ্ধ শক্তিকে। সে যত বড় শক্তিই হোক না কেন। মৃত্যুই মানুষের ধ্রুব ও আকাঙ্ক্ষানাশের চরম শক্তি। মানুষ মৃত্যুকেও দমন করতে চাইল অদ্ভুত প্রক্রিয়ায়। এইসব ইন্দ্রজালে টোটেম চিহ্ন যেমন সম্পৃক্ত ছিল, তেমনি ছিল ধর্মকৃত্য ও নানাধরনের বিশ্বাস। এখনো আমরা শিকারে যাবার আগে তন্ত্র-মন্ত্র ও খেতের পোকানাশে মানুষের মাথার খুলি ব্যবহার করতে দেখি। আসলে এসবই ইন্দ্রজালেরই প্রতীক। কবিতায় প্রতীক এসেছে এ-প্রক্রিয়ার পথ ধরেই। কবিতা আত্মস্থ করেছে প্রতীকধর্মের অন্তর্নিহিত গুণ। এমনকি কবিতায় কবি শব্দে ব্যক্তিগত যে-অর্থ আরোপ করেন তা ওই আদিম চেতনার সম্প্রসারণ বই নয়। সাধারণের শব্দার্থকে দুমড়েমোচড়ে কবি কবিতায় হৃদয়াবেগের যে-মায়াজাল বা অর্থের বেষ্টনি তৈরি করেন অনেকে এটাকেও দৈব বলে স্বীকৃতি দিতে চান।

আদিম মানুষের মনে মানার (‘মানা’ শব্দটি মেলানেশিয়ান) ধারণা খুব ক্ষমতাশালী ছিল। সকল বস্তুতে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও প্রায়ই বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা বস্তুতে মানার সন্নিবেশ ঘটে। বিশ্বাস অনুযায়ী মানা ব্রহ্মাণ্ডে অফুরন্ত শক্তির আধার। এই অপরিমেয় শক্তি অসাধারণ বস্তু বা ব্যক্তির মধ্যে অথবা অপ্রত্যাশিত ঘটনার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে, এবং বলাবাহুল্য, সকল অনায়াস আকাঙ্ক্ষার সাফল্য মানার অস্তিত্ব প্রমাণ করত। যদি কোনো লোক যুদ্ধে অপরাজেয় হয়, সে সাফল্য তার স্বাভাবিক বাহুবলের জন্য নয়, চোখের ক্ষিপ্রতার জন্য নয় বা তার সৈন্যদের অন্যকোনো দক্ষতার জন্যও নয়। সে নিশ্চয় কোনো আত্মার মানা লাভ করেছে, অথবা কোনো বীরের আত্মা তার ওপর ভর করেছে। সেই শক্তি এসেছে তার কবচে, গলায় বাঁধা পাথরে, মণিবন্ধের হাড়ে, কোমরে গোঁজা বৃক্ষপত্রে। অথবা অপার্থিব শক্তির সাহায্য প্রার্থনা করে সে যে-সব মন্ত্র আওড়াচ্ছিল তার মাধ্যমে। মানা ভর করলে একটা নৌকা দ্রুত চলতে পারে না, জালে বেশি মাছ ওঠে না, কিংবা একটা তির মারাত্মক আঘাত হানতে পারে না। এক্ষেত্রে টোটেমও মানার প্রতিভূ হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং মানা কেবল বস্তুগত শক্তির ধারক নয়, এটি ভয় ও বিস্ময়জাত আবেগযুক্ত প্রতিক্রিয়াও। বিরুদ্ধ পরিবেশের প্রতি মানুষের আবেগপূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত এই প্রতিক্রিয়া কবিতার জন্মভূমে চিত্রাঙ্কিত। আকাঙ্ক্ষিত ফললাভের জন্য অদৃশ্য শক্তি হিশেবে মানাকে বাধ্য করা বা আদিম মানুষের আবেগগত প্রতিক্রিয়া এবং জীবনযুদ্ধের জন্য চরাচরের অদৃশ্য শক্তির যথেচ্ছ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যে-ঐন্দ্রজালিক জগৎ মানুষ সৃষ্টি করেছিল তা কবিতাকে দিয়েছিল বিশেষ প্রবণতা। কবিতার উদ্দেশ্য ওই ইন্দ্রজালের মূলেই। ফলে মানুষ সভ্য হয়েও যেমন আদিম সহজাত প্রবণতাগুলো ত্যাগ করতে পারে নি, তেমনি কবিতার প্রবণতাগুলোও উৎকর্ষপ্রাপ্ত হয়েছে কিন্তু পরিত্যক্ত হয় নি।


হয়তো সভ্যতার অগ্রগতি ও বিবর্তনের সঙ্গে কবিতা এভাবেই পুরাতন চারিত্র্য থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নতুন বেশ ধারণ করে।


