কবির বিচিত্র আনন্দ ও এক নিম-হাকিমের আনাড়িপনা

নিত্য মালাকারের জন্ম দেশবিভাগের ঠিক ৩দিন পরে (১৮ আগস্ট ১৯৪৭), এখনকার বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলার ভদ্রঘাটে। বেড়ে ওঠা নদিয়ার নবদ্বীপে। তারপর থেকে স্থায়ীভাবে রয়েছেন কলকাতা থেকে প্রায় ৭৫০কিমি দূরে কোচবিহার জেলার মাথাভাঙায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : সূত্রধারের স্বগতোক্তি (১৯৮৮), অন্ধের বাগান (১৯৯৪), দানা ফসলের দেশে (২০০২), গীতবিতান প্রসূত রাত্রি এই বৃষ্টিধারা (২০০৮), যথার্থ বাক্যটি রচনার স্বার্থে (২০১২), নিমব্রহ্ম সরস্বতী (২০১৫)।


হাটের মাঝে বাটের মাঝে হরবখত জবরদস্ত নানা সত্য আমাদের নিকট ধরা দেয়। তাহাদের নামে হলফ কাটিয়া দিব্য এই দুনিয়াদারি চলিয়া যায়। তবু সেইসব সিধা সত্যের আড়াল হইতে আরও নানা রকম অপার সত্য থাকিয়া থাকিয়া আমাদের পানে মুখ বাড়াইয়া দেয়। আচানক তাহাদের আছেময়তা জাহির করে। অপার বলিয়াই তাহাদের বিবরণ যেন আমাদের কানে প্রলাপের মতো ঠেকে। এই প্রলাপের মাত্রা যে-কবিতায় যত বেশি, তাহাই আমাদের কাছে তত ভালো বলিয়া ঠাহর হয়। তবে, কবিতা যেহেতু অনেকান্ত এক বুনন, সকল প্রলাপ পাঠক নিজের নিজের মতো করিয়া তর্জমা করেন। ফলে আমাদের কাছে যে-আরক তীব্র, অপরের তাহা ফিকা লাগিতেই পারে। অমন এক-যাত্রায় পৃথক-ফলের জন্য কবিতা মনে মনে তৈয়ার। ভালো-মন্দ লইয়া ভাবিবার দায় তাহার নিজের দিক হইতে নাই। কোনও না কোনও নিরুপায়তা হইতেই তাহার জন্ম।

প্রলাপ বকিলে পাগল বদনাম জুটে। তবে সেই নিন্দার ভিতরে যেন সমাজের কিছু স্নেহ মিশ্রিত থাকে। এই স্নেহটুকুর মূল্যও মনে হয় কিছু কম না। তাই প্রলাপের ভিতরে আকসার কিছু থিয়েটারি ঢুকিয়া যায়। প্রকৃত পাগল না-হইয়াও পাগলের ভূমিকায় অভিনয় করিয়া সুঅভিনেতার দল ঝাঁকে ঝাঁকে হাততালি কুড়াইয়া লন। সেইসব মঞ্চসফলতার হট্টরোলের বাহিরে, কোনও মজিয়া যাওয়া নদীর কূলে, কোনও ছায়াহীন গাছের মূলে, ধুনি জ্বালাইয়া বসিয়া থাকেন কিছু কিছু সাধক। সেই চর্যাপদের আমল হইতে আজ অবধি এইভাবেই রচিত হইয়া চলিতেছে বাংলা কবিতা। ক্বচিৎ রাজানুকূল্য মিলিলেও, তাহাতে রাজসভা ধন্য হইয়াছে মাত্র, কবিতার কিছু আসে যায় নাই। তাহা যেন মর্মমূলে চিরপ্রান্তিকই রহিয়া গিয়াছে।


