বই থেকে : পাখিরা কোথাও অতিথি নয়

জুমার দিনের ফুটবল ম্যাচ ❑❑

আমি আতর বিক্রেতা করিম মিয়ার ছোট ছেলে বজলুর বন্ধু। বজলু আমাদের পাড়ার ম্যারাডোনা, পাড়ার পেলে। প্রত্যেক জুমার দিন ভোরে মসজিদ ঝাড় দ্যায় আর ফ্লোরে কার্পেট বিছায়। আগামী শুক্রবার আমাদের পাড়ার সাথে উত্তর পাড়ার ফুটবল খেলা। নিশ্চিত সবাই, বজলু মিয়া গোলের পর গোল দিয়ে পাড়ায় ছড়াবে আতরের ঘ্রাণ। গতকাল গ্রীষ্মের গরমে ফুটবল খেলে মসজিদের কলে মুখ-হাত ধুয়েছি। গতকাল জার্সি কিনতে গিয়েছিলাম নিউমার্কেটে। সেখানে পোলার আইসক্রিম খেয়েছি। হায়, খেলা মানে এখানে পাড়ায় পাড়ায় মারামারি। —ফুটবল কি তবে ডায়নোসরের ডিম? —ফুটবল কি আদমবোমা! —ফুটবল দিয়েও যুদ্ধ হয় দেশের সাথে দেশের! বজলু মিয়ার ফুটবল ছুটে যাচ্ছে পশ্চিম থেকে আরও পশ্চিমের গোলপোস্টে। বিশ্ব রাজনীতি ক্রমশই ঘোলা হয়ে আসছে।

পাখিরা কোথাও অতিথি নয় ❑❑

[দেশভাগ কী?—ভাইয়ের বাড়িতে পাসপোর্ট নিয়ে যাওয়ার নাম। দেশভাগ হলে লাভ হয় কার?—কয়েকটি পরিবারের। বিদেশি শাসকের জায়গা নেয় কে?—দেশি শোষক দেশভাগের পর বেডরুম পড়েছিল বাংলাদেশে আর রান্নাঘর ভারতবর্ষে। পাসপোর্ট দেখিয়ে রান্নাঘরে যেতাম, পাসপোর্ট দেখিয়ে আসতাম ঘুমাতে। ছিলাম অর্ধেক ভারতীয়, অর্ধেক বাংলাদেশি। হায়, পূর্বপুরুষদের অপরাধী মনে হয়, পাখিরা তো ভাগ হয় নি! আমি ব্রিটিশ আমলে যখন বলতাম ‘বন্দে মাতরম’, ‘জয় হিন্দ’, ব্রিটিশরা বলত দেশদ্রোহী আর ভারতবাসী বলত দেশপ্রেমিক। দেশ ভাগ হলে হয়ে গেলাম পাকিস্তানি। পাকিস্তানে ‘জয় হিন্দ’ কিংবা ‘জয় বাংলা’ বললে বলা হতো দেশদ্রোহী। আর ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বললে দেশপ্রেমিক। দুই পাকিস্তান ভাগ হলো, জন্ম হলো বাংলাদেশের। —আজ পাকিস্তান জিন্দাবাদ মানে বর্বরতা। —জয় ভারত মানে ভারতের দালাল। দেশভাগ মানে আহা ভাইয়ের বাড়িতে পাসপোর্ট নিয়ে দাওয়াত খেতে যাওয়া। আগামী জন্মে আমি পরিযায়ী পাখি হব, বিনা ভিসায় সাইবেরিয়ায় যাব আর বাংলাদেশে আসব। শোনো হে, পাখিরা কোথাও অতিথি নয়!

হ্যালির ধূমকেতু ❑❑

ছায়াপথের মানচিত্র আঁকতে আঁকতে ঘুমিয়ে পড়ি। স্বপ্নে হ্যালি চাচার সাথে দেখা, হ্যালি চাচার নামে একটি ধূমকেতু আছে, ২০৬১ সালের কোনো এক সন্ধ্যায় দেখা যাবে। আমি সেদিন সকালে তোমাকে নিয়ে ধূমকেতু বানানোর কারখানায় যাব, ধূমকেতুর গুদামঘরে গিয়ে সেলফি তুলব। সন্ধ্যায় দুরবিন হাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকব, তুমি কিন্তু আমাকে বকবে না প্লিজ। একটা গোপন কথা বলি, শোনো, তোমাদের বাড়ির উঠোনে একটি সুচ রেখেছিলাম। ১০ হাজার বছর পর দেখলাম ১ সেন্টিমিটার ধুলো জমেছে ওটার ওপর। ১ মিলিয়ন বছর পর ওই ধুলো ১ মিটার উঁচু হলো। আজ দেখলাম ওই উঁচুতে কয়েকটি ওয়াইনের বোতল নৃত্য করছে। নক্ষত্রদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মৃত্যুর কয়েক মুহূর্ত আগে বিজ্ঞানী হ্যালি ওয়াইন খেতে চেয়েছিলেন, আর আমার হ্যালি চাচা পড়েছিলেন ‘লাকুম দিনুকুম ওয়াল ইয়াদিনযার যার ধর্ম তার তার’! আহা, হ্যালির ধূমকেতু যেদিন দেখা যাবে, সেদিন থাকব না আমি!

