কাব্য আর কাহিনি প্রায়শই একই অঙ্গে আত্ম হয়ে বিরাজ করছিল আমাদের এই ভূখণ্ডে। সে বহুকাল আগ থেকে। উপনিবেশ কিবা সাম্রাজ্যবাদের ভাব-নান্দনিক বিস্তার তার যূথ অনিন্দ্য কাঠামোকে ছেয়ে ফেলেছে ছিন্ন ছিন্ন ধারকের ছাঁচে। আমাদের কাহিনি হয়েছে কাব্য-সুর-হারা, হয়েছে নিরেট পড়ে দেখবার বিষয়, শোনানোর বা শুনবার নয়, মুখে বলবার নয়; আর আমাদের কাব্য কেবলই ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন জৈবনিক অবলেশ নিয়ে গুমরে মরার মধুর-তিক্ত প্রহসন। হারিয়ে গেছে যৌথ চেতনার মধ্য থেকে প্রকাশিত প্রেম-কাম-বিরহ-বেদনার সহজিয়া স্রোতে ভেসে চলা মানুষ। সেই মানুষকে তাদেরই জীবনের নিজস্ব তরিকায় তৈরি করা চলমান ভাবপ্রবাহে পুনরায় দেখে নেবার একটা উপায় এই দুই রচনা। কাব্যের আশ্রয়ে কাহিনি-আখ্যান কিবা আখ্যানের অভিপ্রায়ে কাব্য—যে-কোনোকিছুই বলা যেতে পারে একে। হতে পারে আখ্যানকাব্য কিংবা কাব্যআখ্যান। কিংবা অন্য অন্য কিছু। তবে কাব্য আর গল্প বা আখ্যানের যে ভেদ লুপ্ত করে দেবার বাসনা জারি রেখে ইতঃপূর্বে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সমৃদ্ধ হয়েছে আমাদের শিল্পপ্রকরণ, এই রচনাদ্বয় তার থেকে খানিকটা স্বতন্ত্র পথ খুঁজে নিয়েছে। এখানে কাহিনি আর কাব্য পরস্পরের প্রতি নিগূঢ় সংবেদনশীল, আরও গভীর সমঝোতা রেখে কেউ কারও বিন্দুমাত্র ক্ষতি না করে লুপ্ত হবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। কহতব্যের দুর্নিবার একমুখী নির্বিরতি কথাবেগ এ রচনাদ্বয়কে পাঠকের সাথে আদি-অন্ত একমর্মে যুক্ত থাকার শক্তি দেয়। ঐতিহ্যের কাছে হাত পেতে অধুনার ভাষার চলমান সৃষ্টিশীল সৌন্দর্যকে তার রথবাহন করে একটি নয়া ভাষার সহজ সবেগ প্রকাশ এর লক্ষণ। আমাদেরই চিরচেনা সাধারণ নর-নারীর প্রেম-টান-যাতনা-সংঘর্ষ-জয়-পরাজয়ের ভাষ্যকে প্রতীচ্যের সুদূর-কবির এক বহুচেনা প্রেমকথার আখর থেকে জারিত করে নিয়েছেনয়নতারা আবার দহনদয়িতায় দূর জাপানের কোনো এক লোককথার আখর থেকে জারিত করে নিয়েছে আত্মমর্ম। আশা করি, পাঠকের জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা হবে।
[বই দুটি প্রকাশ করেছে বাতিঘর। প্রচ্ছদ করেছে সব্যসাচী হাজরা।নয়নতারা’র পৃষ্ঠাসংখ্যা ৬৪, দাম ১৫০ টাকা। দহনদয়িতা’র পৃষ্ঠাসংখ্যা ৯৬, দাম ২০০ টাকা।
নয়নতারা ❑
প্রেমের গোলাপ ফোটে ঘ্রাণে বিকশিয়া ওঠে যে জমিনে রোদে আর জলে পৃথিবীর খরা-বান শত শত বলিদান যার বুকে উপচে উছলে। যার প্রাণপ্রবাহের স্রোতে চলে সময়ের আঁকাবাঁকা ভাঙাচোরা তরী যার বুক-শ্বাস হতে হাওয়া বয় পথে পথে পবনস্বননসুন্দরী। যার শোণিতের সুধা জীবনে বাড়ায় ক্ষুধা পিপাসার ভাসায় জোয়ার সে তো এই ভূমি জানি আহা কত হানাহানি তারে নিয়ে সতত অপার। তারই তিল কণা হাতে মানুষ বিবাদে মাতে তারই মনে এঁকে চলে ক্ষত সেই ভূমি বাসনায় অচেতনে চেতনায় গড়ে হৃৎবাস অবিরত। কথনের এ আখর এই ধ্বনি ঝরঝর অবিরল তারই উপজাত, তারই সে বয়ানে তাই মেতেছি অধম হায় তুমিও সে আনন্দে মাতো। তবু ভাবো একবার এই ভুমি একাকার জীবনে জীবন মিশে থাকে সেইখানে মানুষের অপ্রেমের বিভেদের রেখা এক জ্বলে বাঁকে বাঁকে। তবু এ ভূমির গহিনের চেনা কিবা অচিনের একটি ইশারা থাকে ফুটে একটি অবাক রেখা নয়নে হৃদয়ে লেখা শিরাধমনিতে যায় ছুটে। সম্পর্ক পরিচয় কিছু তার বড়ো নয় বড়ো নয় কিবা লেনদেন আগে তার কী বা আছে কী আছে সুদূরে কাছে বাজে না সে সুরে সাইরেন।
একদা এ মানবজমিনে দুই নরনারী পরিচয় পায় পরস্পর সে পরিচয়ের ইতিহাস কিছু নাই, যেন বা প্রথম ভোরে, মানবনয়ন পুবের আকাশপানে তাকিয়ে প্রথম পায় আলোর আভাস, তখন আকাশ তার আঁচলে আঁচলে দেয় ছড়িয়ে লালাভ মায়ারঙ সে মমতা কখনো ধরে যে নাম স্নেহের, টানের কিংবা প্রেমের মানুষ যেমন পায় তখন অন্যের পরিচয় সেইভাবে অন্য কেউ আপনের মতো এসে ছুঁয়ে যায় গহনমরম তার পরশের ব্যাকরণ কেউ তো জানে না, তবু শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিকশিত হয় এক পরমসুখের বীজ, বীজ থেকে ধীরে ধীরে পুষ্প হয়, মালা দোলে জগতের অদেখা শাখায় হাওয়া তারে দেয় দোল, নয়ন তাহার নাম, অপোগণ্ড, চাষাপুত্র, জমিনে কাদায় জলে একাকার সে যে নামে সে নয়ন, ফোটে নি নয়ন সেই আলো নিয়ে, রুপালি সোনালি কিবা বিজুলি চমকলাগা সেই দৃশ্যাতুর রূপচমকের ভাগ্য তার হয় নাই, তবুও নয়ন তার নাম, সে যে মায়ের নয়নজলে ভেসে রুধিরে অশ্রুতে মেখে জঠরের গ্রন্থি ছিঁড়েছুড়ে এসেছিল মানুষের মমতাছায়ায়, তখন যে নয়ন আছিল ঘুমে, তাকায় নি, তবু মায়ের নয়নে সে যে গোপনে নয়ন রেখেছিল, তাই, যখনই নয়ন তার ফুটেছিল, আলোর সমুদ্রে সুধার তরঙ্গে, গন্ধের এমন বনে, ধ্বনির উতরোলে, তখনই নিভেছে নয়নদীপ মায়ের তাহার, আহা, শীতল একটি হাত, তার গালে পরশনে পরশনে লেগেছিল, তখন বোঝে নি, সেই ওম, সেই দুধগন্ধ আর নাকে লাগিবে না কভু, নয়ন দেখিবে নাকো আর নয়নের সেই স্নেহকরুণা অপার, পুষ্পকুঁড়ি মেলে দিয়ে বৃক্ষের যে মূল গেল লুকায়ে মাটির ভেতর চিরতরে তারই বেদনার মতো সে নয়ন, বুঝি তাই, না-জানার না-বোঝার বেদনার ছায়া করে দিতে দূর বাল্যেই নয়ন হয়ে ওঠে সকলের নয়নের মণি দিকদিশা হারিয়ে ছোটা সে ঘুড়ি, মেঘ আসমান বায়ুবাঁধ ভেঙে ভেঙে পৌঁছে যাবে নিরুদ্দেশ পার নয়ন নয়ন ডাকে পাড়াময় শত কণ্ঠ, নয়ন এদিকে আসো শুনে যা নয়ন, সকলের নানান আবদারে নয়নের কাটে দিন, বাপ তার খাটে ক্ষেতে, জমিনে কর্ষণে যেটুকু রয়েছে তার ভূমি, তারই হৃৎকোটরের থেকে তুলে নেবে স্বর্ণশস্যভার, রক্তে ঘামে চোখের পানিতে ধুয়ে বাপে-পুতে জীবনের ছবিটাকে দেখে সেই সুখপটে আহা!
