কোরিয়ার সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্য: কয়েকটি প্রাথমিক বিবেচনা

একজন কোরীয় লেখক, গবেষক, বা যদি ধরি, এর বাইরে থাকা ব্যক্তিও, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে যা যা জানেন, আমরা সেসব নিশ্চিত করে বলতে পারি না। তবে আমরা কোরিয়ার কথা নানানভাবে জানি। যেমন আমরা জানি, কোরিয়া দুটো দেশে ভাগ হয়েছে ১৯৪৫ সালে—উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া। প্রায় কাছাকাছি সময়ে বাংলা ভাগ হয়েছে ১৯৪৭ সালে। তৈরি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান, পরে বাংলাদেশ। কোরিয়ার ভাগ দ্বিতীয় যুদ্ধ ও ঔপনিবেশিকতার ফল, বাংলা ভাগের বেলায়ও তাই। তবে কোরিয়ার ক্ষেত্রে এ যুদ্ধে জাপানের পরাজয় এবং বাংলার ক্ষেত্রে জয়ী ব্রিটিশের শাসন-কাঠামো ও ব্যয়নির্বাহে দুর্বল হয়ে যাওয়া—সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন যুক্ত ছিল।

আমরা জানি, বর্তমানে উত্তর কোরিয়ায় চলছে কমিউনিস্ট একনায়কতন্ত্র ধরনের শাসনব্যবস্থা আর দক্ষিণ কোরিয়া গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী শিউলে ১৯৮৮ সালে বিশ্ব-অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আসর বসে। একশো মিটার দৌড়ে বর্ণিল নখের অধিকারিণী কৃষ্ণাঙ্গ সুন্দরী, ‘ফ্লো জো’ নামে খ্যাত, ফ্লোরেন্স গ্রিফিথ জয়নারের কথা সেই প্রজন্মের অনেকেরই মনে থাকতে পারে। পুরুষদের একশো মিটার দৌড়ে কানাডার বেন জনসন প্রথম হলেও ডোপ পরীক্ষায় তার রক্তে ড্রাগ ধরা পড়লে পদক বাতিল হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কার্ল লুইসকে প্রথম ঘোষণা করা হয়। এ ঘটনাটিও সিউল অলিম্পিকে অত্যন্ত সাড়া জাগিয়েছিল। 

এভাবেই গত শতকের আশির দশকে প্রথম আমাদের কোরিয়ার সঙ্গে নতুন করে পরিচিত ঘটে। হাল আমলে কোরিয়ার পরিচিতি সিনেমা ও সংগীত দিয়ে। সিনেমায় কিম কি-দুকের, গ্যাংনাম স্টাইলের পিসে এবং কোরীয় তরুণদের ব্যান্ড বিটিএস সারা পৃথিবীতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশে কোরীয় সংগীতের জয়জয়কার। অনেক শিশু-কিশোর এতটাই কোরীয় সংগীতের অনুরক্ত যে অল্প বয়সে তারা কোরিয়ার ভাষা পর্যন্ত নিজে থেকে আয়ত্ত করে ফেলেছে। 

ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইউটিউবে কোরীয় নাটক-সিনেমাও এতে বিরাট ভূমিকা পালন করছে। সেই তুলনায় কোরীয় সাহিত্যের ততটা জোয়ার বাংলায় নেই। কবি হিসেবে কো উন এবং ঔপন্যাসিক হিসেবে ২০১৬ ম্যান বুকার পাওয়া হাং কাং ছাড়া কোরীয় সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের প্রায় কিছুই জানা ছিল না। তবে প্রথমে কো উনের একটি কবিতা সংকলন ২০১৭ সালে বাংলাদেশে এলটিআই কোরিয়ার সহায়তায় প্রকাশিত হয়, বলতে গেলে এটিই প্রথম কোরিয়ার সাহিত্যের সঙ্গে বাংলা ও বাংলাদেশের সাহিত্যের সরাসরি সংযোগ। অতি সম্প্রতি ঢাকার 'উজান প্রকাশন' থেকে কোরিয়ার গল্প (২০২০) ও কোরিয়ার কবিতা (২০২০)-র অনুবাদ প্রকাশিত। এতেও এলটিআই কোরিয়ার সহযোগিতা ছিল। ঢাকার 'সময় প্রকাশন' থেকে ২০২০ সালেই বাংলায় অনূদিত হয় হাং কাং-এর দ্য ভেজিটেরিয়্যান উপন্যাসটি। 

তবে বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে কোরিয়ার সংযোগকে আমরা আরেকটু পিছিয়ে দেখতে পারি। বিশেষভাবে যুক্ত করতে পারি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পেয়ে সারা পৃথিবীর বৌদ্ধিক মহলে খ্যাতিমান। এক কোরীয় যুবকের সঙ্গে তাঁর কানাডায় দেখা হয়। (প্রভাতকুমার, ১৪১৭: ৩৯৮) কোরিয়া তখন জাপানের অধীনে, যা ওই কোরীয় যুবকের একদমই পছন্দ নয়। তাঁর মতে, ‘‘এমন একটা সময় আসবে যখন পৃথিবীতে জাপানী চীনীয় রুশীয় কোরীয় প্রভৃতি নানান জাতির মধ্যে আর্থিক-স্বার্থগত রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতাই সবচেয়ে ঐতিহাসিক ঘটনারূপে থাকবে না।’’(রবীন্দ্রনাথ, ১৪১৫: ৬১৫) তাঁর মতে, পৃথিবী শোষক ও শোষিতে দুভাগ হয়ে যাবে। সে বলে, ‘‘আজ পৃথিবীতে যে যুগান্তকারী দ্বন্দ্বের সূচনা হয়েছে সে ভিন্ন ভিন্ন মহাজাতির মধ্যে নয়, মানুষের এই দুই বিভাগের মধ্যে, শাসয়িতা এবং শাসিত, শোষায়িতা এবং শুষ্ক। এখানে কোরীয় এবং জাপানী, প্রাচ্যও পাশ্চাত্য এক পঙ্‌ক্তিতেই মেলে। আমাদের দুঃখই আমাদের দৈন্যই আমাদের মহাশক্তি। সেইটেতেই জগৎ জুড়ে আমাদের সম্মিলন এবং সেইটেতেই ভবিষ্যৎকে আমরা অধিকার করব।’’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৪১৫: ৬১৬) প্রভাতকুমার এ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘‘যুবকের মত এই যে, পরাভূত এবং পদানত জাতির দুঃখদৈন্যই তাহাদের মহাশক্তিশালী করিবে।’’ (প্রভাতকুমার, ১৪১৭: ৩৯৮)

কোরীয় যুবকের এই ভাবনাটিই ব্রিটিশ শাসনাধীন ও পরে দেশভাগকৃত বাংলা অঞ্চলের বহু যুবকের মনের কথা ছিল, নয় কি? 

কোরিয়ার নবজাগরণ দেরিতে হলেও বিপুলভাবে এখন প্রতীয়মান। কেউ কেউ মনে করেন এর পেছনেও রবীন্দ্রনাথের একটি প্রচ্ছন্ন ভূমিকা আছে। কোরিয়ার সেই জাপানের অধীন দশার ভেতরে এক কোরীয় সাংবাদিক যুবক রবীন্দ্রনাথকে কোরিয়ার জন্য কিছু লিখে দিতে বলেন। রবীন্দ্রনাথ ইংরেজিতে লেখেন: 

In the golden age of Asia 
Korea was one of the lamp-bearers 
And that lamp is waiting to be lighted again
For the illumination in the East.

