অলঙ্করণ : সারাজাত সৌম
একবছর আগেও কোলকাতা থেকে গোপালগঞ্জ, একদিনের মধ্যেই পৌঁছানো যেত। শিয়ালদা থেকে ট্রেনে চেপে সোজা খুলনা। ঠিক দুপুরের মধ্যে। তারপর ভৈরব জলের আড়পাতা টু পাইস হোটেলে একটু অহড়র ডালের সাথে দাড়কিনি মাছের ঝোল খেয়ে লঞ্চে চেপে বসলেই লোহাগড়া পার হয়ে সদরের ঘাট। চাইলে স্টিমারে চেপে একেবারে বৌলাতলি। বর্মার সাথে এই মফস্বলি বন্দরের কেমন এক আশ্চর্য মিল। সেরকম একই রোশনাই। খালাসির ক্রমাগত হাঁকডাক আর মাল ওঠানো-নামানো। কিংবা উলপুরের বাবুদের পাঁচ হাজার টাকায় কেনা রয়েজ ফোর মডেলের গাড়ি। সেটাও বোলতলিতে থাকে আজকাল। এখানকার নদী পছন্দ মনে হয় সমাজদার রাইচরণ রায় চৌধুরীর। দু বছর আগে ভেবেছিলেন নদীর ঠিক পাশে একটা বাড়ি বানাবেন। সেটা বাঈবাড়ি হবে। তারপর কোলকাতা থেকে জিগরি দোস্ত তারিনীবালা এলে, তার কাছে নতুন টকিজের গল্প শুনবেন। ধরমতলার মোড়ে থিয়েটারের নতুন যে পোস্টার, প্রেমেন্দ্র মিত্তর নামে এক লোক বানিয়েছে অংশুমালী নামের সিনেমা, সেখানে নায়িকা কানন বালা—সেসবের গল্প শুনবেন। তারপর পারলে বোলতলি বাজারে বসাবেন টকিজের কল। নড়াইল আর গোপালগঞ্জ সদরের লোকদের আর টকিজ দেখতে খুলনা, ফরিদপুর যেতে হবে না।
এসব রাইচরণের প্রায় বছর দুয়েক আগের ভাবনা ছিল। সে মতো বাঈবাড়ির কাজ শুরু হয়েছিল। গত ছ'মাস হল কাজ থেমেছে। শুধু কাজ কেন, এখানের মানুষও কেমন থেমে থেমে আছে। তারা কি থেমে যাওয়া রিল হয়ে গেল টকিজের! না, ১৯৪৮ একটা থমকে যাওয়া সাল। সেই থমকে যাওয়া আটচল্লিশ সালের একেবারে শুরুতে তারিনী বাড়ি ফিরল। বর্মা থেকে, কলকাতা হয়ে। আশ্চর্য, কদিন আগেও সেটা ছিল বাড়ি ফেরা। এখন সেটা দেশ থেকে দেশে যাওয়া। তারপর আরেক দেশে যাওয়া।
শিয়ালদা থেকে ইস্ট পাকিস্থানে আসা আজকাল কঠিন ব্যাপার। এপাড় থেকে শুধু ট্রেন যাচ্ছে। এপার-বাংলার সমস্ত গেরস্থালি পাচার হচ্ছে ওপারে। ঢাকা, খুলনা, বরিশাল সবখান থেকে শুধু সারে সারে মানুষ। কেন তারা সব কিছু ফেলে যাচ্ছে কে জানে। পুব বঙ্গের সম্পন্ন হিন্দু পরিবারগুলোও এখানে এসে আশ্রয় খুঁজছে। গাছ শেকড় উপড়ে অন্যখানে লাগানো কঠিন। তবু দেশ ছাড়াছাড়ির এ চক্রে গাছেদেরও নিস্তার নাই! তারিনী একটা ব্যাপার ভাবছে, গত বছর তো এত মানুষ আসতে দেখেনি সে এপাশে। এবার এত কেন। পাঞ্জাব বর্ডারেও অবস্থা একই। মানুষ আসছে আর আসছে। কাল দেখা হয়েছিল জয়দেব সিন্ধিয়ার সাথে। করাচির এ ছেলেটার সাথে তারিনীর পরিচয় রেংগুনে। কাল শোনা গেল ও কলকাতায় একটা বাড়ি খুঁজছে। এপাশের মুসলমানরা কী করছে। এরাও কি মাইগ্রেশনে যাবে! পার্ক স্ট্রিটের উর্দু স্পিকিং মুসলমানরা? বসিরহাটের খেতি চাষা?
