পাণ্ডুলিপির পাঠ : কাঠ চেরাইয়ের শব্দ

কবি শোয়াইব জিবরানের কাঠ চেরাইয়ের শব্দ  নব্বই দশকের একটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতাগ্রন্থ। দীর্ঘদিন আউট অব প্রিন্ট থাকার পর এবছর বইটি নবপ্রচ্ছদে পুনর্মুদ্রিত হচ্ছে জেব্রাক্রসিং থেকে। পরস্পরের কবিতাপ্রেমী পাঠকদের জন্য তুলে দেওয়া হলো কয়েকটি কবিতা।



ছায়া এলিজি


রাত্রি ছিলে। রাস্তায় একা পেয়ে শুনিয়েছ গান, মানে বুঝি নি। আজ অন্ধকারে ভয়ে ভয়ে তুলে ধরেছি মাথা, ঐ যে আকাশ আর নুলোভাই তারা সাতজন, বোনের লাশ নিয়ে শ্মশানেতে যায় নিত্যরাতে, কী বেদনা তাদের সাথে খেলা করে, জানি।

ভাষা তার অর্ধ বুঝি। যিনি জেগে আছেন মাঠের ওপারে, বটগাছ নদী আর বাতাস নিয়ে। আত্মা মাঝে মাঝে পাঠাই তার খুঁজে। কী কঙ্কাল বেঁচেবত্তে থাকা, অর্ধ স্বপ্ন আর অর্ধ জাগরতা নিয়ে। দিবানিশি।

সে ডাকে। দিঘির জলে ডুবে গেলে চাঁদের দেহ। আমি কি আর ফিরে যেতে পারি? ফেরে কি কেহ? যে ফেলে এসেছে ছায়া, পথের ধুলোয়।

ছায়া ফেলে হাঁটি। তিনি স্নেহ আর শৈশব। তার সাথে জানাশুনা ছিল সেকালে। আজ শুধু মাছির মতো মুখ মনে পড়ে। রাত্রি ছিলে।


গুহাবাস


বৃষ্টির ফোঁটা চুলে নিয়ে গুহায় ফিরেছি। দুঃখতাপ উড়ছে কুণ্ডলী পাকিয়ে। সল্‌তেটা আরেকবার উস্কে দিতে চাই। জ্বলছে চর্বি গলে গলে অন্ধকার; আলোর পিঠে কাঁপা কাঁপা। শোনাও বন্ধু মন্ত্র হরিণধরা, সুরা আল বাকারা মেঘের কাপড় আমার দু’চোখে। অন্ধতা নিয়ে কার কাছে যাব, কে ফেরাবে নপুংসতার অহং শব্দব্রহ্মা, শব্দ সাজাই কাঠের কারুকা, পালং ছুতার মিস্ত্রি।

কী কবিতা লিখে গেলেন গুরু, ঘুম ভেঙে যায়। অতৃপ্ত বাসনায় ভিজে ওঠা রাতের পোশাক ফেলে হামাগুড়ি দেবো, ডাকল দেখো রাপসোদাই। তিনবার। ঘুম থেকে গীত ভালো, হাঁটু ভেঙে জমিনে গড়াই।

এই বুঝি হাতের তালুতে লেখা ছিল, তাম্রলিপি। উলুখাগড়ার দেহ নিয়ে উড়ে উড়ে যাওয়া—মন্ত্রে বেঁধেছি দেহ আচমন শেষে শরীর পাতন। বৃষ্টির ভেতর উসকানি থাকে পদাবলির। ভক্তিমার্গ, রাধাগীত। এই শব্দে সঙ্গম সাজাই।


শিকারি


মাথায় পালক নিয়ে এই অসময়ে বেরুনো কি ঠিক হবে? চারিদিকে আগুন নদী, পথঘাট অগ্নিবাতাস। যারা গিয়েছিল অন্ধ পাখি হাতে কোড়া শিকারে ফেরে নি। রক্তের ঘ্রাণ বাতাসে চাপ চাপ ছড়িয়ে আছে। পিতা প্রপিতামহ খেয়েছে বনের বাঘ আমি সামান্য ভগ্নস্বাস্থ্য বালক, দু’হাতে কী আর আগলাব রক্তমাখা দাঁত, নখর, বাঘডাক। নাকেমুখে বনের কাঁটা, পাতা লেগে আছে কাঠুরিয়া শক্ত কুড়ালে কেটেছে বৃক্ষকোমর অরণ্য হাত পা ছড়িয়ে বনের গায়ে পড়েছে আমার শুধুই অরণ্যবাস, না কাঠুরিয়া, না শিকারি। নারী এবং হরিণমাংস খেয়েছে যারা, জিহ্বা পাতালব্যাপী নারীর গর্ভে জন্ম মাগো, পিতা ছিলেন হরিণ শিকারি ব্যাধের সংসারে জন্ম বধূ বংশসুতোবনে আমার হাতেই দিয়েছে তুলে তিরধনু পাখির পালক এই অসময়ে করাল বনে কার কাছে আত্মা রাখি?