এশিয়ার স্বর্ণযুগে কোরিয়া 
ছিল এর আলোকবর্তিকাধারীদের অন্যতম 
এবং সেই আলোকবর্তিকা আবারও 
জ্বলে উঠতে অপেক্ষা করছে 
পুরো প্রাচ্যকে আলোকিত করার জন্য। 

সোজা কথায় কোরিয়া হবে এশিয়ার আগামীদিনের সূর্য। রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলি লিখে নিয়ে কোরীয় যুবক চলে যায়, এবং কদিন পরে কোরিয়ার সমস্ত দৈনিকে ছাপা হয় রবীন্দ্রনাথের এই বাণী এবং কোরিয়ায় দেখা দেয় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা। বলা হয়, সেই প্রেরণায় ফলশ্রুতিই আজকের কোরিয়া।

আজ সারা পৃথিবীতে কোরিয়া বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নত জাতি হিসেবে উঠে দাঁড়িয়েছে। যদিও এর ভেতরে একটি কিন্তু আছে। তা হলো কোরিয়ার জনমানসের ভেতরে নিহিত জাপানি ও ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক মানসিকতার বোধ।

বর্তমানে কোরিয়ার মতো সমৃদ্ধ দেশের এই দশার সমান্তরালে দেখি বাংলা অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত হীনদশা। যদিও সাহিত্যক্ষেত্রে বাংলা ভাষার কবি-লেখক রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, যা কোরিয়ার সাহিত্যের কারো ভাগ্যে এখনও জোটে নি। বোধ করি এই একটি দিকেই বাংলা সাহিত্য কোরিয়ার চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু কোরিয়া কবিতার কো উন-এর মতো বাংলা সাহিত্যের কোনো কবি-র কি বিশ্বখ্যাতি আছে এখন? বা বাংলা সাহিত্যের কেউ উপন্যাস লিখে ম্যান বুকার পুরস্কার পেতে পারেন—এই সম্ভাবনা এখনও বোধ করি সুদূর পরাহত। তারপরও কোরিয়ার সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের তুলনামূলক আলোচনা করতে গেলে আমাদের বেশ কিছু বিষয় বিশেষভাবে সচকিত করবে।


বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, সাহিত্যের প্রধান উদ্দেশ্যে একটি হলো সৌন্দর্য সৃষ্টি করা, আরেকটি হলো কল্যাণসাধন। সৌন্দর্যবোধ সাহিত্য থেকে মনে ও শরীরে যায় কিনা, বা সৌন্দর্য থেকেই সাহিত্য সৃষ্টি হয় কিনা এই নিয়ে বিরাট দার্শনিক তর্ক তো কত হয়েছে। কোরীয় নারীদের সৌন্দর্যচর্চার বিষয়টি একজন গবেষক তিনটি পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে বলে উল্লেখ করেছেন—১. পরিষ্কার করা (Cleaning), ২. বর্ণের সমতা রক্ষা করা (Toning) ৩. আর্দ্রীকরণ (Moisturization)। (মধুশ্রবা,২০১৩:৬৫) 

কোরীয় সৌন্দর্যচর্চার এই বিষয়টি প্রতীকী অর্থে ধরলেও পুরো কোরিয়া দীর্ঘদিন সময় নিয়েছে পরিষ্কার হতে, কিন্তু তার আগেই দেখা দিয়েছে দেশভাগ। বর্তমানে দুই বর্ণের কোরিয়া আমাদের সামনে দৃশ্যমান। সেই কোরিয়া থেকে ঘটেছে দেশান্তর ও অভিবাসন। তেমনি একজন অভিবাসী মানুষ সৌন্দর্যকে দেখছেন ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট থেকে। তিনি ‘সৌন্দর্যের সুরক্ষা’ নামের একটি বই লিখেছেন, যেখানে উঠে এসেছে মূলত বর্তমান বিশ্বের গভীর সাংস্কৃতিক সংকটের কথা। তিনি বইটির শেষে বলছেন: ‘‘The saving of beauty is the saving of that which commits us.’’ (Byung-Chul,2018:75) ‘‘সুন্দরকে রক্ষা করার মানে যা আমাদের দায়বদ্ধ করে সেটিকেই রক্ষা করা।’’—এ কথাটি হলো বুয়ুঙ্গ-ছুল হানের ‘সেভিং বিউটি’ বইয়ের শেষ কথা।

বুয়ুঙ্গ-ছুল হান একজন সংস্কৃতি বিষয়ক-তাত্ত্বিক। বলাবাহুল্য তিনি জন্মেছিলেন কোরিয়ায়। বর্তমানে জার্মানিতে থাকেন। সেখানে বার্লিনে ইউনিভার্সিটি অব দ্যা আর্টস (ইউ.ডিকে)-এ দর্শন ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নে অধ্যাপনা করেন। তাঁর বিখ্যাত বইয়ের ভেতরে আছে দ্য সেন্ট অব টাইম, দ্য ট্রান্সপারেন্সি সোসাইটি, দ্য বার্নআউট সোসাইটি এবং সেভিং বিউটি। লেখেন জার্মান ভাষায়। সেভিং বিউটি, জার্মানে যার নাম ‘দাই ইরেটাঙ্গ দেস শেনেন’ Die Errettung des Schonen—এ বইটি যখন প্রকাশিত হয়, ততদিনে তাঁর বইয়ের সংখ্যা কুড়ি পেরিয়ে গেছে। আমরা তাকে বলতে পারি কোরীয় বংশোদ্ভূত জার্মান-তাত্ত্বিক। 

হান তাঁর সেভিং বিউটি-তে আমাদের নন্দনচিন্তার সংকটটি সর্বব্যাপ্তভাবে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। চৌদ্দটি পরিচ্ছেদে লেখা আশি পৃষ্ঠার ছোট্ট একটি বই। শিল্পসাহিত্যে ও আমাদের চিন্তায় মসৃণতা, হাওয়াই তুলিতে ঘষে তৈরি করার সৌন্দর্য (এয়ারব্রাসড বিউটি) অর্থাৎ মেকি নকল সৌন্দর্যের ধারণা যেভাবে তৈরি হয়েছে তাতে শিল্পের যে দাঁতনখ আছে, এটা যে কামড়ে ধরতে পারে—সেই বিষয়টিই আমরা যেন ভুলে যেতে চলেছি। তিনি এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চান। কাজটি অত্যন্ত দরকারি, হান এই বইতে কলিজা নাড়ানো এক একটি বক্তব্যে আমাদের আসলে একটু একটু করে অপরাধী করে দেন। একই সঙ্গে একটু একটু করে জেগে উঠতে থাকে আমাদের প্রতিরোধবোধ।

