নৈঃশব্দ্যের জল ও আগুন

১৯৯৩ সালে চোখ নেই দৃশ্য নেই কবিতার বই দিয়ে চঞ্চল আশরাফের শুরু নয়। তারো আগে থেকে তিনি লিখে আসছেন। বাংলাদেশের সাহিত্যিক পরিস্থিতির অন্যতম দর্শক তিনি। কিন্তু প্রতিক্রিয়াহীন দর্শক নন। সাহিত্য নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নানান অসংগতি এবং মূঢ়তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি প্রায়শই সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। প্রচুর পরিমাণে আলোচনা-সমালোচনা লিখেছেন। তৈরি করেছেন বির্তক। এর ফলে তার সমালোচক সত্তার আড়ালে পড়ে গেছে তার কবিসত্তা। তবে সেটি শক্তি হারিয়ে আড়ালে চলে গেছে, তা নয়। বরং তার প্রতিটি নতুন কবিতার বইতে আগের কবিতার বইয়ের চঞ্চল আশরাফকে আরেক দফায় নতুন করে আমরা পেয়েছি।

তার কাছ থেকে আমরা এ পর্যন্ত চারটি উল্লেখযোগ্য কবিতার বই পেয়েছি। প্রথমটির কথা তো আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এর পর ১৯৯৬ সালে অসমাপ্ত শিরদাঁড়া, ২০০২ সালে ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে। এবং ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো। শুরু থেকে শেষাবধি কবি হিসেবে চঞ্চলের সেই ধারাবাহিকতাই বজায় রয়েছে, যাতে তিনি নিজের কবিসত্তা নিয়ে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছেন।

চঞ্চল আশরাফ কবিতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাসও লেখেন। ১৯৯৭ সালে তার উপন্যাস কোনো এক গহ্বর থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ছোটগল্পের বই আছে দুটো—শূন্যতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়ধ্বনি (১৯৯৯) এবং সেই স্বপ্ন, যেখানে মানুষের মৃত্যু ঘটে (২০০৭)। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো যে প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে তিনি প্রায়শই নিজেকে বির্তকের কেন্দ্র নিয়ে আসেন, তা নিয়ে একটি বইও তিনি প্রকাশ করেন নি। যেটি লিখেছেন আমার হুমায়ুন আজাদ (২০১০) তা স্মৃতিকথামূলক একটি বই। এটি প্রবন্ধগ্রন্থ নয়, স্রেফ একটি গদ্যগ্রন্থ।


আধুনিক কবিতা নির্মাণের যে সূক্ষ্মতা আশরাফের কবিতায় তার নমুনা ছড়ানো আছে। তিনি তার অন্তর্গত আর্তি এবং বিক্ষোভের সামঞ্জস্য তৈরি করেন।


সবমিলিয়ে তার কবিতার বইয়ের সংখ্যা ৪টি, গল্পগ্রন্থের সংখ্যা ২টি, উপন্যাস ১টি এবং ১টি স্মৃতিকথামূলক গদ্যগ্রন্থ। ১৯৬৯ সালের ১২ জানুয়ারিতে ফেনীর দাগনভুঁইয়াতে জন্মগ্রহণ করা চঞ্চল আশরাফের বইয়ের সংখ্যা ৮টি। কবিতার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের লেখা লিখে থাকলেও তার মূল পরিচয় তিনি কবি। তিনি তার উৎস চেনেন কবিতার অভিজ্ঞানে।

যদিও অনেকবার বলেছি ধোঁয়ার কথা আগুনের উৎসজ্ঞান কখনো ছিল না পাহাড়চূড়োয় সারারাত বৃষ্টিপাতশেষে পাথরের গায়ে লেগে প্রবাহিত জল                      জেনে গেল আত্মপরিচয় (উৎস, ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে, পৃ.৯)