নমশূদ্র আর মুসলমানে ভরা গোপালগঞ্জের এই জংলার বিলে, উলপুরের এই ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবার বড় অনিরাপদ। সেটা রাইয়ের ছোট পিসে সুরেন গুহর মার্ডারের পর থেকে
কলকাতার বন্ধুদের সাথে কতদিন দেখা নেই তারিনীর। সে তো প্রায় পাঁচ বছর। ও যখন বর্মায় চলে গেল তখন যোগেন মণ্ডল কেবল লোয়ার এসেম্বেলিতে। সেবার হক সাহেব ক্ষমতায়। এখন সবকিছু বদলে গেছে। যোগেন মণ্ডল এখন পাকিস্তান এসেম্বেলির স্পিকার। করাচির মালস হিলে থাকেন। এই সেই যোগেন মণ্ডল, যিনি রিপন কলেজে তারিনীর সিনিয়র ছিলেন। তারিনী নিজেও নমশূদ্র বাড়ির ছেলে। সেই থার্টিজের কলকাতায় রেলো মিউজিক, গ্রামোফোন আর বাঙালি ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত কল্লোল সাহিত্যের যুগে যোগেন মণ্ডলের ধরমতলার মেসেও সে থেকেছে অনেক সময়। তারপর পার্ক স্ট্রিটে আসা নতুন শরৎচন্দ্রের নভেল কিনে সে যেত বোলতলি। সেখানে ছিল রাইচরণ—তার বাল্যবন্ধু, কায়স্থের ছেলে। অথচ কী আশ্চর্য— তার প্রিয় বন্ধু তারিনী। সেটি কি সে রিপন কলেজে পড়েছে বলে? নাকি দুজনে মিলে ভেবেছিল বোলতলি বানাবে টকিজের কল?
—শোন, তারিনী, মুশেরিরে তোর কেমন লাগল, ক তো? খাস লখৌনি জিনিস রে! আচ্ছা আমরা যদি কখনো টকিজ বানাই, মুশেরিরে অ্যাক্ট্রেজ করব, হুম!
রাইয়ের খবর জানে না তারিনী দেড় বছর। দেড় বছর আগে ওর চিঠি পেয়েছিল। তখন সবে পাকিস্তান হলো। রাইদের সবাই তো কলকাতা চলে এল। রাই চিঠি লিখল,''তারিনী রে। আমি রয়ে গেছি রে। তুই চলে আয়। মুশেরিও আছে। আমরা টকিজ বানাব।"
মুশেরি কি আসলেই যায় নি? কে জানে। এই পাগল রাইচরণকে নিয়ে আর পারা গেল না। অথচ এ ছেলেটার একা একা ইস্ট পাকিস্তানে পড়ে থাকাটা বিপদজনক। নমশূদ্র আর মুসলমানে ভরা গোপালগঞ্জের এই জংলার বিলে, উলপুরের এই ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবার বড় অনিরাপদ। সেটা রাইয়ের ছোট পিসে সুরেন গুহর মার্ডারের পর থেকে।
তারিনী খুব অদ্ভুত একটা জিনিস দেখছে। পুববাংলার নমশূদ্রদের এপাশে আসার হার খুব কম। বরং বিরুইপুরের দিকের থেকে কিছু পরিবার নাকি ইস্ট পাকিস্থানে চলে গেছে। যোগেন মণ্ডলই এর কারণ। নমশূদ্র কৃষক তার ভরসার জায়গায় বরং মুসলমান কৃষকের সাথেই মিল পাচ্ছে। বছর দুই আগে পাকিস্তান আন্দোলনের সময় গান বাঁধা হয়েছে, "শেখ আর শূদ্রের একই দুশমন।"
