প্রিয় ১৫ : মোশতাক আহমদের কবিতা

সড়ক নম্বর দুঃখ বাড়ি নম্বর কষ্ট

বাড়ির নম্বর ঠিকানা বদলাতে হয়েছে ঢের; অবশেষে সম্প্রতি একটি স্থায়ী ঠিকানায় গড়েছি বসত। প্রশস্ত বিজয় সরণি ধরে এগিয়ে পতন সড়ক আর পরাজয় লেনের সংযোগে একটু দাঁড়ালেই চোখে পড়বে বিষণ্ন ট্রাফিক পুলিশ সারাক্ষণ হাত উঁচিয়ে আনন্দের রাস্তা জুড়ে; গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে দ্রুত গাড়িঘোড়া যাচ্ছে বেদনার হাইওয়ে দিয়ে। রিকশা নেবেন; নাম উচ্চারণমাত্র সো-ও-জা  নিয়ে যাবে বাড়ির সদর দরজায়, গেটের সাদা ফলকে লেখা আছে কালো অক্ষরে : সড়ক নম্বর দুঃখ বাড়ি নম্বর কষ্ট।

চড়ুইকে নিবেদিত পঙ্‌ক্তিমালা

১. তুমি যেভাবে খাও প্রকৃতি-বরাদ্দ এঁটো বর্জ্য লিখতে বসে সেই ভঙ্গিমা এল আমার স্মরণে। চড়ুই আমার চড়ুই! মানুষ খুঁটে খায় সমূহ সৌন্দর্য                                    তোমার ধরনে। ২. মানুষের কোনো রকম প্রকৃত আনন্দও নেই চড়ুই আমার চড়ুই। মৌলিক আনন্দের ভ্রূণ আত্মসমর্পণে। শুধু মানুষই জানে সে অভিজ্ঞতা কতটা ক্লান্তির, করুণ। ৩. চড়ুই আমার, কাউকে যখন খুব ভালোবাসা যায় মানুষ পারে না আর তাকে ভুলে যেতে, যদিও-বা প্রত্যাখ্যানের অতল জলে তাকে তুমুল ডুবায়                             প্রিয়তম জিহ্বা। ৪. স্মৃতি আগুন; মানুষ কি কখনো ভুলে যেতে পারে ওই উজ্জ্বলতা? বুকে বাজে যা অবিরাম লোকে বলে সাজানো দুঃখবিলাস; যাকে আঘাত করে ভালোবাসা সেই শুধু জানে একা                             অসহায় কষ্টের নাম।

লক্ষ্মীট্যারার প্রতি অন্ধ হোমার

দেখেছি একবার, লাবণিগ্রস্ত অতঃপর— অন্ধ দুই চোখ, অথচ এ হোমার হিমশিম তাকে ঘুম পাড়াতে। কাকতালীয় এই যোগাযোগ দিয়ে যায় পবিত্র আগুনের ধারণা : এ সৌন্দর্য পোড়ায় না কখনও; মুগ্ধতা জাগিয়ে তোলে বলে আহিতাগ্নি জ্ঞানে পূজনীয়। কে দাঁড় করাতে চায় তোমার চোখের বিপরীতে দুর্মুখ বিশেষণটি? বলি না লক্ষ্মীট্যারাও, বলি আদ্যোপান্ত সুখপাঠ্য, একটি শুধু ভুল বানান পৃথিবীর সর্বশেষ কবিতাটির অনিন্দ্য মুখে শিশুসুলভ বিচ্যুতির মতো কেঁপে ওঠে।

কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে

‘নবীন মেঘ দেখে সুখীজনও অন্যমনা হয়ে পড়ে আর যার কণ্ঠালিঙ্গনকামীজন দূরে তার তো কথাই নেই।’ (পূর্বমেঘ : ৩ : অনূদিত মেঘদূত) আড়মোড়া সময়ে শয়ান সে-বেলা কড়া নাড়ো টের পাই কবোষ্ণ আঙুল; আমারই প্রজেক্টর ছুড়েছে                      দরজার পর্দায়                                    আসন্ন মুখ। তারপর খুব হাওয়া খোঁয়ারি-কাটা-বাতাসে জাগে ব্যক্তিগত রাডার:                      কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে;                                    তোমার শহরে? কুবেরের অভিশাপ কাঁধে যক্ষের দুপুর তুমি প্রযত্নে মেঘমালায় গতকাল একটা দীর্ঘশ্বাস কুরিয়ার সার্ভিস শরণম্! আজ খুব হাওয়া               কোথাও নেমেছে বৃষ্টি:                             তোমার চোখে?