চঞ্চল আশরাফের এই আত্মপরিচয় তাকে দেখিয়ে দেয় ‘ধুলোর আড়ালে ধুলো, ধুলোর প্রকাশ্য ধুলো মানুষেরা’ কারা কতটপা দূরত্বে বসবাস করে। কিন্তু সেই দূরত্বে বা নৈকট্যে তিনি আলোড়িত হন না। তাকে নাড়িয়ে দেয় বাস্তব পার হওয়া, কি বাস্তবতার গভীরে থাকা আগুন ও ছাইভস্মময় বেঁচে থাকার সূত্রগুলো। এর যেগুলো নিরেট ও বস্তুকাঠামোর বাইরে তাছাড়া তার বিচারবিবেচনাগুলো কবিতায় পরাবাস্তবতার লক্ষণাক্রান্ত—

দু’পাশে চুলের গোছা মাঝখানে উপচানো চোখ চোখের ভেতর থেকে                             বেরিয়ে পড়েছে স্তন (মুখ, ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে, পৃ.৩০)

বা

তার বুক থেকে পালিয়েছে স্তন, সেখানে রয়েছে ঝুলে মৃত ঠোঁট, বহু পুরুষের! (প্রেক্ষিত, ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে, পৃ. ৩১)

এবং তার সমস্ত পরিপ্রেক্ষিতে একদিকে থাকে অপ্রেম ও যৌনতায় মেশানো ক্রূরতা এবং অন্যদিকে থাকে ততটাই প্রেমময়তা এবং শরীরী সংবেদনায় মেশানো করুণা এবং প্রবল একটা ঠাট্টার বোধ। গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো-র একেবারে শুরু থেকে সেই গভীর ঠাট্টার বোধ আমাদের সচকিত করে তোলে—

প্রকৃত জড়িয়ে থাকে এই সাপ নির্বাচিত বৃক্ষদের সুঠাম শাখায় আঠাময় জিহ্বার চকিত প্রকাশ দেখে                                                  শূন্যতায় ....তবু শরীর পেঁচিয়ে-থাকা ওই সব সশব্দ নিঃশ্বাস রাতের বাতাস ঘন হয়ে ওঠে

সে অভিজ্ঞতা সুখকর, ব্যথানির্ভর নীল

ভোরবেলা নেমে পড়ো, যেতে হবে বিষের সন্ধানে... (শিকার, গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো, পৃ.৯)

কবিতার মাধ্যমে চৈতন্যে কোলাহল নয়, বরং নৈঃশব্দ্য তৈরির এই যে প্রক্রিয়া তা আসলে পাঠককে তার চৈতন্যে একটা বিমূঢ়তা তৈরি করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রই যেন তার কবিতা ধারণ করে। নইলে তিনি কেন লেখেন—

সবচেয়ে বড় খেলা ক্ষমতা আর নারীচিত্ত হরণের—খেলোয়াড় ঘিরে এখানে দর্শকও আছে...

খেলতে খেলতে , দেখতে দেখতে একদিন সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসে। অন্ধকার নামে। মাটির ভেতর কীটের খেলার সামগ্রী হয়ে যায় প্রাক্তন                                                                            খেলোয়াড় (খেলা, গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো, পৃ.১০)

এই কটি কথার ভেতরে একটা নির্মম ক্রূর ঠাট্টায় ভরা হাসি শোনা যায়। গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো বইয়ের স্তরে স্তরে চঞ্চল আশরাফের এই হাসির বোধ আমাদের সেই আধুনিকতার সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটায় যা আমরা আধুনিককালে মিলান কুন্ডেরার গল্প-উপন্যাসের মধ্যে দেখেছি, আর এখানে দেখেছি সন্দীপন চট্টপাধ্যায়ের গদ্যে। চঞ্চলের ঠাট্টার ভেতর থেকে একেবারে হৈ হৈ করে, কিন্তু শব্দহীনভাবে, এমন এক পোড়াগন্ধ যেটি একেবারেই অভিনব।

আমাকে পেঁচিয়ে ফেলে গোপনতাকামী আগুনের সুতোগুলো, যতই প্রকাশ্য হতে চাই, চাপা পড়ি তার হাসির তলায়

অন্তর্বাস থেকে ছুটি নিয়ে দ্যাখো, সে কেমন বেরিয়ে পড়েছে— আর, স্বপ্নে হারিয়ে ফেলা হাসিসহ জড়িয়ে ধরেছে তাকে বিরহলাঞ্ছিত প্রেমিকের দল (স্ট্র্যাপ, গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো, পৃ.১১)