কিন্তু এই ভরসা আবার নষ্ট না হয়ে যায়। আজ লঞ্চে দেখা হয়েছিল বিজয় সরকারের সাথে। ছিপছিপে ফর্সা একটা ছেলে। সে কবিগান গায়। ওর সাথে আরেকটা ছেলে। একদম হালকা, কাঁধ অব্দি চুল। সে কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তে গেছিল। নাম লাল মিয়া। সে তারিনীকে একটা ছবি এঁকে দিল। নদীর চরের ছবি।
—কি তুমি কি থাকিয়া গেলে বিজয়? —কই আর যাব। কবির দেশ আছে নাকি? হে হে! তাছাড়া দাদা, নমশূদ্ররা তো দেশ কেউ ছাড়তিছে না। বরং যাগে সাথে মেশে তারাই তো থাকবে। আপনেরে বরং একটা গান শুনাই দাদা... লোহাগড়া আইসে পড়ছে। ওইখানে নেমে যাব দাদা।
লঞ্চ বোলতলি পৌছাতে প্রায় সারা রাত কেটে গেল। শেষরাতের দিকে সুনসান একটা বাজারে এসে তারিনী পৌঁছালো, তখন সেটাকে একটা ভুতুড়ে বাজার বলা যায়। ঘাটের কুলিদের কাছ থেকে শোনা গেল, কাল উলপুরের বাবুদের বাড়িতে আগুন দিয়েছিল মুসলমান কৃষকেরা। নমশূদ্ররাও ছিল। এতে বোলতলি বাজারের মুসলমান কুলিদের খুব খুশি মনে হলো। শত হলেও, উলপুরের বাবুরা গত পঞ্চাশ বছরে তাদের অত্যাচার কম করে নি।
তাতে, শোনা যাচ্ছে, উলপুরে থাকে বাবুদের বাড়ির ছোট বাবুটি, মানে রাইচরণ চৌধুরী ভস্ম হয়ে মরেছে। শেষে ওদের বাড়িতে সে একাই ছিল। কী সব ছবি বানানোর কল বানাচ্ছিল। আর সম্পত্তি বেচছিল। বাকি অবশিষ্ট। অবশ্য খুব বেশি কিছু ছিলও যে, তা না। রয়েজ গাড়িটা নাকি কিনে নিয়েছে বোলতলির বিশ্বাসরা। সেটা চালানোর জন্য ড্রাইভার খোঁজা হচ্ছে।
শেষ কালে রাইচরণের সাথে থাকত নাকি শুধু তার উড়িয়া চাকর রামমালি। আর লখনৌ-এর মশুরী বাঈ। জানা গেল, নয়া মুসলিম লীগ নেতা ছমেদ শেখ নাকি তাকে বলেছিল, মশুরী বাঈকে তাকে দিয়ে দিতে। ঠিক, মুসলমানের নয়া দেশে এই মুসলিম আওরাত কাফের আধপাগলার কাছে থাকবে কেন। সেটা নিয়েই বিতণ্ডার শুরুয়াত। এবং বিতণ্ডার এক পর্যায়ে মদগ্রস্ত রাইচরণ তার শেষ সম্বলগুলোর একটা দোনালা বন্দুক দিয়ে ছমেদকে গুলি করে বসে। বেচারা অল্পের জন্য বেঁচেছে। রাখে আল্লাহ।
যাহোক এই জমিদার মেজাজ নয়া পাকিস্থানের প্যাট্রিয়ট চাঁদতারা ব্যাজধারী মরদরা মানতে রাজি নয়। তারা দলবেঁধে রায় বাড়িতে আগুন দিয়েছে। রাইচরণ ভিতরে ছিল। খানিকটা বেহুঁশ। আজকাল নাকি মদ খেয়ে ওভাবেই পড়ে থাকত। মশুরীও ভেতরে ছিল। কেউই বেরুতে পারেনি। পুড়ে মরেছে।