হাওয়া-বদলের কবিতা

খোলা জানালায় সমুদ্র, বালি,                      ক্যালেন্ডারের ছবির মতো পরিপাটি ঝাউবন, ব্যালকনি জুড়ে অনেক আলাপের সুনীল অবকাশ, সোহাগি মানিপ্লান্ট বিবস্ত্র লতিয়ে ওঠে                             নিঃশ্বাসের শব্দে আরতি ফোটায়; বাতাসের লোনা ঝাপটায় মদিরতা                             ‘চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন’: দু’দণ্ডের শান্তি মেলে কি হাওয়া-বদলে? হয়তো সবাই হাওয়া-বদলে যায়, তাই আমাদেরও যাওয়া হয়তো রীতির কাছে সমর্পণে আছে সমকক্ষতার আনন্দ; হয়তো-বা গুমোট লাগে ঘরে, তাই আমরাও যাই হয়তো আছে রীতিবিরোধী আনন্দ কিছু এই হাওয়া-বদলে! ব্যালকনি জুড়ে অনেক আকাশ আর খোলা জানালার চকিত চুম্বক ফেলে ফিরে চলা ফের        ‘ঝড় বাদলে আঁধার রাতে’                      ঘরের গহন পথে...

ইদিপাস ও রত্নেশ্বর

আহ ইদিপাস! দু’চোখে-সুচ-বেঁধানো মরণপণ প্রায়শ্চিত্তের গল্প শুনে আসছিল যারা এ যাবৎকাল, বহু দেশ বহু ভাষাভাষী আছে, সহমর্মী হৃদয়-দ্রবণে মনোযোগ মেশাবে আরো। আজও বয়ে চলে ইদিপাস-কূটৈষার জিন ...

প্রতিদিন নতুন নতুন হালকা মেঘ ওড়ে, আড়ালে পুরাতন গোলচাঁদ, উজ্জ্বল আধুলি, স্থাণু দৌড়বাজ যেন-বা। এই শারদীয় সৌন্দর্য, এই বিষাদেরা হৃদয় ও কবিতার মতো ধ্রুপদী।

‘সকালের আকাশের মতো বয়স’ নিয়ে সফোক্লিসের দেশ পেরিয়ে এই বাংলায় এলে সজারুর বেশে, মৈমনসিংহ গীতিকায় রত্নেশ্বর নাম পেলে; অভিশাপের সুচ-বেঁধানো শরীর জোড়া প্রতীক্ষা ছিল জীবনের সহোদরা চম্পক সেবিকা-আঙুলের। অজাতপুষ্পা নির্বাসিতা একজন, সাধনার সমান বয়সী, শরশয্যা থেকে তোমাকে টেনে আনতে আনতে, ইদিপাস, ক্লান্ত ক্লান্ত সে নারী নদীস্নানে ঝরাতে যায় অবসন্ন গান।

এই নদী শকুন্তলার, শচীতীর্থ : অভিজ্ঞান অঙ্গুরীয় হারিয়েছিল নিতলে। তারপর রাজা দুষ্মন্তের স্মৃতিভ্রংশ প্রত্যাখ্যানে ‘ধরণী দ্বিধা হও’ বলে হারিয়ে গেলেন অগ্নি পরীক্ষার তিন অপমান শেষে সীতার ধরনে।

তারপর ইদিপাস, মানে আমাদের রত্নেশ্বর সদাগর! টের পাও নি মোটে দু’চোখের সুচমুক্তকারী দাসী রমণীর হঠকারিতা। তোমার জীবনদায়িনী, প্রসাধনে মগ্ন তখন, সে অনেক কাহিনি, তাই না!