মাটি ও বিষ ❑❑

ফিরেছি মাটির কাছে, কীটনাশকে মরছে কীট         কাঁচা রাস্তায় শোয়ানো বালু আর লাল ইট। একি হায়, মাটিই আজ ফলাচ্ছে বিষ, সাপের ফণা তুলছে ধানের শিষ! আকাশে উড়ছে ধান        আকাশে উড়ছে সাপ            বিকলাঙ্গ হবে তোমার শিশু, সাপের অভিশাপ। ঠাডা পড়ছে ঠাডা               বাজ পড়ছে বাজ         তুমি প্রাচীন পাপের ডুবন্ত জাহাজ। ক্যামেরা উড়ে যায়        ক্রুদ্ধ পাগল ধমকায়         গ্রামে গ্রামে বজ্রবিদ্যুৎ চমকায়। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে লেখা, মানুষ নয় পুতুল দামি            অতীত রক্ত মেখে তৈরি আগামী; প্রশ্ন এখানে-ওখানে, কিছু না করে গাধা কেন নামী           প্রশ্ন শুনে সমুদ্রের তলে নাচে আয়ুকামী, ধনকামী। গাধাকে ঈর্ষা করে পুবের মেঘ, বাতাসে ওড়ে আগুন লেখা চেক; অগ্নিদেবতার বাহন ছাগল, ছাগলে সব খায় আগুন সব পোড়ায়। পুড়তে পুড়তে ভস্ম ভূমি, ভূমিহীনদের সাথে মহাশূন্যে ভাসছ তুমি। ভাসমান নৌকায় ভাজো মাছ,        মাছের বুক থেকে তুলে নাও কাঁটা আকাশ খুলে ওড়াও পাখি,           সাগরে-সাগরে ঘটাও জোয়ার-ভাটা সূর্যকে ছিঁড়তে ছিঁড়তে উঠে বসো, চিৎকার করে বলো, বিদায়-বিদায় টা-টা মহাসাগরে বানাও রুটিগাছের দ্বীপ, পানিতে মেশাও আগুন আর আটা মহাপ্রলয়ে ভেসে গেলে বাড়ি,        হাঁস হয়ে ভাসো জীবনে বাড়িয়ে পা-টা। তুমি তো জানো গোপন সত্য, নূহের প্লাবনে মাটি তলিয়ে গেলে ভেসে ছিল হাঁস হাঁসের পেটে ছিল সবুজ পৃথিবী-সবুজ ঘাস।

ফারাক্কা বাঁধ ❑❑

হেই, আমি ইবরাহিম গোয়ালার পুত্র কালো গাভির দুধ ফেরি করি চিপাগলির টুংটাং চায়ের স্টলে। জিহবার মতো নরম মাটির ক্ষেত থেকে আনা কালিজিরা বিক্রি করি ভোরের পাইকারি বাজারের মাঠে। ভাঙা সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে শুনি চামেলিবাগের ওষুধ বিক্রেতা মনু মিয়ার লেকচার। মনু মিয়া প্রাচীন ডুবোজাহাজ খুঁজতে গিয়ে পেয়েছিল নীল তিমির দাঁত। আমি শীতের জ্যাকেট গায়ে নক্ষত্রদের পাড়ায় খুঁজি খেজুরের রস। ইতিহাস আর সমাজবিজ্ঞানের বই পাঠিয়ে দিই আমলকির বনে। আমার পৃথিবীর সব গাছ নভোচারী হয়ে উড়ে যায় আগামী আকাশে! হেই, আমি নীল দালানের গ্রাম থেকে উড়ে আসা শাদা বক। পানিশূন্য পদ্মার পেটে দাঁড়িয়ে রেলশ্রমিকের সাথে চা খাই আর মাটি খুঁড়ে খুঁজি দাদার আমলের বলশালী ইলিশ। ভারত মাতার বানানো ফারাক্কা বাঁধের কাছে উট হয়ে চড়ে বেড়ায় আমার গ্রামের কালো গাভি। আমি মরুর বুকে গাড়ি চালানো মেহেদি হাসানের বন্ধু একদিন উটের দুধ ফেরি করব চিপাগলির ‘টুংটাং’ চায়ের স্টলে।

ট্রানজিস্টারের যুগে প্রতিবাদী কবিতা ❑❑

টিনের চালে খুব জোরে বৃষ্টি পড়তাছে। বিবিসির খবর স্পষ্ট শুনতে পাইতাছি না। ট্রানজিস্টারের ব্যাটারি কিনতে হইব, সানলাইট ব্যাটারি। বড় দ্যাশ গিল্লা খাইতাছে ছোট দ্যাশ, জাতিসংঘ মইরা যাইতাছে! মানুষেরা কি আর বাঁচব না? পাখিরা কি আর উড়ব না? মাছেরা কি আর সাঁতার কাটব না? জানালা খুইলা দেখি, বৃষ্টিতে ভেজে নারকেলগাছে পেরেকগাঁথা যৌনচিকিৎসার সাইনবোর্ড। ভেজা কাক উইড়া যায় বাজারের সিনেমা হলের দিকে। যৌনচিকিৎসার সাইনবোর্ড লইয়া নারকেলগাছ হইতে চায় জাতিসংঘের মহাসচিব!
ফেরদৌস মাহমুদ

ফেরদৌস মাহমুদ

জন্ম ৮ কার্তিক, ১৩৮৪; চরডিক্রি, মুলাদী, বরিশাল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর।...বিস্তারিত