ডাল্টন সৌভাত হীরার কবিতা

নিউমোনিয়া

যেসব বৃষ্টিতে আমরা আটকা পড়েছিলাম শ্যাতশেতে নিউমোনিয়া-ধরা হিন্দু বাড়িতে.. প্রায় আঁতুড়ঘরের গন্ধের মতো বিনাশেষ গৌরকালে ঘাটে...

শ্বেত জবা তুলে ঠোঁটে ঠোঁটে বলেছিলাম, 'রাধামাধবের ঠোঁটে এভাবে চুমু খেতে হয়। জীয়ন্ত রাইয়ের বসন খুলে প্রতিদিন স্নান করাতে হয় গাহন-জলে!'

ঠিক সেই বৃষ্টিতুর নিউমোনিয়ার কথা মনে পড়ছে। ভেজা কাপড় পাল্টাতে যেয়ে নতুন শাড়ি না খোঁজা রাইয়ের কথা একদম মনে পড়ছে না।দিব্যি!

বৃষ্টি আসুক। নিউমোনিয়া, শাদা হিন্দু বাড়িতে আমরা আটকে পড়ি। আমার সামনে বসন পাল্টাক রাই।

ক্যাপ্টেন প্লানেট

আমার শৈশবের কোন গল্প নাই।

আমাদের বাসায় খুব পুরানা জামানার একটা শাদাকালো টি.ভি ছিল। সেখানে চলত বিটিভি। শুধু , ইংলিশে বিকেলবেলায় ক্যাপ্টেন প্লানেট হত; তার শব্দার্থ জানা ছিল না বলে এক ধরনের আফসোস আছে।

আমার কৈশোর নিয়েও আমার কোন গল্প নাই। আমাদের বাসার পাশে সদ্য কলেজে ওঠা এবং ফিনফিনে শিফন ভেদ করা তদস্য কোন বড় আপু ছিল না। কাজেই কোন গ্রীষ্মকালীন দুপুরে চুমুর স্মৃতিটুকুও আমার হয় নাই। তবে ক্লাস এইটে বৃত্তি না পাওয়ায় এবং হুমায়ুন আহমেদের 'আঙুল কাটা জগলু' কিনতে না পারায় এক ধরনের আক্ষেপ আছে।

তবে আমার ঢাকা ভার্সিটি জীবন নিয়ে আমার খুব কম আক্ষেপ আছে। এ সময় আমাকে জড়িয়ে, প্রেম-ট্রেম নিয়া ম্যালা কথা শোনা যায়।তার বেশির ভাগই মিথ্যে।

তবে এ সময় আমার প্রিয় সখ ছিল, ফাইভ স্টার বুস্টার দিয়ে কারো হাঁটুতে গুলি করা এবং তাকে দৌড়াতে বলে সম্ভবত আমি তাদের, আমার গত প্রেমিকার ব্যর্থ প্রেমিক ভাবতাম!

বেখাপ্পা

একটা পথ পাওয়া যেত, একদম ঠিকঠাক দৈর্ঘ্যের, একটু ঢিলেঢালা প্রস্থের, আর একটু কাটছাঁট উচ্চতার।

আমি বড় বেখাপ্পা, কোনো পথ, এর উঁচানিচা, স্মুথ হাইওয়ে... কোন কিছুই আমার সাথে খাপ খায় না। বেখাপ্পা; পুরান মার্কেটের প্যান্টের মতো সেইগুলা বিদঘুটে মাপজোকের হয়। আমারে পরলে ঠিক জোকারের মত লাগে। অবশ্য পরিচিত এক দর্জি আছেন, টেইলারিং শপ; উনি সারাদিন মেশিন ঘুরায়া রেশম ও তন্তুর সহবতে পুরান মালের জামাপ্যান্ট সব ঠিক করে দ্যান।

শুধু ঘোড়ার হ্রেষা আর শের শা'র মসনদ হারিয়ে যাওয়া এ রাস্তার কোন মাপজোক নাই। দীর্ঘতম, প্রস্থতম, উচ্চতম! যখনই হাঁটি, বড় বেখাপ্পা খাকি প্যান্টের মত মনে হয় সমূহ সড়ক।

মান সরণীতে ক্যান যাও বেমানান পথিক?

পেয়ালা

অবসন্নতা আমাদের দুপুরের মতো পাক। আমরা যেন আরও বেহুঁশ হয়ে উঠি...আমরা যেন আরো বেহুঁশ হয়ে যাই। হুঁশ হলে দেখি পানের পাত্র নাই, যদিও সেখানে বিষের অভাব নেই। হুশ ফিরে আমরা যেন দেখি, বার্ধক্য পালিয়েছে, শক্ত বিষাল পেয়ালা গেলার মত নওজোয়ান আমি।

ফেরা

কিছু মানুষের কষ্ট পাওয়াটাই স্বভাব। কষ্ট ভেতরে জ্বলে, পোড়ে, দাহগ্নির ভস্ম হয়।

বুকের ভেতরে চেপে রাখা সে আগুনের উত্তাপ, প্রচণ্ড শৈত্যে ফায়ারপ্লেসের সামনে দাঁড়ানোর মতো। কষ্ট—সুখকর। বুকের ভেতরে সবার কম বেশি যজ্ঞ হয়।সেখানে আগুন জ্বলে। ঘি ঢেলে সে আগুন আরো বাড়াই।

*** কবিতাকে আমি ভাঁজ করে রাখি। আম্মার প্রায় পুরাতন শাড়ির রংচটা জর্জেটের কাজ ভুল বানানের মত সযত্নে লুকিয়ে রাখি। পুরানা শাড়ির মত অতি পুরানা কবিতারা আজকাল ভেঙে ভেঙে যায়। ফাউন্টেন পেনের ভাঙা নিবে যেমন শুষে নেই কালি, কবিতাকে তেমনি জিভে তুলে নেই। পুরানা শাড়ির মত সযত্নে তুলে রাখি।

*** জলদ গন্ধহীন হয়ে নিশ্চুপ শ্যাওলার মত আমি এখনো বেঁচে আছি।শুধু আমার মায়ায় বেঁচে আছে কর্কট মাছের বহর, ধারালো দাঁত নিয়ে।মৃত্যুর স্বাদ আছে, এদের কাছেই শিখেছি প্রথম।

আমার জুড়ানো মাংস যেদিন গলায় পুরবে এরা, সেদিন বুঝব আমার গত প্রেমিকারা অপেক্ষা শিখতে পারে মাছেদের কাছে। অযথাই কফি জুড়িয়ে, মাংসের স্বাদ না নিয়ে চলে গেছে তারা। আর এখন যে মাংস জল হয়ে গেছে তার খোঁজে অযথাই ঘোরে ফেরে।

ডাল্টন সৌভাত হীরা

ডাল্টন সৌভাত হীরা

জন্ম ২৫ জানুয়ারি, গোপালগঞ্জ। পড়াশোনা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ন্যাশনাল...বিস্তারিত