কো উনের কবিতা : সম্রাজ্ঞী ও নর্মসখীরা

কিছু উপদেশ

কবিতা রুদ্ধ করে আরো ভালো কবিতার পথ। কবিতা রুদ্ধ করে পরবর্তী কবিতার পথ। কবিতা, কবিতা, আমার নীল নীল কবিতা! যেভাবেই হোক কবিতার ইতিহাস থেকে, কবিতার চলতি ঢং থেকে, কবিতার শতবর্ষী কর্তৃপক্ষের থেকে পালাও। জন্ম নাও একা, অরণ্যে, থরোথরো।

জলপ্রপাতের শব্দ

রাজপ্রাসাদে সম্রাটের শয়নকক্ষের দেয়ালে ছিল চমৎকার এক চিত্র। দেয়ালচিত্রে ছিল গর্জমান জলপ্রপাত। এক রাতে সম্রাজ্ঞী বা নর্মসখীদের সাথে শুতে চাইলেন না সম্রাট। পরের সকালে জাঁহাপনার মেজাজ ছিল খুব খারাপ। তিনি ডেকে পাঠালেন চিত্রকরকে। ভুরু কুঁচকে বললেন : আগের দুই রাত এবং গত রাতে আমার ভালো ঘুম হয় নি। কেন? দেয়ালচিত্রে জলপ্রপাতের গর্জন, সারা রাত ধরে, দারুণ শোচনীয় কোলাহল। এখনি মুছে ফ্যালো দেয়ালচিত্রের এই জলপ্রপাত। শিগগিরই মুছে ফেলা হলো সেই জলপ্রপাত। গভীর ঘুম দিয়ে পরের দিন সকালে উঠলেন জাঁহাপনা। সবিস্তারে বললেন রাজ-সরকারকে : আহ, গত রাতে বেশ ঘুম হয়েছে। ওই বাজে জলপ্রপাতের শব্দটা ছিল না, নিদ্রাকক্ষ ছিল খুব শান্ত। শান্তি!

সূর্যাস্ত

তেমন কারো জন্য, এই বিশ্বে যার জন্ম নেওয়া ঠিক হত না। ভুল। তেমন কারো জন্য, এই বিশ্বে যার জন্ম নেওয়া ঠিক ছিল কেবল একবার নয়, ছয়বার কিংবা সাতবার এবং আরো ছয় বা সাতবার বেঁচে থাকা। ওই যে সূর্য ডুবছে মাত্র।

বাড়ি

ঘর থেকে বেরিয়ে এল কুকুরের লেজ, স্বাগত জানাল। ঘর থেকে বেরিয়ে এল আমার হৃদয়, উল্লসিত, স্বাগতিক। হেলমেট খুললাম আমি। নামিয়ে রাখলাম বন্দুক। খুলে রাখলাম কার্তুজের বেল্ট। খুলে রাখলাম ষাঁড়ের চামড়ার বুট, খুললাম মোজা, বাম মোজা প্রথমে। বেরিয়ে এল আমার নগ্ন পা, থুবড়ে পড়া অঙ্কুরের মতো করুণ। তাকালাম স্ত্রীর ছবির দিকে। কাঁদতে শুরু করেছি আমি।

ডিম পাড়ার গল্প

সকাল বেলার ঘুমে আমি একটা উটপাখিকে স্বপ্ন দেখলাম। না, বরং আগে দেখলাম উটপাখির একটা ডিম। হলদেটে, সাদাটে, নিশ্চুপ সেই ডিম। উটপাখির পেট থেকে পড়ার আগে ওই ডিমের মধ্যে শব্দ হচ্ছিল। মা উটপাখি মাথা নুয়ে শুনছিল সেই শব্দ আর বিড়বিড় করছিল। এরই মধ্যে তাদের আলাপ শুরু হয়ে গেছে। কিছু বইয়ে আমি পড়েছি, ঐশ্বরিক কলবিঙ্ক পাখি ডিমে থাকতেই অলৌকিক কথা বলে। উটপাখি ও উটপাখির ডিমই হোক আর ক্রৌঞ্চ ও ক্রৌঞ্চের ডিমই হোক— প্রত্যেকেই এই বিশ্বে জীবন পায় ডিমের মাধ্যমে। যে কারণে তাদের পরস্পরের অনেক কথা থাকে।

শূন্য পাতা

কোনো কবিতা না আসার রাত। বিমান হামলার রাত। নাম জানা বিমানগুলোর হামলা চলে দিনের পর দিন। কাবুলে নদীর পাশের রাস্তায় একসঙ্গে দুই নাতি, ছেলে ও ছেলের বৌকে হারানো পশতুন এক বৃদ্ধের রাত। ডান পা হারানো ক্ষুধায় মরে যাওয়া পাশের বাড়ির সেই ছেলেটির রাত। রক্তাক্ত বিশৃঙ্খলাই যেখানে জীবন সেই রাত। কেমন বিষাদ বিলাস, আর ঈশ্বর! কেমন সেকেলে অলঙ্কার সব! আমার শূন্য পাতায় কোনো কবিতার রূপ না নেওয়ার রাত।

অনুরোধ

এমন অনেক ডাল আছে যে ডালে কখনো বসে নি কোনো পাখি। বলো না আমি একাকী একাকী। আছে নাকি কোথাও এমন কোনো ডাল যে ডাল কখনো দোলে নি বাতাসে? বলো না আমি আছি যন্ত্রণায়, হুতাশে।

শুভ্রতার গান

এক জীবন স্বপ্ন দেখে আরেক জীবনের। বসন্তের শেষে ফোটে শাদা নাশপাতি ফুল, তাদের হৃদয় থরোথরো, অপেক্ষায় চাঁদের। এক জীবন হয়ে ওঠে আরেক জীবনের মতো। গ্রীষ্মের রাতে, বাজরা ফুলের ক্ষেত অপেক্ষায় চাঁদের। এক জীবন সমাহিত হয় আরেক জীবনে। এখন শীত। গতকাল ঝরল যে ভারী তুষার, সর্বান্তঃকরণে অপেক্ষায় চাঁদের। আমি একটি পাথর ছুড়ি। তুষারে সমাহিত হয়ে তা আবার শুরু করে আরেক জীবন। শেষ পর্যন্ত চাঁদ ওঠে।

সাদা প্রজাপতি

দ্যাখো। একটা শাদা প্রজাপতি প্রজ্ঞার প্রেতাত্মা, উড়ছে নির্বোধ সমুদ্রের ওপর। দুনিয়ার সব বই এখন বন্ধ।

পাহাড় থেকে নামা

পেছন ফিরে দেখি এ কি! এই মাত্র নামলাম যে পাহাড় থেকে তার কোনো চিহ্নই আর নেই। আমি কোথায়? হেমন্তের হাওয়াও মরে গেল ধীরে সাপের গা থেকে খসা ছলমের মতো।

সাম্প্রতিক

খাইবার পাস আফগানিস্তান আর পাকিস্তানের মধ্যে সত্যি রুক্ষ, নির্জন আর হাজার বছর ধরে স্থবির। ঠাং! গোলার আওয়াজ, এমন ফাঁপা এক পূর্ণতা।
সংশ্লিষ্ট পোস্ট : ভোরের স্বগতোক্তি : কো উন ● দানব-তাড়িত এক বৌদ্ধের সাক্ষাৎকার
ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

জন্ম ১৯৭৭; ময়মনসিংহ। পেশায় সাংবাদিক। প্রকাশিত বই : আলো অন্ধকারে আলো অন্ধকারের...বিস্তারিত