মজার বিষয় হলো, হান এই বইয়ের চৌদ্দটি পরিচ্ছেদ রচনায় যাদের শরণ ও স্মরণ নিয়েছেন, যাদের কথার দোহাই দিয়েছেন, তাঁদের সবাই ইউরোপীয়। জর্জ উইলহেম ফ্রেডরিক হেগেল, রোলাঁ বার্ত, হ্যান্স-গিয়র্গ গাদামার, জর্জ বাতাই, কার্ল রোসেনক্রাঞ্জ, জাঁ ব্রদিলার, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন, থিয়োডর অ্যার্ডোনো প্রমুখের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই যুক্ত হয়েছেন প্লেটো, এডমুন্ড বার্ক এবং ইম্মানুয়েল কান্ট। আছেন জোহান উলফোগং গ্যোয়েটে,  সেন্ট অগাস্টিন, আর্থার শোপেন হাওয়ার, ফ্রেডারিক নিৎসে, মার্টিন হাইডেগার, জ্যাক দেরিদা, রাইনার মারিয়া রিলকে, ইভা ইলোৎ, কার্ল স্কিমিৎ, হানা আরেন্থ, ইলেন স্কারি, মিশেল থিওনিসেন, মিশেল প্রুস্ত, মরিস ব্লাশো, আঁলা বাদিয়ু—মোদ্দা কথা একজন কোরীয় মানুষ হয়েও তিনি এশীয় কোনো চিন্তক এমনকি কোরীয় দার্শনিক-ভাবুকের কথা আনেন নি। বৌদ্ধ, তাও, জেন, শামানিজম বা সিন্টো মতবাদে সৌন্দের্যের ধারণা কেমন সেসবের শরণ তিনি নেন নি। কেন নেন নি?

এবার বাংলা সাহিত্যের অত্যাধুনিক কবি অনন্য রায়ের কিছু কথা দেখে নেওয়া যাক। তিনি ‘বিষ্ণু দে সম্পর্কে ছেঁড়া খসড়া’তে লিখেছেন, ‘‘বিষ্ণু দে-র কবিতা ছিল প্রধানত রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতার (বা আস্তিকতার) positive সমালোচনা—রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর-চেতনার খোলশ ভেঙে তাকে বাস্তব এবং গুহ্য-সমাজতন্ত্র হিসেবে প্রতিপন্ন করা।’’ (অনন্য, ২০২৩:২৯৭) তাঁর মতে, ‘‘রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার কাছে বিষ্ণু দে যথেষ্ট লীন; রবীন্দ্রনাথের কক্ষপথে এক বিপরীতমুখী উপগ্রহ বিশেষ।’’(অনন্য, ২০২৩:২৯৭) অনন্যর ভাষ্যে বিষ্ণু দে যা সজ্ঞানে করতে চেয়ে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছেন, তা-ই সাধন করেছেন জীবনানন্দ দাশ, মানে রবীন্দ্রনাথকে উল্টে দিয়েছেন।‘‘ তবুও, জীবনানন্দের কৃতিত্বটা মূলত—কিয়ের্কেগার্দ নয়—অপ্রকৃতিস্থ মার্কসের। তিনিই যথার্থ বিপ্লবী।’’(অনন্য, ২০২৩:২৯৭) তিনি ছোট এই লেখাটি শেষ করেছেন একটি আশাবাদ ব্যক্ত করে: ‘‘আমরা এখন বাংলা কবিতায় এক প্রকৃত বাস্তব মার্কসের অপেক্ষায় আছি।’’(অনন্য, ২০২৩:২৯৭) 

লক্ষণীয়, যে একজন কোরীয় বংশোদ্ভূত জার্মান সংস্কৃতি-তাত্ত্বিকের চিন্তা-ভাবনার আশ্রয় মূলত ইউরোপীয় চিন্তকেরা। এবং একজন ভারতীয় বাঙালি কবির আশাবাদ বাংলা কবিতায় একজন ‘প্রকৃতিস্থ মার্কসে’র আগমনের—এই দুটো বিষয়ই আমাদের দেখিয়ে দেয়, যে আমরা কিভাবে পশ্চিমা ভাবধারায় আদিষ্ট, নির্দিষ্ট করে বললে ঔপনিবেশিক মানসিকতা আমাদের দুরপনেয় ক্ষতের মতো আমাদের ‘আধুনিক’দের ভেতরে বিরাজমান।

কোরীয় সাহিত্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের তুলনামূলক আলোচনার অনেক সূত্রই আমরা খুঁজে পেতে পারি, কিন্তু যে সূত্রটি আপাত অর্থে এই দুই ভাষা ও সাহিত্যে মুক্তির হাওয়া খোলা হাওয়া আনলেও, শেষাবধি এর শেকলে পরিণত হয়েছে, এমন শৃংখল তৈরি করেছে—যাকে আমরা আমাদের জন্য কল্যাণকর মনে করেছি। আদতে তাই আমাদের সাহিত্যের শিরদাঁড়া তৈরি এক জটিল বাধা হয়ে আছে। আমি ‘কঠিন’ বলতে পারতাম কিন্তু ‘জটিল’ বলেছি, কারণ বিষয়টা জটপাকানো দড়ির মতো, ইটের দেওয়ালের মতো কঠিন বাধা নয়। ইটের দেওয়াল ভেঙে ফেললেই হলো, কিন্তু জটিলতার বিষয়টি পশ্চিমা চিন্তা, পশ্চিমা ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে এতটাই এঁটে তৈরি যে এখন আর এর হাত থেকে ‘মুক্তি’ নেওয়া, একে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে, বাতিল করে কোরীয় ও বাংলাদেশের সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের আঙ্গিনায় এর সদম্ভ নয়, উজ্জ্বল কিন্তু বিনম্র উপস্থিতি ঘোষণা করবে—সেই বাস্তবতা আর নেই। পশ্চিমা প্রভাবকে মেনে নিয়েই এই দুই সাহিত্যের নিজস্ব যাত্রাপথ কিভাবে তৈরি করতে হবে—সে প্রসঙ্গে একটু পরে আলোকপাত করা হবে।


আমরা সবাই জানি, তুলনামূলক সাহিত্য কোনো সাহিত্য নয়, আমরা যেমন সংস্কৃত সাহিত্য, তামিল সাহিত্য, তেলেগু সাহিত্য, হিন্দি সাহিত্য, নেপালি সাহিত্য, কোরীয় সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্য বা ফরাসি, জার্মান, ইতালীয়, স্পেনীয়, পর্তুগিজ ভাষায় নিজ নিজ সাহিত্যকীর্তি আছে; কারণ তুলনামূলক সাহিত্য কোনো ভাষা নয়। এটি হচ্ছে বিশ্বসাহিত্যকে পাঠ করার একটি পদ্ধতি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই তাঁর ‘বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘‘...ইংরেজিতে আপনারা তাহাকে Comparative Literature নাম দিয়েছেন। বাংলায় আমি তাহাকে বিশ্বসাহিত্য বলিব।’’(রবীন্দ্রনাধ, ১৪১৫:৬৪৭)

কোরিয়া সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রসঙ্গ আমরা শুরুতেই স্মরণ করেছি। আমরা জানি, গ্যেয়েটের বিশ্বসাহিত্যের ধারণাটি জাতীয় সাহিত্য পার হয়ে যে যে সাহিত্য বিদ্যমান—সেখানে সেখানে আলো ফেলার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জাত। বলা বাহুল্য, আজকের তুলনামূলক সাহিত্যের বীজ গ্যেয়েটের চিন্তাজাত। কিন্তু তুলনামূলক সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্য একটি অন্যটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হলে দুয়ের পার্থক্য আছে। 

