বছর ঘুরে আবারও ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ফের হাজির অমর একুশে গ্রন্থমেলা। প্রতিবছর এই মেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয় কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণাসহ বিভিন্ন ধরনের কয়েক হাজার বই। কোন বই কিনবেন আর কোনটি কিনবেন না, সেই ভাবনায় গলদ্ঘর্ম পাঠকরা। তাদের একটু স্বস্তি দিতে পরস্পরের বিশেষ আয়োজন ‘পাণ্ডুলিপির কবিতা’। এর মাধ্যমে পাঠকরা বইটি সম্পর্কে যেমন ধারণা পাবেন, তেমনি জানতে পারবেন লেখকের শক্তিমত্তা সম্পর্কেও।
আজ প্রকাশিত হলো তরুণ কবি পরাগ রিছিলের কাব্যগ্রন্থ ফুলগুলি ফুলকপি-এর কয়েকটি কবিতা। বইটির প্রকাশক তিউড়ি প্রকাশনী।
দারুচিনি পাতা
দারুচিনির কচি রক্তাভ পাতা দেখে আবারও মনে পড়ে গেল সবার শরীরের ভেতর লাল রক্ত... দারুচিনি পাতা— তুমি যখন অল্পবয়সী ঘি’য়ে রঙে ফর্সা তোমার শিরায়-উপশিরায় যে রক্তের সঞ্চালন তা যেন তোমাকে বেশি রক্তাভ করে তোলে! দারুচিনি পাতার চামড়া ধীরে ধীরে পুরু হয় রেখা-শিরা-উপশিরা অস্পষ্ট হয়। কেবল পরিশ্রমের পর কিংবা ভালো করে লক্ষ করলে যেমন ফুটে ওঠে হাতের রগ নীল রক্ত সঞ্চালন... কেউ তোমাকে ছিঁড়ে দ্যাখে! কেউবা আস্ত রান্নায়। দারুচিনি পাতা— একপাতা জীবনের বিনিময়ে তুমি নিজেকে হারাও, আর পৃথিবীতে সুবাস ছড়াও...
হাওয়ার মিঠাই
হাওয়া তো অদৃশ্য কেবল অনুভব করা যায় হাওয়া শ্বাস-প্রশ্বাস—অক্সিজেন হাওয়া ঈশ্বরেরই প্রকাশ এই জগতে— আমরা কেবল মানুষের প্রতিমূর্তি যদি না থাকে প্রাণবায়ু— সবারই যে ফেলতে হয় শেষ নিঃশ্বাস? যতক্ষণ জীবনদেবতা, দেহের ভেতর না দিলেন ফুঁ— জীবন-মিঠাই জিহ্বায় মিঠাইয়ের স্বাদ লাগিয়ে হাওয়া হয়ে যায়? বলো লালন, বলো সাঁই তবে কী করে হয় হাওয়ার মিঠাই?
দাঁত
জীবন মাড়িতে গজিয়ে ওঠা দাঁতের মতো! শালদুধে বেঁচে ওঠা, ছিল কবে? জীবনদাত্রী স্তন কামড়ে ধরতে ইচ্ছে করবে আচমকা ভয়মনে, ধরিত্রী আঁকড়ে বাঁচার ইচ্ছে যেন প্রাণপণে— ঠিক; কয়েক ফোঁটা অশ্রুর মতো ঝরেও যাবে! শতরঞ্জি অভিজ্ঞতার সাক্ষী হিশাবে রয়ে যাবে শুধু মাড়ি, চিবোতে চিবোতে...
গৃহিণী
যাদের গৃহ নেই— ঘুমায় তারা রাস্তায় ফুতপাতে, পার্কে। এমনকি ছোট হলেও নেয় নি যাদের বুকে টেনে—তারা পথশিশু। আমি তো গৃহী নই! এক দু’সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলাম অবাক হয়ে... এক দু’সেকেন্ড আনমনে... গৃহ চেনা সুদূর, তোমার দিকে চাই নি কোনোদিন পাশে বসে যখন লিখলে সুন্দর হস্তাক্ষরে—পেশার ঘরে—গৃহিণী!