আপাতশ্রুতিতে নিমের ভিতরে কোনও রহস্য নাই। নিম এক প্রাচীন বৃক্ষ। এক উপকারী বৃক্ষ।


কোচবিহারের মাথাভাঙায় বসিয়া কবি নিত্য মালাকার (জ. আগস্ট ১৯৪৭) প্রায় আধাশতকের বিস্তীর্ণ কবিতা-জীবনে বাংলা কবিতার সেই প্রান্তিকতার বিজয়নিশান খানি উড়াইয়াছেন। আজ আমরা তাহার একটি কবিতা পাঠ করিবার সামান্য কোশেশ করিব। পশ্চিমবাংলার আর এক প্রান্তিকবিন্দু বাঁকুড়ার রানিবাঁধ হইতে প্রকাশিত ‘অহিরা’ পত্রিকাটি সুসম্পাদনার গুণে ইদানীং পাঠকদের নজর কাড়িয়াছে। সেই ‘অহিরা’-ই সম্প্রতি (রাসযাত্রা ১৪২২) প্রকাশ করিয়াছে নিত্য মালাকার-এর সর্বশেষ কবিতাবহি নিমব্রহ্ম সরস্বতী। সেই বহির নাম-কবিতাটি লইয়াই আমাদের আজিকার আলাপ। শুরুতে, কবি যেরূপ লিখিয়াছেন, কবিতাটি সেইভাবে একবার পড়িয়া লওয়া যাক—

দ্যাখো, এইবেলা আমি নিম বিষয়ে ভাবছি। যদিচ, সকলি, আলো ও শীত-তীব্রতা মিলিয়ে ছাত্রীপাঠ্য সন্দর্ভ কিছু হয় কিনা নিয়ে তুমুল তোলপাড় হবো ভেবে চির স্ত্রীমুখ দেখে সংযত, হেসে সুখে রোজকার মতো চূড়ান্ত প্রৌঢ়—চা খাচ্ছি বেশ।

হাল ধরে বহুক্ষণ,—এরকম কত দিন যে গিয়েছে। গিয়েছে বিকেল, শুকনো। রাত্রি গিয়েছে। টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া ভুক্তাবশিষ্টের মাংস, খাঁড়ি, ভাঁজ ও মোহনাদর্শন শেষে সাদা সত্য লাভ।—এসব ঘটেছে বহুতর ছলাৎছল ঘাটের অর্চিষ্মান খাবি বেপথুমতি আপন্নের ঘাটে।

তাই, এইবেলা আমি নিম বিষয়ে বিবিধ উপসর্গ অনুসর্গ যোগে দেখছি সুখদ ব্রহ্ম, দেখছি সরস্বত্যৈ হ্রীং ক্লীং।

একটি কবিতায় মনস্থাপনে তাহার শিরোনাম আমাদের সহায় হইতে পারে, না-ও পারে। বর্তমানে, কিছুক্ষণের জন্য নামটিকে সরাইয়া রাখিয়া উপরের কবিতাটিতে ঢুকিবার চেষ্টা লইতে গিয়া আমরা পহেলাই এই বাক্যটির মুখোমুখি হই—দ্যাখো, এইবেলা আমি নিম বিষয়ে ভাবছি। ধরা যায়, দ্যাখো-সম্বোধনের ভিতর দিয়া পাঠকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে চাহিতেছেন কবি। মানুষের ভাবনা যদিও এক গোপন ও ব্যক্তিগত বিষয়, তবু তাহার চিন্তন প্রক্রিয়ার কথাই খুলিয়া বলিতে চান তিনি। সেই ভাবনার শুরু এইবেলা। এইবেলা বলিতে, বর্তমানের কোনও অনুকূল অবসর বুঝাইতে পারে, অর্থাৎ ইত্যবসরে। বা, দিনের কোনও এক নির্দিষ্ট প্রহরের কথাও হইতে পারে তাহা, যেমন সকাল বা বিকাল বেলা। তবে ভাবনার সময়কালটি হইতেও জরুরি হইল ভাবনার বিষয়টি। অর্থাৎ, নিম।

আপাতশ্রুতিতে নিমের ভিতরে কোনও রহস্য নাই। নিম এক প্রাচীন বৃক্ষ। এক উপকারী বৃক্ষ। তাহার ডালপাতার স্বাদের তিক্ততাও তাই আমাদের আদরণীয়। নিম তিক্ত হইলেও, নিমফুলের মধু কিন্তু মিষ্ট। আর নিমের কাঠ? তাহাও নানান জব্বর কাজে লাগে। এইসব কথাই কি ভাবিতেছেন কবি! তাহা ঠাহর করিবার জন্য পরের বাক্যে পঁহুছিয়া আমরা যথেষ্ট জটিলতার মুখোমুখি হই। চিন্তার জটিলতা, বাক্যের গড়নের জটিলতা, উপস্থাপনের জটিলতা—