রাহুল দাশগুপ্তের ‘কেন তুলনামূলক সাহিত্য?’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘‘অনেকেই বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে তুলনামূলক সাহিত্যকে গুলিয়ে ফেলেন। তুলনামূলক সাহিত্যে আমরা বিশ্বসাহিত্যই পাঠ করি। কিন্তু বিশ্বসাহিত্য ব্যাপারটি বেশ এলোমেলো। বিশ্বের সমস্ত দেশের সমস্ত ভাষার গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকীর্তিগুলিই বিশ্বসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। তুলনামূলক সাহিত্য হলো বিশ্বসাহিত্য পাঠ করার একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি। এটি একটি ডিসিপ্লিন, যা এলোমেলোভাবে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির সাহায্যে বা মেথোডলজিতে বিশ্বসাহিত্যকে পড়তে শেখায়। তুলনামূলক সাহিত্যচর্চা বলতে সেই প্রক্রিয়াকেই বোঝায় যার সূত্রপাত হবে পাঠ্যবস্তু থেকে।’’( রাহুল, ২০১১:২৮) 

রাহুল তুলনামূলক সাহিত্যের যে মেথোডলজির সাতটি তাত্ত্বিক ধারার কথাও উল্লেখ করেছেন, সেগুলি হলো: ১. প্রসঙ্গতত্ত্ব (Thematology), ২. বর্গতত্ত্ব (Genealogy), ৩. ইতিহাসবিদ্যা(Historiography) ৪.সাহিত্যিক প্রভাব (Influence), ৫. প্রতিগ্রহণ (Reacietion), ৬. সাহিত্যিক ইতিহাস (Literary History),৭. অনুবাদ তত্ত্ব (Translation Theory)। (রাহুল, ২০১১:২৮)

প্রসঙ্গতত্ত্ব কোনো প্রসঙ্গকে ভিত্তি করা হয়। যেমন: ঔপনিবেশিকতা, যুদ্ধ, দেশভাগ ইত্যাদি। যেমন ইলিয়াড ও ওয়ার অ্যান্ড পিসকে যুদ্ধের প্রসঙ্গ ধরে তুলনামূলক আলোচনা করা যায়। এতে একইসঙ্গে মহাকাব্য ও উপন্যাস—দুটি ভিন্ন বর্গের তুলনা হয়েছে—এটা আবার বর্গতত্ত্বেরও অন্তর্ভুক্ত। আবার কোনো বিষয়, যেমন ঔপনিবেশিকতাকে রবীন্দ্রনাথ ও আলবেয়ার কাম্যু কিভাবে দেখেছেন—এটা ইতিহাসবিদ্যার বিষয়। 

সাহিত্যের প্রভাব আবিষ্কার তুলনামূলক সাহিত্যের ভিত্তিগত বিষয়ের একটি। যেমন: তুলনামূলক সাহিত্যের ফরাসি স্কুল বা ধারা এর সূচনালগ্নে সাহিত্যের প্রভাবকেই তুলনামূলক আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করত। হোমারের প্রভাব ভার্জিলের ওপর, ভার্জিলের প্রভাব দান্তের ওপর—এভাবে দুই ঐতিহ্যের দুই কালের সাহিত্যস্রষ্টা ও সাহিত্যকীর্তির প্রভাবের বিচার করা যায়। 

প্রতিগ্রহণ বলতে কোনো এক বা একাধিক উৎস থেকে উপকরণ ও প্রকরণ গ্রহণ করে ভিন্নমাত্রায় এমনকি পুরো উল্টে দেওয়ার কাজ করা, যেমনটা মাইকেল মধুসূদন করেছিলেন গ্রিক, লাটিন, সংস্কৃতি, ইংরেজি সাহিত্য থেকে বিচিত্র সব দিক নিয়ে মেঘনাদবধ কাব্য লিখে। 

সাহিত্যের ইতিহাস নামের বিষয়টি বিবেচ্য হয়, ইতিহাসের পর্বে-পর্বান্তরে সাহিত্যের বাঁকবদল ঘটলে। যেমন রোমান্টিসিজম বা ভক্তি-আন্দোলন, রেনেসাঁস বা রিয়ালিজম—ইত্যাদির ঐতিহাসিকতা বিচার করে তার পরিপ্রেক্ষিতে তুলনামূলক আলোচনা। আর অনুবাদতত্ত্বের সাহায্যে বিভিন্ন ভাষা ও সাহিত্যের গ্রন্থগুলির অনুবাদের যৌক্তিকতা ও পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে তুলনামূলকতার পরিসরে নিয়ে আসার বিষয়টি আলোচনা করা হয়। (রাহুল, ২০১১:২৯-৩০)

কোরিয়ার সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের তুলনামূলক আলোচনার ক্ষেত্রে আমরা এই সাতটি দিক থেকেই দেখতে পারি। দেখতে পারি, আরো সহজ দিক থেকেও। কারণ তুলনামূলক সাহিত্য মূলত, অন্যকে জেনে নিজেকে জানার  যে-পথ তৈরি করে—এর সূচনায় নিজের সাহিত্যকে জানা, নিজের সাহিত্যের সংকট ও সম্ভাবনার দিকগুলি খতিয়ে দেখার উপায় সন্ধানও যুক্ত হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের (গান: ‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতম হে’) ভাষায়, ‘‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ।’’(রবীন্দ্রনাথ,১৪০১: ৫১) বলতে গেলে তুলনামূলক সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্যটি বোঝার জন্য সবচেয়ে ভালো দৃষ্টান্ত।

৩.
কোরিয়ার সাহিত্যের ইতিহাস দেড় হাজার বছরের, অন্যদিকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস এক হাজার বছরের সামান্য বেশি। আমরা বর্তমান আলোচনায় কোরিয়ার সাহিত্যকে বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে চাচ্ছি এই দুয়ের ভেতরে সংযোগসূত্রগুলি, সঙ্গে এই দুয়ের বিশিষ্টতা ও স্বাতন্ত্র্য। 

লক্ষণীয় এখানে দক্ষিণ কোরিয়ার সাহিত্য বা বাংলাদেশের সাহিত্য বলা হচ্ছে না। কারণ দেশগত ভিন্নতার পরও দুটো ভাষা—কোরীয় ভাষা-সাহিত্য ও বাংলা ভাষা-সাহিত্য—দেশভাগের মাধ্যমে ভিন্ন দুটো অঞ্চলে চর্চিত হলেও মূলত একই ভাষা। ফলে শুরুতেই কোরিয়ার সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের এই উত্তর (কোরিয়া)-দক্ষিণে (দক্ষিণ কোরিয়া) ও পুবে (বাংলাদেশে)-পশ্চিমে (পশ্চিমবঙ্গে)—এই বিভেদ মুক্ত হয়ে নিতে হচ্ছে। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক এই দিকটির আরো গভীরে আছে কোরিয়া ও বাংলা অঞ্চলে বৌদ্ধমতবাদের প্রভাব। একইসঙ্গে দুই সাহিত্যের ভেতরে ঔপনিবেশিকতা, যুদ্ধ ও দেশভাগের প্রকট বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে কোরিয়া ও বাংলা সাহিত্যের আলোচনা হতে পারে। বৌদ্ধধর্ম, কনফুসীয় চিন্তাভাবনা, জেন, তাও এবং খ্রিষ্টধর্ম কোরিয়ার ধর্ম-সমাজ-সংস্কৃতিতে যেভাবে শেকড় গেঁড়েছে—এর তুলনায় বাংলা অঞ্চলেও হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্মের প্রভাবটি, জায়গায় জায়গা মিল ও অমিল দুই-ই সৃষ্টি করেছে। 

