একাডেমি এবার কার

মৌসুম এসে গেছে। নড়েচড়ে বসেছে বাংলার সাহিত্যসমাজ। ‘না, না, করব না, করব না,’ বলেও আলাপ-আলোচনা করছেন কবি-সাহিত্যিকরা। আছে কানাঘুষা ও ফিসফাস। হিসহিস করছেন কেউ কেউ। কেউ আবার নিসপিস। কেউবা বাজাচ্ছেন শিস।

ঘটনা কী?

না, জাতীয় বা মহাজাতীয় কিংবা মহাজাগতিক কোনো ইস্যু নয়। সাহিত্যের নতুন কোনো আন্দোলন-আলোড়ন নয়। বরং এক তরঙ্গহীন প্রসঙ্গ তরঙ্গিত করছে কবি-সাহিত্যিকদের। বরাবরই এটা হয়। এই শীতে এক চিলতে উষ্ণতার জন্য ওঁত পেতে থাকেন কেউ। কেউ বা থাকেন আঁত পেতে, হাত পেতে। কেউবা হাভাতের মতো থাবাতে থাবাতে বলে যান, ‘এবার আমিই।’ হাবা ও গোবাতে দৌড়, হাঁপাতে হাঁপাতে বুড়ো কিংবা ফোঁপাতে ফোঁপাতে ফাঁপাতেরাও ছুটে যায় বাংলা একাডেমিতে। তা তো যাবেই। আমাদের তো নেই সুইডিশ রয়াল একাডেমি, আছে যা তা লয়াল।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের এই মৌসুমে এই-ই হয়। জল্পনা-কল্পনা আর ঈহা-অনীহার গাড়িতে চড়ে এবারও সময় প্রায় এসে গেছে পুরস্কার ঘোষণার। এরই মধ্যে নাম জমা দিয়ে দিয়েছেন প্রস্তাবকরা। নীতিমালা অনুযায়ী ২৫ জন প্রস্তাবকের কাছ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে প্রস্তাব চলে যায় বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের কাছে। এরপরই ২৩ জানুয়ারির মধ্যে প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনায় বসবে ৭ সদস্যের বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার কমিটি। তাদের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বাংলা একাডেমি নির্বাহী পরিষদ। অর্থাৎ ধরে নেওয়া যাচ্ছে আগামী ২৫ জানুয়ারি ঘোষণা হয়ে যাচ্ছে কে কে পাচ্ছেন এবারের বাংলা একাডেমি পুরস্কার।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩-এর জন্য এরই মধ্যে বেশকিছু নাম শোনা যাচ্ছে। কবিতায় মিনার মনসুর, ফরিদ কবির, মজিদ মাহমুদ, ময়ূখ চৌধূরী; কথাসাহিত্যে মাশরুর আরেফিন, পাপড়ি রহমান, আকিমুন রহমান, দিলারা মেসবাহ; প্রবন্ধ ও গবেষণায় জুলফিকার মতিন, আহমেদ মাওলা, শিরীণ আখতার, ভীষ্মদেব চৌধুরী, কুমার চক্রবর্তী; অনুবাদে জি এইচ হাবিব, রাজু আলাউদ্দিন, সফিকুন্নবী সামাদী। এই চার শাখার বাইরে—নাটক, শিশুসাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনি, লোকসাহিত্য, বিজ্ঞান, কল্পবিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান—এসব বিষয় ধরে অন্তত আরও সাতটি শাখায় এবারও পুরস্কার পাবেন কেউ না কেউ। 

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে যা হয়, বরাবরই প্রাপ্য ব্যক্তির নাম টপকে অন্য কোনো নামধারীর হাতে পুরস্কার ও সম্মাননাপত্র উঠে যায়। শেষমুহূর্তে এসে পুরস্কারের শোভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠে অনুজ্জ্বল কিছু নাম। এবারও তেমন হওয়ার সম্ভাবনা আছে খুব বেশিই। এতে পুরস্কার ও সম্মাননাপত্র নিজেও অসম্মানিত বোধ করে বৈকি। নিতান্ত জড়তার কারণে ওই হাত থেকে ফস্কে পড়তে পারে না সেগুলো।


পুরস্কারের জন্য নাম প্রস্তাবকারীদের তালিকা এবং কে কোন নাম প্রস্তাব করেছিলেন তা পুরস্কার প্রদান শেষে প্রকাশ করা যেতে পারে। একইভাবে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের নাম এবং নির্বাহী পরিষদের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের নাম পুরস্কার প্রদানের পর প্রকাশ করা যেতে পারে।


বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের কিছু নীতিমালা আছে। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা চাইলে তা সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন বা বাতিল করতে পারেন। যেহেতু তারা তা পারেন সেহেতু তাদের কাছে কিছু প্রস্তাব: 

১. বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২২-এর ক্ষেত্রে দেখা গেছে ১০ জনের পরিবর্তে ১৫ জনকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। কয়েকটি শাখায় যৌথভাবে পুরস্কার পেয়েছেন কয়েকজন। যৌথতার এই তরিকা বহাল রাখা হোক। 