                                                            যদিচ, সকলি, আলো ও শীত-তীব্রতা মিলিয়ে ছাত্রীপাঠ্য সন্দর্ভ কিছু হয় কিনা নিয়ে তুমুল তোলপাড় হবো ভেবে চির স্ত্রীমুখ দেখে সংযত, হেসে সুখে রোজকার মতো চূড়ান্ত প্রৌঢ়—চা খাচ্ছি

কবিতার এই দোসরা বাক্যাংশে আসিয়া তাহা হইলে দেখা গেল, কবির ভাবদুনিয়ায় নিম নিরঙ্কুশ কিছু নয়। নিম-বিষয়ক সকল ভাবনায় তিনি মিলাইয়াছেন আলো ও শীত-তীব্রতা। অর্থাৎ, তাহার ভাবনার সময়কালটি সম্ভবত কোনও শীতের সকাল। কিন্তু সেই আন্দাজে তাহার ভাবনার গতিপ্রিকৃতির কোনও হদিশ মিলে না। বরং, ক্রমাগত কিছু অসমাপিকা ক্রিয়ার ঢেউ আসিয়া ভাবনার শৃঙ্খলটিকে দীর্ঘ করিয়া তুলে। ভাবনাকে ক্রমে ‘মিলিয়ে’ ‘নিয়ে’ ‘ভেবে’ ‘দেখে’ ‘হেসে’ তবে তিনি চা খাইতে পারেন। আমাদেরও একে একে এই অসমাপিকাগুলির মোকাবিলা করিতে হয়। তাহাদের শঙ্খিল চলনে গড়াইয়া চলা ঘটনা পরম্পরা বা ভাবনা পরম্পরার পিছু পিছু চলিলে দেখি, ইহাদের ভিতর একটি উদ্যোগের বিবরণ আছে, আর আছে তাহা প্রত্যাহারের কবুলিয়ত। কবি সারল্যের সাথেই গোটা প্রক্রিয়াটি ফাঁস করিয়াছেন। এই যে, কোনও কাজে প্রবৃত্ত হইয়া আবার নিজেকে গুটাইয়া লওয়া, ইহার পিছনের মনটিকে বুঝিতে ইচ্ছা করে তাই।

বুঝিতে চাহিলেই কবির মন যে আমাদের কাছে ধরা দিবে এমন নয়। মনে পড়ে, ইতঃপূর্বে রচিত এক কবিতায় এই কবি বলিয়াছিলেন—

সহজ, অথচ ব্যাখ্যা যে কী কঠিন। দেখো যতই বোঝাতে চাই দূরে সরে সরে যায় উন্মূল, ভারহীন সে। (পাখি/ যথার্থ বাক্যটি রচনার স্বার্থে)


রহস্যমোচনে বা আস্বাদনে ছাত্রীরাই হয়তো ছাত্রদের চেয়ে বেশি পারঙ্গম।


তবু, এমন হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও, কবিতায় যেহেতু পাঠকেরও ষোলআনা হক, আমরা আমাদের মতো করিয়া আগাইতে পারি। এবং দেখি, কবি উদ্দীপ্ত হইয়াছিলেন ছাত্রীপাঠ্য সন্দর্ভের সম্ভাবনা লইয়া। আর, তাহা হইতে প্রত্যাহত হইলেন চির স্ত্রীমুখ দেখিয়া। দাগটানা শব্দগুলির দিকে আমাদের তাকাইতেই হয়। খেয়াল করি, নিমের ভাবনার সহিত আলো ও শীত-তীব্রতা মিলিয়া কোনও কবিতা রচনার ইশারা নয়, সন্দর্ভের কথা বলিতেছেন কবি। আর সেই সন্দর্ভ ছাত্রীপাঠ্য। কেন, ছাত্রপাঠ্য নয় কেন! তখন মনে আসে, সন্দর্ভ মানে শুধু প্রবন্ধ-নিবন্ধ নয়, রহস্য বা গূঢ়ার্থ। নিবন্ধ রচনা করিতে হয়, আর রহস্য ঘনাইয়া ওঠে। হয়তো এইজন্যই সন্দর্ভ কিছু রচিত হয় কি না, লিখেন নাই কবি। লিখিয়াছেন, সন্দর্ভ কিছু হয় কিনা। অর্থাৎ, রহস্যের দিকেই কবির পক্ষপাত। আর, রহস্যমোচনে বা আস্বাদনে ছাত্রীরাই হয়তো ছাত্রদের চেয়ে বেশি পারঙ্গম। অন্তত কবির বিবেচনায়। এমন একটি বিবেচনা লইয়া তিনি তুমুল তোলপাড় হইবেন পর্যন্ত ভাবিলেন। কিন্তু সহসা কী হইল, সবকিছু ঘাঁটিয়া ঘ! কারণ আগেই উল্লেখিত—চির স্ত্রীমুখ দর্শন।

