প্ল্যানচেট

নব্বইয়ের কবি প্রদীপ কর-এর ষষ্ঠ বই বাসনাবিস্তারী মহারোদ বইমেলায় প্রকাশ করছে 'বৈভব'। বইটি দুটি পর্বে ভাগ করা। প্রথম পর্ব 'বাসনাবিস্তারী মহারোদ'-এ সরলতার রহস্যে বিবৃত হয়েছে পারিপার্শ্বিক জটিলতার দ্বন্দ্বে আত্মক্ষয়ের চিত্রার্পিত অনুভূতিমালা। দ্বিতীয় পর্ব 'মোমবাতি ও প্ল্যানচেট'-এ সাংকেতিক মায়া ও বিভ্রমে বিন্যস্ত পর্যুদস্ত আপোসে আত্মপীড়নের ক্ষতচিহ্নগুলি। বাংলা কবিতার ঐতিহ্য ও আধুনিকতার পারম্পরিক বিবর্তনের প্রেক্ষিতে কবিতাধর্মের তথাকথিত বহিরঙ্গের নিরীক্ষা এই বইয়ে তেমন গুরুত্ব পায় নি। বরং অনুচ্ছল প্রকাশভঙ্গিতে রচিত এই আসক্তি ও উদাসীনতা।


❑❑ শিস দিতে দিতে এইমাত্র উড়ে গেল মৃত যে পাখিটি                                           সে কি তবে দৃষ্টিবিভ্রম? অতীত নিদ্রা থেকে উঠে সে কত সরলভাবে চলে গেল                                                     ঘুমন্ত জঙ্গলের দিকে ঐশী তীক্ষ্ণশিস, ফাঁকা এই হাওয়ার ভিতরে ফালাফালা করে দিচ্ছে কামার্ত পাহাড়শিখর                                              অতিশূন্যে উঠে গেলে তার বর্ণহীন কিছু চিকন পালক ঝরে পড়ছে উপত্যকায় জ্যোৎস্নায় ঘাসের বিভ্রমে শুয়ে আছে।…   ২. এইবার? কোনদিকে যাব? মধুর মিথ্যে এই বাড়িটিতে যেখানে শুকিয়ে আছে লুপ্ত অর্গান আকর্ষণ সেইদিকে?               চোখ সেদিকে ঘোরাব? স্বাভাবিকতার চেয়ে বেশি কাঁপছে ছায়াচ্ছন্ন মোমবাতির আলো চিত্রকল্প যেটুকু জানাল সেইদিকে ঘুরবে না কম্পাসের কাঁটা যে সুর বাজিয়েছিল নিদ্রার ভিতর আলো মগ্নশান্ত হয়ে প্রায় অন্ধ অন্ধকারে,              এইবার, সেইদিকে হাঁটা…   ৩. তার মানে পাখি নয়                         পাখিটির খাঁচার ভিতরে চিরকাল বসত করে                         যে ক’জন মন সব এই শান্ত ঘরে, প্রচণ্ড নির্জন ঘোর হয়ে বসে আছে?                     ডাকলেই চলে আসবে?                     আর সব গড়গড় করে বলে যাবে?                                         যা কিছু জানতে চাইবে                                         স্থির লক্ষ্যে, পরম স্বজন? ঘুম এল? ঘুম আসছে। বায়বীয় মন ক্ষুধার অতল নিচে পুঁতে রাখি                     অপার নিহত অস্থির বিস্মরণ!   ৪. ক্ষুধার্ত? আচ্ছা বেশ, যা কিছু তোমার চিরপছন্দ একে একে সব দেওয়া হবে:             প্রাচীন রৌদ্রের ভিতর স্যাঁতসেঁতে শিলা             নদীর নরম স্রোতে ভেসে যাওয়া ভিটা             গর্ভিণী সাপের জিভে ঈর্ষা হিসহিস… অথবা             স্বাধীন নাভির নিচে দগ্ধমাংসধ্বনি             অদ্ভুত পীতাভ গুল্ম তুলতুলে যোনি কিম্বা             সেই সার্থক অট্টহাসি। পিছনে অকস্মাৎ মার… আর কিছু কি পছন্দ ছিলে, জীবিত, তোমার?   ৫. বলো, নইলে, আত্মা নুইয়ে রেখে বলাব তোমাকে বলো, নইলে, কিছুতেই রেহাই পাবে না বলো, নইলে, কিছুতেই উদ্ধার হবে না তুমি বলো বলো             পরিত্যক্ত এই বাড়ি, আসবাব আবর্জনার মতো             পড়ে থাকবে দুর্গন্ধে, একান্ত সচেতন                                                        মনন চিন্তন... প্রাগৈতিহাসিক পোকা এখানেই চিরকাল                                                        কুরে কুরে খাবে                                                        বসত বানাবে বলো, যা যা জানতে চাইছি। নইলে                                        দলের লোক ঠিকই বলাবে…   ৬. সজোর বৃষ্টির নিচে ঘনভঙ্গিমায় রঙিন ছাতার নিচে হাঁটলেও, সব ভিজে যায়। সেরকমই সকল সকল… সব… সব... আমাকে বলিয়ে নিয়ে ছাড়ে এইবার দুব্বো গজাবে ঠিক, হাড়ে!   ৭. কিন্তু শান্ত মনে কী বলেছি আমি? মনোহর কাব্যরূপ নিতান্ত পাগলামি উচ্ছিষ্ট করা মুখে কিভাবে যে বলি সারাদিন আমি যেন মাথা নুইয়ে চলি আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে তাদের দণ্ডের মেরু আমার পিছনে কিভাবে যে বের করি? কিভাবে রেহাই? চোরে চোরে মাসতুতো আমিও বেহাই পথ পাল্টে গেছে সব গ্রাম পাল্টে আছে আমার মতন কেউ আনাচে-কানাচে অতৃপ্ত আত্মা নিয়ে ঘুরে মরছি। একা। তাদের দর্শনশাস্ত্রে বাঁচা মরা লেখা।…   ৮. কিছু কি বোঝা গেল?                   কিভাবে পছন্দের খাবার সামনে রেখে                   পানীয়টি উচ্চে তুলে ধরে                   কী রকম পছন্দের ডাকনামে ডেকে                   আদরে আদরে অনাদরে দেহ থেকে আত্মাকে কিভাবে রাখছে ওরা ৫১ পীঠের মতো ছিন্নভিন্ন ক’রে?   ৯.                   স্থির অস্থির                   স্থির অস্থির                       অস্থির                        স্থির কোথায় সে সংগোপন? কোথায় নিবিড় আমার মৃত্যুর গন্ধ? কোন দেহপাত্র থেকে উপচে উপচে পড়ে? তাকে অন্তর্গত রেখে শরীরে আলোর গন্ধ মেখে,                                     যাই…   ১০. যাই। ভোর হয়ে এল। এসব বিভ্রম গল্প গোত্তা খাবে মিথ্যার ঈষৎ পাহাড়ে। তার পরাজিত প্রতিধ্বনি মনুষ্যসঙ্ঘ থেকে দূরে পলকা পালক হয়ে পড়ে থাক উপত্যকা জুড়ে যাই। ভোর হয়ে এল। অতীত বিদ্রূপ ভাঙা হাসি লাঞ্ছিত আত্মাকে অনন্ত রৌদ্রে রেখে আসি ছড়িয়ে পড়ুক ছায়া গড়িয়ে নামুক কোলাহল অনিত্য শূন্য দেহে জেগে থাক ঘুমন্ত জঙ্গল যাই। ভোর শেষ হলে, আলোটি আগুন বিশ্বাসী যাই তবে দূরদেশে পরিযায়ী ভ্রূণ রেখে আসি যাই শেষ উড়ে যাই বিগত জন্ম থেকে উড়ে মিশে যাই পাখিটির কুহক শিসের মৃত সুরে।…
প্রদীপ কর

প্রদীপ কর

জন্ম ৩ আগস্ট, ১৯৭৬; বিষ্ণুপুর, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। প্রকাশিত বই : কবিতা— উড়ন্ত...বিস্তারিত