এবং কবিতার ভেতরে তার নির্মিত পরিস্থিতি, যে গল্পগুলোর মুখোমুখি আমরা হই, বা হতে বাধ্য হই সেখানেও থাকে ওই নৈঃশব্দ্যে ভরা হাসির ক্রূরতা—

একদিন মোমবাাতির আগুনে তর্জনী বুলিয়ে                  বুঝেছিলাম আত্মহত্যা সবার জন্য নয়

একদিন ছাদে শাড়ি মেলে-দেওয়া বিষণ্ন মহিলাকে                          জড়িয়ে ধরেছিলাম স্বপ্নের ভেতর .....

আর একদিন মনে হলো—এসব কিছুই দেয়ালে হিসির পর উবে-যাওয়া মূত্ররেখার চেয়ে বেশি অর্থ                                    ধারণ করে না (স্মৃতিচারণ, গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো, পৃ.১২)


চঞ্চল আশরাফেরও এক নিজস্ব ভঙ্গি আছে শব্দকে নিয়ে নিজের জমিতে ভিন্ন রকমের ফসল ফলানোর।


মাঝে মাঝে মনে হয় জাগরণ ও নিদ্রা, জল ও আগুন—এমনি কিছু বৈপরীত্য দিয়ে তিনি তার কবিতাকে ঘিরে ফেলতে চেয়েছেন। এবং পরক্ষণেই আমরা দেখি, তার দেওয়া প্রাচীর ভেঙে শব্দগুলো সেদিকে ধাবিত হয় যেখানে তিনি আদতে তাদের নিয়ে যেতে চান—

ঘুমের ভেতর তারা গেয়ে গেল: স্রোত ও বাতাসের মধ্যে আমরা                                           এভাবেই থাকি আমাদের মাথার ওপর খুব নিচু হয়ে উড়ে যায় গোধূলিপীড়িত পাখি (স্রোত ও বাতাস, গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো, পৃ. ১৯)

এর পরের কবিতা ‘প্রাপ্তবয়স্কের ডায়েরি’তে তিনি লেখেন—

গোধূলি সরিয়ে সমুদ্র সরিয়ে বিয়ারের ফেনা থেকে বেরিয়ে পড়ল                       পৃথিবীর বিখ্যাত যৌন অপরাধগুলি

(প্রাপ্তবয়স্কের ডায়েরি, গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো, পৃ. ২০)

আধুনিক কবিতা নির্মাণের যে সূক্ষ্মতা আশরাফের কবিতায় তার নমুনা ছড়ানো আছে। তিনি তার অন্তর্গত আর্তি এবং বিক্ষোভের সামঞ্জস্য তৈরি করেন। আবার তার কবিতাতে আমরা সেই অসংলগ্নতা বা খাপছাড়া ব্যাপারগুলো খুব একটা দেখি না—যেগুলো বেশিরভাগ ‘আধুনিক’ কবিতার গায়ে লেগে থাকে। আবার তা বহুবর্ণ কাঁচের গম্বুজও নয় যেখান থেকে অনন্তের শ্বেতপ্রভা বিচ্ছুরিত হয়। কিন্তু তার কবিতা আধুনিক কবিতার সেই প্রতিতুলনা তৈরি করে। সরল ও জটিল, প্রাকাশ্য ও গোপন—পাশাপাশি এই মিশ্রণ তার কবিতায় অভিঘাত সৃষ্টি করে। তার কবিতার রসায়নিক বিস্ফোরণ গদ্যের ভাষাকে উত্তেজনার ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়। তিনি লিখছেন কবিতা, কিন্তু তাতে মেশানো গদ্যের ধারা একেকটি কবিতাকে এমন এক স্থিতিস্থাপকতা দেয়, যাতে সেখানে ঘটানো রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি সেখানে থেকে, মানে সেখানে বিরাজমান থেকেই আমাদের মধ্যে স্তব্ধতার বোধ তৈরি করে দেয়—

আমাদের ইতিহাস মৃত রাজাদের হট্টগোলে তৈরি                                       মানুষের দীর্ঘ নীরবতা