আমাদের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সূচনাই হচ্ছে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করা কবি মাইকেল মধুসূদনের হাত ধরে। যদিও রাজনারায়ণ বসু মাইকেলকে বলেছিলেন, মাইকেল ‘‘পরিচ্ছদ ও আহারে ইংরাজের মত হইলেও তোমার হৃদয়টা সম্পূর্ণ হিন্দু।’’ মাইকেল সেটি স্বীকারও করে নিয়েছিলেন; বলেছিলেন, ‘‘তুমি ঠিকই আন্দাজ করিয়াছ, আমি হিন্দু; কিন্তু একটা সমাজে ঘেঁষিয়া না থাকিলে চলে না, এই জন্য খ্রিষ্টীয় সমাজ ঘেঁষিয়া আছি।’’ (অভ্র, ২০২৩:১৩) 

বাংলা অঞ্চলে খ্রিষ্টীয় ধর্ম স্বমহিমায় বিরাজ করলেও কোরিয়ায়, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫৬% মানুষ এখন কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত নয়। এর পরেই আছে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৭% ভাগ মানুষ এর অন্তর্গত আর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী আছেন ১৫% ভাগ। ফলে এর সামাজিক-সংস্কৃতির ধরনটি অনেকটাই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের আওতায় নেই। অথচ বৌদ্ধচিন্তা ও মতাদর্শ কোরিয়ার মানসজগতের প্রধান প্রণোদনা। যেমন কোরিয়ার বিশ্ববিখ্যান কবি কো উন-এর ‘অনুরোধ’ কবিতায় আছে:

এমন অনেক
ডাল আছে
যে ডালে
কখনো বসেনি কোনো পাখি।

বলো না আমি একাকী একাকী।

আছে নাকি কোথাও এমন
কোনো ডাল
যে ডাল
কখনো দোলেনি বাতাসে?

বলো না আমি আছি
যন্ত্রণায়
হুতাশে।

(কো উন,২০১৭:৩৪)

এখানে একইসঙ্গে তাও মতবাদের সঙ্গে মরমি-ভাবনার আধুনিক জীবনজিজ্ঞাসা এসে মেলে। কোরিয়ার কবিতা এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রে এটি পূর্বাপর সংগতি (কনসিটেন্সি) নিয়ে বিদ্যমান। ফলে, বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কালে এর ইহজাগতিকা এতটাই প্রকট যে মনে হয়, এর কোনো অতীত ছিল না—বলে যদি কেউ আঙুল তোলেন, তাতে একটা জোর তো থাকেই। (ষড়ৈশ্বর্য, ২০১৭:১৫)।

চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বা মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, বা এ অঞ্চলের লৌকিক-পুরাণ-কথন অনেক ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যের কাব্যচর্চায় মূল ধারা হয়ে ওঠেনি। যদিও অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে, স্বয়ং আল মাহমুদের কবিতায় লৌকিকতার: ‘‘বাঙালি কৌমের কেলি কল্লোলিত কর কলাবতী/জানত না যা বাৎসায়ন, আর যত আর্যের যুবতী।’’ (আল মাহমুদ, ২০১৮:৬৫) দেহবাদ ও যৌনতার সঙ্গে এতে লৌকিকতার যত যোগ ততটা মরমি-চেতনার সঙ্গে নয়।

একটি কথা জোর দিয়েই বলা যায়, যে ফিলিস্তিন-ইসরাইল থেকে লেবানন, জর্ডান, সিরিয়া, (মাঝের সৌদি আরব ও এর সংলগ্ন ওমান, ইয়েমেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রুনাই, কাতার, কুয়েত) হয়ে ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, চিন, কোরিয়া, মঙ্গোলিয় এবং জাপান—এর সাহিত্য জুড়ে প্রাচীনকাল থেকে এখনো প্রধান হয়ে আছে কবিতা, এবং যে কবিতা মূলত গীতিময়, এবং পরিবেশনযোগ্য; সর্বোপরি সুর সংগীত ও কবিতা অভিন্ন হয়ে আছে। যদিও বাংলা কবিতার আধুনিকতার সূচনায়ই কবিতার সঙ্গে সংগীতের বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। তদুপরি কাব্য বা কবিতা বাংলা সাহিত্যের মূল ভিত্তি। এই একই পরিস্থিতি কোরিয়ার সাহিত্যেও। 

‘‘কোরিয়ার সাহিত্যের ইতিহাসে চোখ রাখলে দেখা যায় কবিতাই এর মূল ভিত্তি। কোরিয়ার প্রাচীন কালের কবিতা সমাজ ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য, লোককাহিনি, লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় পুরাণকে ভিত্তি করেই লেখা। এই কবিতা কিছুটা গানের ঢঙে ছন্দে লেখা। অর্থাৎ গাওয়ার উপযোগী করে লেখা।’’ ( ছন্দা, ২০২০:৯) 

বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এটি পরিলক্ষিত হয়, এবং বাংলা কাব্যের ধারা কেবল গেয়ই নয়, নৃত্য-বাদ্যসহযোগে অভিনীত হয়েছে প্রাচীন বাংলার কাব্যধারা। (সেলিম, ২০০৯:৩২৬) চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে মৈমনসিংহ গীতিকা তথা পূর্ববঙ্গ গীতিকার দিকে নজর দিলে বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। বাংলা কবিতায় মরমি-চেতনা একদম হারিয়ে গেছে তা নিশ্চয়ই নয়। একদম সাম্প্রতিক কবিতার দৃষ্টান্ত থেকে নিলেও সেটি দেখা যাবে। যেমন, রায়হান রাইন যখন লেখেন: 

নিশ্চয়ই তোমার শেষ তোমার ভেতর শুধু নয়? (রায়হান, ২০০৭:৫৩) 

বা শামীম রেজা যখন লেখেন:

পাহাড়ে উঠতে ক্লান্তি লাগে তবু কেন মানুষ পাহাড়ে ওঠে! (শামীম, ২০২২:১০৫) 

—উল্লিখিত দুজন কবির উক্তির একটি প্রশ্নবোধ দিয়ে, আরেকটি বিস্ময়চিহ্নে ইতি টানা। এই দুই আদতে মরমি-জিজ্ঞাসা ও মরমি-বিস্ময় নয় কি?