ধুলোর গাথা


চাকার উপর ক্লান্ত শুয়ে ছিল পথ চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে পথ ফিরছিল বাড়ি। পথের উপর ছিলাম সামান্য পথিক ছুটে আসা অশ্বখুর, ধুলো, শত্রুর হল্লা শব্দ গুনতে গুনতে বিপন্ন অস্থির। যারা ছিল ঘরে ঘরে পিতা পুত্র মাতা তারা তুলেছে হাহাকার, ছুটেছে চৌদিকে রাজা ছিলেন সুরাঘুমে তিনি গেছেন বনে আর আমি সামান্য শব্দশিকারি শত্রুর ধুলো গুণে সন্তান করেছি প্রসব তারা আজ ধুলোর উত্তরাধিকারী।

পাখিরাত


মধ্যরাতে চুপিচুপি তার চুলে সুর তুলে দেখি উড়ে এসেছে হাজার পাখি খাঁচায় ধরা দেওয়া পাখি আর ঘাসেদের সেই ঘনরাত।

এমনি তাকে লোহার সিন্দুকে ভরে দিয়েছিলেন অবিশ্বাসী পিতা দুটো শস্যদানা নারকেলের খোলে দেহের উত্তাপে ক্ষুণ্ন মিটিয়েছি। শিয়রে মোমবাতি জ্বলে আমরা জ্বলি দেহের আগুনে আগুন আগুন খেলা অর্ধরাত।

তারপর মধ্যরাতে দিঘির মতো সে চুপচাপ। আমি সংগোপনে যেন পাখি প্রিয় বাঁশিপ্রিয় মাঠের রাখাল হাওয়া এনেছে বয়ে কী যে হাহাকার মায়ের স্মৃতি মনে রেখে তার চুলে যেই চক্ষু করেছি গোপন অমনি খুব মৃদু পায়ে সুর এল চুলের ভেতর কণ্ঠে তুলে নিলো গান

উড়ে এল হাজার পাখি, আহা উড়ে যাওয়া পাখি।


সইবাস


১. নিঃসঙ্গতা আমার সই। কালো আর ক্লান্তিমান। তাকে নিয়ে ডেরা গহিন গুহায়-ডিহাং পাহাড়েতে, সেইখানে আমাদের বাস। পাশে মনু নদী বয় সই সই বাতাস নিয়ে। বাতাস কন্যার সখি হয়, তিনি হাহাকার। রাতে আসেন হাতের বালা নিয়ে। দুই সখি প্রেমালাপ সারারাত পাশে আমি জবুথবু একা একা বই কম্পন আর পিঁচুটি নিয়ে। ২. দেহের ভেতর শুয়ে থাকি—গহিন পরবাসে এ কঠিন দুঃখদিনে আত্মীয়রা কই? তারা ছিল বাতাস বাসনা বিদ্যুৎরেখা, জলের ওপারে সাড়ে সাত’শ ভাই। আজ আর কেউ নাই, অজিন কুর্তা, স্তিমিত লন্ঠন আর পঞ্চভাই।

পাশার চালে হেলেদুলে গহিন বনে দেখো বনবাসে যাই।


শিষ্যবচন


ট্যাবু দিয়েছেন গুরু, প্রসাদভাগ না দিয়ে কেমনে খাই। ভিক্ষা মাগি দ্বারে দ্বারে, দুগ্ধবাটি উল্টো করে দাও। রমণীরা বেঁধেছে স্তন কাঁচুলিতে, গুরু তোমার ভাগ কোথা পাব?

এতদিন লতাপাতা, আকন্দকষ, গাভীদুগ্ধফেনা খেয়ে বেঁচেছি। আজ গভীর পরিখায়। চক্ষু দু’টি কই? নাম ধরে ডাকো গুরু, নাম ধরে ডাকো, তোমার রাস্তা যেন দেখিতে পাই।

কী হবে গো আমার, কে তরাবে পার, লকলকে অগ্নিমালার মাথায় ঝুলবে সুতো এই নাকি পথ, মহিষ পিঠে ফিরবেন মাতা, পুত্র তার আঁচলে কী উপায়ে পাবে বলো ঠাঁই?

গিয়েছিলে চিল্লায় অনুপস্থিতির সকল দায়ভার আমায় দিয়ে। পত্নী তোমার এইকালে রজস্বলা হলো। করি নি ভোগ, রিপু স্বমেহনে ভুলেছি।

এইবেলা শুধু নাম ধরে ডাকো গুরু, অন্ধ আজ পড়ে আছি গভীর পরিখায়।

শোয়াইব জিবরান

শোয়াইব জিবরান

জন্ম ৮ এপ্রিল, ১৯৭১; আযমত শাহ্ কুটির, মৌলবীবাজার। শিক্ষা : জাহাঙ্গীরনগর...বিস্তারিত