চির স্ত্রীমুখ কি চিরকালীন স্ত্রীমুখ, যাহা সহসা ভাসিয়া উঠিল সম্ভাবিত সন্দর্ভের প্রস্তাবিত পাঠক সেই ছাত্রীকুলের অদৃশ্য মুখের সারির মধ্য হইতে? হইতে পারে ছাত্রীদের কমবয়সী রহস্যপ্রিয়তাই কবিকে টানিয়াছিল। আখেরে তাহাদের ভিতর দিয়াই বুঝি এক শাশ্বত নারীসত্তার উত্থান ঘটিল। কিন্তু তাহাতে এমন দমিয়া যাইবার কী হইল? ইহার উত্তরে আমরা কবির মুখে পাইতেছি এক আত্মকৌতুকের হাসি। যে-হাসি নির্মলভাবে জানাইয়া দেয়, কবি আজ চূড়ান্ত প্রৌঢ়। তাহা হইলে এইই হইল তাহার হঠাৎ সংযত হইয়া পড়ার রহস্য! কাজেই নিম-ভাবনা দিয়া শুরু হওয়া দিনটি আপাতত আর কোনও ভিন্নতর অভিমুখে যায় না। কবির মুখের সেই বিদগ্ধ হাসির ভিতর দিয়া ফিরিয়া আসে প্রাত্যহিকতায়, চা-পানের আপাতসুখী ছন্দে। একটি শ্বাস ফেলিয়া, কবিতায় এক লাইন ফাঁক ছাড়িয়া, কবিও বলেন—বেশ। তাহার পর একটি দাঁড়ি দেন। কবিতাটির একটি পর্যায় শেষ হয়।

পরবর্তী অংশে দেখি, কবির অভিজ্ঞতার বর্ণনা বিশেষ হইতে সামান্যে পঁহুছিয়াছে। শুরুতে বলিতেছিলেন ‘এইবেলা’-র কথা। এইবার ‘এরকম কত দিন’-এর কথায় আসিলেন। জানাইলেন—‘হাল ধরে বহুক্ষণ,—এরকম কত দিন যে গিয়েছে। গিয়েছে/ বিকেল, শুকনো। রাত্রি গিয়েছে।’ তাহা হইলে দমিয়া যাইবার কাহিনিই শুধু নয়, হাল না-ছাড়িবার অগুনতি ঘটনাও রহিয়াছে জীবনে। অপ্রাপ্তির ভিতর দিয়া দিন গড়াইয়া গিয়াছে বিকালে, বিকাল মিশিয়াছে রাত্রিতে, রাত্রিও ফুরাইয়াছে। তবু নির্বিকার মাঝির তপোভঙ্গ ঘটে নাই। যেন ভাটার টানে মরিয়া আসা এক নদীখাত বাহিয়া তিনি ক্রমাগত চলিয়াছেন কোনও এক আকুল পরিণামের দিকে। অবশেষে, নানা অতিজৈবিক অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়া চলিয়া এক ‘সাদা সত্য লাভ’ করেন তিনি।