কোরিয়ার কবি কিম নাম-জু ‘একমুঠো ছাই’ কবিতায় লেখেন:

কীভাবে দেহ রক্তকে প্রবাহিত করে?
কীভাবে হৃদয় ফুল ফোটায়?
কীভাবে আত্মা আর দেহ এক হয়ে
গান করে এক সাথে রক্ত ও ফুলের সাথে?
আহ ফুল! আহ রক্ত
আহ রক্ত! আহ ফুল!
ফুলের মধ্যে রক্ত বয়ে চলে।
রক্তের মধ্যে ফুল দেখা যায়।
ফুলের মধ্যে মাংসও দেখা যেতে পারে।
রক্তের মধ্যে হৃদয় প্রবাহিত।

(কিম, ২০২০:২০)


৪.
আমরা দেখেছি, চারটি প্রধান কাব্যিক বিন্যাসের মধ্যে দিয়ে কোরিয়ার কবিতার পালাবদল ঘটেছে। সেগুলি হচ্ছে: হায়াগাং (দেশজ বা লোকজ কবিতা), পাইওগক (বিশেষ গান), চ্যাঙ্গা (দীর্ঘ কবিতা) সিজো (প্রচলিত সুর ও গাথা)। বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে চর্যাপদের সংকেতিক কবিতা, পরে মঙ্গলকাব্যের আখ্যানমূলক কবিতা এবং বৈষ্ণব পদাবলীর গীতিকবিতা যখন বাংলা কবিতা আধুনিকতার আদল পায়, সেটি পদ্য থেকে কবিতার অভিমুখী হয়ে ওঠে। সুর ও গাথা কোরিয়ার কবিতা যেভাবে বিদ্যমান বা দীর্ঘকবিতার ঐতিহ্য কবিতায় যেভাবে ক্রিয়াশীল বাংলা কবিতায় ততটা নয়, আধুনিক বাংলা কবিতা লিরিক থেকে মুক্ত হওয়াকে কবিতার মূল দিক বলে ধরে নিয়েছে। যদিও নির্মলেন্দু গুণ বা শ্রীজাত প্রমুখ কবির কবিতায় গীতলভাবটাই প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে।

কোরিয়ার কাব্যধারায় চিন ও জাপানের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রবল প্রভাব শুরু থেকেই ছিল। বাংলা কবিতায় সেদিক থেকে আদিকালে সংস্কৃত, পরে আরবি-ফারসি প্রভাবে সিক্ত হয়েছে। কিন্তু কি কোরিয়ার সাহিত্য কি বাংলা সাহিত্য দুয়ের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রভাবেই এ দুয়ের আধুনিকতা নির্মিত হয়েছে। বিংশ শতকের প্রথম দিকে কোরিয়ায় এবং বাংলা সাহিত্যের তিরিশের দশকের শুরু থেকে এই পাশ্চাত্যপ্রভাব বিপুলভাবে দেখা দিয়েছে।

‘‘এই শতকের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছন্দ আর গানের রোমান্টিক ধারাকে সরিয়ে দিয়ে কবিতায় এক নতুন মাত্রা নিয়ে আসে।’’ ( ছন্দা, ২০২০:৯)—বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে এটি প্রায় হুবহু প্রযোজ্য হতে পারে। একই সঙ্গে কোরিয়ায় দেখি ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সালের জাপানি আগ্রাসন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুই কোরিয়ার যুদ্ধ (১৯৫০-১৯৫৩) এবং ১৯৬০ সালের বিপ্লবী আন্দোলন কোরিয়ার আধুনিক কবিতাকে প্রভাবিত করেছে ভীষণভাবে। (ছন্দা, ২০২০:৯) একইভাবে বলা যায়, ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্যায়ে গত শতকের চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মারী-মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগ, পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলায় ভাষা আন্দোলন, পশ্চিমবাংলা কমিউনিস্ট আন্দোলন, পূর্ব পাকিস্তানে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তর দশকের পশ্চিমবঙ্গে নকশালবাড়ি আন্দোলন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের সাহিত্যে উল্লিখিত প্রতিটি ঘটনা বিশেষভাবে ছাপ ফেলেছে। বিশেষ করে পশ্চিমসঙ্গে সাহিত্যের দেশভাগ এবং বাংলাদেশের সাহিত্যে ভাষা আন্দোলন ও  মুক্তিযুদ্ধের বিপুল প্রভাব লক্ষ করা যায়। 

আবারও খেয়াল করি যে, দেশভাগের মধ্যে দিয়ে বাংলা সাহিত্য বিভক্ত হয় ১৯৪৭ সালে; অন্যদিকে ১৯৪৫ সালে বিভক্ত হয় কোরিয়া। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মর্মান্তিক বিচ্ছেদের বেদনাতুল্য বাংলাভাগের বেদনাও। পঞ্চাশ দশকের বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠাজুড়ে বিভক্ত বাঙালি জাতির আর্তনাদ শোনা যায়। বিশেষ করে ছোটগল্প ও উপন্যাসে সেটি বিশেষভাবে ফুটে ওঠে।

এখানে বলে রাখা ভালো কোরিয়ার গদ্য সাহিত্যের সূচনা হয় সতেরো শতকে। যদিও কোরিয়ার সাহিত্য তখন চিনা ভাষার আধিপত্য। সে সময় থেকে কথাসাহিত্যের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ইয়াংবান ও পানসোরি ধারায় কোরিয়ার গদ্য ও কথাসাহিত্য লেখা হতে থাকে। ইয়াংবান ধারায় চারটি বিষয়ে জোরালো হয়ে ওঠে : ইতিহাস, জীবনী, আত্মজীবনী এবং কাব্যতত্ত্ব মীমাংসা। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্র গদ্যচর্চার সূচনা হয় উনিশশতকের গোড়ায়।

কোরিয়ার কথাসাহিত্যের প্রথম ধ্রুপদি রচনা কিম সী-সেয়াপ-এর লেখা ‘গিয়োমো সিনওয়া’, যেটি ছিল মূলত চিনা ভাষায় লেখা। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এমন হওয়াটা ভাবা যায় না যে, বাংলা সাহিত্য অন্য ভাষায় লেখা হচ্ছে।  

পানসোরি লেখকরা আসেন সতেরো শতকের শেষ দিকে এবং আঠারো শতকের প্রথমদিকে। এসব লেখা আদি ও ঐতিহ্যবাহী প্রথাবদ্ধ গানের ওপর ভিত্তি করে লেখা। কোরিয়ার সাহিত্যে জোসেয়ন পর্বের মধ্যবর্তী সময়ে প্যারাবল জাতীয় গল্প লেখা শুরু হয়। চিনা প্রথাবদ্ধ ও সংস্কাচ্ছন্ন দশা থেকে বেরিয়ে ওই সময়ের লেখকরা সাধারণ মানুষদের নিয়ে লিখতে শুরু করেন। কোরিয়ার সাহিত্যে ফোকলোর এবং মৌখিক সাহিত্যের প্রভাবও যথেষ্ট ছিল।

তবে উনিশ শতক থেকে কি কোরিয়ার সাহিত্যে কি বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূচনা হয়। কোরিয়ায় কবিতা ফরাসি প্রভাব, বাংলা কবিতা ইংরেজি কবিতার প্রভাব এই আধুনিকতার প্রথমে দেখা দেয়। উপন্যাসের ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যে কোরিয়ার সাহিত্যের সামান্য একটু আগে ১৮৫৮ সালে আলালের ঘরের দুলাল লেখা হয়ে যায়। এরও আগে নববাবু বিলাস (১৮২৫), ফুলমণি ও করুণার বিবরণ (১৮৫২), ঐতিহাসিক উপন্যাস (১৮৫৭), দূরাকাঙ্ক্ষের বৃথাভ্রমণ (১৮৫৭-৫৮) লেখা হয়ে গেছে। এবং ১৮৬৫ সালে দুর্গেশনন্দিনী লেখার মধ্যে দিয়ে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের যাত্রা শুরু হয়। 