অবশ্য ওর ছবি বানানোর কলটি নাকি এখনো অক্ষত আছে।
তারিনী সেই প্রাচীন আমলের ছবি বানানোর যন্ত্রটার দিকে তাকাল। সেখানের শাদাকালো ফ্রেমে বয়স্ক মশুরী বাঈ নাচছে
ও কি সব বেচে দিয়েছিল? —হাঁ,বাবু। বড় বাবুরা তো তাদের ছব লিয়ে গিয়েছেন।
তারিনী রামমালির দিকে তাকাল। উলপুরের একদা প্রতাপশালী জমিদার-বাড়ির টিকে থাকা শেষ জনমানব সে। ও আসলে উড়িয়া বামুন। কবে এদেশে এসেছিল, তা মনে হয় ওর নিজেরও মনে নেই। ওকে তারিনী দেখল বছর দশ বাদে। প্রায় দশ বছর আগে, এ ঘরটায় যখন আড্ডা হত, তখন রামমালির হাতে থাকত শারাবের ট্রে। খুব টাকটা স্কচ। ভেড়ার হাটে বসেছিল নতুন বরফ কল। সেখান থেকে আসা বরফ। রুমের দেয়াল জুড়ে বই। এখন পোড়া ছাই থেকে তার দু একটা কবিতা। প্যাটিস ওয়েরন নামে এক অতি স্বল্প পরিচিত কবির বই। সেটা রুমে পোড়া ছাই হয়ে এখনো উঁকি মারছে। সেখানে বলছে, ''এভরি ম্যান ইজ আ অ্যালোন স্পিসেজ..."। আর চিকের ফাঁক দিয়ে মশুরী বাঈ। তার কি বয়স বেড়ে যাচ্ছিল?
—বাবু, উনি ছবকুছ বেচে বেচে এই যন্তর কিনেছিলেন। এই ছবিযন্তর।
তারিনী রুমের একপাশে রাখা ওয়েলিং মুভি হাউজের বানানো সেই টকিজ বানানোর যন্ত্রটা দেখল। সেই আদ্যি যুগের দানব ক্যামেরা। চকচকে কাজ। সেখানে লেখা হিন্দুস্থান মুভিজ। সেখানে কে আছে, কাননবালা, আমি বনফুল? বাকি ধ্রুব বলছে, যিনি জ্ঞানী তিনি বিশ্বরূপী।
—ও পাইছিল কোত্থেকে এইটা? —সাবডিভিশন এস ডিও সাহেবের এ জিনিস আছে বাবু। —এসডিও মানে আর্থার ডসন, সেই অ্যাংলোটা? —হাঁ, বাবু। ছমেদ শেখ কিনে দেছিলেন, সাহাব ইন্ডিয়া চলে যাহার সোময়। বাবু ছব বেচে দিলেন। যন্তরের জইন্যে। শেষে আর দেয়ার কিছু নাছিল। ছমেদ শেখ বইলেলেন তাহার টাকা লাগিবে। নয়ত মশুরী বাঈরে নিয়া যাইবেন। —মশুরী কি ওর সাথে ছিল? —হাঁ বাবু। মায়া কাটাইয়ে যাইতে পারে নাই। হামার মতো। বাবু সেইদিন রাগের বসে ছমেদরে গুলি কইলেন। তারপর ত ছমেদ লোক দিয়া আমাদের পুড়াইয়ে দিল।
তারিনী সেই প্রাচীন আমলের ছবি বানানোর যন্ত্রটার দিকে তাকাল। সেখানের শাদাকালো ফ্রেমে বয়স্ক মশুরী বাঈ নাচছে।
সেরকম খুব রকমের একটা মাস্টার শটে, রাইচরণ রায় চৌধুরী, মশুরী বাঈ, ঘুঙুর, দেশ ছাড়ি-ছাড়িব-করছি মানুষ, পোড়া বইয়ে অজ্ঞাতবাস কোনো কবির কবিতা সব একসাথে এঁটে যাবে।