আইসক্রিমের মাইক
গ্রীষ্মের দুপুর রোদে সময় কাটানো দায়— কেউ কেউ গাছের ছায়ায় বসে বাতাসের খোঁজে কাজ না থাকলে কেউবা জিরিয়ে নিতে চায় এক কাঁচা ঘুমে। দূর থেকে ভেসে আসে গানের শব্দ ‘আমি যখন ইস্কুলেতে পড়ি, আমাকে ভালোবেসে...’ মাইকের শব্দ যত কাছে আসে বাচ্চারা তত উতলা হয়ে ওঠে জমানো ছড়ার ধান, একমুঠ চাল দু’এক টাকা নিয়ে ছুটতে থাকে ছোট আইল দিয়ে, বড় রাস্তার ধারে। খররোদে বরফ দিয়ে প্রাণ ভিজিয়ে নেয়া! উপরের অংশে লেগে থাকা কিছু নারিকেল... ভ্যান যেখানে এসে থামে, তার আরো ছোট ছোট কাস্টমারের আশায় বাক্স খুলে শব্দ করায় কয়েকবার সে শব্দ আচমকা মমতার বুকে এসে লাগে— হয়তো তার সংসারেও লাগবে এমন ঠোকাঠুকি! কিংবা মুখ বন্ধ করে রাখলে যেভাবে মিশে থাকে... সামনের দিকে চলতে শুরু করে গানের সুর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় দূর গ্রামে অল্প বয়সে বিয়ে করে আসা এ গাঁয়ের বধূর মন বিষণ্ন করে, উদাসী করে...
মঙ্গল মাড্ডি
তীব্র বিদ্রূপে শ্লেষ মাখা বাক্যটি ছুড়ে দেয়া হয়েছিল আমার দিকে ‘ও তুই সাঁতাল...’ বিষিয়ে যাচ্ছিল মস্তিষ্কের একপাশ থেকে আরেকপাশ রিনরিন করে ও তুই সাঁতাল... ও তুই সাঁতাল... নিজ হাতে বোনা আমনের ক্ষেত বেয়ে টানতে টানতে শরীরটুকু যোদ্ধাহতের জীবন ক্রলিং... ধুপ করে পড়েছিল অদূরে আমনেরই ক্ষেতে— ধানের গন্ধের সাথে মিশে গিয়েছিল শেষ নিশ্বাস! ঘাসফড়িং উড়ে উড়ে দেখছিল শরীরের নানা ক্ষত এসেছিল পোকা মাকড়—শুঁকেছিল তার চেয়েও বড় কোনো প্রাণীর শিকার বলে গুটিশুটি মেরে ছিল রক্ত চাখে নি! শ্যামল বাংলায় বইয়েছ মঙ্গলের রক্তধারা— ‘ও তুই বাঙ্গাল?’
ফাংস্রি
এখানে বেড়ে উঠছে চাঁদকন্যা— যখন সে দাপিয়ে বেড়ায় পাহাড়ের এপাড়া ওপাড়া শক্ত আবরণের বুকে ধুপ ধুপ শব্দে পাহাড় টের পায় নিজের হৃৎস্পন্দন। তাকে হাসাবে বলে গায়ে ফুটিয়ে তোলে বেগুনি বা হলুদ ফুল! তার বুকে দুঃখ জমা হলে অশ্রু হয়ে নামে রংদী নদীতে... জাজং নাম্মা ফাংসি রি রি জ্যোৎস্নার আলো— চাঁদকন্যা—জোরে হাঁটো দৌঁড়াও, দাপিয়ে বেড়াও দুঃখ ভুলো, দুঃখ ভুলো...