২. পুরস্কারের অর্থমূল্য তিন লাখ টাকার পরিবর্তে আরও বাড়ানো জরুরি। মোটে তো তিন লাখ টাকা, তা-ও যদি যৌথভাবে পুরস্কার পাওয়ার কারণে ভাগেযোগে নিতে হয় তাহলে আর থাকে কী! কোনো শাখায় যৌথভাবে পুরস্কার দিলেও যেন প্রত্যেককে তিন লাখ টাকা করেই দেওয়া হয়। 

৩. পুরস্কারের জন্য নাম প্রস্তাবকারীদের তালিকা এবং কে কোন নাম প্রস্তাব করেছিলেন তা পুরস্কার প্রদান শেষে প্রকাশ করা যেতে পারে। একইভাবে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের নাম এবং নির্বাহী পরিষদের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের নাম পুরস্কার প্রদানের পর প্রকাশ করা যেতে পারে।

৪. মরণোত্তর পুরস্কার প্রদান না করার যে নীতিমালা আছে তা সংশোধন করা যেতে পারে। বাংলা একাডেমি পুরস্কার তো এক বিবেচনায় একটি প্রবেশিকা পুরস্কার। সাহিত্যে কারো কাজের জন্য রাষ্ট্রের প্রাথমিক স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতি না পেয়ে মধ্য বয়সে কেউ মরে গেলে জাতির আত্মা অন্তত শান্তি পাবে না। একইভাবে এই পুরস্কার পাওয়ার জন্য কাউকে যেন মৃত্যুর কাছাকাছি বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে না হয়।

৫. পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি শাখায় বরাবরই একাধিক যোগ্য ব্যক্তির নাম থাকে। ধরা যাক সেগুলোর একটি হচ্ছে কবিতা। যাকে কবিতায় দেওয়া যাচ্ছে না, গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকলে তাকে প্রবন্ধ ও গবেষণা কিংবা অন্য কোনো শাখায় পুরস্কার দিয়ে দেওয়া হোক। অতীতের পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা দেখে মনে হয়, বাংলা একাডেমি এ কাজটা করেও থাকে।

৬. সাহিত্য পুরস্কার প্রদানের পাশাপাশি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার প্রদানের যে লক্ষ্য বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে রয়েছে তা প্রবর্তন করা যেতে পারে। সেটি হতে পারে বঙ্গবন্ধু কিংবা রাষ্ট্রের তেমন কোনো ব্যক্তিত্ব কিংবা জাতির মননের পরিচয় ধরে থাকা কোনো সাহিত্যিকের নামে।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের জন্য যারা নাম প্রস্তাব করেন এবং যারা নামগুলো বিবেচনায় আনেন তাদের প্রতি কিছু প্রস্তাব:

১. প্রতি বছরই যোগ্যদের চেয়ে অযোগ্যরাই এই পুরস্কার বেশি পায়। এই পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রস্তাবকারীদেরও নিশ্চয়ই ভূমিকা আছে। তারা কারো নাম প্রস্তাব না করলে তো কারো নাম তালিকায় ঢোকারই সুযোগ থাকার কথা নয়। সত্যিকার অর্থেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন এমন কারো নাম প্রস্তাব করুন।

২. বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় বিরাট কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন নি, কিন্তু ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় নিবেদিতপ্রাণ, সারা জীবন এ নিয়েই কাজ করেছেন, এমন লোককে পুরস্কারের জন্য বিবেচনায় রাখুন।

৩. বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার ধান্ধায় চার-পাঁচটা বই লিখেছে কিংবা পাগলের প্রলাপের মতো আবোল-তাবোল শতাধিক বই লিখেছেন এমন লোককে পুরস্কারের জন্য বিবেচনায় রাখবেন না। শতাধিক ভালো বই কেউ যদি লিখে থাকে তাকে পুরস্কৃত করার কোনো দরকারই নেই। তিনি এমনিতেই তো বাংলা একাডেমি পুরস্কারের উচ্চতাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা।

বাঙালি জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি। এমন একটা স্লোগান শোনা যায়। পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি যেন এমন ব্যক্তিত্বদের বিবেচনায় নেয় যারা বাঙালি জাতির মননের প্রতীক হওয়ার যোগ্য এবং সেই সম্ভাবনা তার লেখার মাধ্যমে এরই মধ্যে জানান দিয়েছেন।

প্রতি বছরই বাংলা একাডেমিকে সাহিত্য পুরস্কার দিতে হয়। প্রতি বছরই প্রতিটি শাখায় যোগ্য লোক পাওয়া একটু কঠিনও। এক্ষেত্রে কেউ না পেলেও বরং ইজ্জত রক্ষা হয়। বাংলা একাডেমি পুরস্কারের ব্যাপারে যে বিমুখতা তৈরি হয়েছে তা থেকে বাংলা একাডেমিকে বাঁচান। বাংলা একাডেমি পুরস্কার যে লবিং ছাড়া হয় না এটা সাহিত্যসমাজে এখন চাউড় ব্যাপার। এই গুজব ও গঞ্জনা থেকে বাংলা একাডেমি রেহাই পাক।

ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

জন্ম ১৯৭৭; ময়মনসিংহ। পেশায় সাংবাদিক। প্রকাশিত বই : আলো অন্ধকারে আলো অন্ধকারের...বিস্তারিত