বছর ঘুরে আবারও ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ফের হাজির অমর একুশে গ্রন্থমেলা। প্রতিবছর এই মেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয় কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণাসহ বিভিন্ন ধরনের কয়েক হাজার বই। কোন বই কিনবেন আর কোনটি কিনবেন না, সেই ভাবনায় গলদ্ঘর্ম পাঠকরা। তাদের একটু স্বস্তি দিতে পরস্পরের বিশেষ আয়োজন ‘পাণ্ডুলিপির কবিতা’। এর মাধ্যমে পাঠকরা বইটি সম্পর্কে যেমন ধারণা পাবেন, তেমনি জানতে পারবেন লেখকের শক্তিমত্তা সম্পর্কেও।
আজ প্রকাশিত হলো কবি সাজ্জাদ সাঈফ-এর কবিতাগ্রন্থ কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা-এর কয়েকটি কবিতা। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন রাজিব দত্ত। বইটি প্রকাশ করছে তিউড়ি প্রকাশন।
একটি আঙুল একা
চোখে সওয়ার বরুণ জাতক এক— প্রচণ্ড বাতাস উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে পড়েছে চাঁদ, আড়াল করে তারাদের প্রদাহ!
নাও শিরদাঁড়া, নাও কর্কটস্নায়ু, নাও মজ্জায় ভিড়তে থাকা হারমোনিকার সুর, মায়ের মুষ্ঠি হতে হঠাৎই ফসকে গিয়ে তলিয়েছে যে শিশু বানের পানিতে, নাও তার শ্বাস চাপা চিৎকার তুলে কন্ঠস্বরে—
রক্ত জমাট বাঁধা করোটির হাহাকার থেকে এসে এই বাক্যবিরাম বাড়িয়ে দিয়েছে বাহু, তোমাদের জয়োৎসবে, নিঃসঙ্গ; এই সেই আলেখ্য বিশ্রাম— বহুকাল চেতনালুপ্ত, যেন, কোমা থেকে নড়ে ওঠে একটি আঙুল একা!
দিলখোলা
কাঁচিতে চুল ছাঁটানোর শব্দ আড়ি পেতে শুনি, ভালো লাগে, আজ সেলুনের ধারে কাছে আড্ডা বসাই—কাকে যেন বলে বসি ঘুমভাঙা স্বপ্নের কথা, দপ্তরির লোহার আঘাতে ঝননের কথা, পিঠে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানো ছোটখালার কথা; আরও বলি আস্তাবলে সেইসব ঘোড়ার ফিরে আসার কথা, সমস্ত যুদ্ধের শেষে যারা ফিরে আসে, আর, ছিন্নমস্তক যোদ্ধার শেষতম চিৎকার ধাক্কা খেতে থাকে কর্ণকুহরে, তাদের, সুদীর্ঘকাল!
আজ বড় দিলখোলা আমি—আকাশ ছুড়েছে মেঘের বাবল; আর, গেরস্থালীর অবসরে, বৃষ্টির গল্প ওঠামাত্র, ছাতা হাতে উঠানের ধারে এসে দাঁড়াও তুমি, যেন কেউ এখনি ফিরবে বাড়ি!
চায়ের দোকান থেকে দিগন্ত
(কবি শহীদ কাদরীর মৃত্যুদিনে স্মরণ)
পিঠ থেকে পালক ঝরছে পাখির; যেকোনও ফাঁদের দড়ির মতো টানটান, নিখোঁজ মানুষের হঠাৎ ডাকের মতো অনিশ্চিত, এই ধীর বেলা; শনের খড়ি পুড়ছে চায়ের জ্বালে, আসরের আজানের ধ্বনি উপচিয়ে কানের পাশ দিয়ে গর্জে নামল মেঘ—
ঢেউটিনের দীর্ঘ বাক্য নিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে খুব, আমাদের স্মৃতির ভিতর দেরাজ পেরিয়ে সরে যাচ্ছে বিড়াল, স্মরণ থেকে দুহাত দূরে ঘাসফড়িঙেরা সুবর্ণবোধে ভেজা, কী মর্মর, আহা, বিপুল বনভূমি নিয়ে কাছাকাছি অঝোরে ভিজছে একা একটি লোক!
চিনি না লোকটার ঘর—উন্মাদ পাঠের পাশে পড়ে থাকা কবিতাপুস্তক হতে দুয়ারে দাঁড়িয়ে হাঁক দিতেন জোরে, পানিফল সাজিয়ে রাখা ডালায় একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেন কেমন; মানিক বলত জাদুকর ওটা, কিরকম ঠান্ডা চোখের মণি, আর হাসির মধ্যে ডানা ফরফর শব্দ; মোহময়! মোহময়!
কারিগর
সহজ একটা কাজ— কাগজ ভাঁজ করে নৌকা বানানো তারপর এই যে তুমুল বৃষ্টিতে নালা হয়ে গেছে ঘরের সামনে, নৌকাটা ভাসিয়ে দেওয়া৷
সম্পর্কের ভিতর আমরা এভাবে নৌকা বানাই এত এত জল তার চারধারে, পোনামাছ লাফিয়ে ক্রমশ ডুবে যায় কত—নির্ঝরা, তুমি পর্ণমোচি ফুল; গোপন সিন্দুক খুলে তোমাকে দেখাব, মমির আদল নিয়ে কলিজার কাছে ধুকপুক করা অন্তরাত্মা৷
ছায়া ভরে গেছে বিষ পিঁপড়ায়, তারপর নিচু হতে হতে ফিসফিস শোনা যায় তাদের!
বেঁচে থাকার ভিতর সমস্তটাই ঘটে যাচ্ছে অল্প অল্প আঁচে, আমি সমাধি ফলকে লিখে যে যাব, অত কিনারবিহীন অতল অভিজ্ঞান, অতটা শোকমঞ্চের ভাষা কে দেবে আমায় শেষে!
বন্যাপীড়িত অঞ্চল ঘুরে এসে
আকাশ তার পরনের মেঘ খুলে প্রাচীন মানুষের মতো গাছে গাছে কল্লোল শেখে, জলবাজনার কাছে তার অনাদি অশেষ ঋণ—ফসলে ফসলে নামে অমোঘ তুরাগ, রেলসেতু শেষে লাউ ঝোপ কাঁপে, শ্লথ, ওকি সাপের সঙ্গমে? ধারে কাছে বেদেনীর ঘর?
আমার মুখভঙ্গি থেকে বাতাসের অন্তর্গত উভচর এসে নিয়ে যায় ভাস্কর্যের ধারণা, রেখে যায় চরাচরে বিরল দংশন তার; অথৈ উতলা জলে প্রাণী কোলাহল, ডুবে দেখি আমি নেই অতলে কোথাও!
ধান নেই, পূজা নেই, উপাস্য নিজের কাছে অপচয় সোপর্দ করে।