শেষাবধি শুকপাখির অর্থবহ গানে চিনেছিলে বটে সে-অজাতপুষ্পা কাজলরেখাকে। ধুমধাম দরবারে ঝাড়বাতির নিচে বসে, রত্নেশ্বর, মনে পড়ে? কী গান গেয়ে উঠল পাখি :

‘ভাই হইয়া রত্নেশ্বর বোনকে বিয়ে করতে চায়। এই কথা বলিয়া শুকপাখি শূন্যেতে মিলায়।।’


যাত্রাবিরতি

অবকাশহীনতার নীলনকশায় থাকে না যাত্রাবিরতি যাবার পথ ডুবে যাবে রবীন্দ্রসংগীতে                      কে জানিত বলো : কিছুটা গানে ভেসে কিছুটা প্রতিরোধহীন থামতে হলো ক্ষতের হাওড়ে, বেদনার কাশবনে; শেখা হলো অবগাহন, চেনা হলো বাতাসের রং। যাত্রাবিরতির কথা ছিল না নীলনকশায় চোরাবালি তাই থেমে যাওয়া, এক গ্লাস রোদের শরবত হাতে অপেক্ষায় প্রসন্ন সড়ক। আর কত অজুহাত থাকে যাত্রাবিরতির! জীবনটা যেন এক সম্পূরক দৌড়: নতুন বিরতি, নতুন ব্যাটন... আবার খরা, বৃষ্টির গান... গানের ভেলায় চক্রাণুক্রমণ, যাত্রাবিরতি; দ্বিধার ভাসান নির্দ্বিধার ঘাটে।

লুব্ধক যাত্রা

ভালোবাসা এক সম্মোহিত ঢালু পথ যেতে যেতে টারমাকের জলছাপ জন্মান্ধ চোখের সামনে বিলীয়মান ঊর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদলে পথ হারানো ঘরহীন ঘর : কোমল বিদ্রোহী নারী ও পুরুষ চারপাশে প্রজাপতি ওড়াওড়ি ক্লিশে নির্ভার লুব্ধক-যাত্রায় ফুলের গন্ধে তন্দ্রাহারা অগ্র-পশ্চাৎহীন চুমুকের মৌতাত মধুপের পিপাসার গান পকেটে বিচ্ছেদ, ফেরাটা পাহাড়ি পথে কিছুটা এবড়ো-খেবড়ো, মৌচাক থেকে এই বারে নেমে আসে পিলপিল গুঞ্জনঃ : শুকনো-আঙুরলতার সরব বর্শা কে না জানে, প্রণয়ের প্রতিটি যাত্রায়               থাকে বারবার তারিখ-বদলানো                             একটু বেশি দামে কেনা রিটার্ন টিকেট : ফেরার পরোয়ানা।

ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি, ছেলেখেলা

ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি, ছেলেখেলা উড়িয়ে দেয়ার খোলামকুচি, তেজপাতা আজন্ম শেকড়িত, এই বারে বদলে নিলাম ডানা ভাজা ভাজা হলো পর্বতমালা, সিন্ধু কলঙ্কের খোঁজে পাড়ি দিলাম চাঁদ : আমাকে সে ভিজিয়েছে আহিতাগ্নি জোছনায় সোমরস দেয় নি কেবল নির্বোধ মত্ততা পালক পরিয়েছে ধীবর-মগ্নতার বৈরী যানজট কালো ধোঁয়া মানুষের ভিড়ে মনখালি সৈকতের হাওয়া লেগে থাকে নাকে, শুদ্ধতার গান ওই স্তনবতী মেঘেদের স্নানে ঝিরি জল, ঝরনার চুলে মুখ ডুবিয়ে নষ্ট হতে এসে আমি পবিত্রতার গ্লানি নিয়ে ফিরছি

চান্দের গাড়ি

চান্দের গাড়ি, ও চান্দের গাড়ি! আমাকে কোথায় পৌঁছে দেবে এই মাঝ রাতে                      আকণ্ঠ জোছনার পর! হিমছড়ি ইনানির বালিয়াড়ি ফেনার সাগর                      অলীকের দেশে লীন লুকিয়েছে সুনসান ঝাউধ্বনি জোয়ারের কাল আমার যাত্রায় ঊর্ধ্বমুখ               মাধ্যাকর্ষণ এড়ানো অপার্থিব বোররাক চাঁদের ওপারে আগুয়ান মেঘের আড়ালে একাকিনী ঝাপসা-মুখ কোনো রাজকন্যার হাতে ভালোবাসা আর নিসর্গের শোভায় আন্দোলিত                      বাঙলা কবিতার বই চান্দের গাড়ি, চান্দের গাড়ি! কোত্থাও কি  থামবে আখেরে লক্কর-ঝক্কড়                             ভরপেট জোছনায়?