আদিম মানুষ মনে করত তার চারদিকে কোথাও না-কোথাও ‘মানা’ আছে। আধুনিক মানুষ তেমনটা মনে না-করলেও তার অস্তিত্বের গভীরে এমন অনেক মানা পুষে রাখে। মানুষ নতুন মূল্যবোধ লাভ করেছে, নতুন পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। আর তার মানারও হয়েছে নানা রূপরূপান্তর। আর মন্ত্রের, নৃত্যের বা উচ্চারণের মাধ্যমে না-হোক অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় সে রূপান্তরিত মানাকে বাধ্য করতে চায়। পূর্বে উৎসর্গ, প্রার্থনা প্রভৃতির মাধ্যমে মানাকে যেখানে শান্ত করতে হতো, এখন হয়তো রাষ্ট্রাচার, যৌনাচার, বিজ্ঞাপন, এমনকি নানা বৌদ্ধিক প্রক্রিয়ায়ও মানাকে বাধ্য করে অস্তিত্বের সংকট মানুষ মোকোবেলা করছে। বিজ্ঞানের নব নব উদ্যম, প্রযুক্তির উদ্ভবের পেছনেও যে মানার ধারণা কাজ করেছে অর্থাৎ সার্বিকভাবে তা ইন্দ্রজালেরও নবতর প্রক্রিয়া, এটা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারসহ নিজের অফুরন্ত আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্যে যে-মানুষ একদিন ইন্দ্রজালে লিপ্ত ছিল, আজ সে-মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নিজস্ব কর্মপ্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছে। তাই দেখা যাবে আধুনিক কবির কবিতায় ইন্দ্রজালের পরিবর্তে বিজ্ঞানের নবপ্রবর্তনা বিদ্যমান। বলতে গেলে সর্বত্র আজ বিজ্ঞানই হয়ে উঠেছে ইন্দ্রজাল। আমরা যখন মিরোস্লাভ হোলুব কিংবা নিকানো পার্‌রার কবিতা পড়ি তখন সে-রকম অভিজ্ঞতাই লাভ করি। বিস্মিত না-হয়ে পারা যায় না বিজ্ঞান কিভাবে কবিতাকে সমৃদ্ধ করছে। হয়তো সভ্যতার অগ্রগতি ও বিবর্তনের সঙ্গে কবিতা এভাবেই পুরাতন চারিত্র্য থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নতুন বেশ ধারণ করে।

পৃথিবীর সকল ভাষায় ঐন্দ্রজালিক বাক্যকে জোরাল হিশেবে দেখা যায়। ইন্দ্রজাল থেকে কবিতা পুরোপুরি বেরিয়ে আসলেও ঐন্দ্রজালিক প্রবণতা থেকে কবিতা বেরিয়ে আসতে পারে নি। যদি ঐন্দ্রজালিক প্রবণতা কবিতার লক্ষণ হয়ে থাকে তাহলে হয়তো এটা চিরন্তন রূপেই থাকবে। আত্মনিষ্ঠতা ও নৈর্ব্যক্তিকতা উৎকৃষ্ট কবিতার প্রধান গুণ বিবেচনা করলে সর্বাত্মক শক্তির প্রয়োজনেই কবিতায় ইন্দ্রজালগুণ জরুরি হয়ে পড়ে। কবির তখন দরকার হয়ে পড়ে মানাকে যেমন করে হোক বাধ্য করা। দরকার হলে কবি নানারূপ প্রকল্পই গ্রহণ করে থাকবেন। ফলে কবিতায় রহস্যবিস্তার বা পুনরাবৃত্তি ইত্যাদি আদিম ভাষার অনুকল্প কবি ব্যবহার করবেন। এটা চেতন-অবচেতন কিংবা উভয় মনেরই হতে পারে। আধুনিক পরাবাস্তব কবিতার ভিত্তির উৎস ওই একই। এমনকি একটি নিখাদ প্রেমের কবিতায়ও ইন্দ্রজালবিদ্যা প্রচ্ছন্নভাবে লুকিয়ে থাকতে পারে। কবিতাটি রচনার সময় হয়তো কবি তা ভাবেনও নি।

এখানে দুটি উদ্ধৃতি (অংশত) দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি। একটি ভারতের ছত্তিশগড়ের লোকসাহিত্য সংগ্রহ থেকে ধৃত ঐন্দ্রজালিক মন্ত্র, অপরটি মোহাম্মদ সাদিকের কবিতার :

Go my leaping charm Awake love in this girl Love in her walking feet Love in the dust her feet stir Love in her seeing eyes Love in her moving eyelids Love in her listening ears Love in her speaking tongue Love in her laughing teeth Awake, love, my charm Love in the breasts ready to be fondled Love in the vagina fit for love Go my strong strorg charm Let the charm take this girl.