অন্যদিকে ১৮৯৩ সারে জন বানিয়ানের ‘প্রিলগ্রিমস প্রগ্রেস’ কোরীয় ভাষায় অনুবাদ করেন জেমস স্কার্থ গালে। বাইবেলের অনুবাদ হয় ১৯১০ সালে। ইউরোপীয় নন্দনচিন্তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে কোরিয়ার ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি জুড়ে।

আরো একটি বিষয় কোরীয় ভাষার ইতিহাস অনেক প্রাচীন হলেও কোরিয়ার নিজস্ব লিখনপদ্ধতি ‘হ্যাঙ্গুল’ আবিষ্কৃত হয় পনেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে। (Peter, 2003:xiii) সে এগারো শতকে বাংলা লিপি ও লিখনপদ্ধতি সূচনা দেখতে পাওয়া যায়। (ড.সুবীর, ২০১০:৯১) তবে বাংলা লিপির প্রথম নিশ্চিত নির্দশন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ধরলে কোরীয় লিপির মতো বাংলা লিখনপদ্ধতির নিশ্চিত সূচনাও চৌদ্দ-পনেরো শতকে। ফলে কাছাকাছি সময়ে দুই ভাষার লিপির প্রকৃত সূচনাকাল। 

কোরিয়ার হ্যাঙ্গুল রীতির বিকাশের সঙ্গে বিকশিত হতে থাকে কোরিয়ার সাহিত্য। আর উনিশ শতকেই এই রীতির মাধ্যমেই কোরিয়ার সাহিত্যের রেনেসাঁর সৃষ্টি হয়। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও দেখি উনিশশতকে সৃষ্টি হয় বঙ্গীয় রেনেসাঁর। যদিও এ নিয়ে তর্ক আছে, কিন্তু আদতে রেনেসাঁ সবসময় গুটি কয়েক গোষ্ঠী ও উচ্চশিক্ষাসম্পন্ন ও অভিজাত মানুষের ফলশ্রুতি। অন্নদাশঙ্কর রায় তাই লেখেন, ‘‘রেনেসাঁস তো অগ্রসরদের নিয়েই হয়। সর্বজন দিয়ে নয়।’’( অন্নদাশঙ্কর, ২০০১:২০৪)  

কোরিয়া ও বাংলা অঞ্চলে রেনেসাঁস, রিফমের্শন, এনাইটেনমেন্ট, আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব-লক্ষণও প্রায় সেই অর্থে কাছাকাছি। সেই সঙ্গে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়—কোরীয় সাহিত্যের যুগকে সাধারণত দুটি ভাগে দেখা হয়: ধ্রুপদি ও  আধুনিক। বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ তিনটি স্তরের বিভক্ত: প্রাচীনযুগ , মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ। কোরীয় সাহিত্যের বিকাশের অন্যতম দিকটিও ফের স্মরণ করি যে, একসময় ধ্রুপদি চিনা ভাষায় কোরীয় সাহিত্য লেখা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এমনটা ভাবা যায় না যে বাংলা সাহিত্য ভিন্ন ভাষায় লেখা হতে পারে। যদিও পাকিস্তানি শাসনামলে রোমান হরফে, আরবি হরফে এমনকি উর্দু হরফে বাংলা লেখার একটা প্রক্রিয়া শুরুর ভাবনা কারো কারো চিন্তায় দেখা দিয়েছিল। বলাবাহুল্য এটি ঔপনিবেশিক বাস্তবতারই ফল। হরফের দিক থেকে নিজস্বতা এলেও কোরিয়ার সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যে ইউরোপীয় ও পশ্চিমা আচ্ছন্নতা এখনও কম প্রবল নয়। এখানেও কোরীয় সাহিত্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের পরিস্থিতির মিল আছে। যদিও বুয়ুঙ্গ-ছুল হানে দার্শনিক প্রতীতি প্রকটভাবে পশ্চিমালগ্ন ও অনন্য রায়ের ভাবনায়ও প্রতিতুলনাটি মনে রাখি, তাহলে আমাদের নিজের নিজের নান্দিকতায় স্নাত হওয়ার জল আমরা তাহলে কবে তৈরি করতে পারব? যদি প্রশ্ন ওঠে পশ্চিমা নন্দনতত্ত্ব উন্নত আধুনিক কার্যকর হলে কেন আমরা তা গ্রহণ করব না? কিন্তু পাল্টা প্রশ্ন এই যে, কোরীয় বা বাংলা অঞ্চলের মানুষের নন্দনচিন্তা দুর্বল—সেটি কিসের ভিত্তিতে আমরা বলছি? ফলে বুয়ুঙ্গ-ছুল হান নয়, আমরা তাকাতে পারি, কিভাবে ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে কোন কোন ব্যক্তি ভূমিকা পালন করছেন সেখানে। যেমন: কোনিয়ার এনগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো বা গায়েত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক আমাদের সাহিত্যের ওই জায়গাটিতে জোর দিয়েছেন। ঔপনিবেশিক সময়য়ে আদি-মধ্য-অন্তের সাহিত্য পরিস্থিতি তথা রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাদ দিয়ে উপনিবেশ-লাঞ্ছিত দেশগুলির সাহিত্য-অধ্যয়নে বিরাট ফাঁক রয়ে যাবে।

৫.
কোরিয়ার এক অদ্ভুত সময় জাপানি সাম্রাজ্যবাদী শাসন (১৯১০-১৯৪৫)—পঁয়ত্রিশ বছর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পাকিস্তানি শাসনও ঔপনিবেশিকতার রূপ নিয়েছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল—প্রায় পঁচিশ বছরে। কোরিয়াকে শিল্প-সংস্কৃতিতে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে জাপান যেন তারই অনুলিপি (ফটোকপি) করতে আগ্রহী ছিল। জাপানের শক্তিমত্তার কাছে কোরিয়া সবদিক থেকেই দুর্বল। রবীন্দ্রনাথের রাশিয়ার চিঠিতে ‘কোরীয় যুবকের রাষ্ট্রিক মত’ কোরিয়ার সেই সময়ে দশাদুর্দশায় ব্যাকুল এবং উৎক্ষিপ্ত যুবকের ভেতরে স্বাধীন কোরিয়ার স্বপ্ন দীপ্ত হওয়ার কথা শুরুতেই বলা হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কোরিয়া ভবিষ্যতের আশঙ্কাজনক আভাসও মেলে। (রবীন্দ্রনাথ, ১৪১৫: ৬১৪-৬১৬) বলেছি যে, ১৯২৯ সালের এই সময়ে কোরিয়া জাপানের কব্জায়। রাশিয়ার কোরিয়া দখল করবে কিনা করবে না—এই দোলাচলও তখনও ক্রিয়াশীল ছিল। ফলে বিশ শতকের কোরিয়াকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের হাতে একইসঙ্গে লাঞ্ছিত ও উন্নত করার যে যুগপৎ প্রক্রিয়ার ভেতর থাকতে দেখি তাতে কোরিয়ার সাহিত্যের নিজস্বতা অর্জনে সময় লাগে। ততদিনে বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের বিপুল সৃষ্টিকর্ম, তাঁর পরবর্তীকালে গদ্যে-পদ্যে-কবিতায় ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের বাংলা সাহিত্য এর স্বর্ণযুগেই পর্দাপণ করে ফেলেছে। 

