সনাতনী
[উৎসর্গ : সনাতন দাস বাউল
❑❑
সাধনসমাধির অম্লান দূরত্বে, তার একতারা, একা...
খানিক আগেও অস্তগামী সূর্যের রোদ তাকে ছুঁয়েছিল। এখন কমলা এক আভা
ছড়িয়ে রয়েছে অপরূপ তৃষ্ণার মতো, নির্জন সংগীতের স্নানে।
একটিই তার, এতদিন সহস্র ছন্দে জরা জয় করে আবহমান অসীমে বেজেছে
আজ একা। বারান্দায়।
তিনটি চড়ুই, বসে উড়ে গেল। তাদের কিচির মিচির মিশে গেল
অন্যমনস্ক এই মুহূর্তের ভিতর...
সন্ধের অল্প একটু আগে মাধুকরী সেরে ফিরল ফাল্গুন বাতাস
তখনই, একাকিত্বে কেঁপে উঠল
বেজে উঠল সনাতন দাসের একতারা...
উপমা
❑❑
শস্য নিজের র্ধমে এ সংসারে প্রণত হয়েছে
অন্যের ক্ষুধায় সে আত্মনিবেদন করে।
ক্ষুধা ফুরায়, দেখি, শস্যের অনন্ত প্রবাহ।...
আলপথ
❑❑
দু’টি ক্ষেত্রকে ভিন্ন করেছে আলপথ। এই অভিমানে
কৃষক পরিচর্যা করে না তার।
কৃষক লাঙল দেয়, ক্ষেত্রশরীরে দেয় জল
শ্রমের প্রবন্ধস্রোতে জেগে ওঠে অনন্ত ফসল...
আলপথ চুপচাপ দেখে আর দু’প্রান্তের জমিগুলিকে আঁকড়ে ধরে রাখে
অন্যমনস্ক ধান ঝরে পড়ে গুচ্ছ গুচ্ছ তারও শরীরে
রাত্রি নিবিড় হলে সব বিভাজন ভেঙে হেঁটে যেতে ইচ্ছে করে
কৃষকের গৃহে। চাষি আর চাষিবউ সন্তানকে ‘আলপথ’ করে
যেই ঘুম অঘোরে ঘুমোয়, সেই ঘুমের ভিতরে।
মধ্যাহ্ন-ডিঙোনো আলোয় চাষি-বউ ভাত নিয়ে আসে
অন্নপূর্ণা আলোয় প্রতিবেশ ঝলমল করে
আলপথে বসেই অন্নগ্রহণ করে তারা
সে মুগ্ধ হয়ে দেখে,
কৃষকের অন্তর্লীন ক্ষুধায় পরিপূর্ণ হয়েছে বসুধা...
নিদাঘ
❑❑
সকলেই চুপচাপ। শুধু হাওয়া
বইছে গুমোট স্বভাবে। বাঁশপাতা
কাঁপছে তিরতির... অশ্বত্থপাতাও
সকালে বাচ্চা ছেলেটি উঁচু করে ছুড়ে
দিয়ে গেল সমস্ত সংবাদ। তবু
মানুষ চুপচাপ। ধু-ধু হাওয়া
বুকের ভিতরে। প্রতিদিন আমার শরীরে
জমা হচ্ছে লক্ষ লক্ষ অপরাধীর লাশ
অগ্নি র্স্পশ করো আমার নিঃশ্বাস...
বুনোফুল
❑❑
তার যাওয়া আসার পথের পাশে ফুটে থাকি রোজ।
ফুটে ওঠার যে বেদনা, বেদনার যে আনন্দ, সে জানে না
পালতোলা নৌকোর মতো সে যায়
সমস্ত বাতাস সঙ্গে করে ঢেউ খেলতে খেলতে সে যায়
সমগ্র শরীরে তার বৃষ্টিভেজা সুগন্ধের স্নান
আকাশের অনন্ত গভীর তার দুচোখের আলোয় মিশে থাকে
আমার নগন্যতা সে অসীমে পৌঁছতে পারে না
এই না-তাকানো-মুহূর্তটুকুই বিপন্ন আলোয় ধরে রাখি
আমার আর্তস্বর সামান্য রঙের কিছু কারুকাজ নিয়ে
শান্ত নীরব হয়ে থাকে। তবু,
তার পথের প্রান্তে রোজ প্রস্ফুটিত হই
তার আনন্দযাত্রার পাশে নিত্য ফুটে উঠি
সৎ-চিৎ-আনন্দ হয়ে ফুটি...