[প্রথম কিছু অংশদহনদয়িতা ❑
যখন জানালা গলে রাত্রিবেলা জাগে চাঁদমুখ যখন বিবুক চুয়ে নামে ঘন আলো যখন নিজের শ্বাস নিজেকে জাগায় ভয়, যেন অন্য কেউ শ্বাস হয়ে ঢোকে ছদ্মবেশে কোথাও রচিবে অনর্থের গহন-আখ্যান যখন ভোরের সূর্য আকাশের মুখে মেখে লাল গোপন গোপন কথা বলে যায় নির্জন ভাষায় তখন যে মেয়ের চোখে খেলা করে বাঁধভাঙা অশ্রুর প্রপাত বুকের ভেতরে এক জলজোয়ারের খেলা তাকে উজানে ভাসায় গাছে যে বাকল রাখে ঢেকে গাছের বিপন্ন রস, আহা যেন বা জানলেই কেউ শুষে নেবে জীবনের না করে পরোয়া
তখনই কিশোরী এক এ-জগতে নারী হয়ে ওঠে তখনই মনের ভূমে অচেনা দারুণ ফুল ফোটে ঘ্রাণে ঘ্রাণে চারিদিকে কী কথা রটায় অনিমিখে তখনই হৃদয়ে তার শোণিত মাতাল যায় লিখে আনজীবনের ক্ষত, টান সেই থেকে শুরু হয় নাচ, সেই থেকে গান।
মাটিতে আকাশে মায়া ছড়িয়ে রেখেছে ছায়া মানুষের অজানা ভাষায় মানুষ কাজের দায় সেদিকে ভুলে না চায় শত আশা শত নিরাশায়। সেই মায়া বাঁধে ঘর সাজায় যে চরাচর মনের গহিনে আলোছায়া যাকে তুমি সুখ বলো রঙে রঙে টলোমলো সে আশলে জেনো সবই মায়া।
বুঝি তাই মেয়েটির এই নাম হয় এই নামে বনে মাঠে তার পরিচয় হাওয়ায় হাওয়ায় মাখে সুধা ধরথরে দিঘির পানিতে এই নামে জল ভ’রে চোখে তার কী এক জাদুর খেলা আছে দূরের যা কিছু সে যে টানে কাছে কাছে যখন সে হাসে, শোনো সবে, হাসে ফুল-তরুলতা সে চুপ করলে যেন পৃথিবীতে নামে নীরবতা তারই নূপুরের ধ্বনি শুনে শুনে বরষণ শিখেছে পতন মেঘে মেঘে তারই রঙে আকাশের শুরু যে নাচন। দোলানো বেণীর নাচে দোলে পথ, কায়া আবছায়া এ কাহিনি তাকে নিয়ে, সে মেয়েটি নাম তার মায়া।
মায়ার জন্মের দিন আকাশে উঠেছে নাকি পূর্ণকলা চাঁদ পরেছিল তারার মালিকা, মেঘে মেঘে রঙ কিশোরীর লালাভ পায়ের পাতার মতো কোমল সুন্দরে ভরিয়েছে আকাশের বুক মায়ের বুকের কাছে চোখের পিঁচুটি নিয়ে অন্য এক অন্ধকারে ডুব দিয়ে পৃথিবীর যাত্রাপথে নীরব নিশ্চুপ নেমেছিল, কেবলি গন্ধের সঙ্গ নিয়ে মায়ের বুকের, মাথার ওপরে ভাঙা চালা, যেন জোছনা নিজেই করেছে প্রবেশপথ শিশুটির কপোলে বিলাতে পারে নিজের প্রেমের দুগ্ধ-ওম যেন শিরীষের ডালখানা ঢুকে পড়ে কোনো এক ফাঁক গলে চামর