এই আখেরি সত্য কি তবে নিষ্কলুষ, নির্মল, তাই সাদা? তাহার ভিতর কি তবে কোনও জটিলতা নাই! না কি প্রকৃতির সমস্ত জটিল রঙকে ধারণ করিয়াই তাহা সাদা? বা, সেই সত্যের রূঢ় ব্যঞ্জনাটি ঠাহর করিবার জন্য মাঝির চলনপথের অভিজ্ঞতাগুলির ঠার ভাঙিতে হইবে আমাদের। তাহা হইলে একবার দেখিয়া লই, নিরন্তর হাল ধরিয়া থাকা আমাদের মাঝি কিভাবে পৌঁছাইলেন সেই সাদা পরিণতিতে—‘টেনে হিঁচড়ে নিয়ে/ যাওয়া ভুক্তাবশিষ্টের মাংস, খাঁড়ি, ভাঁজ ও মোহনাদর্শন/ শেষে সাদা সত্য লাভ।’ যেন শ্বাপদসঙ্কুল ঘন জঙ্গলের মাঝখান দিয়া ছুটিয়া চলা কোনও নদীখাত বাহিয়া নৌকা চালাইয়া যাওয়া এক মাঝির প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার বিবরণ। সবশেষে মোহানা-অভিমুখী নদী সঙ্গমে গিয়া মিশিতেছে। জলের সাথে জলের সংঘর্ষে তৈয়ার হইতেছে সাদা ফেনা। কিন্তু শুধুই কি তাই? না কী মাংস, খাঁড়ি, ভাঁজ, মোহনা ইত্যাদি শব্দের শারীরিক ব্যঞ্জনাগুলিকেও আমাদের আমলে লইতে হইবে। যাহাতে আভাসিত হইয়া উঠিবে দেহমিলনের একটি বহুস্তর প্রক্রিয়া, সাদা বীর্যপাতের মধ্য দিয়া যে-সঙ্গমের শেষ ‘সত্য লাভ’।

ঘটনাকে যেভাবেই গ্রহণ করি, কবি নিশ্চিত করেন—‘এসব ঘটেছে বহুতর ছলাৎছল/ ঘাটের অর্চিষ্মান খাবি বেপথুমতি আপন্নের ঘাটে।’ বুঝা যায়, সাদা সত্য লাভের পূর্বকথিত অভিজ্ঞতা মাঝির জীবনে বারবার ঘটিয়াছে। এইটুকু টের পাইতে আমাদের অসুবিধা হয় না। তবে, ভাবের জটিলতা ততদূর না-থাকিলেও, বাক্যটির দিকে তাকাইয়া নির্মাণের যথেষ্ট জটিলতার মুখে পড়ি আমরা। বহুতর তৎসম-তদ্ভব-অনুকারশব্দের অভাবিত ও আপাত অন্বয়-বিপর্যয়কারী অবস্থান আমাদের বোধের আলস্যকে আঘাত করে। অর্চিষ্মান-এর তেজ ও দীপ্তির সহিত খাবি-র অন্তঃশ্বাসের সন্নিকর্ষ শেষতক হয়তো এক বিরোধাভাসেরই ছবি আঁকে। অন্তঃকরণ (মতি) যখন কম্পমান (বেপথু) তখন এক ঘাট হইতে আর এক ঘাটে ভাসিয়া যাওয়া বিস্ময়ের কিছু নয়। কিন্তু সেই ঘাটও কোনও এক বিপন্নের ঘাট। তবু তাহাই ঘটে। বারংবার ঘটে। খাবি খাইতে খাইতে আলোকস্নান এবং সেই শিহরনের গ্রস্ততা লইয়া ঘাট হইতে ঘাটে বিস্তারিত হইবার শরীরী সংগীতের মূর্ছনা, ইহাই তো প্রাণের শ্রেষ্ঠ মন্ত্রণা। সেও ফুসলানি কানে না লইয়া উপায় নাই।

তাই কবি আবার নির্বিশেষ হইতে বিশেষে ফিরিলেন। একটি বৃত্ত পুরা হইল বলা যায়। আলাপ শুরু হইয়াছিল ‘এইবেলা’-র কথা দিয়া। তাহার পর আসিল ‘এরকম কত দিন’-এর কথা। শেষে আবার সেই ‘এইবেলা’-তেই ফিরত আসিলেন। ফিরত আসিলেন শুরুর সেই নিম-বিষয়ক ভাবনায়। সেই ভাবনায় আরও আরও অনুপান মিশাইয়া তাহাকে বিস্তারিত করিবার উন্মাদনায় মাতিতে গিয়াও নিজের প্রৌঢ়ত্বের কথা ভাবিয়া সংযত হইয়াছিলেন শুরুতে। তাহার পর দীর্ঘ অধ্যবসায়ের দিনগুলির কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে কঠোর শ্রমিকতার ভিতর দিয়া সত্য লাভের অভিজ্ঞতাগুলি। সেইসব তুমুল প্রাপ্তির ঘটনাও তো কিছু কম নয়। সাফল্যের সেই স্মৃতি আবার প্রাণিত করে কবিকে। তাই আবার ‘এইবেলা’-য়, আবার ‘নিম বিষয়ে’, এই ফিরিয়া আসা।