সেই উঁচু ইস্টিশন আমিও চেয়েছি; মইয়ের ধাপগুলো দেখেছি হিসাব করে—স্বপ্নের ভেতর সে-উচ্চতা স্পর্শমাত্র পড়ে গেছি অনেক গভীর-নিচে

তখন বাইরে বৃষ্টি, মধ্যরাত—আর শস্যভূমি ভেদ-করা                                                                       সেই গান (পাশ ফেরার গান, গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো, পৃ.২১)

আঁরি মিশোর কবিতার মতো চঞ্চলের কবিতায়ও ‘সুদূর অন্তঃপুরে’ কি ‘অন্তঃস্থ সুদূরে’র দিকে গিয়ে সৃষ্টিকে দেখে নেওয়া বিষয়টাও প্রত্যক্ষ করতে চায়। মিশোর একমাত্র চিন্তা ছিল কী করে ‘‘প্রতিকূল বিশ্বের ঘিরে-থাকা শক্তিগুলোকে অকেজো করে রাখা” যায় (লোকনাথ ভট্টাচার্যের অনুবাদ ‘আঁরি মিশো : একস্তম্ভ শিলা’ থেকে)। মিশো মনে করতেন, ‘আমি আছি, আর আছে আমার জমি, আর যা আছে, তা পর!’ (ঐ) মনে করতেন, ক্লান্তিই তার একমাত্র মাদক। তার জেদ যেন, ‘একটি শব্দকেও আমি থাকতে দেবো না তার নিজস্ব অর্থে বা আকারে।’ (ঐ) চঞ্চল আশরাফেরও এক নিজস্ব ভঙ্গি আছে শব্দকে নিয়ে নিজের জমিতে ভিন্ন রকমের ফসল ফলানোর—

যে ফসল ফলিয়েছ বলে পাহাড়চূড়ায় বসে গড়িয়ে দাও হাস্যধ্বনি, উপত্যাকায় নতর্কীও পারে সেটা, নাচের মুদ্রার ফাঁকে দেখেছ, পুরুষ তাকে কতটা চেয়েছে!

ফসলের জন্য লাগে ক্ষুধা, জাগাতেও হয়                             রক্তের গোপনতাসহ বাজাতেও হয় খুব কাছে গিয়ে                                 দূরত্বের ঘণ্টাধ্বনি (নারীর ভেতর কাঁপে, গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো, পৃ. ২৭)

চঞ্চল আশরাফের কবিতায় বারবার ফিরে আসে শরীর ও যৌনতার অনুষঙ্গগুলো। পাশাপাশি তার আড়ালে প্রেম নিয়ে ঠাট্টা চলে। স্থিরবিশ্বাসের ভূমি তিনি কাঁপিয়ে দেন। কারণ স্থিরবিশ্বাস বলে তার মতে কিছু নেই থাকতে পারে না। সবকিছু কম্পমান এবং ভেতর থেকে বাইরে প্রকাশমান। এর বাইরে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। ফলে একটা নগদা-নগদি ব্যাপার থেকে যায়, পূরণ করার মানে সেখানে তাৎক্ষণিকতার দায় পূরণ—

...কার কোমর কে দেয় দুলিয়ে এই ঝাপসা আকাশপর্দায়? নির্জনতা থেকে ছুটে আসছে প্রত্যুষের ট্রেন। তার মনে পড়ে ফজরের নামাজ হয় নি পড়া—মৃত্যুর পর হবে না আঙুর খাওয়া বিনা পরিশ্রমে; কিন্তু স্বপ্নের আপেল কেন সে হারাবে! (মাস্টার্বেশন, গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো, পৃ. ৩৮)

বা

ভেবেছি শরীর বেয়ে উঠব চূড়ায়— যখন চেয়েছি হতে কাছকাছি গোপনাতাকামী আগুনের রেখাগুলো প্রাকশ্যে কেঁপে-কেঁপে সমুদ্রে হারালো

(ঘুমন্ত নারী দিকে, গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো, পৃ. ৩৯)