দোলাবে শিশুর চৌদিকে ভালোবেসে ঝিঁঝিঁ পোকা করেছিল গরীবের গান বেসুরো গলায় তবু তাও সুরে সুরে ভরিয়েছে মাধুকরী জীবনের নীরস শ্রুতির পাত্রখানি ছিল বাপ তখনো নদীর জলে, ডিঙাখানি নিয়ে জলের ওপরে তারও রুপালি চাঁদের বাঁকা হাসি আনন্দকটাক্ষ করেছে হয়তো বা, বলেছে মানুষ তুমি! তোমার ঔরসে আজ প্রাণ এক আসে পৃথিবীর ধোঁয়াঘেরা পথ বেয়ে বেয়ে তখন অধম সে যে মানব-ইতর, এক বেলা এক তিথি শ্রমের দায়ের থেকে ফেরালে নিজেকে জীবন করে না যাকে ক্ষমা পূর্ণিমায় তেতে ওঠে মাছ এ-নদীতে দাইয়ের আনন্দধ্বনি, অসহক্রন্দন শেষে প্রসবিনী-স্মিত-নীরবতা জগতে বোনে যে অপরূপ চিত্রলেখা, নিরানন্দপটে সে দেখার ভাগ্য তার নাই তবু যেন নদীর ’পরে নিজেকে মেলানো শূন্য হাওয়াঞ্চলে বেজে ওঠে কল্পপ্রতিধ্বনি, তোর কন্যা হয়েছে গো, সোনার বরণ কন্যা চোখের পানিতে তখন নদীর জল পেয়েছিল নুন, মাছের শরীর তখনো বুঝি বা অধিক মিঠা এইসব ভেবে ভেবে হাসে আর কাঁদে
একথা ভেবেছে ঝড়ঝঞ্ঝা রক্তক্লেদ মুখোমুখি জিতে আসা অভাগিনী মা যে, হয়তো শয্যায় শুয়ে আপন দুহিতাসঙ্গে সেদিন গভীর মধ্যরাতে ফিরেছিল পিতা হাতে তার মৎস্যভর ঝুলি এক হাসি ঝলমলানো তখন ঘুমিয়ে সবে, শিশুর শরীর থেকে মুছে গেছে গহনজঠরপথে যাত্রাকালে মেখে থাকা জন্মছাপ সবই তখন ঘুমিয়ে গেছে আনন্দ কি উদ্দীপনা জৈবিক নিয়মে অপরাধীমুখে পিতা অন্তরে সহায় করে চিরসখা মাছেদের ঘ্রাণ নিভে আসা জোছনার নিশীথে যখন ঘনিয়ে জমাট অন্ধকার অভিমানে ফেটে পড়ে বুঝি-বা আঁতুরঘর ভ’রে ঠেস দিয়ে খুলে দ্বার তস্করের মতন দাঁড়ায় তখনো দয়াল-চাঁদ তার ভাঙা আলো এক থোকা ফেলেছে ঘুমন্ত শিশুমুখে, যেন তাতেই উপচে পড়ে রূপ ছোট কুটিরের পারাপার জীবনের মায়া তার কখনো ছিল না এই মতো কেবল বাঁচার দায় পুরুষ করেছে প্রাণপণে কেবল বাঁচাতে চেয়ে সঙ্গিনীর জীবন হয়তো সে তখন ভেবেছিল কেন এত মায়া পড়ে গেল মনে হলো মায়া এক নৌকার পালের মতো চোখের সামনে গহন অনন্তপারাবারে যাত্রাপথে দুলিতেছে হেসে হেসে এইভাবে জড়িয়ে নিল-বা বুঝি বেমক্কা সে দয়িতাকে জাগিয়ে নিশীথে বলেছে উন্মাদপ্রায় অথবা শিশুর মতো বালখিল্যভরে— মায়া! এ মেয়ের নাম আমি রাখলাম মায়া।
[প্রথম কিছু অংশ