                                                       (FOLK SONGS OF CHHATTISGARH; VERRIER ELWIN                        ***

মন্ত্র পড় আজ মন্ত্র দাও! ওড়াও দুইহাতে, লালচে গামছার তুমুল নাচ; হিরালী, হুঙ্কারে তোমার অবিনাশী দোহাই পাড়ো, এই যে শিলা, এই তীব্র বৃষ্টি ও সর্বনাশ,                                                   ফেরাও তুমি।

                                                       (হিরালী; মোহাম্মদ সাদিক)

উচ্চতর শক্তি আরোপণের যে-ইন্দ্রজাল কবি তা বিস্তার করেন শব্দে, ধ্বনিতে ও অর্থে।


জীবিকা অর্জন ছাড়াও ভিন্ন উদ্দেশ্যসাধনের জন্য ইন্দ্রজালবিদ্যার প্রয়োজন হতো। অন্যের অনিষ্ট করা, যুদ্ধে পরাজিত করা, পরনারীকে বশে আনা ইত্যাদি। অন্য অনেক মন্ত্রের সঙ্গে ভেরিয়ার এলউইন নারীকে বশ করার এই ঐন্দ্রজালিক মন্ত্রটি সংগ্রহ করেছিলেন এক বয়োবৃদ্ধার কাছ থেকে। উদ্ধৃতাংশের ভাব ও ভাষায় একটা দুর্দমনীয় শক্তি ও মায়াজাল লক্ষ করা যায়। যে-নারী প্রেমিকের প্রতি রুষ্ট তাকে প্রেমের নিপুণ ফাঁদে বন্দি করার মন্ত্রটি আদিম আরোপণকেই নির্দেশ করছে। ইন্দ্রজালের আবেষ্টনী দিয়ে প্রেমাস্পদকে বুঁদ করে ফেলার চতুর ইন্দ্রজাল এর শব্দ প্রয়োগ ও ছন্দস্পন্দে লক্ষণীয়। এটি মন্ত্র নিঃসন্দেহে, কিন্তু তার কবিত্বগুণ কোনোভাবেই উপেক্ষণীয় নয়। একইভাবে দ্বিতীয় উদ্ধৃতিতে ভাটিবাংলায় শিলার হাত থেকে ফসল বাঁচানোর জন্য ডেকে-আনা হিরালীর প্রতি দুর্যোগ-আক্রান্ত হাওরবাসীর আহ্বান কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে। হাওরবাসী মানুষের ধারণা নগ্নগাত্রে গামছা হাতে হিরালী মন্ত্র উচ্চারণ করলেই এই ঝড় ও শিলাবৃষ্টির গতিপথ বদলে দিতে পারে। হয়তো কবিতাটি বাংলাদেশের আশির দশকের বাস্তবতার রূপকে লেখা, কিন্তু এর অনুষঙ্গ হিশেবে যে-ইন্দ্রজালের জগৎ কবি সৃষ্টি করেছেন তা মানুষের আদিম চেতনারই অভিব্যক্তি। যদিও কবিতাটি ইন্দ্রজালের জগৎ অতিক্রম করে সমকাললগ্ন হয়েছে; সমষ্টিগত আবেগের মাধ্যমে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতি বাস্তবের কুহক সৃষ্টি করেছে। আর এখানেই মন্ত্র থেকে কবিতা বেরিয়ে এসেছে নিজস্ব অস্তিত্বের অনুকৃতিতে। উল্লিখিত মন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা কবিতাটিতে ভিন্নভাবে প্রবাহিত, যদিও উভয়ের স্বর একই। ইন্দ্রজালের স্বর আর কবিতার স্বরে যে-মিল তা আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরেই। আমরা যেটাকে শুরুতে বলেছিলাম অসম্ভবের আকাঙ্ক্ষা। কবি যে-অসম্ভবের আকাঙ্ক্ষার স্পর্ধা দেখান আসলে তার উৎস ইন্দ্রজালই। উচ্চতর শক্তি আরোপণের যে-ইন্দ্রজাল কবি তা বিস্তার করেন শব্দে, ধ্বনিতে ও অর্থে। কবি তাই শব্দকে বদলে দিতে পারেন, পারেন শব্দে নতুন অর্থ যোজন করতেও। কালিদাস যখন মেঘকে দূত করে যক্ষপ্রিয়ার কাছে পাঠান, তখন সেটাকে ইন্দ্রজালের শক্তি ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে? সত্যি বলতে মানুষের অস্তিত্বের লড়াইয়ে অসম্ভবের আকাঙ্ক্ষা আত্মরক্ষার ব্রহ্মাস্ত্র। একালে ব্রহ্মাস্ত্র বানানোর অধিকার একমাত্র কবিদেরই দেওয়া হয়েছে।

জফির সেতু

জফির সেতু

জন্ম ২১ ডিসেম্বর, ১৯৭১; সিলেট। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর [চট্টগ্রাম...বিস্তারিত