বা

সমুদ্র উঠল দুলে, জাহাজ কি তৈরি হলো? সঙ্কেতের কঠোরতা নিয়ে সবকিছু স্থির                                                         ঝড়ের ভেতর                                                         জাহাজ কি তৈরি? এখনো রয়েছে জেগে যে-মাটি, সেখানে                                                         দাঁড়াও সবাই মৃতদের রেখে এসো, সঙ্গে থাকুক শুধু                                                         ঝুঁকির কাহিনী (ডুবে যেতে যেতে, গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো, পৃ.৪০)

বা

বহুগামিতার বীজ যেখানেই বুনে দাও উঠে আসবে উদ্ভিদ, রোমঞ্চতাড়িত             মৃতের চুম্বন থেকে (বহুগামিতার বীজ, গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো, পৃ.৪১)


আমাদের অনুভূতিকে ভিন্ন এক অভিযানের দিকে অবিরাম নিয়ে চলেন কবি। চঞ্চল আশরাফের গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো বইয়ের কবিতাগুলোয় সেই নৈঃশব্দ্যময় অভিযান আছে।


গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো’ বইয়ে ৩৮টি কবিতার ভেতর একেবারে শেষ দুটো কবিতা ‘নবজাতক’ ও ‘ঋষব, তোর জন্য’ ছাড়া প্রায় সব কবিতায় তার নির্মম ঠাট্টার ধ্বনি আমাদের কানে এসে বাজে। তিনি ঠাট্টা করেন কারণ আমাদের বেঁচে থাকাটাকে তার প্রহসনময় বলে মনে হয়। ‘আহার’, ‘প্রতিসাম্য’, ‘সার্কাসের তাঁবু থেকে’, ‘বিবেকনামা’-এর মতো কবিতাগুলোতে একটা মন্দ্রগাম্ভীর্য আছে, কিন্তু সেখানেও এই বেঁচে থাকার নানান প্রহসনময় বাস্তবতা বেরিয়ে পড়ে।

কবিতা তো বাস্তবতাকে ধরাও নয়, নির্মাণ নয়। এখানে ঘাসের ভেতরে ঘাস, আকাশে ওপারে আকাশ দেখা যায়। ফলে প্রকৃত আধুনিক কবিতা আমাদের প্রকট বিকট সংকটের চেহারাটা যেভাবে ধরতে পারে আর কোনো কিছুতে এত অল্পে সেটি ধরে দেওয়া কঠিন।

বেঁচে থাকার জন্য আমাদের নিত্য শিকারে বেরিয়ে পড়ার বিপরীত দিকে থাকে কত কত মৃত্যুর দৃশ্য। সেই গভীরতায় দড়ি নামানোর কাজটি এক আধুনিক কবি পারেন। পারেন বলেই কবিতা তার প্রচলিত ছকের মধ্যে থেকে বেরিয়ে পড়ে আমাদের চৈতন্যে অভিঘাত তৈরি করে। তাতে কখনো আমরা আলোড়িত হই। কখনো স্তব্ধ হই। কিন্তু আমাদের অনুভূতিকে ভিন্ন এক অভিযানের দিকে অবিরাম নিয়ে চলেন কবি। চঞ্চল আশরাফের গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো বইয়ের কবিতাগুলোয় সেই নৈঃশব্দ্যময় অভিযান আছে। এই অভিযান আমাদের মুগ্ধ করে না, বরং প্রায়শই আমাদের দিকে মুঠি তুলে ধরে। আমাদের আঘাত করে। আমরা দেখি আমাদের গোপনগহ্বর থেকে বেরিয়ে আসছে ঠাট্টা, যৌনতা, অপারগতার গ্লানি এবং প্রত্যাখানের সাহস। এমনই নানা বৈপরীত্যের সামনে চঞ্চল আশরাফ আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন এবং তার কবিতা থেকে আমরা কোনটা বেছে নেব তিনি কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে কেটে পড়েন। কারণ তিনি আধুনিক। পাঠকের পরোয়া তিনি করেন না।

হামীম কামরুল হক

হামীম কামরুল হক

জন্ম ২২ জানুয়ারি ১৯৭৩। দাদার বাড়ি ফরিদপুর, বাংলাদেশ। নানার বাড়ি বর্ধমান,...বিস্তারিত