কোরিয়ার লেখকেরা গত শতকের ষাটের দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী কথাসাহিত্যকে গড়ে তোলায় আত্মনিয়োগ করেন। এতে পশ্চিমা আধুনিকবাদের প্রভাবে প্রকট হয়ে ওঠে কথাসাহিত্যের প্রথাগত মানবতাবাদী ধারা। বাংলা কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রেও ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রভাব বাড়তে থাকে। কিন্তু এটি যতটা আধুনিক ছিল, ততটা আধুনিকবাদী ছিল না। ফলে বাংলা কথাসাহিত্য বিশেষভাবে বাস্তববাদী ধারায়ই স্নাত হয়েছে। যদি একইসময়ে কবিতায় পরাবাস্তববাদ, প্রতীকবাদ, অভিব্যক্তিবাদ ইত্যাদি সাহিত্য-মতাবাদে সিক্ত হতে দেরি করে নি।

সত্তর দশকের দক্ষিণ কোরিয়া শিল্পপ্রযুক্তির বিপুল বিস্ফোরণ ও নগরায়ণের দিকে যাত্রা করলে সাহিত্যে এর ছাপ পড়ে। জাপানি সাহিত্যের ইউরোপীয় আধুনিকবাদ কোরীয় সাহিত্যেরও অন্যতম অন্বিষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে আমরা দেখতে পাই ২০১৬ হাং কাং-এর লেখা দ্য ভেজিটেরিয়্যান উপন্যাসটি আন্তর্জাতিক ম্যানবুকার জিতে নিতে। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় আধুনিকবাদ ততটা প্রবল হয়ে উঠতে পারে নি। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্য সেই পরিসরে যেতে পারে নি।

৬.
শুরুতেই বলেছিলাম, ‘কোরিয়ার কবিতা’ ও ‘কোরিয়ার গল্পে’র অনুবাদ বাংলাদেশে প্রকাশিত হওয়া মাধ্যমেই যতটুকু কোরীয় সাহিত্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের যোগ। উল্টোদিক কোরিয়ায় বাংলা সাহিত্যের যোগ কতটুকু? বোধ করি রবীন্দ্রনাথ দিয়েই সংযোগের সূচনাটি ঘটেছিল। কিন্তু বর্তমানে কোরীয় ভাষায় বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ ততটা জোরদার নয়। ফলে কোরিয়ার সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের ভেতরে নতুন বিনিময়ের বিপুল অবকাশ আছে। তবে ঔপনিবেশিকতা, ইউরোপীয় আধুনিকতার একপাক্ষিক অনুসরণ কোনো দেশের সাহিত্যেরই বিকাশের সহায়ক বলে মনে হচ্ছে না। 

আমাদের সৌন্দর্যচেতনা ও নন্দনবোধের ভেতরে নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে পশ্চিমা তথা সারা বিশ্বের যোগাযোগ ও বিনিময় আগামীদিনের কোরিয়ার সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের বিশ্বযাত্রায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। নইলে তুমুল তুখোড় সংস্কৃতি-তাত্ত্বিক হয়ে বা কবি হয়েও ইউরোপীয় ‘নন্দনতাত্ত্বিক জ্বিনের আসর’ হতে রেহাই না মিললে কোরিয়ার সাহিত্যের কী হবে বলা মুশকিল। কিন্তু বাংলা সাহিত্য এক আধিভৌতিক দশায় পড়ে থাকবে, বার বার মার্কসের মতো কবি লেখকদের যাচ্ঞা করবে, নিজের মতো রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ দাশ-অতিক্রমী প্রত্যয় তৈরি হওয়া তো দূরের কথা, ব্যক্তও করতে পারবে না।


তথ্য ও গ্রন্থপঞ্জি

অনন্য রায় (২০২৩)। ক্রৌঞ্চদ্বীপ, অনন্য রায় সংখ্যা, সম্পাদক: স্নেহাশিস রায়, কলকাতা
অন্নদাশঙ্কর রায় (২০০১)। ‘বাংলার রেনেসাঁস: পুনর্ভাবনা’, শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, বাণীশিল্প, কলকাতা
অভ্র বসু (২০২৩)। মধুসূদনের কথা, গাঙচিল, কলকাতা
আল মাহমুদ (২০১৮)। ‘সোনালি কাবিন ২’, সোনালি কাবিন, আল মাহমুদের শ্রেষ্ঠ কবিতা, হাওলাদার প্রকাশনী, ঢাকা
কিম নাম-জু (২০২০)। ‘একমুঠো ছাই’, কোরিয়ার কবিতা, অনুবাদ: ছন্দা মাহবুব, উজান প্রকাশন, ঢাকা
কো উন (২০১৭)। ‘অনুরোধ’, খুলির নীরবতা: কো উনের কবিতা, অনুবাদ ও ভূমিকা: ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ, প্রকৃতি
ছন্দা মাহবুব (২০২০)। ভূমিকা, কোরিয়ার কবিতা, উজান প্রকাশন, ঢাকা
ড. সুবীর মণ্ডল (২০১০)। বাংলালিপির উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (১৪১৭, ভাদ্র)। রবীন্দ্রজীবনী, তৃতীয় খণ্ড, বিশ্বভারতী গ্রন্থবিভাগ, কলকাতা
মধুশ্রবা দাশগুপ্ত (২০১৩)। সৌন্দর্য সন্ধানে, কারিগর, কলকাতা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৪০১, মাঘ)। গীতবিতান, বিশ্বভারতী, কলকাতা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৪১৫, পৌষ)। ‘বিশ্বসাহিত্য’, সাহিত্য, চতুর্থ খণ্ড, রবীন্দ্ররচনাবলী, বিশ্বভারতী, কলকাতা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৪১৫ পৌষ)। ‘কোরীয় যুবকের রাষ্ট্রিক মত’, রাশিয়ার চিঠি, দশম খণ্ড, রবীন্দ্ররচনাবলী, বিশ্বভারতী, কলকাতা
রায়হান রাইন (২০০৭)। ‘ নিশ্চয়ই তোমার শেষ তোমার ভেতর শুধু নয়’, তুমি ও সবুজ ঘোড়া, ব্যাস প্রকাশনা, ঢাকা
রাহুল দাশগুপ্ত (২০১১)। ‘কেন তুলনামূলক সাহিত্য?’, তুলনামূলক সাহিত্য: একটি তীর্যক পর্যালোচনা, সম্পাদনা: সুমন গুণ, একুশ শতক, কলকাতা
শামীম রেজা (২০২২)। তিপান্ন, যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে, শ্রেষ্ঠ কবিতা, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা
ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ (২০১৭)। ভূমিকা, খুলির নীরবতা: কো উনের কবিতা, অনুবাদ ও ভূমিকা: ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ, প্রকৃতি
সেলিম আল দীন (২০০৯)। মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য, সেলিম আল দীন রচনাসমগ্র, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা
Byung-Chul Han (2018). Saving Beauty, Translated by Danial Steuer, Polity. London
Peter H Lee (2003). A Histoy of Korean Literature, Cambridge University Press, Cambridge
হামীম কামরুল হক

হামীম কামরুল হক

জন্ম ২২ জানুয়ারি ১৯৭৩। দাদার বাড়ি ফরিদপুর, বাংলাদেশ। নানার বাড়ি বর্ধমান,...বিস্তারিত