আমাদের মনে পড়িতে পারে, কবিতার পহেলা দফায় কবির নিম-ভাবনায় মিলিয়াছিল আলো ও শীত-তীব্রতা। এইবার ঘটিল বিবিধ উপসর্গ-অনুসর্গ যোগ। উপসর্গ বা অনুসর্গের সর্গ-অংশটির ভিতরে আছে সৃজ্যমানতার বোধ। উপসর্গ কোনও কিছুর সমীপে বা সঙ্গে হাজির থাকিয়া নতুন কিছু ঘটাইয়া তুলে। আর অনুসর্গ ঘটাইয়া তুলে পিছন হইতে। আমাদের চিন্তাস্রোতের দ্যোতনাকেও সামনে হইতে বা পিছন হইতে এইভাবে প্রভাবিত করে আরও আরও চিন্তার ঢেউ। রূপান্তরিত করে। এক অভাবিত অনুভাবের সামনে পৌঁছাইয়া দেয়। কবির নিম-বিষয়ক ভাবনার পরিণতিও বুঝি সেইরকমই।


এই সৃষ্টিশীলতার জন্যই তো ব্রহ্মকে অনেকে এই জগৎসৃষ্টির রূপকার ভাবেন।


আবার, উপসর্গ বা অনুসর্গ শব্দযুগল উচ্চারণ করিলে আমাদের ব্যাকরণের কথা মনে না-পড়িয়া উপায় নাই। ব্যাকরণেও অবশ্য তাহারা শব্দের সামনে (উপসর্গ) বা পিছনে (অনুসর্গ) বসিয়া তাহার অর্থকে জব্দ করে। অনুসর্গ হিসাবে না-পাইলেও, নিম-শব্দটিকে আমরা কখনও কখনও উপসর্গ হিসাবে ব্যবহৃত হইতে দেখি। সে-নিম অবশ্য বৃক্ষ নয়, তাহার অর্থ—অল্প, অর্ধেক বা প্রায়। ফারসি হইতে পাওয়া এই উপসর্গটির অন্তত দুইটি প্রয়োগ আমরা আকসার ব্যবহার করি—নিমরাজি (অর্ধেক রাজি) আর নিমখুন (প্রায় খুন)। আবার, হাতুড়ে চিকিৎসকদের বলে নিম হাকিম।

তবে কি শেষ মুহূর্তে আসিয়া উপসর্গের অসিলায় নিম-শব্দের অপর ব্যঞ্জনাটি আমাদের স্মরণ করাইলেন কবি? নিম বিষয়ে ভাবনা কি তবে কোনও অপরিস্ফুট বিষয় লইয়া ভাবনা? নানান চিন্তাসূত্রে যাহা ধীরে ধীরে সুপক্ব হইতে হইতে অবশেষে এইভাবে একটি সুখদায়ক পরিণতিতে পৌঁছাইল—

তাই, এইবেলা আমি নিম বিষয়ে বিবিধ উপসর্গ অনুসর্গ যোগে দেখছি সুখদ ব্রহ্ম, দেখছি সরস্বত্যৈ হ্রীং ক্লীং।

অপূর্ণতা হইতে পূর্ণতার বোধে পৌঁছানো অবশ্যই সুখদায়ক এক অভিজ্ঞতা। ব্রহ্ম-শব্দের ভিতর লুকানো ধাতুটি হইল বৃন্‌হ্‌, যাহার অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া বা দীপ্তি পাওয়া। মনের গহনে যে-ভাবনা অসম্পূর্ণ অস্ফুট হইয়া ছিল, নিম হইয়া ছিল, তাহা বিকশিত হইতে হইতে এক আনন্দস্বরূপে উপনীত হইল। এই সৃষ্টিশীলতার জন্যই তো ব্রহ্মকে অনেকে এই জগৎসৃষ্টির রূপকার ভাবেন। নিজের গহন হইতে নিজেকেই তিনি প্রকাশ করেন আপন রচনায়। তাই তাহার অপর নাম কবি। আমাদের মনে পড়িতে পারে বহুশ্রুত সেই রবিগান—জয় তব বিচিত্র আনন্দ হে কবি! আমাদের এই মাটির পৃথিবীর কবিও সেই বিরাট সৃজনলীলার কণামাত্র অংশীদার। নিজেকে খুঁড়িয়া খুঁড়িয়া তিনিও নিজেকেই প্রকাশ করিতে থাকেন। নিজেকেই রচনা করিতে থাকেন ক্রমাগত।