ধীবর

মাথার ভেতর ঘূর্ণি হয়ে ওঠা কথাগুলো চিরকুটে পেয়েছিল ঠাঁই সেতু থেকে ছুড়ে ফেলা যায়, ফিরতি পথে জলের ঘূর্ণিতে হাজার কথা লতিয়ে ওঠে, জগতে কথারই ডালপালা আমাদের কথাগুলো খুঁজে পাক অতল তবে জলের গভীরে যেতে যেতে                      রুপালি মাছগুলো সন্ধ্যায় ক্রমশ নিজেই ধীবর আমাদের ডুবে যাওয়া কথাগুলো এইভাবে পেয়ে যায় অশেষ তিলক

লক্ষণরেখা

অন্যের গণ্ডিতে ঢুকে বসে আছি লক্ষণরেখার ওই পারে থাকে নিজের জীবন— আত্মকথা উড়িয়ে নেবে পুষ্পক রথ কোনো লেলিহান লঙ্কাকাণ্ডে! লিখতে বসে ঢুকে যাই অপরাপর পাতায়। এই পঞ্চবটী নিরিবিলি, মন্দ বায়ু— সোনার হরিণ চড়ে বেড়াক, কে তাকায়! ওপাড়ে অরণ্যভর্তি মোহ— ছিমছাম উদ্যানে ঝুলছে বর্শাবেঁধা হৃৎপিণ্ড; নীরবে থাকিস আত্মকথা (ও তুই) নীরবে ঝরিস মাঘরজনীর বৃষ্টি! “নারদ কহিল হাসি, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি রামের জন্মস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।”

বিনয় মজুমদারের বাড়ি

পুনরায় ফিরে এসো চাকা এই গায়ত্রী-সন্ধ্যায় বিনয়ের ঘরদোরে: বর্ণহীনতার প্রেক্ষাপটে আকাশের চেয়ে ঢের নীল এই বাড়ি ঢের বেশি ঘনজল ধরে রাখে কূলপ্লাবী                      উজ্জ্বল মাছে ভরা জলাশয়; স্বয়ংসিদ্ধভাবে উঠোনের নিতল গহ্বরে অঙ্কুরিত ভুট্টার বীজ                      রুয়ে গেছে রসিক কবি। অদূর বসন্তে পল্লবিত বিজন ঘরে আমন্ত্রণের প্রস্তাবনা                      ঈশ্বরীর চাইল প্রশ্রয়। শতাব্দী-প্রাচীন চিত্রকর্মের থেকে আরক্তিম আলো চোখে-মুখে মেখে ‘বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ’ দূর থেকে পরস্পর ‘মিলনের শ্বাসরোধী কথা’ ভাবে স্বপ্নাতুর বেলা।

বিরহী

বিরহী দুই চোখে লুকোনো হাকালুকি বাসনা ডুবে যায় ফেরার ঘাটে ঘাটে কাহার প্রার্থনায় মেঘের বিস্ফোরণ চাতক বিলাসিনী স্বাধীন ধারাপাত শ্রাবণ আসে যায় ফেরে না বুলবুল স্মৃতিরা ভাসমান ‘কাগাজ কা কিসতি’ দালির ঘড়ি ভাসে গলিতে নর্দমায় বিমূর্ত বরষা-রাতে স্বপ্ন ধাবমান যক্ষপ্রিয়া উপমান ঝাপসা জানালা মেঘের পয়ারে নাই যতির বালাই বিরহী দুই চোখে লুকোনো হাকালুকি বাসনা ডুবে গেল ফেরার ঘাটে ঘাটে

কফি পেয়ালার সাথে

কফি পেয়ালার সাথে যত বোঝাপড়া এয়ারকুলারের হুহু মধ্যস্থতায়; শকুনি অন্ধকার ঝুপ করে নামছে বেদনা-গলিত পশ্চিমাংশে। জানালার কাচে মাথা কুটে গোয়েন্দা পোকারা জুটে কার্নিশে কার্নিশে, বিষ ক্ষয় বিষে। শূন্য শূন্য সাত অনুপ্রবেশ কৌশল নির্জনা বন্ডকন্যার তরলং জল। আরেকটা রাতের জন্ম দিল মৃতবৎসা রাত, কত বিসম্বাদ কফি পেয়ালার সাথে।
মোশতাক আহমদ

মোশতাক আহমদ

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮; টাঙ্গাইল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক, জনস্বাস্থ্যে...বিস্তারিত