তবে যেকোনও শুদ্ধরূপেরই বিকার আছে, বিবর্তন আছে। বেদে ছিলেন ব্রহ্ম, পুরাণে আসিলেন ব্রহ্মা। নিজেকে বিস্তারিত করিবার কঠোর সাধনায়, যেন ‘ছাত্রীপাঠ্য সন্দর্ভ কিছু হয় কিনা’ দেখিবার কৌতূহলে তিনি সৃষ্টি করিলেন সরস্বতীকে। পরে সেই আপন কন্যাসমের ভিতরেই দেখিলেন ‘চির স্ত্রীমুখ’। ধারাবাহিক প্রতিরোধেও সরস্বতী ঘটনাপ্রবাহ রুখিতে পারিলেন না। শেষতক ব্রহ্মাণীই হইলেন তিনি। কাহিনির মতো শুনাইলেও, ‘এসব ঘটেছে বহুতর ছলাৎছল/ ঘাটের অর্চিষ্মান খাবি বেপথুমতি আপন্নের ঘাটে।’ এইই হইল কবিতাসৃষ্টির আলোছায়াময় রহস্য। কবি একদিকে বাণী বা বাক্‌-এর জন্ম দেন, আবার সেই বাক্‌-এর সাথেই প্রণয়ে লিপ্ত হন। এই বাণী বা বাক্‌-এর দেবীই তো সরস্বতী। তাই, তন্ত্রশাস্ত্র মোতাবেক সরস্বতী হইলেন বাগীশ্বরী—অ হইতে ক্ষ, এই ৫০টি বর্ণে তাহার দেহ গঠিত।

নিজের অস্ফুট ভাবনাটি ক্রমপরিণতিতে পৌঁছানোর ভিতর দিয়া কবি যেমন একদিকে আনন্দস্বরূপ ব্রহ্মকে দেখেন, তেমনই দেখিতে পান নিজের বাণীমূর্তি ধারণকারী সেই বাগদেবীকে। সরস্বতীকে প্রণাম দিলে সংস্কৃত ভাষায় ৪র্থী বিভক্তি (সম্প্রদান কারক) যুক্ত হইয়া শব্দরূপ দাঁড়ায় সরস্বত্যৈ। জ্ঞানের দেবী সেই সরস্বতীকে ‘নমো নমঃ’ বলিয়া নমস্কার জানাইলেই চলে। কিন্তু কবিতা তো শুধু জ্ঞানের বিষয় নয়। তাহার ভিতর মিশিয়া আছে জাদু, মিশিয়া আছে রহস্যময় তন্ত্র। তাই কবি দেখিতে পান, তন্ত্রের ধ্বনিময় ভাষায় কবিতার দেবীকে প্রণাম জানানো হইতেছে—হ্রীং ক্লীং। হয়তো এইভাবে নিজেকেই নিজে দেখিতে পান, এক রহস্যময় ভাষায় আপন সৃষ্টিকে বিনতি জানাইতে। সেই ধ্বনির রণন দিয়া কবিতাটি শেষ হয়।

এইবার আমরা কবিতার নামের দিকে তাকাইবার অবসর লই। দেখি, লিখা আছে—নিমব্রহ্ম সরস্বতী। মানে হইল, একজন অর্ধেক স্বপ্নদেখা কবি কিভাবে তাহার অভীষ্টরচনার সিদ্ধিতে পৌঁছাইতে পারিলেন, তাহা লইয়াই এই কবিতা। এখন আমার এই বুঝ যদি কবির আদি বিবেচনার ধারে-কাছেও না-পৌঁছায়, তবু অন্তত পাঠকের প্রান্তে কবিতাটি আর একবার রচিত হইল। নিম-হাকিমের আনাড়িপনার এই আনন্দটুকু লইয়াই আজিকার মতো বিদায় নিই।

গৌতম চৌধুরী

গৌতম চৌধুরী

জন্ম ১৮ ফাল্গুন ১৩৫৮, ২ মার্চ ১৯৫২, কানপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত। শিক্ষা : উচ্চ...বিস্তারিত